ভবঘুরে কথা
উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা ৭১ এর স্মৃতি : পর্ব ষোল

-পারভেজ চৌধুরী

তিস্তায় ভারি মর্টারের গোলা বর্ষণ!
শনিবার, ৩ এপ্রিল ১৯৭১, তখন ভোর ৩টা হবে, হাল্কা ভূমিকম্পের মতো মাটি কেঁপে উঠার পর গভীর ‘ভুরউম’ শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। অন্ধকারেও দেখি বারান্দার অনেকেই আমার আগে জেগে উঠেছেন! কিসের শব্দ আমরা কেউ বুঝতে পারছি না, আকাশের মেঘ গর্জন? এখন বৈশাখ না এলেও আকাশে মেঘ হতে পারে, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার! চেয়ার থেকে না উঠে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করি, কিন্তু প্রায় আধাঘণ্টা পরই আবার সেই হাল্কা ভূমিকম্পের মতো মাটি কেঁপে উঠার সাথে সেই গভীর ‘ভুরউম’ শব্দ, এবার পরিষ্কার মনে হলো বোমা ফাটার শব্দ। আমরা বাবার কথায় বিমান আক্রমণের জন্য ট্রেঞ্চ খুঁড়ে বাঙ্কারের মতো করেছি। কিন্তু বারান্দার কেউ বললো এই শব্দ তারা আমার আগে একবার শুনেছে এবং এই নিয়ে তৃতীয় বা চতুর্থ বার শুনলো।

আমি উঠে ভেতরে গেলাম বাবা ও ওসি সাহেব দু’জনে শুয়ে থালেও জেগে আছেন। ততক্ষণে আবার মাটি কেঁপে উঠার সাথে সেই শব্দ। হসপাতালের ভেতরের গোল দেয়াল ঘড়িতে ভোর ৪:৩০মিনিটে। বাবা ও ওসি সাহেব নিশ্চিত এটা বিমান আক্রমণ নয়। বিমান এতো সময় আকাশে থাকে না; এতো সময় ধরে একটা একটা করে বোমা ফেলবে না। কামান বা ভারী মর্টারের শেলিং হচ্ছে সম্ভবত তিস্তায় বা আরো কাছে মহেন্দ্রনগরে গোলা পরছে। বাবাকে আমি তুলে বিছানায় বসিয়ে দিলাম। বিশাল উচ্চতার এই মানুষটা আসামের জুরহাটে তার কলেজ ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে প্রথম জীবনে ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীতে যোগ দিলেও যুদ্ধ শেষ হয়ায় আসাম পুলিশে যোগ দেন। আজ মানুষটাকে অন্যরকম লাগছে। বাথরুম থেকে বাবাকে নিয়ে আসার কিছু সময় পর ফজরের আজান পড়ার আগ মুহূর্তে আবারো ঐ ভারি গোলার শব্দ পেতে শুরু করলাম। এই শব্দ আমি চারবার শুনলেও জানতে পারলাম কিছু মানুষ পাঁচ/ছয় বার শুনেছেন। ওসি সাহেব অনেকটাই সুস্থ্য; নিজেই উঠতে পারলেন ও একাই বথরুমে গেলেন। স্টেশন মসজিদে ফজরের আজান শোনা গেলো। সেকালে মসজিদগুলোতে আজকের মতো উচ্চ শব্দের মাইকের ব্যবহার না থাকলেও এই নিস্তব্ধ ভোরে কাছের মসজিদের আজান পরিস্কার শুনতে পাচ্ছিলাম আমরা সকলে।

সেদিন খুব সকালেই থানার সহকারি অফিসার আব্দুল কাইউম সাহেব দুইজন অস্ত্রধারী কনস্টেবলসহ হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটে আসলেন। বাবা ও ওসি সাহাবের সাথে তার কথা বলার ধরণ দেখেই বুঝলাম তারা সকলেই খুব চিন্তিত, কেউ সঠিক উত্তর জানে না। সকাল ৮টার দিকে নিয়মমাফিক মা ও ওসি সাহেবের পরিবার খাবারদাবার নিয়ে আসলো। সকলেই আজ ভোরের গোলার শব্দ শুনেছেন। তবে তাদের আগমনে আতঙ্কিত পরিবেশের পরিবর্তন হলো।

নাস্তা খাবার সময় বাবা তোফায়েলকে স্টেশনে যেয়ে পুরো খবর জেনে আসতে বললেন। সেই সময় জিআরপির একজন বাঙ্গালী গোয়ান্দা কর্মচারি ভীত-সন্ত্রস্তভাবে হাসপাতালে আসলেন। জানা গেল, তিনি গতরাতে দ্বিতীয় গোলা বর্ষণ পর্যন্ত তিস্তা জংশনে ছিলেন। জনতা ইপিআরদের যথাসাধ্য সাহায্য করছে, গতকাল বিকালে(২ এপ্রিল) পাকিস্তানিরা ভারি মেশিনগান দিয়ে গোলাগুলি করলেও সেসব নদীর পশ্চিম পার থেকে, তাই ব্রিজের পূর্বপারের ইপিআররা তাদের বাংকারের ভেতরে নিরাপদে চুপ করে ছিল। স্টেশন থেকে তিস্তা ব্রিজ বা নদীর পূর্ব তীর প্রায় দেড় কিমি দক্ষিণে। রাতে স্থানীয় জনগণ স্টেশন বাজার এলাকায় কিছু মশাল নিয়ে মিছিল করেছে। মধ্যরাতের পর দ্বিতীয় বা তৃতীয় গোলা বর্ষণে উঁচু বিরাট লোহার পানির ট্যাংকে ও বাজারে আঘাত করে। ঐ সময়ে কিছু রেলের মানুষের সাথে তিনি ঠেলা ট্রলিতে করে মহেদ্রনগর পৌঁছান এবং একটু আগে লালমনিরহাট এসে পৌঁছান।

কিছু সময় পরই স্টেশনে কিছু জনতার ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনতে পেলাম। আমি নাস্তা না করেই হাসনাতকে রেখে তোফায়েলের সাথে স্টেশনে দিকে রওয়ানা দিলাম। স্টেশনে আজ সকালে সম্পূর্ণ যুদ্ধ সাজে সশস্ত্র ২৫/৩০জন নবাগত ইপিয়ার দলকে দেখি যারা কোনো বিওপি থেকে গরুর গাড়ি নিয়ে স্টেশনে আসে। তাদের নিয়েই জনতা উল্লাস করছে। ইপিআররা তিস্তা যাবার অপেক্ষায়। জনতা তাদের নাস্তা খাবার দিচ্ছে। তারা সবাই খুবই সতেজ ও উৎফুল্ল। স্টেশনে অল্প কিছু বাঙ্গালী কাজ করছেন। স্টেশন মাস্টারদের কেউ না থাকায় টেলিফোন বা টেলিগ্রাফ মেশিন ঘিরে অনেক উৎসুক মানষের ভিড়। স্টেশনের বাঙ্গালী টেলিগ্রাফ অপারেটর না থাকায় রেল কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল অফিসের কেউ কাজ করছেন। ঐ দুজন জিআরপির গোয়েন্দা ভিড়ের মধ্যেই আছেন, তারা তোফায়েলকে জানালো পাটগ্রাম-বুড়িমারি থেকে গাড়ি ফিরে নাই। জনতা নতুন ইপিআর দলের সাথে তিস্তায় যেতে চায়। তিস্তা বা মহেন্দ্রনগরে সাথে কোনো যোগাযোগ নাই তবে ভোরে যে ঠেলা ট্রলি নিয়ে তিস্তা থেকে কয়েকজন (একজন গোয়েন্দা) লালমনিরহাট পৌঁছে সেটাই আবার ফেরত যায় বিশদ খবর নিতে। তবে উত্তরের সকল স্টেশনের সাথে ও যোগাযোগ আছে। একজন রেল কর্মচারী জানালেন, তিস্তার খবর নিতে ট্রলি মেসেঞ্জারদের সময় লাগবে কারণ তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে এবং ফিরে আসবে। অন্যদিকে পাটগ্রাম থেকে ফিরে আসা গাড়িটি এখন কালিগঞ্জে দাঁড়িয়ে আছে, উত্তরের কয়েকটি স্টেশনে থেমে থেমে ইপিআর, আনসারদের জড় করে আনতে সময় লাগবে। তোফায়েল এই খবরটা আমাকে বাবা আর মোশাররফ চাচাকে জানাতে বললো; সে গাড়ি আদিতমারি পৌঁছলে তবে ফিরবে।

ফিরে এসে দেখি হাসনাতকে রেখে মা তওফিককে নিয়ে বাসায় চলে গেছেন, শুধু কমরুদ্দিন চাচা আছেন। হাসপাতালে গিয়ে নতুন একদল ইপিআরদের স্টেশনে আসার খবরসহ সব জানাই। আহত ইপিআর সদস্যরাও উৎসাহ নিয়ে আমার কথা শুনলো। দিনে হাসনাত থাকবে তাই আমি বাসায় চলে আসলাম। বেলা ১০টার দিকে স্টিম ইঞ্জিনের হুইসেল শুনে বুঝতে পারলাম রেলগাড়ি পৌঁছে গেছে। আমি বের হতে চাইলে মা আমার সাথে খাবার ও কিছু ফল দিতে চাইলো। মা ও তার রান্নায় সহকারী সেই মহিলা রান্নাঘরেই ব্যস্ত। গত দু’দিন মা সকাল-বিকাল হাসপাতালে আসাযাওয়া করায় বাসার অনেক কাজেই পিছিয়ে গেছেন, আমাকে তাই অপেক্ষা করতে হবে।

স্টেশন থেকে মানুষজনের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ও হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মার দেয়া সব খাবাদাবার নিয়ে দৌঁড়ে হাসপাতালে পৌঁছলাম। ওভারব্রিজ থেকেই প্লাটফর্মে মানুষ ও কয়কজন ইপিআর বা আনসার/পুলিসের জটলা দেখতে পেরাম, হাসপাতালে বাবার দু’জন গোয়েন্দা কথা বলছে। তিস্তা থেকে ক্যাপ্টেন সাহেবকে যত দ্রুত সম্ভব ইপিআরদের নিয়ে রেলগাড়ি তিস্তা ফেরত যেতে ও হতাহতদের হাসপাতালে সরাতে নির্দেশ দিরেন, ট্রেনে কোনো সাধারণ জনতাকে তিস্তায় যেতে সম্পূর্ণ নিষেধ কররেন।

সেই সময় ওসি মোশাররফ সাহেবের পারিবার ডাক্তার রহমান সাহেবকে বাসায় নিয়ে যেতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃৃৃপক্ষ তাকে আরো কয়েকদিন পূর্ণ বিশ্রামে থাকার উপদেশ দেন ও বলেন বাসায় গেলেই আবার থানা-পুলিশের কাজের ঝামেলায় জড়িয়ে গেলে বিশ্রাম হবে না। এখানে কেউ তাকে কাজের ঝামেলায় জড়াবে না তাছাড়া থানায় ছোট বাবু কাইউম সাহেবতো আছেনই।


তোফায়েলও আমাকে বাবার কাছে যেতে বললো কিন্তু আমি তার সাথে থাকতে চাই। এ সময় হুইসেল দিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করলে তোফায়েলসহ অন্য্যান্য্য্রা হই হুল্লোড় করেই উঠে পরা শুরু করলে আমিও তোফায়েল সাথে লাফিয়ে উঠে যাই।

তোফায়েল একবার হাসপাতালে এলেও কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে। আমি জানি এবারো সে কাউকে না জানিয়ে তিস্তায় যাবে; তাই সময় নষ্ট না করে হাসনাতের কাছে খাবার দিয়ে গোয়েন্দা কর্মচারীদের সাথে প্লাটফর্মে চলে আসলাম। উত্তরদিক থেকে আসা ৪-৫ বগির ছোট ট্রেনে ২৫/৩০জন বাঙ্গালী ইপিআর আসলেও অনেক আনসার তাদের পোশাক ও রাইফেলসহ এসে সকালে আসা ইপিআরদের সাথে যোগ দিয়েছে। প্লাটফর্মে বেশকিছু মানুষ জড় হলেও ক্যাপ্টেন সাহেবের হুকুম মতো আনসার কমান্ডার ও ইপিআররা তাদের গাড়িতে উঠতে দিচ্ছে না। তাই হৈচৈ হচ্ছে – গাড়ি ছাড়তে সময় নিচ্ছে। তাদের কাছে লাঠিবল্লম, তীরধনুক, বন্দুক দেখা যাচ্ছে। তোফায়েলসহ কয়েকজনের কাছে রাইফেলও আছে। বয়স্ক আনসার কমান্ডার বারবার বললেন তাদের আর সেচ্ছাসেবকের প্রয়োজন নাই। তোফায়েলও আমাকে বাবার কাছে যেতে বললো কিন্তু আমি তার সাথে থাকতে চাই। এ সময় হুইসেল দিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করলে তোফায়েলসহ অন্য্যান্য্য্রা হই হুল্লোড় করেই উঠে পরা শুরু করলে আমিও তোফায়েল সাথে লাফিয়ে উঠে যাই।

গাড়ির ভেতরে আমরা জনতার সাথে চিৎকার দিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে থাকলে সেই আনসার কমান্ডারটি আমাদের সাথে পেরে না উঠে চুপ হয়ে যান। গাড়িতে প্রায় ৫০/৬০জন ইপিআর ছাড়াও আনেক পোশাক ও রাইফেলধারী আনসার আমাদের থেকে আলাদা আছেন।

তোফায়েল আরো দুজন পোশাকধারী জিআরপি কনস্টেবল ও একজন গোয়েন্দা কর্মচারী সবাই জিআরপির রাইফেল সঙ্গে। এছাড়া আরো ২/৩জন সাদা পোশাকের মানুষের হাতে রাইফেল (জিআরপির ব্যারাকের রাইফেলের নিচে বাটের উপর যে সিরিয়াল নাম্বার থাকে তার আগে GRP ছাপা থাকে, যেমনটা তাদের গাড় মেরুন টুপি ও ঘাড়ের স্ট্রাপে পিতলের GRP)। এই কামরাতে কোনো ইপিআর নাই। ট্রেন খুবই ধীরগতিতে চলছে। জনতাও থেমে থেমে স্লোগান দিয়ে সবাইকে সতেজ রাখছে। একসময় আমি আসতে করে তোফায়েলের কাছে জানতে চাইলাম সে রাইফেল কোথায় পেয়েছে। তোফায়েল জানায় ১লা এপ্রিল সকালে জিআরপি কনেস্টবলরা তাদের আরমারি থকে সব রাইফেল বের করে, সেও একটা পায়, বিহারি কনস্টেবলরা আগেই ব্যারাক ছেড়ে চলে যাওয়ায় সবগুলো(প্রায় ৫০টি) বাঙ্গালীদের হাতে আসে। কিন্তু বাবা আহত হলে তা ফেরিয়ে দিয়ে হাসপাতালে চলে যায়। আজ সে নিয়েছে গোয়েন্দা কর্মচারী মারফত, আমি জানতে চাই সে কি রাইফেল চালাতে জানে বা চালিয়েছে? তোফায়েল বলে হ্যা ১ তারিখে কয়েকবার, সেই ধাক্কার ব্যাথা এখনো আছে। তোফায়েল অনেক আগে থেকেই কিছু নেতাগিরি ভাবের ছিল। আমাদের বড় ভাই সিলেটে পড়াশোনার পর ১৯৬৫ সালের দিকে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে চলে যান। বড় বোনেরাও ১৯৬৬ তে হোস্টেলে চলে যায়। তাই তোফায়েলই ছিল বাসার বড় ও আমাদের সবকিছুর স্বাভাবিক নেতা। বাবা ১৯৬৮ সালে সৈয়দপুর বদলি হলে সে একাই কুড়িগ্রাম নতুন শহরের বহুমুখী সরকারি স্কুলের বাণিজ্য বিভাগে তার বাকি একবছর থেকে ১৯৬৯ সালে এসএসসি শেষ করে। সেই সময় সে আমাদের পারিবারিক ও বড় ভাইয়ের বন্ধু আতাহার উদ্দিন (আমরা তাকে রুনু দা ডাকি) ও তার বড় ভাই আজাহার উদ্দিন পরিবারের সাথে ছিল। বাবা-মাসহ আমরা ছোট তিনজন তার কথাতেই চলতাম। সৈয়দপুরে সে পুলিশ কনস্টেবলের সাথে যোগসাজসে আমাদের বিনা পয়সায় আপার ক্লাসে সিনেমা দেখাতো; কোক-ফান্টা খাওয়াতো (সেই প্রথম আমি আর হাসনাত বুঝলাম আমরা পুলিশ অফিসারের ছেলে)!

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা মহেন্দ্রনগর পৌঁছে গেলাম। তোফায়েল আমকে মহেন্দ্রনগর স্টেশনে নেমে যেতে বললেও আমি রাজি হলাম না। গাড়িতে আরো লোকজন যদি যায় তবে আমিও যাব। গাড়ি গতি খুবই ধীর কারণ বিভিন্ন জায়গায় থেমে গাড়ি থেকে নেমে রেললাইন পরিবর্তনের শিফট লিভার টানতে হচ্ছে। আমরা তিস্তা জংশনের আউটার সিগনাল ও ইনার পার হয়ে কিছুদূর পর ট্রেন পুরো থেমে গেল। আর সামনে যাবে না। এখান থেকে তিস্তা জংশন প্লাটফর্ম আরো প্রায় ৫০০/৬০০মি. হবে। সামনে উত্তরের কেবিন ঘরে গোলা পরেছে। কিছুদূরে কতগুলি মালগাড়ির উপর গোলা পরেছে, একটা উল্টে মূল লাইনের উপর পরে আছে। আমরা সবাই নেমে এখন হেঁটে যাব। কিন্তু সেই আনসার কমান্ডার ও ইপিআররা কিছুতেই আমাদের এগুতে দিবে না।

এর কিছু পর একজন বয়স্ক ও ঊর্ধ্বতন ইপিআর সদস্য দূর থেকে সামনে এগিয়ে এসে তাদের ক্যাপ্টেনের আদেশের কথা বলেন কিন্তু জনতা হইছে করেই চলেছে। এক সময়ে তিনি সবাইকে চুপকরে তার কথা শোনার আনুরোধ করলে আমরা চুপ হয়ে যাই। তিনি শান্তভাবে নিজের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলা শুরু করলেন, ‘এই যে আপনারা আমাদের এই পোশাক দেখছেন, আমরা এই পোশাকের কাজ করি। এই মাটি রক্ষা করা আর তার জন্য যুদ্ধ করা এই পোশাকের মানুষদের কাজ। আমাদের সাথে এখন অনেক মানুষজন আছে। যারা গত কয়কদিন থেকে আমাদের সাহায্য করছেন। গতরাতে কিছু মানুষ বাজারে মাশাল মিছিল করে আমাদের বিপদে ফেলেছিল। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হইছে। লাঠি-বল্লম দিয়া যুদ্ধ হয় না, আপনারা হাতিয়ার (রাইফেল) চালাইতে শিখেন নাই, শুধুশুধু গোলাবারুদ নস্ট করবেন না। আমাদের হাতিয়ার আছে কিন্তু গোলাবারুদ নাই। আপনারা আপনাদের গোলাবারুদ দিয়ে যান। আর নেতাদের বলেন আরো ভাল হাতিয়ার গোলাবারুদের জোগাড় দিতে, পাঞ্জাবীদের আমরাই সামাল দিতে পারব।’


উঁচু প্লাটফর্ম না থাকায় আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে গাড়িতে উঠলাম- ততক্ষণে বেলা ২:৩০ বা ৩টা বাজে; গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে লাগলো।

তার এই কথায় পরিবেশ বদলে যায়, সবাই মাথা নিচু করে তার কথার বাস্তবতা বুঝতে পারে। সঙ্গে থাকা কয়েকটি রাইফেল ফেরত দিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের রাইফেল আছে কিন্তু গোলাবারুদ নাই। আমরা সঙ্গে যা নিয়া আসছি, গতকাল কিছু খরচ হইছে, আপনাদের কাছে থাকলে গোলাবারুদ দিয়া যান, নেতাদের বলেন ভাল হাতিয়ার আর গোলাবারুদ পাঠাতে, চালাবার অনেক লোক আছে।।’ আমাদের যার কাছে যা ছিল সব খালি করে তাকে দিয়ে দেন। আমরা লাইনের ধারে ঘাসের উপর মাটিতে বসে থাকলাম। একসময়ে গোয়েন্দা একজন বললেন এভাবে বসে থাকলে হবে না। সংগ্রাম কমিটির নেতাদেরকে আরো আস্ত্রপাতি ও গোলাবারুদের ব্যবস্থা করতে বলতে হবে। এরমধ্যে স্থানীয় মানুষজন ভোরের মর্টারের গোলাবর্ষণের সময় আহত কয়েকজনকে নিয়ে আসে তাদের লালমনিরহাট হাসপাতালে নিতে গাড়িতে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে দিকে ইঞ্জিন ড্রাইভার/ফায়ারমেনরা অত্যন্ত ক্লান্ত, তারা গাড়ি নিয়ে ফেরত যেতে চান। তাই আমরাও ফিরে যাব বলে গাড়িতে উঠা শুরু করি। আসবার সময় দক্ষিণমুখী গাড়ির ইঞ্জিন তার সামনে ছিল কিন্তু এখন লালমনিরহাটে উত্তরমুখী যেতে হবে কিন্তু ইঞ্জিন ঘোরান যাবে না। ইঞ্জিন পেছন থেকেই ধীরে ধীরে উত্তরে যেতে হবে।

ড্রাইভার/ফায়ারম্যান তাদের একজনকে লাল/সবুজ পতাকা দিয়ে শেষ কামরার শেষ দরজায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো যাতে ড্রাইভারকে আগাম লাল/সবুজ সিগন্যাল দেখাতে পারে। উঁচু প্লাটফর্ম না থাকায় আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে গাড়িতে উঠলাম- ততক্ষণে বেলা ২:৩০ বা ৩টা বাজে; গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে লাগলো।

চলবে…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

১ Comment

  • Parvez Elahi Chowdhury , মঙ্গলবার মে ৭, ২০১৯ @ ১১:৫৮ অপরাহ্ন

    ধন্যবাদ ! দেশের অতীত ইতিহাস জানার ও সবাইকে জানাবার সুযোগ করে দেবার জন্য ! আসুন আমরা সকলকে তাঁর প্রাপ্য সুযোগ ও অধিকার দিয়ে ন্যায় ও শান্তি প্রতিস্টায় সহযোগিতা করি ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!