ভবঘুরে কথা
হযরত কেল্লা শাহ্‌ বাবা

-নূর মোহাম্মদ মিলু

বাংলার বিখ্যাত আউলিয়া ও ধর্ম প্রচারক বাবা হযরত শাহ্‌ জালাল ইয়ামেনি আউলিয়ার (রহ:) অন্যতম মুরিদ ছিলেন হযরত কেল্লা শাহ্‌। হযরত কেল্লা শাহ্‌র প্রকৃত নাম সৈয়দ আহমদ গেছুদারাজ। কথিত আছে, হযরত শাহ জালাল (রহ:) বাবা কেল্লা শাহ্‌ সহ ৩৬০জন আউলিয়া সাথে নিয়ে বাংলায় ইসলাম প্রচার করতে আসেন। তৎকালীন বাংলার রাজা ছিলো গৌর গোবিন্দ। তিনি ছিলেন তান্ত্রিক শক্তিতে বলিয়ান। রাজা গৌর গোবিন্দের ‘জীয়ন কূপ’ নামে একটা আশ্চর্য এক কূপ ছিল। সেই কূপে মৃত লাশ ফেলে দিলে তা সাথে জীবিত হয়ে যেত। বাবা শাহ্‌ জালাল যখন ৩৬০ জন আওলিয়া সহ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় আগমন করেন তখন গৌর গোবিন্দের সাথে তুমল যুদ্ধ বাঁধে, এই যুদ্ধে গৌর গোবিন্দের কোন সৈন্য মারা গেলেই রাজা তাদের জীয়ন কূপে ফেলে আবার জিবীত করে ফেলতেন।

এভাবে গৌড় গোবিন্দের সাথে হাজার চেষ্টা করেও যখন বাবা শাহ্‌ জালাল যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারছিলেন না। তখন তিনি ধ্যানে জানতে পারেন ঐ জিয়ন কূপের শক্তি না নষ্ট করা পর্যন্ত এই যুদ্ধে জয় লাভ সম্ভব নয়। তখন তিনি তার সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়াদের ডেকে জীয়ন কূপ নষ্ট করার কথা বলেও কাউকে রাজি করাতে পারেন নি। কারণ সেই জিয়ন কূপের পাহারায় থাকতো ৪০জন উলঙ্গ নারী, ইসলামে অশ্লীলতার কাছে যাওয়া হারাম। যখন হযরত শাহ্‌ জালাল এ নিয়ে যখন ভীষণ চিন্তামগ্ন তখন তাঁর অনুরাগী ভক্ত গেছুদারাজ বাবা শাহ্‌ জালালের চিন্তিত মুখ সহ্য করতে না পেরে এই কাজে রাজি হয়ে যান। এরপর গেছুদারাজ যখন সেই কূপের সামনে যান তখন ইসলামের মান অক্ষুন্ন রাখতে নিজের ধারালো তরবারি দিয়ে আল্লাহু আকবার বলে এক কোপে নিজের কল্লা কেটে তিতাস নদীতে ফেলে দেন। কল্লা ছাড়া বাবা গেছুদারাজ তরবারি হাতে যখনই জিয়ন কূপের সামনে গেলেন তখন বাবার এই ভয়াবহ রূপ দেখে ৪০ জন উলঙ্গ নারী দিকবিদিক হয়ে পালিয়ে যান।

বাবা গেছুদারাজ তখন এক টুকরা গরুর মাংস ঐ কূপে ফেলে দিলে সাথে সাথে ঐ কূপের সকল ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এরপর কল্লা ছাড়া গেছুদারাজ শাহ্‌র দেহ বাবা শাহ্‌ জালালের নিকট তার পায়ের সামনে গিয়ে প্রাণ ত্যাগ করে। সেদিন শাহ্‌ জালাল বাবা বলেছিলেন “যদি কেউ আমার দরগাহ জিয়ারত করতে আসে, তাহলে সে যেন সবার আগে কল্লা শাহ্‌র মাজার জিয়ারত করে নেয়। তা না হলে তার জিয়ারত অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।”
বাবা শাহ্‌ জালাল কল্লা শাহ্‌র পাক দেহ নিজ হাতে সিলেটে দাফন করেন। অপর দিকে বাবা কল্লা শাহ্‌ কাটা মাথা তিতাস নদীতে ভাসতে ভাসতে খড়মপুর নামক স্থানে আসলে তা খড়মপুরের জেলেদের জালে আটকা পড়ে, যখনই হিন্দু জেলেরা নদী থেকে জাল টান দেন, তখনই নদীতে ভূমিকম্প শুরু হয়। ফলে গৌরাঙ্গ দাস নামক এক হিন্দু জেলে এই ঘটনার রহস্য বাহির করতে নদীতে ডুব দিয়ে দেখেন যে জালের মধ্যে একটা কাটা মানুষের কল্লা আল্লাহ আল্লাহ জিকির করছে, এই কেরামতি দেখে সে অবাক হলে বাবা কল্লা শাহ তাকে নিজের মুরিদ করে নেন এবং খরমপুরে ইসলাম প্রচার করার নির্দেশ দেন। এরপর গৌরাঙ্গ দাস সেই জাল নদী থেকে তুললে বাবা কল্লা শাহ তাদের আড়ালে যেতে বলেন। এরপর সবাই আড়ালে চলে গেলে তিতাস নদীর পাড়েই আল্লাহর কুদরতে আপনা আপনি গায়েবি কল্লার শাহ্‌র মাজার সৃষ্টি হয়।

এই ঘটনার ৭০০ বছর পরও আজও বাবার ওরশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খড়মপুরে লাখ লাখ ভক্তের সমাগম হয কেল্লা বাবার বাৎসরিক ওরশে। বর্ষা মৌসুমে এই ওরশ হয় বলে নদী পথে হাজার হাজার নৌকায় নিশান টানিয়ে গান-বাদ্য বাজিয়ে ভক্তগণ বাবার গুণগান করতে করতে সমবেত হয়। প্রতিবছরের ন্যায় এই শ্রবণ মাসেও অনুষ্ঠিত হবে বাবার ওরশ।

হযরত কেল্লা শাহ্‌ বাবার ওরশ

সময়:
ছয় দিনব্যাপী
২৬শে শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ থেকে শুরু

স্থান:
হযরত সৈয়দ আহাম্মদ গেছুদারাজ (রহঃ) (কেল্লা শাহ বাবা) ‘র মাজার শরীফ।
খড়মপুর, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

যাতায়াত-

ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খড়মপুরে বাস বা ট্রেন দুই পথেই যাওয়া যায়। সিলেটগামী ট্রেনে করে আজমপুর আর চট্টগ্রামগামী ট্রেনে উঠলে আখাউড়া বা ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামতে হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে অটোতে করে পৌছে যাওয়া যাবে খড়মপুর কেল্লা শাহ্‌’র মাজারে।

তবে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসে নৌপথে। তিতাস নদীতে এই উপলক্ষ্যে হাজার হাজার নৌকায় করে ভিড় করে খড়মপুরের ঘাটে। তবে এই সব নৌকার বেশিভাগই রিজার্ভ করে আসেন ভক্তরা।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!