গুরুচাঁদ ঠাকুর

-গৌতম মিত্র

১৯১২ সালে পঞ্চম জজ গুরুচাঁদ ঠাকুরকে সমাজ সেবার জন্য “দরবার মেডেল” উপহার দেন। একই সালে দিল্লির দরবার “রুপার মেডেল” উপহার দেন।

১৯১২ সালে ওড়াকান্দিতে ছাত্রাবাস নির্মাণে ১০,০০০ টাকা বরাদ্ধ হয়। বাকেরগঞ্জ ঝালকাঠি গর্ভমেন্ট হাইস্কুলে ২০জন ছাত্রের বিনাব্যয়ে শিক্ষারব্যবস্থা করেন। বরিশালে পিরোজপুর হাইস্কুলে একটি ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা করেন। দমিত শ্রেণির শিক্ষায় সরকারি উন্নয়নে উদ্দ্যেগ নেন গুরুচাঁদ ঠাকুর।

১৯১৩ সালে শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তার ঘোষণানুযায়ী পূর্ববঙ্গের তপসিলীভূক্ত জাতিসমূহের ছাত্রদের পড়াশুনার সুবিধার্থে কিছু সরকারি হোস্টেলের ব্যবস্থা করেন। এছাড়াও নীলরতন সরকার বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার কংগ্রেসি সদস্যরা দমিত শ্রেণির ছাত্রবাস নির্মাণে লিখিত প্রস্তাব রাখেন।

১৯১৫/১৬ সালে মতুয়াদের দলিল আদি গ্রন্থ ‘শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থ’ প্রকাশে গুরুচাঁদ ঠাকুর মগ্ন থাকায় রাজনৈতিক শিষ্যদের মাধ্যমেই দাবিমালা সরকারি স্তরে উপস্থাপন করতে থাকেন।

লক্ষ্মৌচুক্তির সাত মাস আগে ১৯১৬ সালের মার্চ মাসে গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় সুরেন্দ্রনাথ ব্যার্নাজি ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে দাঁড়িয়ে সরকারি চাকরিতে নমঃশূদ্রদের নিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে সরকারের কাছে দাবি জানান। ১৯১৭ সালে লর্ড মন্টেগুর সঙ্গে মুকুন্দবিহারী মল্লিক নানান সমস্যা সমাধানের আবেদন জানান।

পূর্ণ ভোটাধিকারসহ অস্পৃশ্যদের জন্য তিনি মুসলমানদের অনুরূপ separate electorate সহ আইনসভায় proportional represenation দাবি করেন। গুরুচাঁদ ঠাকুর বৃটিশ সৈন্য বাহিনীতে সৈন্য হিসেবে নমঃশূদ্র যুবককে পাঠানোর ব্যবস্থা নেন।

১৯১৮ সালে গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় নমঃশূদ্র ছেলেদের পড়াশোনার জন্য কলকাতায় একটি হোটেল খোলা হয়। এর পরিচালনার ভার দেওয়া হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর।

১৯১৯ সালে মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনে অনুন্নত শ্রেণীর এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভারতবর্ষে অন্যান্য প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশ এ ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।

১লা আগষ্ট ১৯১৯ সালে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করে গুরুচাঁদ ঠাকুরকে পত্র লিখেন। গুরুচাঁদ ঠাকুরকে এভাবে আহ্বান করা হয়েছিল-

পরাধীন এ ভারতে সবে সহ দূঃখ
স্বাধীনতা বিনা কভূ নাহি হবে সুখ,
অসহযোগের পথে আসিবে সু দিন
দূরে নহে নিকটেতে সেই শুভ দিন।।

অনুন্নত জতি মধ্যে আপনি প্রবীন
শ্রেষ্ঠ নেতা বলে মান্য আছপ চিরদিন,
স্বাধীনতা যজ্ঞে তাই করি আমন্ত্রণ
জাতি নিয়ে আসুন এই পথে এখন।।

এরপর গুরুচাঁদ ঠাকুর জবাব দেন-

অনুন্নত বলি যত আছে বঙ্গদেশে।
কোন ভাবে দিন কাটে বেহালের বেশে।।
বিদ্যাশিক্ষা বেশী কিছু তারা শিখে নাই।
প্রকৃত দরদ দিয়ে জাগান চেতনা।।

১৯২০ সালে যখন ভারতবর্ষে অসহযোগ আন্দোলন চলছে তখন গুরুচাঁদ ঠাকুর সেই আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। গুরুচাঁদ ঠাকুর ভূমি সংস্কারক হিসেবেও যথেষ্ট অবদান রাখেন। ১৯২২ সালের জুন মাসে বর্তমান পিরোজপুর জেলায় এক বিশাল কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে সর্বপ্রথম আমূল ভূমি সংস্কারের দাবি গৃহীত হয়।

এছাড়া ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠন করে। নতুন প্রদেশে জনসংখ্যার ভিক্তিতে চাকরি দেওয়া হবে ঘোষণা করা হলে নমঃশূদ্র সম্প্রদায় তাকে স্বাগত জানায়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন গুরুচাঁদ ঠাকুর।

বাংলার বিভিন্ন জেলায় ঘুরে নানা ধরনের সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে বাংলার কৃষক সমাজকে জাগাতে চেয়েছিলেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। তাঁর এই মহান কর্মযজ্ঞ দেখে বর্ণবাদী তৎকালীন কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতারা তাদের আন্দোলনে শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরকে আহ্বান জানান।

অম্বিকাচরণ মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ এমনকি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখ ঠাকুরকে পশ্চাৎপদ শ্রেণির প্রধান নেতারা পত্র দেন। তা কখনও ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯২০ সালের অসহযোগ আন্দোলন বা বিদেশি দ্রব্য বয়কট আন্দোলনে যোগ দিতে বারবার পত্র মারফত আহ্বান করেন। গুরুচাঁদ ঠাকুরকে চিঠি দিয়েছিলেন নমঃশূদ্রদের স্বদেশী আন্দোলনের সামিল করার জন্য। তার প্রতিত্তোরে ঠাকুর বলেন-

নিপীড়িত জাতি আছে যত বঙ্গদেশ
চিরদিন কাটে দিন দারিদ্যর বেশে,
রাষ্ট্রক্ষেত্রে অর্থক্ষেত্রে অধিকার নাই
সব অধিকার নিছে উচ্চবর্ণ ভাই।।

যদি উচ্চবর্ণ আজি তাহাদের চায়
সেই পথে আছে মাত্র একটি উপায়,
দেশে দেশে বলি যারা আজি ঘুরিতেছে
কিছু বাপু বোজা এভাব ধরেছে।।

সুদিনে মোদের যারা করিয়াছে ঘৃণা
আজ কেন আসে তারা কিছু বুজিনা,
স্বার্থ রক্ষা এরা সবে জানে ভাল করে
তোমাদের কাছে আসে স্বার্থের খাতিরে।।

১৯২১ সালের মার্চে-এপ্রিলের নির্বাচনে জয়ী হন ওড়াকান্দির চণ্ডালজাতির মতুয়া বাবু ভীষ্মদেব দাস। আইন সভার প্রথম অস্পৃশ্য মনোনীত সদস্য হবার পরপরই পূর্ববঙ্গের ‘বিল’ অঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশা মোচনের জন্য সরকারের দৃষ্টি বরাবর আর্কষণ করেন। তখন গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেন-

ভীষ্ম করিও না বৃথা আপসোস
অবশ্যই সাহায্য আমি করিব তোমারে
নিশ্চয় মেম্বর তুমি হবে এই বারে।।

১৯২২ সালে Bangla Local self act ও Bengal village self government act-এ গুরুচাঁদ ঠাকুরের স্বপ্নপূরণ করতে এমএলএ ভীষ্মদেব দাস বঙ্গীয় আইন সভায় প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে প্রতিটি সরকারি বিভাগে সব পদের জন্য ১৮ শতাংশ ডিপ্রেসড ক্লাসের মানুষের জন্য সংরক্ষণ করার দাবি জানান।

১৯২৩ বাংলা ১৩৩০ সালে গোপালগঞ্জে পদ্মবিল কোননের ঘটনার প্রেক্ষিতে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধে। গুরুচাঁদ ঠাকুরের সুপরামর্শে হিন্দু সমাজ বীরত্বের সঙ্গে আত্মরক্ষা করেছিল। এই দাঙ্গার খবর দেশবিদেশ পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। বাংলার লাট সাহেব লর্ড লিটন স্বয়ং আসেন পর্যালোচনা করতে।

নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে গোপালগঞ্জে গিয়ে মানপত্র প্রদানের মাধ্যমে লাট সাহেবকে সম্মাননা জ্ঞাপন করেন। লর্ড লিটন গুরুচাঁদ ঠাকুরের ব্যবহার দেখে প্রীত হন। সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গে ঠাকুর গুরুচাঁদ অণগ্রসর জাতির দুঃখদুর্দশার কথা লর্ডকে ব্যক্ত করেন। তখন লর্ড লিটন বাংলার অনুন্নত জাতির উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯২৪ সালের মার্চ মাসে খুলনা শহরের করোনেশন হল বা টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বঙ্গীয় নমঃশূদ্র মহাসম্মেলন। ওই সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেছিলেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। তখন উদাত্তকণ্ঠে বলেছিলেন-

জাতির উন্নতি লাগি হও সবে স্বার্থ ত্যাগী
দিবা রাত্রি চিন্তা কর তাই,
জাতি ধর্ম জাতি মান জাতি মোর ভগবান
জাতি ছাড়া অন্য চিন্তা নাই।।

১৯২১ থেকে লাগাতর সুদীর্ঘকালের নিরন্তর চেষ্টার ফলে ১৯৩০ সালে বাঙ্গালায় ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ, যশোর, ঢাকা, খুলনায় প্রভূত পরিমাণ যোগ্য ও শিক্ষিত ডিপ্রসড ক্লাসের যুবকদের চাকরি হয় নি। নমঃশূদ্র নেতাদের লাগাতর দাবির ফলে ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয় এই সব অঞ্চলে অস্পৃশ্য প্রার্থীর ক্ষেত্রে চাকরি দেবার বেলায় দৃষ্টি দেয়া হবে।

১৯৩১ সালে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনে ৫৬৯টি, সাওঁতাল বা আদিবাসী ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য বর্ধমান ডিভিশনে ২৪৬টি এবং নমঃশূদ্র ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য ঢাকায় ১০৬৭টি স্কুল স্থাপন করেন। সর্বমোট ১৮৮২ টি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে।

১৯৩২ এ পুণাপ্যাক্টের চুক্তি সাক্ষরিত হয়।

১৯৩৩ সালের ২৪শে জুলাই গুরুচাঁদ ঠাকুরের সুযোগ্য পৌত্র প্রমথরঞ্জন ঠাকুর ফরিদপুরের গর্ভনরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চাকরি ক্ষেত্রে ডিপ্রসেড ক্লাসের জন্য ১০ শতাংশ চাকরি সংরক্ষণের দাবি করেন।

১৯৩৪ সালে ফেব্রুয়ারি সেশানে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের অমূল্য ধন রায় ও শরৎচন্দ্র বল নোটিশ দেন, যেন অস্পৃশ্য জাতিদের জন্য ২৫ শতাংশ চাকরি পদে সংরক্ষণ দেবার জন্য আলোচনা করেন এবং দেন।

১৯৩৫ সালে ডিসেম্বর মুকুন্দবিহারী মল্লিক দ্বারা পেশ করা একই প্রস্তাবের ভাগ্যে একই ফল হয়েছিল। ওই বছর অবশেষে এপ্রিল মাসে শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে নমঃশূদ্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দুদের শাস্ত্রীয় জাত বা বর্ণ রিজার্ভেশনের বিরুদ্ধে official বা আইনগত এই প্রসাশনিক বা শাসনযন্ত্রে রিজার্ভেশন ছিল জাত ব্যবস্থার মূলে কুঠারঘাত।

গুরুচাঁদ ঠাকুরের দাবিতে পাওয়া বৃটিশ সরকারের দেওয়া রিজার্ভেশন তাই ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রীয় কাউন্টার রিজার্ভেশন। কাউন্টার রিজার্ভেশনের এই নেতাদের নেতা ছিলেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। যা শুরুও হয়েছিল ১৯০৬ সালে শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে, তার শেষ হয় ১৯৩৬ সালে শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে।

গুরুচাঁদ ঠাকুর অস্পৃশ্য আর শূদ্র প্রজাদের দেশের রাজা হবার আন্দোলন, আর দেশের রাজা হয়ে বহুজন সমাজের নিজ হাতে justice করার, দেশের বিকাশ আর দেশবাসীর কল্যাণ করার যে আন্দোলন তিনি দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে করেছিলেন।

১৯৩৭ সালে ৯১ বছর বয়সে ২৭ শে মার্চ শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর মহাপরিনির্বাণ হয়। কলকাতা এলর্বাট হলে তার স্মৃতিসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, নেতাজি সুবাস চন্দ্র বসু। শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর পতিত জাতি নিয়ে আন্দোলন করার জন্য পতিত পাবণ বলা হয়।

……………………………
আরো পড়ুন:
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: দুই
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: তিন

……………………………
তথ্যসূত্র:
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত।
শিক্ষা আন্দোলনে গুরুচাঁদ ঠাকুর।
সরকারি চাকুরীতে গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদান।
শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!