ভবঘুরে কথা
গুরুপূর্ণিমা

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষের মুণি-ঋষি-সাধু-গুরু-সন্ন্যাসী অর্থাৎ আধ্যাত্মিক জ্ঞানীজন যখন তাদের নিজস্ব মত বা যে মতে তারা জ্ঞানপ্রাপ্ত তা প্রচারে নেমেছেন তখন বেশিভাগ সময়ই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে ভক্তদের মাঝে তা প্রচার করেছেন। ষড়ঋতু প্রধান অঞ্চল হওয়ায় এই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রচার-প্রচারণা বছর জুড়ে চালানো সম্ভব হতো না। বিশেষ করে বর্ষাকালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রচারণা স্থগিত রাখতে হতো। বাইরে ঘুরে ঘুরে প্রচার কাযক্রম সম্ভব না হওয়ায় বর্ষাকালের চারমাস সময়ে সাধুগুরুরা গুহা বা আখড়ার মতো নির্দিষ্টস্থানে অবস্থান করে শিষ্যদের মাঝে জ্ঞান প্রদান করতেন। এই সময়কে বর্ষাবাসও বলা হয়। এ সময়ে ভক্তরা আশ্রমে দীর্ঘদিন গুরুর সান্নিধ্য লাভ করতে পারতো। নিজেকে জানার-নিজেকে অনুসন্ধান করার মার্গ গুরুর কাছ থেকে হাতে কলমে শেখার সুযোগ তৈরি হতো এই সময়কালে। তাই এই তিথি ভক্তদের কাছে অনেকবেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আর এই প্রচারণা বন্ধ রাখার কার্যক্রম শুরু হতো আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথি থেকে। এই বর্ষাবাস কালের সূচনা যে পূর্ণিমা তিথি তাই ভক্তকূলের কাছে পরিচিত গুরুপূর্ণিমা নামে। এই পূর্ণিমা তিথির গুরুপূর্ণিমায় গুরুবাদী ভক্তরা নিজ নিজ গুরুকে পূর্ণভক্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে।

ভক্তের চোখে গুরু অপেক্ষা অধিক সম্মানিত ও ভক্তির পাত্র আর কেউ নেই। গুরুই সর্বচ্চো জ্ঞান। এই ‘গুরু’ শব্দটি ‘গু’ এবং ‘রু’ এই দুটি সংস্কৃত শব্দ সমন্বয়ে গঠিত। এর ‘গু’ শব্দের অর্থ “অন্ধকার” বা “অজ্ঞতা” আর ‘রু’ শব্দের অর্থ “আলো”। আর ‘গুরু’ অর্থ যিনি অন্ধকার দূর করে আলোর প্রতিষ্ঠা করেন। মনের অজ্ঞানতাকে দূর করে যিনি আলোর পথ দেখান তিনিই গুরু। তাই শিষ্যের কাছে গুরুই পরমব্রহ্ম, পরমগতি, পরাবিদ্যা, পরম আশ্রম, পরম উৎকর্ষ, গুরুই পরমধন। শাস্ত্রে আছে-

গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু‚ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ
গুরুরেব পরং ব্রহ্মম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।

অর্থাৎ জীবনে গুরুই হলেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। তিনিই আমাদের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের জ্ঞান বা পরম ব্রহ্মজ্ঞান দান করেন। সেই গুরুর উদ্দেশ্যে ভক্তি জানাই।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন ‘গুরু হল ঘটক’। যিনি ভগবানের সঙ্গে ভক্তের যোগ ঘটিয়ে দেন। গুরু শিষ্যের ভাব অনুযায়ী মন্ত্র ও ইষ্ট ঠিক করে দেন। গুরু হলেন আধ্যাত্মিক পথের দিশারী। মানুষকে জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উন্নীত করে পরম সত্যস্বরূপ ঈশ্বরের সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন। …সকলেরই গুরু সেই এক সচ্চিদানন্দ। কিন্তু যেহেতু আমরা তাকে সাক্ষাত্‍ভাবে ধরতে পারছি না, এজন্য সাধনের সহায়করূপে কোন মানব গুরুকে আশ্রয় করতে হয়। আবার মানব গুরুর প্রতি ঈশ্বরদৃষ্টি রাখতে হয়। অর্থাত্‍ মানব গুরু হলেন সেই ঈশ্বর গুরুর প্রতীক। মানব গুরু তার সাধ্যানুসারে শিষ্যকে চরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করেন। কিন্তু সচ্চিদানন্দগুরু সাধককে তাঁর স্বরূপপ্রাপ্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যান এবং তিনিই সাধকের সাধনপথের সর্বদা সঙ্গী, পথনির্দেশক ও চরম লক্ষ্য। হিন্দিতে একটা প্রবচন আছে-

‘গুরু গোবিন্দ দুয়ো খাড়ে‚ কাকে লাগু পায়
বালিহারি গুরু আপনে যিন গোবিন্দ দিয়ো বতায়ে।।

অর্থাৎ যখন গুরু ও ঈশ্বর দুজনেই সামনে দাঁড়িয়ে তখন প্রথমে গুরুকে ভক্তি জানাতে হবে কারণ তিনিই আমাদের ঈশ্বরকে চেনান।

শিষ্যের কাছে গুরুর স্থানই সর্বোচ্চ। তাই গুরু যাতে কোনো কারণে কোনরূপে রুষ্ঠ না হন সেদিকে সদাসর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। গুরুকে ভক্তি প্রদর্শনের জন্য যদিও বিশেষ কোনো দিবসের প্রয়োজন পরে না। কারণ প্রতি নি:শ্বাসেই গুরুকে স্মরণ করা পূর্ণবিশ্বাস ও আস্থায় ভক্তি রাখা শিষ্যর একান্ত কর্তব্য। তারপরও এই দিনটি ভক্তদের কাছে বিশেষভাবে পূজিত। কারণ এই দিনে গুরুকে ভক্তি নিবেদনের বিশেষ সুযোগ পায় ভক্তকূল। 

বিভিন্ন শাস্ত্রে, প্রচলিত মতে, এমনকি বিভিন্ন সাধুগুরুরা এই দিনটিকে বিশেষভাবে পালন করে আসছেন নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী। বেশ কয়েকজন গুরু ও ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই পূর্ণিমা তিথি আরো মহিমান্নিত হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- 

গুরুবেদব্যাস:
বেদ উপনিষদের গুরুতত্ত্বকে অষ্টাদশ পুরাণ রচনার মধ্য দিয়ে সর্বসাধারণের কাছে সহজবোধ্য করেছেন বলে ঋষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব গুরু হিসেবে সকলের কাছে পূজিত। বেদকে আলাদা আলাদ বিভাগ করেছেন বলে তিনি বেদব্যাস নামে খ্যাত লাভ করেন। এছাড়া তিনি সমস্ত উপনিষদের মূল বিষয়কে সুশৃঙ্খলভাবে লিপিবদ্ধ করে ব্রহ্মসূত্র রচনা করেন। আবার মহাভারত ও তার অংশবিশেষ গীতাও তারই রচনা। যাতে সকল শাস্ত্রের মূল বিষয়গুলি সহজভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি। অনেকে মনে করেন, বেদব্যাস তার রচিত ২১৬ স্তোত্রের ‘গুরুগীতা’ সমস্ত গুরুদের উদ্দেশ্য উৎসর্গ করেন বলে হিন্দু সন্ন্যাসীরা বেদব্যাসকে সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু মনে করে থাকেন। এও ধারণা করা হয় যে, বেদব্যাসের সময় থেকেই গুরুশিষ্যের পরম্পরার সূত্রপাত। তাই তার জন্মতিথি অর্থাৎ আষাঢ়ের পূর্ণিমার এই দিনটিকে গুরুর উদ্দেশ্যে শিষ্যের সম্মান প্রদর্শনের দিন হিসেবে পালন করা হয়। 

মহর্ষি ব্যাসদেবের জন্মতিথি বলে এই পূর্ণিমাকে ব্যাসপূর্ণিমাও বলা হয়। তিনি ছিলেন ঋষি পরাশর ও মৎস্যগন্ধা সত্যবতীর সন্তান। বিবাহের পূর্বেই ঋষি উরসে জন্ম বলে জন্মের পরে ব্যাসদেবকে তার মা পরিত্যাগ করেন। এই কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসই পরবর্তীতে মহাঋষি ব্যাসদেবে পরিণত হন। গুরু হিসেবে জগতে পূজিত হন। তার প্রতি ভক্তি নিবেদন করতে ভক্তকূল তার জন্মতিথির আষাঢ়ে পূর্ণিমা গুরুপূর্ণিমা বলে পালন করে আসছে।

গুরুশিব:
হিন্দু পুরাণে আছে, মহাদেব হলেন আদি গুরু। তার প্রথম শিষ্য হলেন সপ্তর্ষির সাত ঋষি- অত্রি, বশিষ্ঠ, পুলহ, অঙ্গীরা, পুলস্থ্য, মরীচি ও ক্রতু (নাম নিয়ে মতভেদ আছে)। আদিযোগী শিব এই তিথিতে আদিগুরুতে রূপান্তরিত হন। তিনি এদিন এই সাত ঋষিকে মহাজ্ঞান প্রদান করেন। সেই ঘটনাই কালক্রমে গুরু প্রথার সৃষ্টি করে। আষাঢ়ের পূর্ণিমা তিথিতে এই ঘটনা ঘটেছিল বলে শিব ভক্তদের কাছে এই গুরুপূর্ণিমা অত্যাধিক তাৎপর্যপূর্ণ। ভক্তরা এই দিন নিজ নিজ গুরুর মধ্য দিয়ে শিবকে পূজা করে গুরুপূর্ণিমার রাতে। 

গুরু গৌতমবুদ্ধ:
বৌদ্ধ মতে গুরুপূর্ণিমার গুরুত্ব অসীম। বোধিজ্ঞান লাভের মাসখানেক পর আষাঢ় মাসের এই পূর্ণিমা তিথিতে সারনাথে গিয়ে গৌতম বুদ্ধ পাঁচজন শিষ্যকে প্রথম উপদেশ প্রদান করেন; একে বলে ধম্ম-চক্কপবত্তন সুত্ত। এই ঘটনাকে স্মরণ করে বৌদ্ধ মতানুসারীরা গুরুপূর্ণিমার রাতে নিজ গুরুকে ভক্তির মধ্য দিয়ে জগতগুরু গৌতম বুদ্ধকে স্মরণ করে থাকে।

পাঁচজন শিষ্যকে প্রথম উপদেশ প্রদান করার পরই বুদ্ধ বর্ষার চারমাস কাটিয়েছিলেন মূলগন্ধ-কুটিতে, এই সময়টা বৌদ্ধ মতের অনুসারীদের আত্মসংযমের সময়। বৌদ্ধ মতে আষাঢ়ের পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বর্ষাবাসের সময় নবীন-প্রবীণ সমস্ত শ্রমণকে জনপদ ছেড়ে আশ্রমে জড়ো হয়ে ছত্রিশ সপ্তাহের পাঠগ্রহণে অংশগ্রহণ করে। একে চারমাসিও বলা হয়। 

গুরু মহাবীর:
আষাঢ়ের পূর্ণিমা তিথিতে জৈনধর্মেও ‘চাতুর্মাস’ বা চার মাসের ধর্মনিষ্ঠার পর্ব শুরু হয়। জৈন মতে, গুরুপূর্ণিমার দিনেই গান্ধারের গৌতম স্বামীকে, মহাবীর তার প্রধান শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন ও দীক্ষা প্রদান করেন। তাই জৈনদের কাছেও এই দিনটি গুরুপূর্ণিমা হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টাই জৈন ধর্মের অনুসারীদের আত্মসংযমের সময়, আচার-আচরণ, ভোজন সব কিছুতেই সংযম করে থাকে জৈন সাধকরা। 

শ্রীশ্রীঠাকুরঅনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “গুরুপূজা বাদ দিয়ে কোনো পূজা হয় না। শাস্ত্রে বলে সর্বদেবময়ো গুরুঃ।” অর্থাৎ গুরুপূজাই সবার আগে। তাকে উপেক্ষা করে অন্যকোনো পূজা হয় না। বিভিন্ন ধর্ম-দর্শন-মত-পথে আষাঢ়ের এই পূর্ণ তিথির উৎসবে ভিন্ন ভিন্ন আচার-রীতি প্রচলিত থাকলেও মূলত গুরুর প্রতি শিষ্যের সম্মান-ভক্তি প্রদর্শনই গুরুপূর্ণিমা পালনের মূল উদ্দেশ্য। গুরুবাদী মতানুসারী মাত্রই এই দিনটিকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তারা প্রত্যেকেই এই দিনটিকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ আচার-রীতি অনুসারে নিজ নিজ গুরুকে ভক্তি নিবেদন করে থাকে। আয়োজন করে থাকে উৎসবাদি। বৌদ্ধ-জৈন মতানুসারীরা নিজ নিজ গুরুর স্মরণের মধ্য দিয়ে জগৎগুরুকে স্মরণ করে থাকে এই দিনে। সাধক বা ভিক্ষুরা গুরুর সান্নিধ্যে আশ্রমে একত্রিত হয় বর্ষাবাসের জন্য। 

সনাতন বিশ্বাসীরা, গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষ্যে মন্দিরে বা বাড়িতে নিজ নিজ গুরুদেবের পূজা করে থাকে। তবে জীবত অবস্থায় গুরুকে সরাসরি পূজা করার বিধান নাই। তাই গুরুর পাদুকার পূজা করা হয়। যদি গুরুদেব জীবিত থাকে, তবে গুরুর পাদুকা জলচৌকির ওপর রেখে গুরুদেবকে নতুন বস্ত্র পরিধান করিয়ে মালা, মুকুট ও অলঙ্কারাদি দিয়ে সাজিয়ে পাদুকা পূজা করে। যদি গুরুদেব সশরীরে উপস্থিত না থাকেন তহলে একই রূপে দুধ, গঙ্গাজল, ঘি, মধু, দই, অগরু ইত্যাদি দিয়ে মন্ত্র সহযোগে চরণ ধোয়াতে হয়। এরপর পাদুকা থালায় রেখে চন্দন দিয়ে সাজিয়ে ফুলমালা দিয়ে পূজা করা হয়। এটা গুরুর প্রতিকৃতির সামনে রেখে করা হয়। এরপর শিষ্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভোজন, নামকীর্তন, গান ও গুরুকে নানারকম উপহার দিয়ে দিনটি পালন করে। এই দিনটি প্রত্যেক ভক্তেরই আনন্দ উপভোগের দিন। অনেক সময় গুরুও এইদিন দীক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন, নামপ্রদান করেন।

তবে এই নিয়ম কেবল গুরুবাদীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈদিক যুগ থেকেই গুরুকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতবর্ষে পালিত হয়ে আসছে গুরুপূর্ণিমা। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাও ছিল গুরুমুখী। গুরুই ছিল পরমজ্ঞান-পরমধ্যান। সেসময় শিক্ষাগ্রহণের জন্য শিশুকালেই শিষ্যকে যেতে হতো গুরুগৃহে। গুরুগৃহে অবস্থান করে গুরুর আশ্রমেই ছাত্রকে পাঠ নিতে হতো। গুরুর দায়িত্ব ছিল ছাত্রকে জীবনের সকল পঠন-পাঠন দেওয়া। আর ছাত্রের কর্তব্য ছিল গুরুর সকল আজ্ঞা মেনে কঠিন নিয়মের ভেতর দিয়ে নিজেকে তৈরি করা। সেসময়ের জীবনব্যবস্থা চার আশ্রমে বা চারভাগে বিভক্ত ছিল। এটি চর্তুরাশ্রম নামে পরিচিত। এর প্রথম আশ্রম অর্থাৎ জীবনের প্রথম ২৫ বছর গুরুগৃহে থেকে ব্রহ্মচর্য আশ্রম পালনের মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে হতো। এই সময় প্রত্যেক ছাত্রকে গুরুপূর্ণিমায় গুরুকে পূজা করে গুরুর অভিপ্রায় অনুযায়ী দক্ষিণা প্রদান করতে হতো। তবে তা অবশ্যই ছাত্রের সামর্থ অনুযায়ী। 

তবে কেবল শিক্ষাগ্রহণের জন্য যখন শিষ্য গুরুর আশ্রমে যায় তখন সেই গুরু নির্ধারিত হয় শিক্ষাগুরু হিসেবে। এই সম্পর্কের হেতু যতদিন ছাত্রাবস্থা থাকে ততদিন গুরুর সকল নির্দেশ পালন করলেও আজীবন তার আজ্ঞা নাও পালন করতে পারে। কিন্তু শিষ্য যখন গুরুর কাছ থেকে দীক্ষাগ্রহণ করে তখন পারস্পারিক সম্পর্ক হয় গুরু-শিষ্যের। আর এ সম্পর্ক হয় জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক। এতে শিষ্য গুরুর প্রতিটি কথা আদেশ হিসেবে পালন করে থাকে। সনাতন মতে দীক্ষার তিন প্রথা- শৈব, বৈষ্ণব ও শাক্ত। শৈবমতে সর্বপ্রথম শুরু শিব। বৈষ্ণব মতে শ্রীকৃষ্ণ আর শাক্তমতে শ্রীচণ্ডী। এদেরই চিরাচরিত গুরু বলে মানা হয়। 

অন্যান্য গুরুবাদী মতে দীক্ষা প্রথা নিজ নিজ মতানুসারে হয়ে থাকে। তবে এই দীক্ষা প্রথা কেবল ভারতবর্ষ জুড়েই নয় এশিয়া জুড়েই রয়েছে। সুফি মতে এই দীক্ষাকে বলা হয়  বয়াত বা বায়াত। বাংলার বাউল মতেও গুরু-শিষ্য পরম্পরা বিদ্যমান। ফকির লালন সাঁইজি গুরুর গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন-

আমি বলি তোরে মন,
গুরুর চরণ কর রে ভজন,
গুরুর চরণ পরম
রতন কর রে সাধন।।

মায়াতে মত্ত হলে
গুরুর চরণ না চিনিলে,
সত্য পথ হারাইলে
সব খোয়ালে গুরু-বস্তু ধন।।

ত্রিপীনের ত্রিধারে
মীনরূপে গুরু বিরাজ করে,
কেমন করে ধরবে তারে
মনরে অবুঝ মন।।

মহতের সঙ্গ ধরো
কামের ঘরে কপাট মারো,
ফকির লালন বলে, কোলের ঘোরে
হারালি রে পরশ রতন।।

গুরুবাদীদের পারস্পারিক রীতি নীতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মূলত সকলের উদ্দ্যেশ্যই এক। গুরুর মাধ্যমে পরম বা স্রষ্টাকে লাভ করা। গুরুই একমাত্র স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার একমাত্র পথ এই বিশ্বাসে গুরুকেই সর্বোচ্চ জ্ঞান করে তার প্রতি পূর্ণভক্তিতে সাধন-ভজন করে থাকে শিষ্য। আর এই গুরুর প্রতি শিষ্যের যে ভক্তি তা প্রদর্শণের জন্য চাঁদের হিসেবে বছরের যে দিনটি আদিকাল থেকে চিহ্নিত তাই পরিচিত গুরুপূর্ণিমা নামে। গুরুকে লাভ করাও যেমন শিষ্যের জন্মজন্মান্তরের সাধনা। তেমনি এই বছরের এই পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদের পূর্ণরূপের দর্শণ পাওয়াও দুস্কর। কারণ এই সময় আকাশে মেঘ-বৃষ্টির আশঙ্কা থাকে প্রবল। এই মহিমান্নিত দিনটি গুরুশিষ্য উভয়ের জন্যই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই দিন শিষ্য যেমন গুরুকে ভক্তি প্রদর্শন করার সুযোগ লাভ করে তেমনি গুরুও ভক্তের দর্শনের আশায় থাকে। 

গুরুধ্যান
ধ্যায়েচ্ছরসি শুক্লাব্জে
দ্বিনেত্রং দ্বিভুজং গুরুম্।
শ্বেতাম্বরপরিধানং
শ্বেতমাল্যা নুলেপনম্।।
বরাভয়করং শান্তং
করুণাময় বিগ্রহম্।
বামেনোৎপলধারিণ্যা
শক্ত্যা-লিঙ্গিত বিগ্রহম্।
স্মেরাননং সুপ্রসন্নং
সাধকাভীষ্টদায়কম্।।

গুরুস্তোত্রম
ওঁ অখন্ডমন্ডলকারং ব্যাপ্তং
যেন চরাচরম্।
তৎ পদং দর্শিতং
যেন তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ।।
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু
গুরুদেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরের পরং ব্রহ্মা
তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ।।
একং নিত্যং বিমলচলং
সর্বৃধী সাক্ষীভূতম্।
ভাবাতীতং ত্রিগুণরহিতং
সদ্ গুরুং তং নমাম্যহম্।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

২ Comments

  • লিমন , বুধবার জুলাই ১৭, ২০১৯ @ ৬:০০ অপরাহ্ন

    গুরুপূর্ণিমা সম্পর্কে জানা হলো।
    ধন্যবাদ সাধু
    জয় গুরু

    • ভবঘুরে , বুধবার জুলাই ১৭, ২০১৯ @ ৮:০১ অপরাহ্ন

      জয়গুরু সাধু…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!