ভবঘুরেকথা
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে পণ্ডিত শশধরাদি ভক্তসঙ্গে
কালীব্রহ্ম – ব্রহ্ম ও শক্তি অভেদ

শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তসঙ্গে তাঁর সেই পূর্বপরিচিত ঘরে মেঝেতে বসিয়া আছেন, – কাছে পণ্ডিত শশধর। মেঝেতে মাদুর পাতা – তাহার উপর ঠাকুর, পণ্ডিত শশধর এবং কয়েকটি ভক্ত বসিয়াছেন। কতকগুলি ভক্ত মাটির উপরেই বসিয়া আছেন। সুরেন্দ্র, বাবুরাম, মাস্টার, হরিশ, লাটু, হাজরা, মণি মল্লিক প্রভৃতি ভক্তেরা উপস্থিত আছেন। ঠাকুর পণ্ডিত পদ্মলোচনের কথা কহিতেছেন। পদ্মলোচন বর্ধমানের রাজার সভাপন্ডিত ছিলেন। বেলা অপরাহ্ন – প্রায় ৪টা।

আজ সোমবার, ৩০শে জুন, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দ (১৭ই আষাঢ়, শুক্লা অষ্টমী)। ছয়দিন হইল শ্রীশ্রীরথযাত্রার দিবসে পণ্ডিত শশধরের সহিত ঠাকুরের কলিকাতায় দেখা ও আলাপ হইয়াছিল। আজ আবার পণ্ডিত আসিয়াছেন। সঙ্গে শ্রীযুক্ত ভূধর চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর জ্যেষ্ঠ সহোদর। কলিকাতায় তাহাদের বাড়িতে পণ্ডিত শশধর আছেন।

পণ্ডিত জ্ঞানমার্গের পন্থী। ঠাকুর তাঁহাকে বুঝাইতেছেন – যাঁহারই নিত্য তাঁহারই লীলা – যিনি অখণ্ড সচ্চিদানন্দ, তিনিই লীলার জন্য নানা রূপ ধরিয়াছেন। ঈশ্বরের কথা বলিতে বলিতে ঠাকুর বেহুঁশ হইতেছেন। ভাবে মাতোয়ারা হইয়া কথা কহিতেছেন। পণ্ডিতকে বলিতেছেন, “বাপু, ব্রহ্ম অটল, অচল, সুমেরুবৎ। কিন্তু ‘অচল’ যার আছে তার ‘চল’ও আছে।”

ঠাকুর প্রেমানন্দে মত্ত আছেন। সেই গন্ধর্ব বিনিন্দিত কণ্ঠে গান গাহিতেছেন। গানের পর গান গাহিতেছেন:

কে জানে কালী কেমন, ষড়্‌ দর্শনে না পায় দরশন।

গান – মা কি এমনি মায়ের মেয়ে।
যার নাম জপিয়ে মহেশ বাঁচেন হলাহল খাইয়ে ৷৷
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় যার কটাক্ষে হেরিয়ে।
সে যে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড রাখে উদরে পুরিয়ে ৷৷
যে চরণে শরণ লয়ে দেবতা বাঁচেন দায়ে।
দেবের দেব মহাদেব যাঁর চরণে লুটায়ে ৷৷

গান – মা কি শুধুই শিবের সতী।
যাঁরে কালের কাল করে প্রণতি ৷৷
ন্যাংটাবেশে শত্রু নাশে মহাকাল হৃদয়ে স্থিতি।
বল দেখি মন সে বা কেমন, নাথের বুকে মারি লাথি ৷৷
প্রসাদ বলে মায়ের লীলা, সকলই জেনো ডাকাতি।
সাবধানে মন কর যতন, হবে তোমার শুদ্ধমতি ৷৷

গান – আমি সুরা পান করি না, সুধা খাই জয় কালী বলে,
মন-মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতালে মাতাল বলে।
গুরুদত্ত বীজ লয়ে প্রবৃত্তি তায় মশলা দিয়ে,
জ্ঞান শুঁড়িতে চোয়ায় ভাঁটি, পান করে মোর মন-মাতালে।
মূল মন্ত্র যন্ত্র ভরা, শোধন করি বলে তারা,
প্রসাদ বলে এমন সুরা খেলে চতুর্বর্গ মিলে।

গান – শ্যামাধন কি সবাই পায়,
অবোধ মন বোঝে না একি দায়।
শিবেরই অসাধ্য সাধন মনমজানো রাঙা পায় ৷৷

ঠাকুরের ভাবাবস্থা একটু কম পড়িয়াছে। তাঁহার গান থামিল। একটু চুপ করিয়া আছেন। ছোট খাটটিতে গিয়া বসিয়াছেন।

পণ্ডিত গান শুনিয়া মোহিত হইয়াছেন। তিনি অতি বিনীত ভাবে ঠাকুরকে বলিতেছেন, “আবার গান হবে কি?”

ঠাকুর একটু পরেই আবার গান গাহিতেছেন:

শ্যামাপদ আকাশেতে মন ঘুড়িখান উড়তেছিল,
কলুষের কুবাতাস পেয়ে গোপ্তা খেয়ে পড়ে গেল।

গান – এবার আমি ভাল ভেবেছি।
ভাল ভাবীর কাছে ভাব শিখেছি।
যে দেশে রজনী নাই, সেই দেশের এক লোক পেয়েছি।
আমি কিবা দিবা কিবা সন্ধ্যা সন্ধ্যারে বন্ধ্যা করেছি ৷৷

গান – অভয় পদে প্রাণ সঁপেছি।
আমি আর কি যমের ভয় রেখেছি ৷৷
কালী নাম মহামন্ত্র আত্মশিরশিখায় বেঁধেছি।
(আমি) দেহ বেচে ভবের হাটে, দুর্গানাম কিনে এনেছি ৷৷

“দুর্গানাম কিনে এনেছি” এই কথা শুনিয়া পণ্ডিত অশ্রুবারি বিসর্জন করিতেছেন। ঠাকুর আবার গাহিতেছেন:

গান – কালীনাম কল্পতরু, হৃদয়ে রোপণ করেছি।
এবার শমন এলে হৃদয় খুলে দেখাব তাই বসে আছি ৷৷
দেহের মধ্যে ছজন কুজন, তাদের ঘরে দূর করেছি।
রামপ্রসাদ বলে দুর্গা বলে যাত্রা করে বসে আছি ৷৷

গান – আপনাতে আপনি থেকো মন যেও নাকো কারু ঘরে।
যা চাবি তাই বসে পাবি (ওরে) খোঁজ নিজ অন্তঃপুরে ৷৷

ঠাকুর গান গাহিয়া বলিতেছেন – মুক্তি অপেক্ষা ভক্তি বড় –

গান – আমি মুক্তি দিতে কাতর নই,
শুদ্ধাভক্তি দিতে কাতর হই গো।
আমার ভক্তি যেবা পায় সে যে সেবা পায়,
তারে কেবা পায় সে যে ত্রিলোকজয়ী ৷৷

শুদ্ধাভক্তি এক আছে বৃন্দাবনে,
গোপ-গোপী ভিন্ন অন্যে নাহি জানে।
ভক্তির কারণে নন্দের ভবনে
পিতাজ্ঞানে নন্দের বাধা মাথায় বই ৷৷

-১৮৮৪, ৩০শে জুন-

…………………..
রামকৃষ্ণ কথামৃত : একবিংশ অধ্যায় : প্রথম পরিচ্ছেদ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!