মহাবতার বাবাজী

শান্তমধুর নিদাঘ নিশীথ। মাথার উপর বড় বড় উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো আকাশের বুকে আলো বিকিরণ করে চারিদিকে একটা স্বপ্নের মায়াজাল রচনা করেছে। শ্রীরামপুর আশ্রমের বারান্দায় শ্রীযুক্তেশ্বরজীর পাশে আমি বসে আছি। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গুরুদেব, আপনি কখনও বাবাজীর দর্শন পেয়েছেন?’

শুনে তাঁর চোখদুটি ভক্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমার এই সোজাসুজি প্রশ্নে একটু হেসে তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, পেয়েছি বই কি! আমার বহু পূণ্যবলে বলে আমি তিন তিনবার এই অমর মহাগুরুর সাক্ষাৎ পেয়েছি। প্রথমবার আমাদের সাক্ষাৎ হয় এলাহাবাদের কুম্ভমেলায়।’

ভারতবর্ষে কুম্ভমেলার মত ধর্মীয় মহামেলা স্মরণাতীত যুগ হতে চলে আসছে। এইসব ধর্মীয় মহামেলা অগণিত লোকের চোখের সামনে একটা আধ্যাত্মিক লক্ষ্য সর্বদা ধরে রেখে আসছে। হাজার হাজার সাধুসন্ন্যাসী যোগীঋষিদের দর্শনলাভের জন্য লক্ষ লক্ষ ভক্ত প্রতি বার বৎসর অন্তর একবার করে মেলায় সমবেত হন।

এমনসব সাধুসন্ন্যাসীরাও আছেন, যারা কেবলমাত্র একবার মেলায় এসে সংসারী নরনারীদের পূণ্য আশীর্বাদ বর্ষণ করা ছাড়া আর কখনও তাঁদের নির্জন স্থান হতে প্রকাশ্যে আসেন না।

শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজী বলতে লাগলেন, ‘বাবাজীর সঙ্গে যখন আমার সাক্ষাৎ হয় তখনও আমি সন্ন্যাস গ্রহণ করিনি। তবে লাহিড়ী মহাশয়ের কাছ থেকে তখন আমার ক্রিয়াযোগে দীক্ষা নেওয়া হয়ে গেছে। ১৮৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে এলাহাবাদে যে কুম্ভমেলা হয়, তাঁরই উৎসাহে আমি সে মেলাতে যোগদান করি। সেই আমার প্রথম কুম্ভমেলা দর্শন। দারুণ ভিড় আর হট্টগোলের মাঝে আমি একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি।

চতুর্দিকে আমার আগ্রহব্যাকুল দৃষ্টির সম্মুখে কোন প্রকৃত সদ্‌গুরুর পূণ্যমূর্তির আবির্ভাব ঘটল না। গঙ্গার তীরে একটা পোলের কাছ দিয়ে যাচ্ছি, চোখে পড়ল একটি পরিচিত মূর্তি- কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন ভিক্ষাপাত্রটি বাড়িয়ে দিয়ে।

হতাশ হয়ে ভাবলাম, এ মেলাটা একটা ভিখিরীর দলের চেঁচামেচি আর হট্টগোল ছাড়া অন্য কিছুই নয়। আমার মনে হয় যে পশ্চিমের বৈজ্ঞানিকেরা, যারা মানবজাতির প্রত্যক্ষ মঙ্গলসাধনের জন্যে জ্ঞানের পরিধি ধৈর্যের সঙ্গে বাড়িয়ে চলেছেন, তারা কি এইসব, যারা ধর্মের ভণ্ডামি করে অথচ ভিক্ষাই যাদের একমাত্র উপজীবিকা, তাদের চেয়ে ভগবানের কাছে বেশি প্রিয় নন?

সমাজসংস্কারের এই সব ছোটখাটো চিন্তাগুলি হঠাৎ পেল; দেখি, সামনে এক দীর্ঘকায় সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আমায় বলছেন- মশায়, এক সাধুজী আপনাকে ডাকছেন।

-কে তিনি?

-আসুন, এলে নিজেই দেখতে পাবেন।

ইতস্ততঃ করে এই সংক্ষিপ্ত উপদেশটি পালন করতে গিয়ে এলাম একটি গাছতলায়- তার শাখাপ্রশাখার নিচে একজন গুরু তাঁর বেশ দর্শনযোগ্য দলবল নিয়ে বসে আছেন‌‌। গুরুজীর জ্যোতির্ময় মূর্তি অপূর্ব দর্শন, ঘনকৃষ্ণ চক্ষু দুটি অত্যুজ্জ্বল। আমার আগমনে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি আমায় আলিঙ্গন করে সস্নেহে বললেন, স্বাগত, স্বামীজী!

আমি জোরালো প্রতিবাদ করে বললাম, না মশায়, আমায় স্বামীটামী কিছু বলবেন না; আমি ওসব কিছু নই।

-দৈবাদেশে যাদের আমি স্বামী উপাধি দিই, তারা আর তা পরিত্যাগ করতে পারে না।

সাধুটি নিতান্ত সাধারণভাবে কথাগুলি বললেও কথাগুলির মধ্যে সত্যের গভীর দৃঢ়তা ছিল; সঙ্গে সঙ্গে মনে হল যেন দেবতার আশিসধারায় প্লাবিত হয়ে গেছি। আমার এরূপ হঠাৎ স্বামী পদবীতে পদোন্নতি লাভ হওয়াতে একটু হেসে, যিনি আমায় এরূপভাবে সম্মানিত করলেন, সেই নরদেহে দেবতারূপী মহাগুরুর চরণে আমি প্রণাম নিবেদন করলাম।

বাবাজী- কারণ তিনি ছাড়া আর কেউ নন- সেই গাছতলায় তাঁর নিকটে একটি আসনে আমায় বসতে বললেন। শরীর তাঁর বেশ দৃঢ় আর বলিষ্ঠ- দেখতে ঠিক লাহিড়ী মহাশয়ের মত। যদিও আমি এই দুই মহাগুরুর অদ্ভুত সাদৃশ্যের কথা বহুবার শুনেছিলাম, তবুও কিন্তু তখন তা আমার চোখে ঠিক ধরা পড়েনি।

বাবাজীর এমন একটা শক্তি ছিল যে, কারোর মনে কোন বিশেষ চিন্তার উদয় হলে তা তিনি নিবারণ করতে পারতেন। বোধহয় সেই মহানগুরুর এই ইচ্ছা ছিল যে, তাঁর সামনে আমি সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই অবস্থান করি- তাঁর প্রকৃত পরিচয় পেয়ে বেশি অভিভূত হয়ে না পড়ি।

-কুম্ভমেলা দেখে কি মনে হয়?

বড়ই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম, মশায়। পরে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, অবশ্য আপনার দর্শন না পাওয়া পর্যন্ত। কেন জানি না- আমার মনে হয় শান্তশিষ্ট সাধুসন্ন্যাসীদের সঙ্গে এই সব হট্টগোল একেবারেই খাপ খায় না‌।

গুরু মহারাজ বললেন, বৎস! (যদিও দেখলে তাঁর দু’গুণ আমার বয়স বলে বোধ হবে) বহুর দোষের জন্যে সবাইকেই একসঙ্গে বিচার করে বোসো না। পৃথিবীতে সব জিনিসই ভালমন্দে মিশানো- বালির সঙ্গে চিনির মিশ্রণ যেমন। চতুর পিপীলিকার মত হও; বালি ফেলে রেখে চিনির দানা খুঁটে নাও। যদিও অনেক সাধুসন্ন্যাসী এখানে এখনও মায়া আর ভ্রান্তিবশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তবুও মেলাতে এমন কিছু লোকও আছেন যাদের প্রকৃতই ঈশ্বরলাভ হয়েছে।

মেলায় এই মহানগুরুর সাথে আমার নিজ দর্শনলাভের কথা স্মরণ করে আমি তৎক্ষণাৎ তাঁর কথায় সায় দিলাম।

আমি বললাম, মশায়! আমি পশ্চিমের বৈজ্ঞানিকদের কথাই ভাবছিলাম। বুদ্ধিতে তারা আমাদের এখানকার সমবেত বেশিরভাগ মানুষের চেয়েও কত বড়। কোন্ সুদূরদেশে ইউরোপ বা আমেরিকায় তারা বাস করেন- তাদের ধর্মমতও সব বিভিন্ন, আর এই বর্তমান মেলার মত সব মেলার প্রকৃত মূল্য কি, সে বিষয়েও তারা অজ্ঞ।

তারা ভারতবর্ষের ধর্মগুরুদের সাক্ষাৎ পেলে খুবই উপকৃত হতে পারেন। বুদ্ধিবৃত্তিতে তারা খুব উন্নত হলেও বহু প্রতীচীবাসী একেবারে দারুণ জড়বাদী। অন্যেরা বিজ্ঞান বা দর্শনশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হলেও সকল ধর্ম যে মূলতঃ এক, সে কথাটা তারা মানেন না। তাদের বিশ্বাসটাই হচ্ছে এক দুর্লঙ্ঘ্য বাধা, যা আমাদের কাছ থেকে তাদেরকে চিরতরেই পৃথক করে রেখেছে।

কথাটা মনোমত হওয়ায় বাবাজীর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, দেখছি যে তোমার প্রাচ্য আর প্রতীচ্য এই দুই দেশের জন্যেই বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সর্বমানবের জন্যেই তোমার উদারহৃদয় যে কেঁদে উঠেছে তা আমি আগে টের পেয়েছি, আর সেইজন্যেই তোমাকে এই জায়গায় ডেকে এনেছি।

তিনি বলতে লাগলেন, পূর্ব আর পশ্চিম এই দুই প্রান্তের মধ্যে কর্ম আর ধর্মসাধনার সুবর্ণময় মধ্যপথ রচনা করা উচিত। পশ্চিমের কাছ থেকে পার্থিব উন্নতির জন্যে ভারতবর্ষের যেমন অনেক কিছু শেখবার আছে, তেমনি তার প্রতিদানে ভারতবর্ষও পশ্চিমকে এমন এক সর্বজনীন প্রণালী শিক্ষা দিতে পারে যাতে করে সে যোগবিজ্ঞানের সুদৃঢ়ভিত্তির উপর তার ধর্মমত প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হবে।

স্বামীজী, পূর্ব-পশ্চিমের সুসঙ্গত ভবিষ্যৎ আদানপ্রদানের কাজে তোমায় অংশ গ্রহণ করতে হবে। বছর কয়েক বাদে আমি তোমার কাছে একটি শিষ্যকে পাঠাব যাকে পশ্চিমে যোগ প্রচারের কাজে তোমাকে তৈরি করে নিতে হবে। সেখানে বহু ধর্মপিপাসু আত্মার আকুল আহ্বান বন্যার মত আমার কাছে এসে পৌঁছচ্ছে। আমি অনুভব করছি যে, আমেরিকা আর ইউরোপে বহু সম্ভাব্য সাধুসন্তরা জাগরিত হবার জন্যে অপেক্ষা করছেন।

গল্পের এই স্থানে শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজী তাঁর পূর্ণদৃষ্টি আমার মুখের উপর স্থাপিত করলেন।

শুভ্র চন্দ্রালোকে চারিদিক তখন হাসছে। শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজী একটু হেসে শুরু করলেন, বৎস! তুমি হচ্ছ সেই শিষ্য, যাকে বাবাজী মহারাজ বহু বছর আগে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

শুনে অবশ্য খুবই খুশি হলাম যে বাবাজীই আমাকে শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজীর কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু এও আমি তখন কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিলাম না যে আমার ভক্তিভাজন গুরুদেব আর তাঁর এই শান্ত আশ্রম ভূমি ত্যাগ করে আমি পশ্চিমে গিয়ে থাকব কি করে, আর কি নিয়ে।

শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজী তারপর বলতে শুরু করলেন, বাবাজী তখন ভগবদ্ গীতা সম্বন্ধে বলতে লাগলেন। আমায় তাঁর কতকগুলো প্রশংসার কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে গীতার বিভিন্ন অধ্যায়ের আমি যে কিছু ব্যাখ্যা লিখেছি, সে খবরও তিনি জানেন।

তারপর সেই মহানগুরু বললেন, স্বামীজী, আমার অনুরোধে আর একটি কাজের ভার তোমায় নিতে হবে। তুমি খ্রিস্টীয় আর হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের মূলগত ঐক্য প্রদর্শন করে একটি ছোট্ট বই লেখ না কেন? এই দুই শাস্ত্র থেকে সমভাবের উক্তি সকল পাশাপাশি উদ্ধৃত করে দেখিয়ে দাও যে, ঈশ্বরের প্রিয় ভক্তেরা সবাই একই সত্য বলে গেছেন- এখন যা মানুষের সাম্প্রদায়িকতার অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন।

কতকটা সংশয়ের সঙ্গে বললাম, মহারাজ! এ আপনার কি অদ্ভুত আদেশ! এ কি আমি পালন করতে পারব?

বাবাজী মৃদু হেসে আশ্বাস দিয়ে বললেন, বাবা! সন্দেহ করছ কেন? আরে এ কার কাজ, আর সব কাজ কেই বা করায় বল? ভগবান আমায় দিয়ে যা কিছুই বলাচ্ছেন, তা সব সত্য হয়ে ফলে যেতে বাধ্য।

সাধু মহারাজের আশীর্বাদে মনে নববলের সঞ্চার হল, বই লিখতে সম্মত হলাম। বিদায় নেবার সময় উপস্থিত দেখে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও পর্ণাসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালাম।

গুরুমহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন, লাহিড়ীকে জান? একজন মহাপুরুষ, নয় কি, কি বল? আমাদের যে দেখা হয়েছে তা তাকে বোলো! বলে লাহিড়ী মহাশয়কে জানাবার জন্য আমায় একটা সংবাদ দিলেন।

বিদায়গ্রহণকালে ভক্তিভরে প্রণাম করে উঠতেই তিনি মধুর হেসে বললেন, তোমার লেখা শেষ হলেই আমি তোমায় দর্শন দেব- উপস্থিত এখন বিদায়!

(চলবে…)

…………………………
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে : ভারতের সাধক-সাধিকা

যোগী-কথামৃত (Autobiography of a Yogi) শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ বিরচিত পূজনীয় ও পরমারাধ্য আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পিত।

মৎপ্রণীত ইংরাজী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ্ এ যোগী’র বঙ্গানুবাদে শ্রীমান ইন্দ্রনাথ শেঠের স্বেচ্ছা প্রণোদিত প্রয়াস ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ ও আশির্বাদ জানাই।- পরমহংস যোগানন্দ

পুণঃপ্রচারে বিনীত- প্রণয় সেন

…………………………
আরো পড়ুন:
মহাবতার বাবাজীর দর্শন লাভ: এক
মহাবতার বাবাজীর দর্শন লাভ: দুই

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!