শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ

অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : তিন

কর্মসন্ন্যাসী অখণ্ডমণ্ডলেশ্বর স্বরূপানন্দ শুধু নিজেই কাজ করে যান না, তাঁর এই নিষ্কাম ও কল্যাণকর কর্মযজ্ঞে সকলকেই প্রবৃত্ত করতে চান। এ যুগের ত্রিতাপক্লিষ্ট সকল মানুষের আত্মোন্নতির জন্য অপরিসীম আকুতি তাঁর প্রাণে। তিনি সকলকে ডাক দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, তোমার জীবনের মধ্য দিয়ে জগতের কল্যাণ প্রসূত হবে।

চাই শুধু অটুট সংকল্প আর অপরিসীম একাগ্রতা। জাগতিক সুখের কল্পনা ছেড়ে জগন্মঙ্গল অনুষ্ঠানে নিজেকে, নিজের সহধর্মিনীকে, নিজের পুত্র কন্যাকে সর্বতোভাবে উৎসর্গ করে দাও। তাতেই পাবে জীবনের পরম তৃপ্তি, আত্মার অসীম আনন্দ।

প্রতিটি ভক্তকে আপন সন্তানের মত স্নেহ করেন স্বরূপানন্দ। সকলেই তাঁর আত্মার আত্মীয়। সন্তানগত প্রাণ পিতার মত সকলের জন্যই তাঁর সমান উদ্বেগ। একবার কোন এক ভক্ত কোন কারণে নিজেকে হতভাগ্য বলে দুঃখ করেছিল। একথা শুনে বাবামণি স্বরূপানন্দস্বামী বড় ব্যথা পান অন্তরে।

তিনি বলেন, তোমাদের হতভাগ্যতা দূর করবার জন্য আমি আমার একখানি করে বুকের পাঁজর ভেঙেচুরে গুড়ো করে দেব। তোমাদের সকলের দুঃখের দিন ঘোঁচাবার জন্য আমি আমার প্রতি বিন্দু রক্ত ঢেলে দেব। আমি আমার পরমায়ুর প্রত্যেকটি নিঃশ্বাস তোমাদের কল্যাণের আহ্বানে অবহেলে উৎসর্গ করব।

কোন মানুষেরই কখনো আত্মবিশ্বাস ও ঈশ্বরবিশ্বাস হারিয়ে হতাশ হওয়া উচিত নয়। মানুষ শুধু শক্তি সাধ্য ও বুদ্ধি অনুযায়ী কাজ করে যাবে। ফলের দিকে তাকাবার প্রয়োজন নেই। বিপদে আপদে সব অবস্থাতেই আমাদের চিত্ত যাতে অবিচলিত থাকে, ঈশ্বরবিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাস যাতে অটুট থাকে এবং ঈশ্বরভক্তি অচল থাকে, তার জন্য অমূল্য উপদেশ দান করেছেন স্বামীজী।

আশাহত ব্যর্থ মনোরথ কোন এক ভক্তকে তিনি বলেছেন, সকলের দুয়ার হতে ফিরে এসেছ বলে হতাশ হবার কিছু নেই। তুমি এখন একবার ভগবানের দুয়ারে আঘাত হান। সেই অসম্বলের সম্বল, অশরণের শরণ, অনাশ্রয়ের আশ্রয়, পরমানন্দ পুরুষের পদযুগল একবার জড়িয়ে ধর। হতাশ হয়ো না, ভগবানের কাজ তোমার দ্বারাই হবে। তিনি তাঁর কাজ করিয়ে নেবেন।

তিনি আরও বলেছেন, নিজেকে ঈশ্বরের যন্ত্র বলে ভাববে। জানবে ঈশ্বরের ইচ্ছাকেই তুমি তোমার প্রতিটি কর্ম ও চিন্তার মধ্যে রূপায়িত করে চলেছ।

ভবিষ্যৎ ভেবে কোন লাভ নেই। তবে ভবিষ্যতের উপর আস্থা হারানোও উচিত নয়। ভবিষ্যতের উপর আস্থা হারানোর অর্থ ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস হারানো। ভগবান যদি সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা হন, তাহলে অতীত ভবিষ্যতেরও স্রষ্টা; অতীত ও ভবিষ্যৎ যখন আমাদের চিন্তার উপর নির্ভর করে না তখন তার কথা ভাবার কোন অর্থ হতে পারে না।

কোন কাজ করতে গিয়ে মানুষ অহমিকা ত্যাগ করতে পারে না। যশের জন্য লালায়িত হয়। কাজ শেষ হতে না হতেই হাতে হাতে নগদ ফল চায়। সেই জন্য স্বামীজী বলেছেন, নিজেকে তুচ্ছ নাম-যশের ঊর্ধ্বে জেনে সাধন করে যাও। প্রতি শ্বাসে প্রতি প্রশ্বাসে নিজেকে অক্ষয়, অমর, অব্যয়, অদ্বিতীয় অখণ্ড পরমাত্মাস্বরূপ জেনে আত্মসমাহিত হও।

আত্মস্থ নিস্তব্ধতায় মৃত্যুঞ্জয়ী পরাক্রমে বিশ্বজগতের স্বার্থ-কোলাহলকে পরাস্ত কর। নিজেকে বিশ্বের প্রতি অণু-পরমাণুতে আর বিশ্বকে ও নিজেকে ওতপ্রোতভাবে প্রত্যক্ষ করে নিজের জন্মজীবনকে সার্থক করে উপদেষ্টাকে ধন্য কর।

ভারতীয় আধ্যাত্মসাধনার যে গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারা আবহমান কাল হতে বয়ে চলেছে, সেই শাশ্বত ধারাটিকেই এক আশ্চর্য সাধনা ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করে তুলতে চাইছেন স্বরূপানন্দ। তিনি ভারতের সনাতন ধর্মাদর্শের সার্থক উত্তরসাধক, ধারক এবং বাহক।

তিনি চান ভারতের প্রতিটি মানুষ সনাতন ভারতের ব্রহ্মজ্ঞান ও অখণ্ড বিশ্বাত্মবোধে বলীয়ান হয়ে বিশ্বপ্রেমের এক একটি মূর্ত ও জীবন্ত প্রতীকরূপে পরিগণিত হবে।

ভারতে জন্মগ্রহণ করলেই কেউ প্রকৃত ভারতীয় হয় না। ভারতের যে নিজস্ব সনাতন ব্রহ্মজ্ঞান তাকে নিজের জীবনে ফুটিয়ে তুলতে হবে। ভারতের সনাতনী আদর্শের মূল কথা হলো, জীবন থেকে ধর্ম আলাদা নয়‌। জীবনের প্রতিটি কর্ম ও চিন্তার মধ্যে ধর্মকে প্রত্যক্ষ করতে হবে; জগতের প্রতিটি বস্তু ও ঘটনার মধ্যে ব্রহ্মের সর্বময় কর্তৃত্বকে উপলব্ধি করতে হবে।

মহাভারতে দেখা যায়, শ্রীকৃষ্ণের হাতে কূট রাজনীতি ধর্মনীতিতে পরিণত হয়েছে, রাজভ্রাতাদের গৃহকলহ ও যুদ্ধবিগ্রহ ধর্মযুদ্ধে পরিণত হয়েছে, কুরুক্ষেত্রের লোমহর্ষক বিভীষিকাময় হত্যাকাণ্ড এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে মণ্ডিত হয়ে উঠেছে।

তাই স্বরূপানন্দ বলেন, চরক সুশ্রুত প্রভৃতি বিজ্ঞানীদের মত ভারতের জড়বিজ্ঞানের সাধকেরাও ব্রহ্মজ্ঞানে চৈতন্যময় থাকবেন। অর্জুনের মত ভারতের বীর রণ নিপুণ যোদ্ধারাও যুদ্ধকালে ব্রহ্মদৃষ্টি হারাবেন না; শ্রীকৃষ্ণের মত ভারতের রাজ-নীতিবিদগণ কূট কৌশল প্রয়োগ কালেও ব্রহ্মচৈতন্য বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হতে দেবেন না।

ভারতীয় হওয়া মানেই পারিবারিক ও সামাজিক মানুষ হয়েও ঋষি হওয়া, ব্রহ্মজ্ঞ হওয়া, দৃশ্যমান সকল বস্তু ও ঘটনার মধ্যে ব্রহ্মের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি লাভ করা।

উপাসনা দুই রকমের- সাকার ও নিরাকার। এই দুটি ধারা আদিকাল হতে বয়ে এসে ভারতের ধর্মসাধনার ক্ষেত্রটিকে নানাভাবে উর্বর ও সমৃদ্ধ করেছে। সাকার উপাসনার সময়ে হ্রীং, ক্লীং, শ্রীং প্রভৃতি কতকগুলি বীজ মন্ত্র জপ করতে হয়।

প্রত্যেক মন্ত্রের একটি করে রূপ আছে, একটি করে বিশেষ বর্ণ ও ধ্বনি আছে। কিন্তু নিরাকার উপাসনার একমাত্র মন্ত্র হচ্ছে ওঙ্কার বা প্রণব মন্ত্র। ওঙ্কার হচ্ছে সর্বমন্ত্রের সার।

ওঙ্কার হচ্ছে সর্বরূপ, সর্ববর্ণ, সর্বধ্বনির সার। ওঙ্কার হচ্ছে সর্ব দেবদেবীর সারভূত সত্তার এক আশ্চর্য শব্দদ্যোতনা।

সকল মন্ত্র এই ওঙ্কার মন্ত্রের কাছে প্রকৃষ্টভাবে নূত বা নত হয় বলে এর নাম প্রণব। আবার চিরকাল এইভাবে বিরাজমান থেকেও এ মন্ত্র প্রকৃষ্টভাবে নব অর্থাৎ চিরনূতন বলে এর নাম প্রণব।

স্বামী স্বরূপানন্দকে অনেকে প্রশ্ন করেন, আপনি হরি ওঁ মন্ত্রের প্রবর্তন করেন কেন?

স্বামী স্বরূপানন্দ উত্তরে বলেন, এ মন্ত্র হচ্ছে অখণ্ড ব্রহ্মবীজ। অবশ্য যে কোন মন্ত্র কাউকে দান করার সময় পাত্রাপাত্র বিচার করতে হয়। কিন্তু বেদসার প্রণব মন্ত্র সর্বসাধারণের। এতে অচণ্ডাল ব্রাহ্মণ সকলের সমান অধিকার।

ব্রহ্মজ্ঞানী মহাসাধক লোকনাথ ব্রহ্মচারী একবার কয়েকজন অব্রাহ্মণকে ব্রহ্মগায়ত্রী ও ওঙ্কার মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কয়েকজন অন্ত্যজকে উপনয়ন দিয়ে ব্রহ্মমন্ত্রে অধিকার দান করেছিলেন। সুতরাং আজ ওঙ্কার মন্ত্র সবার মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে।

এই মন্ত্রের অভাবেই আজ ধর্মজীবনে অসঙ্গতি ঘটছে। মানুষে মানুষে ভেদবুদ্ধি ও বিরোধ বেড়ে যাচ্ছে। শত শত দেবদেবীর মূর্তি পূজো করে যে সমাজ নিজের মধ্যেই নিজে শত খণ্ডে বিভক্ত, সে সমাজকে এক অখণ্ড সমাজে পরিণত করতে হবে ওঙ্কার মন্ত্রসাধনার মাধ্যমে।

এমন কি যার গুরু নেই, সেও এই মন্ত্র জপের অধিকারী। এ মন্ত্র জীবের অন্তরে স্বতস্ফূর্ত, এ মন্ত্র জীবের কর্ণে স্বতশ্রুত, এ মন্ত্র জীবের মনে স্বগতোচ্চারিত। কারণ ওঙ্কার হচ্ছে নাদের উপাসনা। যে নাদ আপনা আপনি স্ফুরিত হয়ে অশ্রুত ধ্বনিতে বিশ্বনিখিল ব্রহ্মাণ্ডকে স্পন্দিত ও আচ্ছন্ন করে রেখেছে, ওঙ্কার হচ্ছে সেই পরম নাদ।

‘’হরি ওঁ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, পবিত্র ওঙ্কার মন্ত্র আমার সব পাপ সব তাপ সব অধি-ব্যাধি ও ক্লেশ হরণ করবেন। তিনি শত কোটি জীবকে তার মধ্যে আকর্ষণ করে টেনে নিচ্ছেন। তিনি হচ্ছেন পরমানন্দস্বরূপ আকর্ষণসত্তা।

তাই সদা সর্বদা হরি ওঁ কীর্তন করতে হবে। বর্ণে বর্ণে ভেদ, জাতিতে জাতিতে বৈষম্য, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিদ্বেষ দূর করবার জন্য অন্য কোন পথ নেই, অন্য কোন উপায় নেই। এই মন্ত্র কীর্তন ছাড়া খণ্ড জীবনচেতনাকে অখণ্ড জীবনবোধে পরিণত করা সম্ভব নয়‌।

এই ওঙ্কার মন্ত্রের দ্বারা গৃহীদেরও সাধনা করে যেতে হবে। এমন কি, অখণ্ড ওঙ্কার মন্ত্র-বীজ স্বামী-স্ত্রীর মিলনকেও সুন্দরতর ও পবিত্রতর করে তুলবে। যে মিলনকে শিব ও শক্তি, আত্মা ও পরমাত্মার অধ্যাত্মিক মিলনে পরিণত করবে।

ময়মনসিং জেলার এক গৃহী ভক্তকে স্বরূপানন্দ একবার লেখেন, প্রকৃত গৃহী ভোগব্যাপারকেও সাধনাবর্জিত করবে না। বৃথা ও অনাবশ্যক ইন্দ্রিয়চর্চা সযত্নে পরিহার করে যে কোন সম্ভোগকে সাধনার সঙ্গে যুক্ত রাখবে। জীবের ধর্মে দেহ মিলিত হয় দেহের সঙ্গে; মিলিত হয় সংসার ধর্মের প্রয়োজনের দাবীতে। কিন্তু মানুষের মধ্যে শুধু জীব নেই।

জীব ও শিব দুইই আছে। জীবের ধর্মে মানুষের দেহ যেমন স্ত্রীর দেহের সঙ্গে মিলিত হতে চায়; তেমনি শিবের ধর্মে এক পারমার্থিক প্রেরণায় তার আত্মাও মিলিত হতে চায় অনাদি অনন্ত অনির্বচনীয় পরমাত্মার সঙ্গে। তাই প্রতিটি গৃহীকেও সাধনা করে যেতে হবে যে সাধনা তাদের খণ্ড থেকে নিয়ে যাবে অখণ্ডতার উপলব্ধিতে।

ধর্মসাধনার জন্য ত্যাগের প্রয়োজন নেই। সংসারাশ্রমে থেকেও ধর্মের মূল নীতিগুলিকে জীবনের প্রতি পদে সার্থক করে তোলা যায়।

স্বরূপানন্দ স্বামীর মতে আজকাল আমাদের দেশে সুসন্তান জন্মগ্রহণ করছে না, তার কারণ সন্তান জন্ম কাজটি কামোত্তেজনায় আবিল হয়ে উঠেছে।

এ কাজ কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার নামান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তাঁর মতে সন্তান প্রজনন কাজটি পূজা অর্চনার মতই পবিত্র ব্যাপার। দেবপূজায় যেমন অকালবোধন নিষিদ্ধ, তেমনি সন্তান প্রজননের জন্য অকালসঙ্গম নিষিদ্ধ।

ধূপ ধুনোর গন্ধে আমোদিত দেবপূজার জায়গাটিকে যেমন সব দিক দিয়ে পবিত্র করে তোলা হয়, তেমনি সন্তান প্রজননের জায়গাটিকেও এমনভাবে পবিত্র করে তুলতে হবে যাতে জনক-জননীর মনে তা সাত্ত্বিক ভাব সঞ্চারিত করতে পারে। দেবপূজায় প্রত্যেকটি মন্ত্রোচ্চারণ, অঙ্গসঞ্চালন, প্রত্যেকটি সংকল্প, আবাহন ও বিসর্জন শাস্ত্রনির্দেশ অনুসারে অনুষ্ঠিত হয়, সন্তান প্রজনন কালেও তাই করতে হবে।

কর্মযোগী স্বরূপানন্দ শুধু কাজ করে যান না। তাঁর কর্মযোগের মূল নীতি ও পদ্ধতি এবং তাঁর সাধনার সত্য ও আদর্শগুলিকে সব সময় লিপিবদ্ধ করে চলেছেন এবং সেগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর প্রণীত বহু গ্রন্থের মধ্যে ভক্তদের উপদেশ দেবার ছলে লেখা ত্রয়োদশ খণ্ডে সমাপ্ত অখণ্ড সংহিতা ও আপনার জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ওঙ্কার মন্ত্রের একনিষ্ঠ সাধক ও অখণ্ড বিগ্রহের প্রতিষ্ঠাতা কর্মযোগী স্বরূপানন্দের সাধনার শেষ নেই। জগতের কল্যাণের জন্য কর্মে তাঁর কিছুমাত্র বিরতি নেই। নিখিল বিশ্বের প্রতিটি নর-নারীর দৈহিক ও আত্মিক উন্নতির জন্য তাঁর চিন্তা ভাবনার অন্ত নেই।

ওঙ্কার মন্ত্রের নিরলস সাধকরূপে তিনি দূরদূরান্তের বিচ্ছিন্ন প্রাণগুলিকে হৃদয়ের টানে একত্রিত করেছেন মহান আদর্শের বেদীতলে। কে ডোম, কে চণ্ডাল, কে মুচি, কে মেথর, এ বিচার তিনি কখনো করেন না। তাঁর নির্দেশ, অখণ্ড বিগ্রহের কোন পূজক তা কখনো করবে না।

সে শুধু যেখানে যত খণ্ড বিচ্ছিন্ন নরনারী ছড়িয়ে আছে তাদের সকলকে এই বিগ্রহের পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেবার জন্য ডেকে এনে জড়ো করবে।

একবার স্বামীজীকে প্রশ্ন করা হয় ভগবান সাকার না নিরাকার।

তার উত্তরে স্বামীজী বলেন, ভগবান সাকারও বটেন, নিরাকার বটেন, আবার সাকার নিরাকারের অতীত অব্যক্তাকারও বটেন।

যিনি আকার ধারণ করেও সাকার নন, আবার আকার ধারণ না করেও নিরাকার নন, তিনি অব্যক্তাকার। ভগবান সাকার না নিরাকার তা নিয়ে তর্ক করা উচিত নয়। কারণ তিনি স্বরূপঃ তো অসীম ও অব্যক্ত। তাই তাঁকে সাকার বা নিরাকার কিছু একটা বললেই তিনি সীমাবদ্ধ হয়ে যান। তিনি ইচ্ছা করলেই সাকার বা নিরাকার হতে পারেন।

কোন উপাসনা শ্রেষ্ঠ সে সম্বন্ধেও স্বামীজী বলেছেন, যার চিত্তসংস্কার যে রকম, সে সেই রকম উপাসনা করবে। যে যেভাবে উপাসনা করবে সেই পথেই অনন্যচিত্ত হয়ে চলবে। সাধক যতই সিদ্ধিলাভের পথে এগিয়ে যাবে ততই সাকার নিরাকারের ভেদজ্ঞান তার আস্তে আস্তে চলে যাবে।

সাকার উপাসক শেষে দেখবে যাকে সে আকারবিশিষ্ট বলে দেখে আসছে এতদিন, তিনি সমস্ত আকারের অতীত। আবার নিরাকারের উপাসকও একদিন দেখতে পাবে যাকে এতদিন অরূপ ও আকার ধারণে অক্ষম বলে জেনে আসছে তিনি নিখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল স্থূল রূপের মধ্যে বিচিত্রভাবে বিরাজ করছেন।

স্বামীজীর অখণ্ডতাবোধ শুধু মানবজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তা প্রাণীজগতেও প্রসারিত। পুপুনকির আশ্রমে অনেক বিষধর সর্প আজও বাস করে। একবার এক কর্মী জল খেতে গিয়ে কলসীর মধ্যে একটি গোখরো সাপ দেখে পাশের গাঁ হতে ওঝা আনিয়ে ধরায়।

কিন্তু পরে ওঝা গাঁয়ের লোকের চাপে সাপটিকে আশ্রমেই ছেড়ে দিয়ে যায়। সেই থেকে ভয়ঙ্কর সাপটি আশ্রমেই রয়ে গেছে। কারো কোন ক্ষতি করেনি। সর্বজীবে সর্বভূতে অহিংসা, মৈত্রী ও অখণ্ডতাবোধ প্রসারিত হলে কোন জীবই আমাদের হিংসা বা কোন ক্ষতি করবে না।

স্বামীজী আসন, প্রাণায়াম প্রভৃতি অষ্টাঙ্গ যোগসাধনায় সিদ্ধ হয়েও কোন বিভূতি দেখান না কখনো। তবে মাঝে মাঝে তাঁর ভক্ত শিষ্যেরা তাঁকে একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে দেখে আশ্চর্য হয়ে যান। তিনি যখন পুপুনকির আশ্রমে মাটি কাটছেন আশ্রমকর্মীদের সঙ্গে, ঠিক তখনি কোন ভক্ত তাঁকে দেখেন বারাণসীর আশ্রমে।

এ বিষয়ে স্বামীজীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বামীজী হেসে বলেন, এতে তাঁর কোন কৃতিত্ব নেই। কৃতিত্ব হচ্ছে যে তাঁকে এভাবে দেখে তার। কারণ কেউ যদি কাউকে অনন্য মনে চায় তাহলে তাঁর সূক্ষ্ম দেহটিকে সে এইভাবে দেখতে পায়।

অখণ্ড মন্ত্র যেমন সর্ব মন্ত্রের সমন্বয়, অখণ্ড বিগ্রহের পূজক নিজে তেমনি সর্ব জাতির পূর্ণ সমন্বয়ের প্রতীক।

………………..
ভারতের সাধক ও সাধিকা : সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে : ভারতের সাধক ও সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত- প্রণয় সেন

……………………….
আরো পড়ুন:
অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : এক
অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : দুই
অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!