স্বামী স্বরূপানান্দ

অনেকে মনে করেন, বীর্যধারণ করাকেই ব্রহ্মচর্য বলে। কিন্তু ‘বীর্যধারণায় ব্রহ্মচর্য’ ব্রহ্মচর্যের এই সংকীর্ণ সংস্কারটি মানেন না স্বরূপানন্দস্বামী। অনাবশ্যক বীর্যক্ষরণবন্ধ ব্রহ্মচর্যের একটি দিক মাত্র, সব নয়। সর্বাঙ্গীণ আত্মোন্নতির জন্য জপতপ, আসন, সৎ চিন্তা, সদাচার সহ অনুশীলন প্রভৃতি আরও অনেক কিছু দরকার।

বৃহ্ ধাতু হতে ব্রহ্ম শব্দের উৎপত্তি। বৃহ্ ধাতুর অর্থ বড় হওয়া। এর থেকে বোঝা যায় ব্রহ্মচর্য এমন একটি অভ্যাস বা সাধন যা জীবনকে বৃহতের দিকে নিয়ে যায়। আত্মাকে সমস্ত সংকীর্ণতা ও খণ্ডতা হতে মুক্ত করে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় অখণ্ড পরমাত্মার সমুদ্রসঙ্গমে।

যারা ব্রহ্মচর্যের অভ্যাস করতে চান, তাদের প্রতিদিনের অবশ্য পালনীয় কর্তব্যগুলি কি, তার বিস্তৃত বিবরণ স্বামীজী তাঁর ‘সরল ব্রহ্মচর্য’ ও ‘সংযম সাধনা’ গ্রন্থ দুটিতে দান করেছেন। প্রতিটি কর্তব্যের পিছনে কি যুক্তি আছে, তাও বিশ্লেষণ করেছেন সরলভাবে।

ব্রহ্মচর্য্যাভ্যাসীদের প্রথম কর্তব্য হলো ব্রাহ্ম মুহূর্তে অর্থাৎ সূর্য ওঠবার চার ঘণ্টা আগে বিছানা থেকে ওঠা। এই পবিত্র ও পরম মুহূর্তে সৎ চিন্তা, সৎ কার্য ও সৎ অনুশীলন সবচেয়ে ভাল হয়। প্রাতঃকালীন শৌচকর্মের পর প্রাণায়াম, আসন বা ব্যায়াম, যার যা অভ্যাস তা করা উচিত।

তারপর স্নান। স্নানের পর উপাসনা। যারা দীক্ষাপ্রাপ্ত, তারা গুরুপ্রদত্ত মন্ত্র জপ করবেন। আর যাদের গুরুকরণ হয়নি, তারা ভগবানের কাছে অনন্যচিত্ত হয়ে তেজ, শক্তি, বীর্য, জ্ঞান, কর্মক্ষমতা, সৎসাহস, একাগ্রতা, পরোপচীকির্ষা প্রকৃতি গুণগুলো প্রার্থনা করবেন। চিত্তে প্রশান্তি না আসা পর্যন্ত সকলকেই প্রার্থনা করতে হবে।

তারপর পিতামাতার পাদবন্দনা করতে হবে। পিতামাতার বন্দনা জীবন ও চরিত্রগঠনে সবচেয়ে বেশী সহায়তা করে। মাকে দেশমাতা ও জগন্মাতার সঙ্গে অভেদজ্ঞানে প্রণাম করতে হবে।

নিবেদন না করে অন্নগ্রহণ করা উচিত নয়। ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তিগণ নিজেকে ব্রহ্মজ্ঞান করে এবং অন্নকেও ব্রহ্মজ্ঞান করে অন্নগ্রহণ দ্বারা ব্রহ্মেরই সেবা করে থাকেন। যারা ভক্ত তারা ভগবানের মানসিক সেবা করিয়ে প্রসাদ গ্রহণ করবেন।

যারা অখণ্ডসাধক তারা তিনবার প্রণব বা ওঁ উচ্চারণ করে আহার্য বস্তুতে তিনবার জলের ছিটে দিয়ে পরমেশ্বরের নাম স্মরণ করবেন। তারপর খাদ্য স্পর্শ করে চোখ বন্ধ করে ভ্রূমধ্যে মনকে সংস্থাপিত করে তিনবার বা পাঁচবার ভগবানের দ্বাদশ অক্ষর নাম বা ‘ওঁ আদ্যাশক্তিঃ পরমানন্দং ব্রহ্ম’ জপ করতে হবে।

তারপর ‘ওঁ জগন্মঙ্গলোহহং ভবামি’ অর্থাৎ আমি জগতের কল্যাণকারী হচ্ছি এই মন্ত্র তিনবার মনে মনে উচ্চারণ করতে হবে। আহার্য বস্তু গ্রহণের মধ্য দিয়ে ভগবানেরই অর্চনা হচ্ছে, এটা কখনো ভুললে চলবে না। খাবার সময় প্রতিটি গ্রাসে ও চর্বণে ভগবানের নাম জপ করতে হবে।

মুসলমানেরা ভক্তিভাবে ‘বিস্মিল্লাহ’ নাম উচ্চারণ করে আহার করবেন। ঈশ্বরে অনিবেদিত অন্নজল কল্যাণপ্রার্থী কোন ব্যক্তির পক্ষে গ্রহণ করা উচিত নয়।

সাত্ত্বিক আহার সবচেয়ে ভাল। তবে মাছ মাংস ছাড়া অন্য কোন উপায় না থাকলে কম মশলা সহকারে তা খেতে হবে। বেশী ঝাল অম্ল বা উত্তেজক মশলা কোনক্ষেত্রেই খাওয়া উচিত নয়। যা কিছু উগ্র বা উত্তেজক, খাদ্য হিসেবে তাই নিষিদ্ধ।

বিকালে যারা ব্যায়াম করেন না তারা মুক্ত বাতাসে বেড়াবেন। তারপর স্নান করে অথবা মুখ হাত ধুয়ে সন্ধ্যা উপাসনায় বসবেন। সন্ধ্যায় একদিন সমবেত উপাসনা বিধেয়। রাধাকৃষ্ণতত্ত্ব ভালভাবে না বুঝে তাঁদের লীলা বিষয়ক কীর্তনে ব্রহ্মচর্যাভ্যাসকারীদের কোন লাভ হবে না। মাঝে মাঝে ভজন গান ভাল। যন্ত্রসংগীত মনোঃসংযোগে সহায়তা করে।

রাতের খাওয়া লঘু হওয়া দরকার। শোবার আগে দিনলিপি লেখা উচিত। সারাদিনের ভালমন্দ সব কাজ অকুণ্ঠভাবে স্মরণ করে ও তা লিখে অনেকে বিবেকের দংশন অনুভব করেন, তাদের নীতিবোধ জাগ্রত হয়। যাদের মন দুর্বল অর্থাৎ কোন কুকাজের কথা স্মরণ করতে গেলে মনে আবার কুভাব আসে, তারা সকালে দিনলিপি লিখবেন।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে ঈশ্বরচিন্তা করলে ঘুমের মধ্যে মন আপনা থেকে সাত্ত্বিকভাবে ভরে ওঠে। মাঝে মাঝে কোন মহাপ্রাণ, পরোপকারী চরিত্রবান লোককে দিনলিপিগুলি দেখিয়ে তাঁর পরামর্শ নেওয়া উচিত। নাম জপ ব্রহ্মচর্যের পরম সহায়ক। যারা অন্য নাম জপ করেন না তারা ব্রহ্মগায়ত্রী মন্ত্র জপ করবেন। এই মন্ত্র আত্মাকে অফুরন্ত তেজ ও শক্তি দান করে।

ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎসবিতুর্বরেণ্যং
ভর্গো দেবস্য ধীমহি ধিয়োয়ো নঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ।।

যিনি স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল এই তিন লোকের প্রসবকা- সত্ত্ব, রজঃ ও তম এই তিন গুণের স্রষ্টা, যিনি ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান এই তিন কালের সৃজনকারী, যিনি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিসমূহকে প্রেরণ করেন, সেই দেবতা বা পরব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ স্বতঃপ্রকাশ সবিতার ধ্যান করছি। যার থেকে বিশ্বচরাচর উৎপন্ন হয়, সেই পরমেশ্বর হচ্ছেন সবিতা।

এই ব্রহ্মগায়ত্রী জপ করবার সময় মনে মনে আমাদের ভাবতে হবে, আমি ব্রাহ্মণত্ব লাভ করছি, আমাদের মধ্যে ব্রহ্মতেজ স্ফুরিত হচ্ছে। তপোসিদ্ধ সাধকের অনন্ত আত্মশক্তি সঞ্চারিত হচ্ছে আমার মধ্যে। ব্রহ্মগায়ত্রীর সাধককে একটিবারের জন্যও জগতের মঙ্গলচিন্তার কথাটা ভুললে চলবে না।

ব্রহ্মগায়ত্রী জপ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ‘ওঁ জগন্মঙ্গলোহহং ভবামি’ বা আমি সকলের কল্যাণকারী হচ্ছি এই মন্ত্র জপ করে সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জগতের, সর্বজীবের কল্যাণের জন্য যে ভগবানকে ডাকে, জগতের কল্যাণে যে জীবন ধারণ করে, সে-ই প্রকৃত ব্রাহ্মণ, জন্ম তার যে কুলেই হোক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না। ওঙ্কার মন্ত্রে একমাত্র তারই অধিকার আছে। যে কেবল নিজের স্বার্থে ভগবানকে ডাকে ওঙ্কার মন্ত্রে তার কোন অধিকার নেই।

প্রাচীন আর্য ঋষিরা যে বেদশাস্ত্র রচনা করেন তার শক্তির উৎস হচ্ছে ব্রহ্মগায়ত্রী। আবার এই ব্রহ্মগায়ত্রীর উৎস হচ্ছে ওঙ্কার। এই ওঙ্কার হচ্ছে মহামিলনের মন্ত্র। এ মন্ত্রের মধ্যে আছে সর্বমত ও পথের এক উদার স্বীকৃতি। এই ওঙ্কারমন্ত্রের সাহায্যেই আর্য ঋষিগণ জগতের সমস্ত খণ্ডবস্তুকে এক মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক ঐক্যবোধের অখণ্ড সূত্রে গ্রথিত করতে পেরেছিলেন।

পাপী তাপী দীন দরিদ্র কারো হতাশ হবার কোন কারণ নেই। স্বামী স্বরূপানন্দের অমোঘ আশা ও আশ্বাসের অমৃত বাণী আজ যারা ভারতের আকাশে বাতাসে ধ্বনিত। প্রাচীন বৈদিক মন্ত্রের প্রতিধ্বনি করে তিনি বলেছেন, পড়তে পড়তে তোমরা উঠে দাঁড়াবে। মরতে মরতেও বেঁচে উঠবে। তোমাদের ধংস নেই। মৃত্যু নেই, পতন নেই। তোমরা অমৃতের পুত্র, অমরত্বের অধিকারী। দিব্যবীর্যে তোমাদের জন্ম।

কেউ ভয় করবে না। কোন ক্ষেত্রেই দুর্বলতার সঙ্গে আপোস করবে না। আর্য ঋষিদের আর একটি কথা ভুলবে না। সে কথাটি হলো ‘মরণং বিন্দুপাতেন জীবনং বিন্দু ধারণাৎ।’ বীর্যধারণই জীবন আর বীর্যক্ষয়ই মৃত্যু। দুধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকে যেমন মাখন, তেমনি বীর্যও রক্তের সঙ্গে এক হয়ে মিশে থাকে।

বীর্য হচ্ছে শরীরের বিশুদ্ধ শোণিত হতে উৎপন্ন সারভূত এক তেজোময় পদার্থ। শরীরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রক্তকণিকা হতে এই বীর্য বা রক্তকণিকা উৎপন্ন হয়ে থাকে‌। তাই এই বীর্য হচ্ছে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সকল শক্তির উৎস।

অহেতুক বীর্যক্ষয় ব্রহ্মচর্য সাধনের একান্ত পরিপন্থী। সুতরাং দৈহিক ও আত্মশক্তি লাভের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মচর্য সাধনাকে সার্থক করে তোলবার জন্য যথাসম্ভব বীর্যক্ষয় নিবারণ একান্তভাবে দরকার।

কামচেতনাই বীর্যক্ষয়ের একমাত্র কারণ। যে স্নায়বিক উত্তেজনার ফলে রক্তের মধ্য থেকে শুক্র পৃথক হয়ে বেরিয়ে আসে, তা হলো কামগত।

সুতরাং কামোদ্দীপক কোন দৃশ্য দেখা বা বই পড়া উচিত নয়। একমাত্র মাতৃজ্ঞানে ছাড়া পরনারীর মূর্তি বা প্রতিমূর্তি দেখাও ঠিক নয়। বিবাহিত জীবনে পুরুষের সংযম সাধনার ব্যাপারে স্ত্রীর একটি বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। এজন্য নারীজাতির মধ্যে উপযুক্ত শিক্ষার প্রসার দরকার।

নারীশিক্ষা আমাদের দেশের প্রাচীন আর্যশাস্ত্রসম্মত নয়, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বৈদিক যুগের বহু সুশিক্ষিতা মহিলা বেদমন্ত্রের রচনা করেন। তাঁদের মধ্যে অপালা, শাশ্বতী, লোপামুদ্রা, আত্রেয়ী, বিশ্ববারা, পৌলমী প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।

ঋকবেদের শতপথব্রাহ্মণে গার্গীর ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে মৈত্রেয়ীর পরিচয় পাওয়া যায়, তাঁরা নারী হলেও উচ্চস্তরের ব্রহ্মবাদিনী ছিলেন। মহাভারতের বনপর্বে শিবা ও শান্তিপর্বে সুলভার কথা আছে, এঁরা দুজনেই বেদপারগা ছিলেন‌। সুলভা যোগশাস্ত্রেও পারদর্শিনী ছিলেন।

স্বরূপানন্দ বলেছেন, নারীর হৃদয়ে পতিপ্রেম ও সন্তানস্নেহ থাকলেই হবে না। তার প্রকাশ সংযত ও সুষ্ঠুতম প্রণালীতে পরিচালিত হওয়া চাই। এর জন্য সুশিক্ষার দরকার।

অসংযত স্বামীকে অযথা রতিদান অথবা পেটুক সন্তানকে অপরিমিত খাদ্যদান স্বামীপ্রেম বা সন্তানস্নেহের পরাকাষ্ঠা নয়। যে প্রেম ও স্নেহ নারীদের বুক জুড়ে বিরাজ করছে তার সূক্ষ্ম অস্তিত্ব তারা গভীরভাবে অন্তরের অন্তরতম স্থলে অনুভব করবেন এবং তার প্রকাশটা হবে যতদূর সম্ভব সুসংযত এবং শ্রেয়োমুখী‌।

স্বামীর সব সাধনায়, সব কর্তব্যে ও সব অনুষ্ঠানে স্ত্রীরা যাতে সুযোগ্য সহধর্মিণী ও সহযোগিনী হয়ে উঠতে পারেন তার জন্য উপযুক্ত জ্ঞানবিদ্যার অনুশীলন করতে হবে।

ঋকবেদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণ পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। পথক্লান্তির নিবিড়তম জড়তায় আচ্ছন্ন ও অবশ হয়ে আসছে সারা অঙ্গ। তবু সামনে এখনও অনেক পথ, লক্ষ্য এখনও অনেক দূর‌। এমন সময় ইন্দ্র এগিয়ে এলেন তাঁর সামনে চরৈবেতি মন্ত্র নিয়ে।

বজ্রনির্ঘোষে তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ক্লান্ত হয়ে থামলে চলবে না। এগিয়ে চল। এগিয়ে চলাটাই হলো সত্য, এগিয়ে চলাই হলো অমৃত। তুমি সামান্য পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছ আর ঐ দেখ সূর্য অনাদিকাল হতে পথ চলেও একটিবারের জন্যও অলস বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে না‌। অতএব এগিয়ে চল।

বাবামণি স্বরূপানন্দস্বামীরও সেই এক কথা। শুধু কাজ আর কাজ। কাজ কর। এগিয়ে চল। এক মুহূর্ত থামলে চলবে না‌। কাজই ছন্দ দান করে জীবনের গতিতে।

স্বামীজী শুধু কাজের উপদেশ দেন না মুখে। নিজের হাতে কাজ করেন। তাঁর বয়স কত কেউ জানে না। কিন্তু আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সমানে অক্লান্তভাবে কাজ করে এসেও তাঁর অমিত কর্মশক্তি কমে যায়নি এতটুকু।

লম্বা চুল ও দাড়ি পেকে গেছে, কিন্তু মুখের কান্তি ও জ্যোতি এতটুকু ম্লান হয়নি, বরং বেড়ে চলেছে দিনে দিনে। তার সঙ্গে বেড়ে চলেছে তাঁর কর্মশক্তি। কারণ তাঁর অনন্ত যৌবনশক্তিসম্ভুত সমস্ত কর্মোদ্যম জনকল্যাণে নিয়োজিত।

বিহারে ধানবাদ জেলার অন্তর্গত পুপুনকিতে এক বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে যে মাল্টিভার্সিটি বা বিশ্ববিদ্যাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে তা তাঁর বিরাট কর্মশক্তির অভ্রান্ত নিদর্শন। এখানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী শুধু বিনা খরচে শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ স্তর পর্যন্ত পড়তেই পারে না, তারা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে সব কাজ করে তার জন্য তাদের পারিশ্রমিক সঞ্চিত হয়ে থাকে এবং তারা পড়া শেষ করে চলে যাবার সময় একসঙ্গে কিছু মোটা টাকা নিয়ে যেতে পারে। পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে চলে কারিগরী বিদ্যা এবং নীতি ও ধর্মশিক্ষা।

কারণ নৈতিক শৃঙ্খলা মনে প্রতিষ্ঠিত না হলে কোন শিক্ষাই সফল হয় না, বুদ্ধি তখন গঠনমূলক না হয়ে, হয়ে ওঠে ধ্বংসমূলক। অনেকে মনে করেন যৌবন অতি বিষম কাল। কারণ এই সময় মানুষের কামনা বাসনা অতি প্রবল থাকে এবং লোভ লালসায় বশীভূত হয়ে মানুষ প্রায়ই বিপথে যায়।

কিন্তু স্বামীজী তা মনে করেন না। উপরন্তু নিষ্কাম কর্মপ্রেরণার দ্বারা এই যৌবনকে সকলের মধ্যে সার্থক করে তুলতে চান তিনি। তিনি সকলের জন্য নিয়ে এসেছেন এক আশ্চর্য অনন্ত যৌবনশক্তির বার্তা।

কিন্তু সে যৌবন ত সাধারণ যৌবন নয়। যৌবন শুধু বয়সের মাপকাঠি দিয়ে জানা যায় না। স্বামীজীর মতে জীবনের যে অংশে মানুষের সুপ্ত প্রকৃতি প্রবল উচ্ছ্বাসে জেগে উঠে জগৎকল্যাণে সার্থক হয়ে উঠতে চায়, তারই নাম যৌবন।

তিনি বলেন, প্রকৃত যৌবন নির্ভয়, নির্ভুল। প্রকৃত যৌবন অখণ্ড আনন্দস্বরূপ, উদ্দাম স্বাধীনতাস্বরূপ ও উন্মুক্ত ঔদার্যস্বরূপ। এই যৌবন কখনো কোন দুর্বলতা বা অলস অকর্মণ্যতাকে মেনে নিতে পারে না। তাই লক্ষ যুগের শ্লথতার শৃঙ্খল সে চূর্ণ করে দেয়, বিপ্লবের তরঙ্গতাড়নে কুসংস্কারের পর্বতপ্রমাণ বাঁধ ভেঙে দিয়ে দুর্বার বেগে ছুটে চলে। এই যৌবনশক্তিকে সংযত করে কল্যাণকর কর্মে নিয়োজিত করাতেই জীবনের সার্থকতা।

কিন্তু যাই কর, সব কর্ম হবে নিষ্কাম এবং কল্যাণময়। একবার মরুত্ত যজ্ঞে হবি পান করে অগ্নিদেবের ক্ষুধামান্দ্য হয়েছিল। তাইতো মনে করলে চলবে না, কামনা পূরণ হলেই কামনা কমে যাবে; ভোগের উপকরণ হাতে পেলেই ভোগবাসনা চলে যাবে।

কামনা হচ্ছে ঠিক আগুনের মত আর তার উপকরণ হচ্ছে ঘি। আগুনে ঘি দিলে যেমন আগুন বেড়ে যায়, তেমনি ভোগে তৃপ্ত না হলে কামনাও বেড়ে যায়। সুতরাং মনেপ্রাণে নিষ্কাম হয়ে উঠতে হবে সকলকে। তা না হলে অনন্ত যৌবনশক্তির অমিতবেগ কামনার জালে যাবে শোচনীয়ভাবে আটকে, তার গতি যাবে রুদ্ধ হয়ে।

এজন্য চাই প্রকৃত জ্ঞান। চাই ঈশ্বরোপলব্ধি, আত্মোপলব্ধি। আসলে জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে ত কোন পার্থক্য নেই। প্রকৃত জ্ঞান মানুষের মনকে করে তোলে নিঃস্বার্থ, কর্মকে করে তোলে নিষ্কাম।

প্রকৃত জ্ঞানের আলোকে মানুষ সর্বভূতে ঈশ্বরের সূক্ষ্ম অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে, ঈশ্বরের সঙ্গে আপন আত্মার অভিন্নতার কথাও বুঝতে পারে। তখন তার স্বার্থ বলতে কিছু থাকে না। তখন সকল কর্মকে ঈশ্বরের অর্চনা বলে মনে করতে বা সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করতে কোন দ্বিধাবোধ করে না মানুষ।

আবার নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান জ্ঞানকে করে তোলে নির্মল। নিষ্কাম কর্মযোগীর নির্মল চিত্তে তত্ত্বজ্ঞান আপনা হতে জাগে।

গীতার কর্মসন্ন্যাসযোগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- যিনি নিয়ত নিষ্কাম কর্ম করেন সেই কর্মযোগীর তত্ত্বজ্ঞান জন্মিলে দেখা শোনা, স্পর্শ করা, গন্ধ নেওয়া, খাওয়া, ঘুমানো, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া, কথা বলা, মলমূত্র ত্যাগ করা এবং উন্মেষ ও নিমেষরূপ কাজগুলি করেও তিনি ভাবেন, আমি কিছুই করি না‌। ইন্দ্রিয়গুলি কেবল নিজের নিজের বিষয়গুলি গ্রহণ করছে ও আপন আপন কাজ করে যাচ্ছে।

এইভাবে কর্মের কোন বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন না কর্মযোগী। পদ্মের পাতায় যেমন জল লাগে না কর্ম করেও কর্মফলে তেমনি আসক্ত হন না তিনি। সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরে দান করে চিরমুক্ত থাকেন।

স্বামী স্বরূপানন্দ নিজের জীবনের মধ্যে একই সঙ্গে জ্ঞানযোগ ও কর্মযোগের অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছেন। যিনি যোগী, তাঁর আত্মা যত বিশুদ্ধ ও চিত্ত নির্মল এবং সেই বিশুদ্ধ আত্মাকে বশীভূত করতে পেরেছেন, তিনি জিতেন্দ্রিয়, তিনি সকলকেই নিজের আত্মার মত দেখেন, তিনি কর্ম করেও কর্মের বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন না।
গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরও বলেছেন-

যিনি যুক্ত অর্থাৎ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কর্ম করেন, তিনি ব্রহ্মনিষ্ঠা বা কর্মের ফল সম্পর্কে উদাসীন থাকার জন্য শান্তি লাভ করেন। আর যিনি অযুক্ত অর্থাৎ নিজের কামনা পূরণের জন্য কাজ করেন তিনি কর্মের বন্ধনে বাঁধা পড়ে যান। তিনি কখনো শান্তি পান না।

স্বরূপানন্দ স্বামী বলেন তাঁর নিজের কামনা বলে কিছু নেই। তিনি সকল কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করে জগতের কল্যাণের জন্য কাজ করে চলেছেন। আসক্তির জন্য নয়, এ কাজ তাঁর আত্মশুদ্ধির জন্য। যে শরীর, মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় দিয়ে কাজ করেন তাতে তাঁর কোন আমিত্ববোধ নেই।

(চলবে…)

……………………….
আরো পড়ুন:
অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : এক
অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : দুই
অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : তিন

…………………………………
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে: ভারতের সকল সাধক ও সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত- প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!