ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই

-শ্যামল কুমার ঘোষ

ব্যক্তি জীবনে আমি কমিউনিস্ট ভাবধারার অনুসারী। ছাত্রজীবনে সরাসরি কমিউনিস্ট রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলাম। অন্ধ ধর্মানুসারীদের গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলাকে আমি কখনো সমর্থন করিনি; এখনো করি না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানবতাহীন ধার্মিকের চেয়ে যুক্তিবাদী মানবিক ব্যক্তি চিরকালই আমার কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

অতি ছোটবেলায় গ্রামে এক বিশেষ সাধক শ্রেণীর মানুষদের দেখতাম, যাঁরা লাউয়ের খোল দিয়ে তৈরি একতারা; সাথে লাউয়ের খোলেরই পাত্র নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে বিশেষ ভাবধারার গান গেয়ে ভিক্ষা করতেন। তাঁদের পোশাক ছিল সাদা আলখেল্লা ধরনের।

গ্রামের মানুষ তাঁদের বাউল, কেউ কেউ বৈরাগী নামে ডাকতো। সময়ের সাথে সাথে বুঝতে পেরেছি এঁরা এক বিশেষ মত-পথের মানুষ। যে মত-পথকে মোটের উপর বলা যায় মানবতার পথ। এ সমস্ত মানুষজন ছিলেন নিরাভরণ এবং নিরহংকার, নিতান্তই সদাসিদা সদানন্দ ধরনের।

হিন্দু ও মুসলিম দুই ধর্মের অনুসারী লোকজনই এই শ্রেণীর অন্তর্গত ছিলেন। সময়ের ধারাবাহিকতায় এক সময় স্কুল ছাড়িয়ে কলেজ, কলেজ ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কর্মজীবন। কর্মজীবনে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলাধীন শ্রীপুর ডিগ্রি কলেজে কর্মস্থল হলেও প্রথম থেকেই আমার আবাসিক অবস্থান ছিল মাগুরা জেলা সদর।

যে বিশেষ ব্যক্তিকে নিয়ে আমার এই স্মৃতিচারণমূলক লেখা তাঁর সাথে পরিচয় মূলত এই জেলা সদরে অবস্থানজনিত কারণে। যদিও তাঁর সম্পর্কে আমি আগেই জানতাম দু:সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্রে। ১৯৯৪ সালে আমার চাকুরি জীবনের প্রথম পর্যায়ে ঐ বিশেষ ব্যক্তিত্ব। যিনি কিনা একাধারে প্রথিতযশা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ও বাউল সাধক তাঁর কর্মস্থল মাগুরার চৌরঙ্গী মোরস্থ শান্তি ঔষধালযয়ে উঠাবসা শুরু হয়।

তাঁর পুত্র কবিরাজ তপন কুমার বসু কালক্রমে হয়ে উঠেন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যাঁর সম্পর্কে কিছু বলার জন্য এত ভূমিকা তিনি হলেন বাউল সাধক কবিরাজ মনোরঞ্জন বসু। শাস্ত্রীয় মতে যাঁর গুরুপাঠের নাম ছিল মনোরঞ্জন গোঁসাই।

যিনি ছিলেন ফকিরকুল শিরোমণি লালন সাঁইয়ের প্রশিষ্য। তাঁর গুরু ছিলেন কোকিল সাঁই। ছোটখাট চেহারার একজন সদা হাস্য ব্যক্তি ছিলেন বাউল মনোরঞ্জন গোঁসাই। শ্বেতশুভ্র বসনে তিনি ছিলেন বাউল সম্প্রদায় ও সাধারণ লোকারণ্যে এক অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মানবতাবাদী মনোরঞ্জন গোঁসাই কু-সংস্কারমুক্ত উদার মানুষিকতার মানুষ ছিলেন।

আমি নিজে যদিও বাউল মত-পথের যথার্থ অনুসারী নই, তবে এই মত-পথের প্রতি রয়েছে আমার অতিবেশি অনুরাগ। এই অনুরাগ থেকেই প্রায় নিয়মিত আমার যাতায়াত শুরু হয় তাঁর মাগুরার নতুন বাজারস্থ বটতলার বাড়িতে।

যেহেতু বাউল মতের অতি গূঢ় তত্ত্ব তাদের নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে আলোচনার সুযোগ নেই। সেহেতু আমি হয়তো সেই গূঢ় তত্ত্বের স্বাদ পাইনি তবে জনারণ্যে প্রকাশ্যে বলার মত তত্ত্ব বা মানবতাবাদী বাণী, কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে নির্দ্বিধায় বলতেন।

এইভাবে সরাসরি এই মতের অনুসারী না হলেও, তাঁর মত-পথের মূল কথাই হলো মানবসেবা; সর্বোপরি জীবসেবা। আত্মা মাত্রই পরমব্রহ্ম থেকে উৎসারিত। জীবের জীবনকাল শেষে মোহনাশ অন্তে আত্মা আবার পরম ব্রহ্মেই লীন হয়।

সদাচারী বাউল মনোরঞ্জন গোঁসাই বাউল মত-পথের অনেক ভেকধারী অসাধু গাঁজা ভাং সেবীদের আশ্রয় প্রশ্রয়ের স্থল ছিলেন না। যারা নেশাকে সাধন ভজনের অপরিহার্য বিষয় মনে করেন তাদের এই মহান ব্যক্তির কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিল না।

পবিত্র কোরান, গীতা এবং সুফি দার্শনিকদের দর্শন ছিল তাঁর নিত্য পাঠ্য। যুক্তিহীন, বিবেকহীন, মানবিকতার লেশশূন্য, কূপমণ্ডুক কীটসদৃশ ব্যক্তিবর্গকে তিনি করুণার দৃষ্টিতে দেখতেন এবং শুদ্ধাচারী হওয়ার উপদেশ দিতেন। ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনে নিজ স্ত্রীর সাথে আধ্যাত্মিক চিন্তা চেতনায় ভিন্নতা থাকলেও নিজ বিশ্বাস থেকে সরে আসেন নি বা আপোস করেন নি।

অনিবার্য কারণেই তাঁর সংসার জীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে নানা অশান্তি ও প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে। মানবসেবী অতিথিবৎসল মনোরঞ্জন গোঁসাই মানুষ ভালোবাসতেন। তাঁর এই সাধন পথে সদাসর্বদা তাঁর সহযাত্রী ছিলেন তাঁর পুত্র মাগুরা আয়ুর্বেদিক কলেজের অধ্যক্ষ কবিরাজ তপন কুমার বসু ও পুত্রবধূ তিথী বসু।

এছাড়া পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন এতদাঞ্চলের তথা সারাদেশের একজন অগ্রগণ্য কবিরাজ। শত সহস্র জটিল দুরারোগ্য রোগীর তিনি চিকিৎসা করেছেন। আবিষ্কার করেছেন বেশকিছু নতুন আয়ুর্বেদিক ঔষধ। যেমন- এরকম একটি উল্লেখযোগ্য ঔষধ হচ্ছে ‘বিভূতি ভষ্ম’। এছাড়াও তাঁর আবিষ্কৃত আরো কিছু ঔষধ আছে।

মূলত সদালাপী, সদাহাস্য এই মানবতাবাদী বাউল সাধকের সারাটা জীবন কেটেছে মানব তথা জীবসেবায়। ব্যক্তিগত জীবনে আমি তাঁর কাছে একান্ত কৃতজ্ঞ, কারণ বাউল মত পথের অনেক খুঁটিনাটী বিষয়াদি যেমন আমি তাঁর কাছে শুনতে পেরেছি, তেমনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার নানা বিষয় তাঁর কাছে প্রাপ্ত হয়ে নিজ আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা জীবনকে কমবেশি সমৃদ্ধ করতে পেরেছি।

ব্যক্তি জীবনে আমার কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে বাউল দর্শনের অনেকটাই জেনো মিল খুঁজে পাই। দুই ক্ষেত্রেই মানুষ এবং মানবতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে সবাইকেই একদিন এ ধরাধাম ত্যাগ কর আবার প্রকৃতিতেই লীন হতে হয়।

সেই অনিবার্য পরিণতির রূঢ় বাস্তবতায় মনোরঞ্জন গোঁসাই আজ আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর বিশাল ভক্ত শ্রেণী, তাঁর সমৃদ্ধ জীবন দর্শন। আমরা যাঁরা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি তারা নি:সন্দেহে ভাগ্যবান।

এই মানব হিতৈষী ব্যক্তির জীবন দর্শনের কণা মাত্র যদি আমাদের জীবনাচারে প্রতিফলিত হয় সেটাই হবে আমাদের বিশাল প্রাপ্তি।

……………………………..
-শ্যামল কুমার ঘোষ
শ্রীপুর সরকারী ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক।

…………………………………….
আরো পড়ুন:
ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই
আমার দেখা কবিরাজ গোঁসাই
আমার পিতা ভক্ত মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর দর্শন

মরমী সাধক মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী
মনোরঞ্জন গোঁসাই: স্বরূপ সন্ধানী দার্শনিক
মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর জীবন দর্শন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!