ভবঘুরে কথা
মহর্ষি মহেশ যোগী

-প্রণয় সেন

কে যেন হাসছে। বড় মধুর অথচ রহস্যময় সে হাসি। তখন সবেমাত্র রাত্রি শেষ হয়ে ভোর হয়েছে। হিমালয়ের সানুদেশে শিশু দেবদারুর ডালে পাখিরা জেগে উঠলেও চাপ চাপ অন্ধকার যেন জটলা পাকিয়ে আছে গাছের মাথায় মাথায়। হৃষিকেশের পুণ্যতোয়া গঙ্গার বুকের উপর ঘন হয়ে জড়িয়ে আছে তখনো ভোরের ভিজে কুয়াশা। তবু সেই হাসিটিকে উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে ক্রমশঃ। সমস্ত কুয়াশা আর অন্ধকার ভেদ করে সেই আশ্চর্য হাসির ছটা ভোরের নরম আলোর মতই স্বচ্ছবিপুল বিস্তারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিক হতে দিগন্তের পথে। সমুদ্রতীরে এসে সেই আলোটি সহসা থমকে দাঁড়ায় একবার। তারপর সমুদ্র পার হয়ে ছুটে যায় পশ্চিমের মহদেশগুলোর পথে যেখানে অবিদ্যার অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে এখনো, সেখানকার মানুষগুলোর মোহনিদ্রা এখনও কাটেনি।

এ হাসির আলো হচ্ছে মহর্ষি যোগীর মুখের। তিনি সব সময় হাসেন। আর সেই হাসি থেকে বেরিয়ে আসে এক দিব্য আলোর ছটা। যে আলো একই সঙ্গে অনন্ত জ্ঞান আর অফুরন্ত আনন্দের প্রতীক। তিনি সব সময় হাসেন; তিনি সব সময় সুখী। তিনি সর্বজ্ঞ, সচ্চিদানন্দময় । কারণ তিনি জানেন, পৃথিবীর আনন্দই একমাত্র সত্য। দুঃখের জন্য মানুষের জন্ম হয়নি। তিনি জানেন, মানুষের আত্মার মধ্যেই আছে অফুরন্ত আনন্দরূপ অমৃতের ভাণ্ড, আছে পরমজ্ঞানের দিব্য আলোর রাজ্য। ধ্যান যোগে সেই আত্মাকে জানতে পারলেই উজ্জ্বল ঊষালোকবিদ্ধ নিশান্ধকারের মত নিশ্চিহ্ন ভাবে পালিয়ে যাবে যত সব অসত্য আর অবিদ্যার মায়িক অন্ধকার।

১৯১১ সালের ১১ই অক্টোবর উত্তরকাশীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয় মহেশ যোগীর। বাবা মা ছিলেন শৈব। তাই দেবাদিদেব মহেশ্বরের নাম অনুসারে ছেলের নাম রাখেন মহেশ। দেবদেবীর নাম অনুসারে ছেলেমেয়ের নামকরণ করা একটা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন প্রতিটি হিন্দু পরিবারে। মহেশের বাবা মাও সেদিন এই প্রথারই অনুবর্তন করতে চেয়েছিলেন। দেবতার নামে নাম রেখেছিলেন ছেলের; কিন্তু রোগা রোগা চেহারার এই অতি সাধারণ ছেলেটির মধ্যে তাঁরা খুঁজে পাননি কোন দেবতুল্য পরিণতির আভাস। সেদিন তাঁরা ভাবতে পারেননি তাঁদের এই মহেশ, মহেশ্বরের মতই হয়ে উঠবে এক মহাযোগী। সুদীর্ঘ দিনের সাধনায় যোগৈশ্বর্য্য সে লাভ করবে, তা সে বিতরণ করে বেড়াবে সারা জগৎ জুড়ে।

একবার নিউইয়র্কে ম্যাডিসান স্কোয়ারে এক সভানুষ্ঠানের পর গ্যারাগিণ্ডলা নামে একজন আমেরিকান ভদ্রলোক প্রশ্ন করেন, যীশু খ্রিস্টের সারাজীবন মানবজাতির কল্যাণের জন্য, দুঃখের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় এবং চরম দুঃখভোগ ও শোচনীয় অকালমৃত্যুর মধ্যে হয় সে জীবনের পরিসমাপ্তি হয়। কিন্তু কেন ?

মহর্ষি তখন বলেন, যীশু খ্রিস্টকে যদি আমরা মানব জাতির ত্রাণকর্তা বলি তাহলে তিনি দুঃখভোগ করেছিলেন একথা বলা তাঁর উপর অবিচার করা হবে। তাহলে এই কথাই প্রমাণিত হবে যে, সমগ্র মানব জাতির ত্রাণকর্তা যিনি – তিনি নিজেকে দুঃখ থেকে ত্রাণ করতে পারেন নি। যীশু দুঃখ ভোগ করেছিলেন এটা দেখার ভুল। যখন থেকে যীশু তার আত্মার সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক বুঝতে পেরেছিলেন, সেদিন থেকে সমগ্র মানবজাতির বৃহত্তর সত্তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে দিয়েছিলেন, সেইদিন থেকে প্রকৃত পক্ষে তিনি অখণ্ড পরমানন্দ লাভ করেছিলেন।

তিনি ছিলেন অমৃতের পুত্র। তিনি তাঁর অন্তরের মধ্যে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ বিভূতি আমৃত রূপ আনন্দের অফুরন্ত উৎস খুঁজে পেয়েছিলেন বলেই তিনি মানব জাতিকে বলতে পেরেছিলেন, তোমাদের অন্তরের মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরের রাজ্য। যীশু ছিলেন জীবন্মুক্ত পুরুষ। তাঁর দেহটা ক্রুশবিদ্ধ হলেও তাঁর দেহগত কোনো জৈবচেতনা তাঁর নিত্যশুদ্ধ আত্মাকে স্পর্শ করতে পারেনি। দেহ হচ্ছে অনন্ত জড়বস্তু; তা কখনই আত্মার সমান হতে পারে না। সুতরাং তাঁর দেহ থেকে চিরমুক্ত আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করে নেবার ক্ষমতা তাঁর ছিল। মহর্ষি আরও বলেন, ‘যারা জানে না তাদের অন্তরের মাঝেই আছে অমৃত, আছে অখণ্ড অনন্ত পরমানন্দের উৎস তারাই দুঃখভোগ করে। এ যেন রাজার ছেলে হয়ে ভিখারীর বেশে ঘুরে বেড়ানো আর বাপকে কষ্ট দেওয়া। ঈশ্বর মানুষকে কখনো দুঃখভোগের জন্য সৃষ্টি করেননি। ঈশ্বর প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন অফুরন্ত আত্মসম্পদ আর অমৃত ভাণ্ডার। আত্মবিস্মৃত অবিদ্যাগ্রস্থ মানুষ সে সম্পদের কথা জানে না বলেই দুঃখ ভোগ করে, অহোরহ ত্রিতাপ জ্বালায় দগ্ধ হয়।’ পাশ্চাত্যে গিয়ে মহর্ষি প্রথমে বললেন, ‘মানবজীবনে দুঃখ সত্য নয়, আনন্দই একমাত্র সত্য। আনন্দই হচ্ছে ব্রহ্ম।’

আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে

আনন্দেন জাতানি জীবন্তি,

আনন্দং সম্প্রত্যভিসং বিশন্তি।

তৈত্তীরীয় উপনিষদের এই বাণীটিকেই যেন নতুনরূপে তুলে ধরলেন মহর্ষি। আনন্দ হতেই জীবের জন্ম, আনন্দের জন্যই তারা বেঁচে থাকে এবং মৃত্যুর পর অনন্দরূপ পরমাত্মার মধ্যেই লীন হয়ে যায় তাদের জীবাত্মা। দেখতে দেখতে তেরটি বছর কেটে গেল। ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল। এর মধ্যে যোগসাধনার সবচেয়ে বড় দুটি কঠিন স্তর ধ্যান ও সমাধি, দুটিতেই পূর্ণসিদ্ধি লাভ করেছেন মহর্ষি মহেশ।

তাঁর গুরুদেবের ধ্যানরত মূর্তিটি সব সময় প্রেরণা দিত তাঁকে। পদ্মাসনে সংস্থিত গুরুদেব শঙ্করাচার্য যখন শিবের মত পর্যঙ্কবদ্ধ হয়ে নিশ্চল হয়ে ধ্যান করতেন সত্যি সত্যিই তাঁকে ভগবান শঙ্করের মত দেখাত। অনন্যচিত্ত আত্মার স্বরূপ চিন্তা করার নাম ধ্যান। ধ্যান সগুন ও নির্গুণ দু’রকম হতে পারে। ধ্যানযোগে আত্মার স্বরূপ চিন্তা করতে গিয়ে ধ্যানী পরমাত্মার আভাস পান। পরমাত্মাকে নারায়ণ, আদিত্যমণ্ডল, বৈশ্বানর প্রভৃতি কোন বিশেষরূপে দেখার নাম সগুণ ধ্যান। আর পরমাত্মাকে বিশ্বরূপ, অথচ নিরাকার, অপ্রমেয় রসগন্ধদিবর্জিত অরূপ, অব্যক্ত ও অপ্রত্যক্ষস্বরূপ অনুভব ও উপলব্ধি করার নাম নির্গুণ ধ্যান। প্রথমে সগুণ ও পরে নির্গুণ ধ্যান অভ্যাস করতে থাকেন মহেশ যোগী।

এই ধ্যান দ্বারা জীবাত্মাকে পরমাত্মার মধ্যে সংস্থাপিত করা এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মাকে সমভাবে ও সহাবস্থানে আনতে পারাই হল সমাধি। মাঝে মাঝে সুধা-রসক্ষরণশীল চান্দ্রালোকের মত অজস্র অমৃত – ধারায় প্লাবিত সর্বব্যাপী পরমাত্মা পুরুষকে নিজদেহে ও জীবাত্মার মধ্যে চিন্তা করে আমিই সেই পরমাত্মা ও পরব্রহ্ম বলে ধ্যান করতে করতে সমাধিস্থ হয়ে পরতেন মহেশ যোগী এবং এই সমাধিস্থ অবস্থায় অনেক্ষন থাকতেন।

এই ভাবে যুগ যুগব্যাপী সাধনার দ্বারা জীবিত অবস্থাতেই মোক্ষ বা জীবন্মুক্তি লাভ করলেন মহেশ যোগী। লাভ করলেন অতুলনীয় অধ্যাত্মসম্পদ আর অপরিসীম যোগ বিভূতি। কিন্তু তবুও তাতে সন্তুষ্ট তৃপ্ত হলেন না তিনি। অনেক দিনের একটি আশা ছিল মহেশ যোগীর। তখন সাধনা সবেমাত্র শুরু। তাঁর আশা ছিল, জীবনে যদি কখনও সিদ্ধিলাভ করেন তাঁর সাধনায় তাহলে জনকল্যাণের জন্য কিছু করবেন। তবে এ কল্যাণ পার্থিব কিছু নয়, সম্পূর্ণরূপে অপার্থিব। মানুষের দেহগত সমস্যার কথা কখনও তিনি ভাবেননি। তাঁর মতে মানুষের একমাত্র সমস্যা আত্মিক আর আধ্যাত্মিক। তাই তিনি চান সারা বিশ্বের সমগ্র মানবজাতির আত্মিক পরিপূর্ণতা।

নিজের জন্য মোক্ষ কোনদিনই কাম্য ছিল না তাঁর। মহর্ষি বহু আগে হতেই লক্ষ করেছেন, মানুষ অমৃতের পুত্র হয়েও প্রতি মুহূর্তে তারা মৃত্যুসন্ধুক্ষিত। অবিদ্যাগ্রস্ত মানুষ ভুলে গেছে তার আত্মার স্বরূপ, অমৃতত্ব। বিভিন্ন জীবদেহবাসী আত্মার অভিন্নত্ব ভুলে গিয়ে তারা বিবাদে বৈষম্যে জড়িয়ে পড়েছে পরস্পরের সঙ্গে। এই বিবাদ ব্যাক্তিগত, শ্রেণীগত ও জাতিগত পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে।

তাই এক গোপন ইচ্ছা জেগেছিল মহর্ষির মধ্যে, শুধু তাঁর নিজের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে কল্যাণকর এমন কিছু করবেন যাতে করে নির্মল ও সুন্দর হয়ে ওঠে সব মানুষের আত্মা, যাতে করে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় মানবসমাজে। তখনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন মনে মনে, যোগ সাধনার মধ্যে যে অমূল্য অধ্যাত্মসম্পদ তিনি লাভ করবেন, তা নিজের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে বিলিয়ে দেবেন সকল মানুষের মধ্যে।


সহসা অদ্ভুত খেয়াল চাপল মহর্ষির মনে। তখন ১৯৫৯ সাল। খেয়াল হলো, তিনি পাশ্চাত্যে যাবেন। বাস্তুতান্ত্রিক বাসনাবিক্ষুব্ধ পশ্চিমের দেশগুলোতে পরিব্রাজকের মত ঘুরে ঘুরে তিনি প্রচার করবেন আধ্যাত্ম সাধনার বাণী।

সমস্ত অন্তর উজাড় করে তিনি সব মানুষকে দিতে পারবেন প্রকৃত জ্ঞানের আলো আর অনন্ত আনন্দের অমৃত- তার জন্যে বাকুলভাবে কত প্রতীক্ষা করেছেন মনে। সিদ্ধিলাভ করে ঋষীকেশের নিভৃত নির্জন অরণ্য প্রদেশে এক আশ্রম গড়ে তুললেন মহর্ষি মহেশ যোগী। দেখতে দেখতে দু-একজন করে ভক্ত এসে হাজির হল। আসতে আসতে বড়ো হয়ে উঠতে লাগলো আশ্রমটি। তাঁর গুরুদেবের নাম অনুসারে মহর্ষি আশ্রমটির নামকরণ করলেন শঙ্করাচার্য নগর। সহসা অদ্ভুত খেয়াল চাপল মহর্ষির মনে। তখন ১৯৫৯ সাল। খেয়াল হলো, তিনি পাশ্চাত্যে যাবেন। বাস্তুতান্ত্রিক বাসনাবিক্ষুব্ধ পশ্চিমের দেশগুলোতে পরিব্রাজকের মত ঘুরে ঘুরে তিনি প্রচার করবেন আধ্যাত্ম সাধনার বাণী।

স্থূল ভোগচেতনাসর্বস্ব সেখানকার মানুষদের অতৃপ্ত অশান্ত চিত্তকে দেবেন স্থায়ী আত্মিক প্রশান্তির সন্ধান। তিনি তাদের শেখাবেন, যে পথে তোমরা চলছ তা ভুল, যে জীবন তোমরা যাপন করছ তা বিকৃত। তোমরা ভোগ লালসায় উন্মত্ত হয়ে বস্তুর বাইরের দিকটা নিয়ে মাতামাতি করছ; কিন্তু তোমরা বস্তুর অন্তনিহিত আত্মসত্তার কোন সন্ধান পাওনি। কারণ তোমাদের সেই অন্তর্দৃষ্টি নেই। তিনি তাদের বলবেন, যা করেছ করেছ, এবার তোমরা জাগো, আবিদ্যায় অন্ধ হয়ে থেকো না।

ধ্যানলব্ধ অন্তর্দৃষ্টির দ্বারা তোমরা প্রথমে তোমাদের নিজেকে চেনো, তারপর জগৎ ও জীবনের স্বরূপ কে চেনো। প্রথমে ধ্যানের দ্বারা আপন আত্মার স্বরূপকে চেনো, ভালোভাবে উপলব্ধি করো। দেখবে কোন কিছুর মধ্যে ভেদ নেই, কোন অসাম্য নেই মানুষে মানুষে। ভেদজ্ঞান সমস্ত রকমের বিরোধ বিষমতার মুলে, সেই ভেদজ্ঞানের উর্ধ্বে উঠে গিয়ে অখণ্ড অনন্ত শান্তির অধিকারী হবে তোমরা। তখন দেখবে, বস্তুর যে দিকটাকে ভোগ্য ভেবে পাগলের মত ছুটে চলেছ তাকে পাওয়ার জন্য, সেটা একান্তভাবে মায়িক। বুঝতে পারবে বাঁচার আনন্দ, জীবনের সার্থকতা কখনও কোন বস্তুর উপর নির্ভর করতে পারে না।

………………………………………………..
সুধাংশুরঞ্জন ঘোষের ভারতের সাধক ও সাধিকা থেকে
পুণঃপ্রচারে : প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!