ভবঘুরে কথা
কঠিয়াবাবা রামদাস

-প্রণয় সেন

উত্তরাখণ্ডের শীতার্ত মধ্য রাত। দূর পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় ঘন তুষারের অবরণ। চীড় ও দেবদারু বিশীর্ণ শাখা থেকে টুপটাপ করে বরফের কণা ঝড়ে পড়ছে। এই শীতের মধ্যে কৃচ্ছ্রবতী তরুণ সাধু ধুনী জ্বালিয়ে আসনে উপবিষ্ট। ধ্যান-জপে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। দেহটি ক্লান্ত, অবসন্ন প্রায়। দুই চোখে তার দুর্নিবার ঘুম নেমে আসে। আসনের উপর দেহটি কোন এক সময় ঢলে পড়লো, তা তাঁর

হুশ নেই। ধুনীর উপর মাঝে মাঝে বরফ পড়ছে। কিছুক্ষণের পর কাঠের আগুন নিভে গেলো। এই প্রাণান্তকর শীতে ঘুমাবারই বা উপায় কোথায়? কাঁপতে কাঁপতে যুবক সাধুটি উঠে বসলেন। কিন্তু এ বিপদে কী করে আজ প্রাণ বাঁচাবেন? রাত্রে ধ্যানের আসন ছেড়ে ওঠা গুরুদেবের বারণ। পাহাড়ীদের বাড়ি থেকে যে আগুন সংগ্রহ করবেন, তার উপায় নেই। কাছেই গুরুদেবের ঝুঁপড়ি সেখানেই তিনি ধ্যানমগ্ন।

তাঁর কাছে গিয়ে জ্বলন্ত কয়লা চাইতে যাওয়া, সে যে আরও সাংঘাতিক! প্রায় জ্বলন্ত অগ্নিতে ঝাঁপ দেওয়ার সমান। কাছে গেলেই তিনি ক্রোধে ফেটে পড়বেন। শিষ্যের তামসিক অলসতায় ধুণী নিভে গেছে, এ অপরাধের জন্য চরম দণ্ড না দিয়ে তিনি ছাড়বেন না। আবার এদিকেও বিপদ কম নয়। অবিলম্বে আগুন সংগ্রহ করতে না পারলে মাঘের এই প্রচণ্ড শীতে মৃত্যু অনিবার্য।

অবশেষে তরুণ সাধু সাহস নিয়ে ঝুঁপড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ডাকতে লাগলেন ‘গুরুজী।’

কিছুক্ষণ পর ভিতর থেকে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে ভেসে উঠলো, কে? বাইরে কে দাঁড়িয়ে?

ভয়ে ভয়ে শিষ্য বললেন, ‘মহারাজ আমার ধুনী নিভে গেছে। যদি কৃপা করে আমায় ধুনী থেকে কিছু কয়লা দেন, তাহলে আবার তা জ্বালিয়ে নিতে পারি। শীতে জমে যাচ্ছি মহারাজ।’ ঝুঁপড়ির ভেতর থেকে গর্জন করে উঠলেন, জপ ধ্যান করার সময় নিশ্চই ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তা না হলে জ্বলন্ত ধুনী নিভে যায় কি করে?


একঘণ্টা এইভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকো, তবু আগুন মিলবে না। উন্মুক্ত প্রান্তরে হিমালয়ের তীব্র শীতের মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে রইলেন রামদাস। দেহ অসাড় হয়ে পড়েছে। এমন সময় সহসা ঝুঁপড়ির দরজা খুলে গুরুদেব এবার জ্বলন্ত কাঠ বাইরে ছুড়ে দিলেন।

ঘুম আর আরামের দিকে এতোই যদি ঝোঁক তাহলে বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে ঘর ছেড়ে এলে কেনো? গার্হস্থ্য জীবনের সুখকর পরিবেশেই তো বেশ ঘুমাতে পারতে! শিষ্য রামদাসের তখন শীতের কাঁপুনির থেকে ভয়ের কাঁপুনিই বেশি লাগছে। রামদাস কাতর মিনতির সুরে বারবার বললেন, ভুলক্রমে তিনি ঘুমিয়ে পরে অপরাধ করে ফেলেছেন। এমন ভুল আর কখনো হবে না। ধুনীর আগুন আর কখনো নিভবে না। তবু গুরু কঠোরভাবে বললেন, একঘণ্টা এইভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকো, তবু আগুন মিলবে না। উন্মুক্ত প্রান্তরে হিমালয়ের তীব্র শীতের মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে রইলেন রামদাস। দেহ অসাড় হয়ে পড়েছে। এমন সময় সহসা ঝুঁপড়ির দরজা খুলে গুরুদেব এবার জ্বলন্ত কাঠ বাইরে ছুড়ে দিলেন।

বললেন, আর যেনো এমন না হয়। এইভাবে কৃচ্ছ্রসাধনার মধ্যে দিয়ে সমানে ধ্যান জপ করে যেতে লাগলেন রামদাস।

তার গুরু মহাসমর্থ তাপস শ্রী শ্রী ১০৮তম স্বামী দেবদাসজী মহারাজ। নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের শ্রীমৎ নাগাজীর শাখার এক শক্তিমান আচার্য্য দেবদাসজী মহারাজ। ভারতীয় সাধকসমাজে তখন তাঁর বিরাট প্রসিদ্ধি। এই শক্তিধর মহাসাধকের অন্তলোকের পরিচয়, তাঁর মহাজীবনের জ্যোতিম্ময় স্বরূপ অনুগত শিষ্য রামদাসের সাধন সত্তায় তখন ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। সাধক রামদাস তাঁর গুরুমহারাজের অপার মহিমার পরিচয় পেয়েছেন। আত্মগোপনশীল যোগীগুরুর বাহ্যবরণটি ভেদ করতে সেদিন তাই তাঁর সাধনোজ্জ্বাল দৃষ্টি ভুল করেনি। আধ্যাত্মপথের দুঃসাহসিক অভিযানে তরুণ সাধক রামদাস এগিয়ে চলেছেন। আর এ অভিযাত্রার জন্য দিনের পর দিন তাঁকে কম মূল্যও দিতে হয়নি।

কৃচ্ছ্রসাধনা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার চরম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সদ্ গুরু তাকে তাঁর পরম পরিণতিটির দিকে টেনে নিচ্ছেন। গুরু রামদাসকে ডেকে বললেন, কোন বিশেষ কাজের জন্য আমি বাইরে যাচ্ছি। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি এই গাছের তলায় ধুনী জ্বালিয়ে বসে থাকবে। আসন ছেড়ে যাবে না। দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগলো, তবু গুরুর দেখা নেই। এদিকে উঠতে পারছেন না রামদাস। আহার, নিদ্রা, মলমূত্র ত্যাগ পর্যন্ত বন্ধ। একাসনে বসে ক্রমাগত আটদিন শুধু অবিরাম ধ্যান জপ করে যেতে লাগলেন তিনি। গুরুদেবের প্রতি একনিষ্ঠাই সেদিন তার জীবনে এক দৈবী শক্তির প্রেরণা জাগিয়ে তুললো।

অবশেষে গুরু ফিরে এলেন। সব কিছু শুনে প্রসন্নতার হাসি হেসে বললেন, সদ্ গুরুর চরণে এই আত্মসমর্পণই সাধকের সবচেয়ে বড়ো কাজ। বড়ো প্রস্তুতি, এতেই মেলে সাধকের বহু পর্থিত ধন, গুরুকৃপা। গৃহত্যাগের বেদনা ও বাবা মায়ের চোখের জল এই পরমপ্রাপ্তির মধ্যদিয়েই যে সার্থক হয়ে ওঠে। এতেই তার অভীষ্ট সিদ্ধ হয়।যোগীবর দেবদাসজী শিষ্যকে তাঁর অপরিমেয় যোগ বিভূতি অর্পণ করলেন। গুরু বুজলেন, রামদাস আধ্যাত্মযোগের এক শক্তিমান আধার। তবু নিরন্তর ভৎসনা আর শাসনের কঠোরতার দ্বারা তাঁর মধ্যে ক্রোধ জাগে কিনা, সে অধৈর্য হয়ে পড়ে কিনা তা পরীক্ষা করে যান তিনি। মাঝে মাঝে বলেন এ চামার, এ ভাঙ্গী। শুধু খাবারের জন্য সন্ন্যাসী হয়েছিস।

এইভাবে তীব্র যন্ত্রণার দ্বারা শিষ্যের অন্তরের অহঙ্কার ও অভিমানকে সংযত করতে চান তিনি। রামদাস জানেন, গুরুজীর এই কঠোর বাহ্য রূপের ভিতরে রয়েছে এক অপরূপ ভগবৎসত্তার প্রকাশ। ঐশী করুণার মাধুর্যে যোগৎবিভূতির ঐশ্বর্য ও মহিমায় তা ভরপুর। এই বিরাট মহাপুরুষের চরণে তাই তিনি এমনভাবে পড়ে আছেন। একদিন অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে রামদাসকে প্রহার করতে লাগলেন গুরুদেব। আর বলতে লাগলেন, ‘আমার এত দিনকার বড়ো বড়ো চেলা সব চলে গেছে, আর তুই শালা ভাঙ্গী কিজন্য আমার পেছনে এমন করে লেগে আছিস বলতো ? এখনই তুই আমার সামনে থেকে দূর হ। কোন শালার সেবার আর আমার এতটুকু দরকার নেই।’

লাঠির আঘাতে মাটিতে পড়ে গুরুর চরণ ধরে বারবার মিনতি করতে থাকেন রামদাস। বাড়িঘর, বাবা-মাকে ছেড়ে এসে আপনার চরণে আশ্রয় নিয়েছি। আমার আর যাবার কোনো জায়গা নেই। আমার আর কোনো আশ্রয় নেই বাবা। মুহুর্তে দেবদাসজী যেনো অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। স্মিত হেসে বললেন, এবার তুই শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিস বেটা। এখন তোর অহংবোধ দূর হয়েছে। স্থির ও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বুদ্ধি। তিনি আরও বলেন বৎস তোমার সকল অভীষ্ট সিদ্ধ হবে। ঋষি সিদ্ধি আজ থেকে তোমার করতলগত। অল্পকালের মধ্যেই তুমি ব্রহ্ম এর সাক্ষাৎ লাভ করবে।


এরফলে বেশিক্ষণ আরামে ঘুমাতে বা শুয়ে থাকতে পারতেন না রামদাস। প্রচণ্ড শীতে তাঁর চাদর বলতে ছিল তিন হাত লম্বা এক সুতির কাপড়। এই কঠের কোমরবন্ধনীর জন্য পরবর্তীকালে কঠিয়াবাবা নামে পরিচিত হন রামদাস।

গুরুদেবের চরণতলে অশ্রুসজল চোখে লুটিয়ে পড়লেন রামদাস। কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও ব্রতপালনের মধ্যে আধ্যাত্মসাধনার পথে ক্রমাগত এগিয়ে যেতে হত রামদাসকে। শীত গ্ৰীষ্ম সব সময়ই ধুনী জ্বালিয়ে প্রায় সারারাত্রি ধরে জপতপ করে যেতে হত তাঁকে। আলস্য ও আরাম যাতে রামদাসের কোনো বাধা সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য গুরুজী তাঁর কোমড়ে ভারী কাঠের একটি আড়বদ্ধ বেঁধে দিয়েছিলেন। তাতে আবার এক কাঠের লেংটি ঝোলানো থাকত। এই সব পরেই রাতে শুতে হত তাকে। এরফলে বেশিক্ষণ আরামে ঘুমাতে বা শুয়ে থাকতে পারতেন না রামদাস। প্রচণ্ড শীতে তাঁর চাদর বলতে ছিল তিন হাত লম্বা এক সুতির কাপড়। এই কঠের কোমরবন্ধনীর জন্য পরবর্তীকালে কঠিয়াবাবা নামে পরিচিত হন রামদাস।

একদিন গুরুদেব আদেশ দিলেন, এবার তোমাকে দ্বারকাধাম দর্শন করতে যেতে হবে।  এই দ্বারকাধাম নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের সাধকদের মহাতীর্থ। রামদাসের কিন্তু গুরুজীকে ছেড়ে কোথাও যেতে মন চাইছিলো না। তিনি তাই করযোড়ে বললেন, বাবা, আপনাকেই আমি ভগবৎস্বামী স্বরূপ বলে জানি। শাস্ত্রে বলে সদ্ গুরুর চরণতলেই আছে সব তীর্থ। আপনার চরণতলে বসেই আমার তীর্থ ধর্ম সব হচ্ছে। তাই দ্বারকায় যাওয়ার আমার ইচ্ছা নেই।

একথায় রাগে গর্জন করে উঠলেন দেবদাসজী মহারাজ। ক্রোধাত্মক কণ্ঠে বললেন, আরে দেখছি, তুমি মহাজ্ঞানী হয়ে পড়েছো। তুমি ভাবছো তোমার মতো জ্ঞানী আর কেউ নেই। আমি নিজে দ্বারকা দর্শন করে এসেছি। আমার গুরু দ্বারকা দর্শন করে এসেছেন। আর তুমি কিনা বলছো তোমার দ্বারকায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এই বুদ্ধি পরিত্যাগ কর। তুমি দ্বারকা ঘুরে এসো। অগত্যা বাধ্য হয়ে দর্শন করে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো রামদাসের। শোকে অভিভূত হয়ে পড়লেন তিনি।

তার গুরুদেব দেবদাসজী মহারাজ তাঁর আসার আগেই দেহ ত্যাগ করেছেন। গুরুজীর শূন্য আসনের দিকে তাকিয়ে শোকে উন্মক্ত হয়ে উঠলেন রামদাস। যে গুরুজীকে দেখে তিনি বাবা, মা, আত্মীয়, পরিজন, ঘরবাড়ি সব ছেড়ে এসেছেন, ৺যার স্নেহচ্ছায়ায় থেকে সব কিছু ভুলে ছিলেন তিনি, তিনি তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন। এ দুঃখ তিনি ভুলতে পারলেন না কিছুতেই। তীব্র শোকাবেগে তিনি তাঁর মাথার জটা ছিড়তে লাগলেন। তাঁর গুরুভাইরা তা দেখে তাঁর মাথা মুড়িয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি আহার নিদ্রা সব ত্যাগ করে দিনরাত শোকে বিলাপ করে যেতে লাগলেন। সাতদিন এইভাবে কাটার পর দেবদাসজীর আত্মা এক জ্যোতির্ময় মূর্তি ধারণ করে আবিভূত হলেন শোকাতুর রামদাসের সামনে। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে স্নেহভরে কণ্ঠে গুরুজী বললেন, বৎস, কেনো এমন করছ? আমি আশির্বাদ করছি তোমার কল্যাণ হবে। তাছাড়া আমার তো মৃত্যু হয়নি, আমার এই জীবনের লীলাটি শুধু সমাপ্ত করেছি। প্রয়োজনমত আমি মাঝে মাঝে তোমাকে দর্শন দেব। গুরুজীর তিরোধানের পর সাধনার কঠোরতা আরও বেড়ে গেলো কাঠিয়াবাবার।

বেড়ে গেলো কৃচ্ছ্রসাধনার তীব্রতা। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে চারিদিকে পঞ্চধুনী জ্বালিয়ে মাজখানে বসে তপস্যা করতেন তিনি। আবার প্রবল শীতে বরফগলা জলে সারারাত গা ডুবিয়ে জপতপ করতেন। পরদিন সকাল বেলায় অন্যান্য সাধুরা যখন জল থেকে তাঁকে তুলে আনত, তখন নিঃসাড় ও নিস্পন্দ হয়ে থাকত তাঁর দেহটি। সে দেহে কোনো চেতনা থাকতো না। তারপর আগুনের তাপ লাগানোর পর চেতনা ফিরে আসত তাঁর শরীরে। এইভাবে রামদাস কঠিয়াবাবা সাধক হিসাবে খ্যাতি ও যোগসিদ্ধির কথা দিনে দিনে ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

১ Comment

  • Aniruddha Bhattacharjee , বুধবার এপ্রিল ১৭, ২০১৯ @ ৯:৩১ পূর্বাহ্ন

    বড় ভাল লাগল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!