ভবঘুরে কথা
রমনা কালী মন্দির

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

একসময় ঢাকায় রমনা এলাকায় ছিল দশনামী গোত্রের হিন্দুদের একটি মন্দির। সুউচ্চ চূড়া বিশিষ্ট এই মন্দিরটি আকারে খুব বেশি বড় ছিল না। ১২টি সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরের বারান্দায় উঠতে হত। এ বারান্দার মধ্যখানে কাঠের সিংহাসনে স্থান পেত লাল পাড়ের শাড়ী পরিহিত স্বর্ণ মনি-মুক্তার অলঙ্কারে ভূষিত কষ্ঠি পাথরের কালিক ও ভদ্র কালি মূর্তি। যতীন্দ্রমোহন রায়ের ঢাকার বিবরণ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে- “এই কালীমূর্তিটি বিক্রমপুরাধিপূত চাঁদরায়ের প্রতিষ্ঠিত বলে জনশ্রুতি আছে।”

ধারণা করা হয়, নেপাল থেকে আগত জনৈক কালী দেবীর কোন এক ভক্ত মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে মন্দিরটি ভাওয়ালের রানী বিলাসমণি দেবী সংস্কার করে দেন।

১৮৫৯ সালের ঢাকার এক মানচিত্রে রমনা কালী মন্দিরকে কৃপাসিদ্ধির আখড়া নামে অভিহিত করা হয়েছে। নাজির হোসেন তার কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “এ মন্দিরের পুরানো নাম কৃপাসিদ্ধি আখড়া, প্রায় সাড়ে চার শত বছর পূর্বে গোপালগিরি নামে ভারতের বদ্রিনারায়ণ থেকে এসেছিলেন এক সাধু পুরুষ। তিনিই এ আখড়ার গোড়া পত্তন করেছিলেন। এখন যে মন্দির রয়েছে সেটি তৈরি করেন হবু চরনগিরি প্রায় আড়াইশ বছর পূর্বে।”

রমনা কালী মন্দিরের সঙ্গে আরেকটি নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হচ্ছেন ব্রহ্মানন্দ গিরি। অলৌকিক শক্তিধর সিদ্ধ সাধক হিসেবেই তিনি ঢাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন। জানা যায়, অন্তস্বত্বাবস্থায় ব্রহ্মানন্দের মাতা দস্যুদের হাতে অপহৃত হন। পথে এক তিলক্ষেতে ব্রহ্মানন্দ জন্মগ্রহণ করে। ব্রহ্মানন্দের পিতা এই খবর পেয়ে ছেলেকে তার কাছে নিয়ে যান। দিন দিন ব্রহ্মানন্দের চারিত্রিক দোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে তার মাতা কুলত্যাগী হয়ে বেশ্যাবৃত্তিতে চলে যান। ঘটনাক্রমে ব্রহ্মানন্দ একবার বেশ্যালয়ে যেয়ে তার মাতার ঘরে প্রবেশ করে। পুত্রের কপালে জড়–লের চিহ্ন দেখে মা তাকে চিনতে পারলে অনুতাপেদ্বগ্ধ হয়ে ব্রহ্মানন্দ সন্ন্যাস নেন। তিনি রমনার কালী মন্দিরে এসে দশনামী সন্ন্যাসীদের সান্নিধ্যে এসে ব্রহ্মানন্দ গিরি নাম ধারণ করে। তিনি দুষ্কর্মের প্রতিশোধ গ্রহণের সংকল্পে তান্ত্রিক সাধনায় মগ্ন হন।

অপর সূত্র মতে, সংসার বীরাগি হয়ে ব্রাহ্মণ যুবক ব্রজ গোপাল ভট্টাচার্য রমনায় এসে শ্রীমৎ মাধবানন্দ গিরি মহারাজের আশ্রয় নেন। এখানেই তিনি মাধবানন্দ গিরি মাহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়ে গিরি সম্প্রদায়ে যোগ দিয়ে ব্রহ্মানন্দ গিরি নাম ধারণ করেন। তিনি দীর্ঘ ৫ বছর গুরুর কাছ থেকে বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যায়ন ও কঠোর তপস্যার মাধ্যমে সাধন মার্গে যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেন। কিন্তু তিনি তাতে তৃপ্ত হতে পারেন নি। ব্রহ্মানন্দ গুরুর অনুমতিক্রমে আগম বাগীশ নাগভট্টের কাছে কৌল সাধনার জন্য তান্ত্রিক দীক্ষা লাভ করেন। তারপরে তিনি তীর্থ দর্শন শেষে বিক্রমপুরের শ্রীপুরের কাছে কীর্তিনাশা নদী কূলে এক বিরাট প্রস্তর খণ্ডের উপর ধ্যানমগ্ন হন। এখানেই তিনি তপসিদ্ধ হয়ে ইষ্টদেবীর সাক্ষাৎ লাভ করেন। কথিত আছে, দেবী তাকে বর দিতে চাইলে তিনি অস্বিকৃতি জানান। বর নিতে রাজি না হলেও দেবী তাকে বার বার অনুরোধ করতে থাকেন। এতে তিনি দেবীকে বিরাট প্রস্তর খণ্ডটি মস্তকে বহন করে তাকে অনুসরণ করতে বলেন। তাকে থামতে বললেই তিনি চলে যাবেন এই শর্তে দেবী রাজী হন। ব্রহ্মানন্দ হাঁটতে হাঁটতে মধ্যাহ্নকালে কয়েকজন ভক্তসহ রমনা কালী মন্দিরে প্রবেশ করেন। কিছুসময় পরে দেবী বলে উঠেন ‘ব্রহ্মানন্দ আমি আর অগ্রসর হতে পারছি না। দরজায় পাথর ঠেকে যাচ্ছে।’ ব্রহ্মানন্দ তাকে থামতে বললে শর্তানুসারে প্রস্তরখণ্ড ফেলে দেবী প্রস্তান করেন। কথিত আছে, এ পাথরটি দীর্ঘদিন রমনা মন্দিরের দরজার পাশেই পড়ে ছিল। সাধক প্রবর ব্রহ্মানন্দ গিরির ‘সিদ্ধিসন’ বলে অনেকেই এ পাথরটিকে পূজা করত। ব্রহ্মানন্দ এখান থেকে পুনরায় শ্রীপুরে ফিরে যান। ব্রহ্মানন্দ গিরি মহারাজের পুত্র পরবর্তীতে রমনা মঠের সেবাইত হন এবং এ বংশের শেষ বংশধর মঙ্গল গিরিও এই মঠের সেবাইত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে প্রতি অমাবস্যায় দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হত। মঠটির দক্ষিণদিকে পরবর্তী কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মন্দিরটি দশনামী সন্ন্যাসীদের মঠ বলেও অনেকে উল্লেখ করেছেন। শঙ্করাচার্য সম্প্রদায়ের গিরি উপাধিধারী উদাসীরা এই মঠ নির্মাণ করে। এই মঠে ব্যাঘ্রাম্বর পরিধানা চতুর্ভূজা পাষাণময়ী কালীকা দেবী অধিষ্ঠিত আছেন। মহারাজ রাজবল্লভ মঠটির সংস্কার করেন। পরবর্তী ১৮৯৭ সালে সংঘটিত এক ভূমিকম্পে মঠটির শীর্ষভাগ ফেঁটে গেলে গবর্নমেন্টের পক্ষ থেকে তা সংস্কার করে দেয়া হয়। ঐতিহাসিক আহমদ হাসান দানীর বিবরণীতে- “কালীবাড়ীর সামনের পুকুরটা কাটিয়েছিলেন ভাওয়ালের রাণী বিলাসমনি।” তবে ইংরেজ শাসনামলের নথিপত্র সূত্রে জানা যায় এ পুকুরটি ঢাকার ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ডস কাটিয়েছিলেন।

১৮৪০ সালে প্রাচীরে ঘেরা রমনা মন্দিরের চূড়ার অলংকার দেখে কর্নেল ডেভিডসন প্রথমে ভেবেছিলেন এটি একটি ক্যাথলিক উপাসনালয়। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন এটি কালিমন্দির। দরজার সামনে গিলটিনের মত কাঠের একটি যন্ত্র, যেখানে ছাগল ছানা উৎসর্গ করা হয়। তিনি জানতে পারেন উৎসর্গকৃত ছাগল ছানার মাথাটি মন্দিরের পুরোহিত পেয়ে থাকেন। ঢাকায় মন্দিরের সংখ্যা ৫০টির মত হওয়ায় এখানে অন্য রংয়ের ছাগল ছানা থেকে কালো রংয়ের ছাগল ছানার চাহিদা ও দাম দু’ই কয়েকগুণ বেশি বলে ডেভিডসন তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

ঐতিহাসিক আহমদ হাসান দানীর মতে, “প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে বাদ্রী নারায়ণের যোশী মঠ থেকে জনৈক গোপালগিরি ঢাকা এসে প্রতিষ্ঠা করেন একটি আখড়া। সে সময় এর নাম ছিল কাঠঘর। মূল মন্দিরটি হরিচরণ গিরি নির্মাণ করেন তিনশ বছর আগে। পরবর্তীকালে মন্দিরের অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়। মূল মন্দিরটি ছিল দর্শনীয়। পুরো মন্দিরটি ছিল পুরানো ইটের দেয়ালে ঘেরা। দক্ষিণে মন্দিরে প্রবেশের একটিমাত্র দরজা ছিল। ভেতরে ঢুকে বাদিকে ছিল একটি চতুষ্কোণ কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ। যার কেন্দ্রে ছিল একটি বেদী। এখানেই ছিল প্রাচীন মন্দিরটি। মন্দিরের ছাদ উঁচু। মন্দিরটি বাংলার চৌচালা ও হিন্দু স্থাপত্যরীতি অনুসারে হলেও এতে মোঘল স্থাপত্য রীতির প্রভাবও লক্ষণীয়। মন্দিরের দরজাটি পাকা। মূল মন্দিরের চূড়া ছিল ১২০ ফুট উঁচু। যা বহু দূর থেকে চোখে পড়ত। মূলত মন্দিরটি কালী মন্দির নামে পরিচিত ছিল।”

রমনা কালী মন্দিরের সঙ্গে মা আনন্দময়ীর নাম ওৎপড়তভাবে জড়িত। রমা পাগলা বা বাবা ভোলানাথ নামে পরিচিত ঢাকার নবাবদের শাহবাগ বাগানের কর্মচারি বা তত্ত্বাবধায়ক ‘রমনীমোহন চক্রবর্তী’র স্ত্রী ছিলেন মা আনন্দময়ী। আনন্দময়ীর ভক্তরা রমনা ও সিদ্ধেশ্বরীর কালীবাড়িতে তার জন্য দুটি আশ্রম নির্মাণ করে দেয় বলে জানা যায়। রমনা কালী মন্দির লাগোয়া ছিল মা আনন্দময়ীর আশ্রম। জানা যায়, মা আনন্দময়ী কারো কাছ থেকে দীক্ষাগ্রহণ করেননি। ১৩২৯ সালে ঝুলন পূর্ণিমার দিন আনন্দময়ী নিজেই নিজেকে দীক্ষা দেন বলে জানা যায়। বিয়ের পরে আনন্দময়ী ১৩৩১ বঙ্গাব্দে স্বামীর কর্মস্থল শাহবাগে চলে আসেন। ঢাকায় আসার পরে এই দম্পতি শাহবাগের বাগানের একাংশে আশ্রয় নেয়। ২ মে ১৯২৯ সাল/১৯ বৈশাখ ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে আনন্দময়ী রমনায় প্রতিষ্ঠা করেন আশ্রম। মা আনন্দময়ীর দেশী-বিদেশী বহু ভক্ত ছিল।

১৯৩২ সালে এই দম্পতি উত্তর ভারতের দেরাদুনে চলে যান। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন আনন্দময়ী ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেও তার স্বামী ভোলানাথ ঢাকার রমনাতেই থেকে গিয়েছিলেন।


পরবর্তীতে ভাওয়াল থেকে আনা রাজবাড়ির কালী মূর্তিটি ছিল তার পাশে। মন্দিরের উত্তরপূর্বে ও পশ্চিমে ছিল পূজারী ও অন্যান্য ভক্তদের থাকার ঘর। ভিতরেই ছিল শিব মন্দির। ছিল নাটমন্দির ও সিংহ দরজা। মন্দিরের সামনে ছিল একটি পুকুর। যা আজো কালের সাক্ষী হয়ে আছে। কালী মন্দিরের সামনের এ পুকুরটা খুবই প্রাচীন।”

তপন কুমার দে তার গণহত্যা একাত্তর রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- “…কালী মন্দির (রমনায়) নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে শ্রী মা বলেছেন- ঐ স্থানে যে ভাঙ্গা শিবমন্দিরটি আছে ও একটি ভাঙ্গা শিব আছে, ঠিক সেখানেই কালীর একটি ছোট মন্দির করা হবে এবং যেখানে শিবটি বসানো আছে সেখানেই কালীমূর্তি বসানো হবে। …রমনা আশ্রম প্রতিষ্ঠা হলে শ্রী শ্রী মা আনন্দময়ী বাংলা ১৩৩৬ সালের ১৯শে বৈশাখ এবং ইংরেজী ১৯২৯ সালের ২রা মে নব প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে পর্দাপন করেন।

মন্দিরের ভেতরে ছিল শ্রী শ্রী ভদ্রকালীর মূর্তি। সুন্দর কাঠের নির্মিত সিংহাসনে স্থাপিত ছিল ভদ্রাকালী মূর্তি। পরবর্তীতে ভাওয়াল থেকে আনা রাজবাড়ির কালী মূর্তিটি ছিল তার পাশে। মন্দিরের উত্তরপূর্বে ও পশ্চিমে ছিল পূজারী ও অন্যান্য ভক্তদের থাকার ঘর। ভিতরেই ছিল শিব মন্দির। ছিল নাটমন্দির ও সিংহ দরজা। মন্দিরের সামনে ছিল একটি পুকুর। যা আজো কালের সাক্ষী হয়ে আছে। কালী মন্দিরের সামনের এ পুকুরটা খুবই প্রাচীন।”

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তার অতীত জীবনের স্মৃতি গ্রন্থে রমনা কালী মন্দির সম্পর্কে বলেছেন- “রেসকোর্সের পরিধির মধ্যে যে দুটো মন্দির অবস্থিত, তার মধ্যে পূর্ব দিকের মন্দিরে থাকতেন শিব মন্দিরের পূজারী আনন্দময়ীর স্বামী। পশ্চিম দিকের মন্দিরে থাকতেন আনন্দময়ী।”

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকবাহিনী রমনা মন্দিরটি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এতে মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বহু নিরিহ মানুষকে অমানুষিক ভাবে হত্যা করে।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!