ভবঘুরে কথা
ঢাকেশ্বরী মন্দির

সনাতন ধর্মালম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতি কবে বা কোন সময় ঢাকাতে গড়ে উঠে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া মুশকিল। এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্য মতে, ঢাকার আদি মন্দির বকশিবাজারস্থ ঢাকেশ্বরী মন্দির। এছাড়াও ঢাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বহু মন্দির। ১৮৩২ সালে ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ হেনরি ওয়াল্টারের এক রিপোর্ট থেকে তথ্য পাওয়া যায়- তখন ঢাকায় মন্দিরের সংখ্যা ছিল ৫২টি। ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেলর তার টাইপোগ্রাফি অব ঢাকা (১৮৪০) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ঢাকা শহরের হিন্দুদের ধর্মকর্মের স্থানগুলো হল- ৫২টি আখড়া, ৫৫টি কালীবাড়ি ও ১২টি স্নান ঘাট। ঢাকেশ্বরী দুর্গা মন্দিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্রাহ্মণদের সংখ্যা ছিল ১৮ জন এবং যারা যজমানী অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করেন ১৮৩৮ সালে তাদের সংখ্যা ছিল ৩৪৫ জন। প্রফেসার রংগলাল সেনের ঢাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রবন্ধ থেকে জানা যায় ১৮৪০ সালে ঢাকায় ১৯৯টি মন্দির ছিল।

১৯৪৭ সালের পূর্বে ঢাকায় স্থাপিত মন্দিরগুলোর মধ্যে কয়েকটি মন্দির বেশ উল্লেখযোগ্য। এরমধ্যে ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালী মন্দির, জয়কালী মন্দির, সিদ্ধেশরী মন্দির, লক্ষীনারয়ণ জিউ মন্দির ইত্যাদি। এছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিল অনেক মন্দির। তবে সেগুলো সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না।

২৭ সেপ্টেম্ব ১৮৯১ সালে ঢাকা প্রকাশ-এ প্রকাশিত একটি সংবাদ-

ঢাকায় ধর্ম্মমন্দির
যে ধর্ম্ম স্বয়ং ভগবানের উপদিষ্ট; যাহা পরম যোগীগণের শত সহস্র বর্ষব্যাপী কঠোর তপস্যার ফল ; যাহার জন্য সাম্রাজ্যধিপতিগণও অনায়াসে বিষয় ভোগ তুচ্ছ করিয়া গভীর অরণ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক পত্রাদি ভক্ষণ দ্বারা জীবিকা নির্ব্বাহ করা শ্রেয়োবোধ করিতেন; যে সারবান্ ধর্ম্মকে বিনাশ জন্য কত শত দৈত্য রাক্ষস সমুদ্যত হইয়াও কিছু করিতে পারে নাই ; যাহা অনন্তকাল হইলে অনন্ত লোকের সদগতির একমাত্র নিদান স্বরূপে বিরাজমান, সর্ব্বজ্ঞ মহর্ষিদিগের ভবিষ্যৎবাদিতা সাফল্য করিবার জন্যই যে এই কলিকালে সেই ধর্ম্মে লোক সমূহ আস্থাহীন হইয়া নানা অসৎপথে বিচরণ করিতেছে। মহাকাল পুরুষ মাহাপ্রলয়ের হেতুভূত পাপরাশি সঞ্চিত করিবার জন্য জীবসমূহকে নিয়তই পাপের দিকে নানা প্রলোভন দ্বারা টানিতেছে, তাহারই কৌশলে সামান্য বুদ্ধি আধুনিক মানবের আপাত মনোমুগ্ধকর মত সমহদ্বারা ভ্রান্ত মান সমূহ পারলৌকিক বহু কষ্টের নিদান অসৎপথের পন্থী হইতেছে, জন্মজন্মান্তরীণ অশেষ কল্যাণের হেতুভূত হিন্দুর অবিনশ্বর ধর্ম্ম সম্বন্ধে শোচনীয় দশা উপস্থিত। এই কঠিন সময়ে ধর্ম্মরক্ষার উপায় না করিলে কেবল যে ভবিষ্য বংশের অপকার হইবে, তাহা নহে ; যদি ইহজন্মের পুণ্যবলে পুনরায় মানব জন্ম লাভের আশা কাহারও থাকে, তবে সঙ্গে সঙ্গে পরজন্মে তাঁহারও বাধ্য হইয়াই অসৎধর্ম্ম গ্রহণ দ্বারা অসৎগতি লাভ করিতে হইবে। অতএব যাহাতে এ ধর্ম্ম রক্ষা পায়, তাহার উপায় করা বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রেরই অবশ্য কর্ত্তব্য।

বলা বাহুল্য যে, সদুপদেষ্টবর্গের শাস্ত্রার্থ প্রচার ও ধর্ম্মবিষয়ক আলোচনা ধর্ম্মজ্ঞান লাভের পক্ষে একান্ত আবশ্যক। সদুপদেষ্টার পরিমাণ অতি অল্প, প্রত্যেক গৃহে গিয়ে ধর্ম্মোপদেশ প্রদান তাঁহাদের পক্ষে সহজ নহে, অতএব সর্ব্বসাধারণের জন্য এক একটি নির্দিষ্ট স্থান হওয়া আবশ্যক। কিন্তু নিতান্ত পরিতাপের বিষয় পূর্ব্ববঙ্গের রাজধানী এই ঢাকা নগরীতে এমন একটি স্থান নাই, যাহা ঐ উদ্দেশ্য সাধন পক্ষে সাধারণের সুবিধাজনক। কোন সাধু মহাপুরুষ আগমন করিলে, তাঁহারও আতিথ্য সৎকারের একটি সর্ব্বজন পরিচিত স্থান হয় না। বারোয়ারীর দেবার্চ্চনা মহোৎসবাদি করিতে হইলে স্থানাভাবেই তাহা ঘটে। অবশ্য ঢাকাতে এমন শত শত মহৎ আছেন, যাঁহারা ঐ সমস্ত কার্য্য নির্ব্বাহোপযুক্ত স্থান দিতে পারেন ও দিয়া থাকেন ; কিন্তু সেরূপ ব্যক্তিগত অনুগ্রহের প্রার্থনায় সাধারণ ভদ্রলোকদিগের কাজ করিতে প্রবৃত্ত হয় না। আর একটী গুরুতর অসুবিধা। মোকদ্দমাদি নানা কারণে অনেককে ঢাকায় আসিতে হয়, কিন্তু অনেকেই স্থানাভাবে নিতান্ত কষ্ট পাইতে হয়। অতিথি অভ্যাগতের হিন্দুর অন্যতম কর্ত্তব্য। সাধ্যানুসারে তাহা না করিলে পাপ আছে। কিন্তু ঢাকাবাসী এই পাপে চিরকাক্সিক্ষত। পূর্ব্ববঙ্গের শীর্ষস্থান ঢাকার এ কলঙ্কে পূর্ব্ববঙ্গবাসী মাত্রেই সম্পর্কিত এবং সময় সময় অসুবিধাগ্রস্থ। এই সকল কলঙ্ক, অসুবিধা ও ধর্ম্ম কার্য্যরে অন্তরায় সমূহ নিরাকরণ জন্য ঢাকায় একটি ধর্ম্ম মন্দির প্রতিষ্ঠা করা স্থির হইয়াছে। এই মহৎকার্য্যে ঢাকার অধিকাংশ গণ্যমান্য লোক সমুৎসাহী হইয়াছেন। সত্বরেই অনুষ্ঠান পত্রপ্রচার হইবে তাহাতেই পাঠক দেখিবেন যাঁহারা একার্য্যে ব্রতী, তাঁহাদের পদ মর্যাদা এই কার্য্য সম্পাদনের বিশেষ অনুকূল। এই কার্য্যে প্রায় পঁচিশ সহস্র টাকার প্রয়োজন। শুনতে যদিও অধিক বোধহয়, তথাপি ইহা হিন্দুসমাজের পক্ষে অতি সামান্য। পূর্ব্ববঙ্গেই এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যাঁহাদের একজন ইচ্ছা করিলে এ অশেষ পুণ্যের নিদান অসাধারণ প্রতিষ্ঠার কার্য্যে সমস্ত ব্যয় প্রদান করিতে সমর্থ। কিন্তু যে পর্যন্ত তেমন কোন মহাত্মা আমাদিগের আশা ফলবতী না করিতেছেন, ততকাল হিন্দুমাত্রকেই আরমা অনুরোদ করিতেছি, যাহাতে এই কার্য্য সুসম্পন্ন হয়, তৎপক্ষে সকলেই মনে প্রাণে যত্নবান হউক।

৩১ জানুয়ারি ১৮৯২ সালে ঢাকা প্রকাশ-এ প্রকাশিত একটি সংবাদ-

ধর্ম্মনুষ্ঠানের স্থান
ঢাকাতে হিন্দু সাধারণের ধর্ম্মানুষ্ঠান জন্য উপযুক্ত স্থান নাই। ঢাকেশ্বরীর বাড়ি সহরের অধিকাংশ লোকের পক্ষে অগম্য। অধিকাংশ লোকের সুবিধাজনক একটিও স্থান কেন নাই, তাহার উত্তর সর্ব্বজন পরিজ্ঞাত। ঢাকায় বাসিন্দা ভদ্রলোক কেহ নাই। যাঁহাদিগকে ভদ্রলোক না বলিলে হয় ত রাগিয়া অগ্নিশর্ম্মা হইবেন, এমন মৌখিক ভদ্র হয় ত ঘরে ঘরেই আছে। এই ভদ্র মহাশয়দিগের কার্য্যে শৌগুকের শ্রীবৃদ্ধি, বেশ্যার বাড়ী হর্ম্ম নিকতন, আর বিড়াল কুত্তার বিবাহে লাক টাকা ব্যয় দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু যাহা করিলে সাধারনের ধর্ম্মলাভ হয়, যাদ্বারা ধার্ম্মিক সমাজে চিরস্মরণীয় হওয়া যায়, এমন কার্য্য একটিও দেখিবার উপায় নাই। এই স্থানে এই ৫/৭ শত বৎসর মধ্যে কত সহস্য বড়লোক জন্মিয়াছে, কিন্তু তিন পুরুষ পরে যে, লোকে নাম করিবে, এমন কার কি কীর্তি আছে ? যেমন লক্ষ লক্ষ নির্ধন এই ভূমিতে মিশিয়া গিয়াছে, তদ্রুপে সেই অগণিত ধনের ভাণ্ডারিগণও এই মাটিতে অচিহ্নিত হইয়া রহিয়াছে ; সে প্রচুর অর্থের স্বর্থকতা কি এই? অবশ্য বিদেশ হইতে ভিখাই রাম ঠাকুর আসিয়া লক্ষ্মীনারায়ণের কৃপায় কয়পুরুষ আপনার নাম রাখিতে সমর্থ হইয়াছেন। জন্মাষ্টমীর জন্য রাম সরদার ও কৃষ্ণচন্দ্র সরদারের নামও কিছুদিন থাকিবে, বোধ হইতেছে ; কিন্তু সমস্ত ঢাকাবাসীর পক্ষ ইহাই কি প্রচুর ? যাহারা বেশ্যার জন্য বৃথা জেদ বা শক মিটাইবার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করিতে পারে, তাহারা ১৫/২০ হাজার টাকা ব্যয় বা স্বার্থত্যাগ স্বীকার করিয়া কি সাধারণ ধর্ম্ম কার্য্যরে জন্য একটা বাড়ী করিয়া দিতে পারে না ? দেখিতেছি, যেমন মুক্তগাচার প্রাতঃস্মরণীয় লক্ষীদেব্যা দ্বারা ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে ময়মনসিংহের গৌরব রক্ষা পাইতেছে তদ্রুপ অন্য স্থানের কোন্ ধার্ম্মিক ব্যক্তি দ্বারা ঢাকায় এইরূপ ধর্ম্মমন্দির প্রতিষ্ঠিত হইলে তবে ঢাকাবাসীর নাম রক্ষা পাইবে। সম্প্রতি আমাদিগকে কোন মহাশয় জানাইয়াছে, তাঁহার সমস্ত সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া যে দশ সহস্র টাকা হইবে, তাহা সমস্ত দ্বারা এই ধর্ম্ম মন্দির প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলে তিনি অকাতরে অবিলম্বে তাহা দিতে সম্মত আছেন। কিন্তু এই কার্য্য দশ হাজার টাকায় নির্ব্বহ হওয়া সন্দেহ স্থাল ; ধর্ম্ম সভার বিবেচনায় এ জন্য প্রায় বিশ সহস্র টাকা লাগিবে। অতএব তাঁহার দশ সহস্র টাকা গ্রহণ করিতে তৎসহ অন্যান্য ব্যক্তি হইতে বাকী টাকা সংগ্রহ করিত হইবে, সুতরাং কেবল তাঁহার নামে ঐ ধর্ম্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করা সঙ্গত হইবে না। পক্ষান্তরে আমরা দেখিতেছি, এমন একটি কার্য্যরে জন্য-যাহার ফল ঢাকার ৮২০০ অধিবাসী নিত্য ভোগ করিবে, এবং ঢাকায় আগন্তুক অন্যান্য স্থানের লক্ষ লক্ষ লোক উপকৃত হইবে, এমন ধর্ম্ম কার্য্য দ্বারা আপনার নাম চিরস্মরণীয় করিতে ২০ হাজার টাকা ব্যয় স্বীকার করা অনেকেই শ্লাঘ্য মনে করিবেন। আমরা আশা করি, এই মহৎ কার্য্যে যাঁহারা সমুৎসুক তাঁহারা অচিরে আমাদিগকে পত্র দ্বারা জানাইয়া বাধিত করিবেন। তাঁহারা অত্রত্য ধর্ম্মসভার হস্তেই টাকা দিউন-অথবা নিজ লোক দ্বারা উপযুক্ত স্থলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত করুন। উভয় প্রকারেই এই মহৎ কার্য্য সম্পাদন করিতে পারেন। যে সভা বিক্রমপুরস্থ কুলীন সমাজের প্রধান ব্যক্তি নবাব সরকারের দেওয়ান বাবু চন্দ্রকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় ও ভাওয়াল রাজমন্ত্রী বাবু কালীপ্রসন্ন ঘোষ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ দ্বারা পরিচালিত হইতেছে, তাহাতে ঐ জন্য অর্থ প্রদানে উদ্দেশ্য সিদ্ধির পক্ষে কোন সন্দেহ নাই।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!