অনুকুল ঠাকুর

অনুকুল ঠাকুরের বাণী: তিন

৬১.
পরমপিতা দিলে হয়, আমি বুদ্ধি করে বা চেষ্টা করে কিছু বলতে পারি না। তিনি যখন যা যোগান, তেমনি বলি, তেমনি চলি। এছাড়া আমার উপায়ও নেই।

৬২.
যার কাছ থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা পেয়ে পালন পোষণ পেয়ে আজ আমি পূর্ণ তার শরীর হতে আমার শরীর আর এই মহান মানুষ টিকে-ই আমরা পিতা বলি।

৬৩.
তবে সেই আদি কারণকে জানতে হবে, অনাদিরাদি-গোবিন্দে যেয়ে পৌঁছাতে হবে। তাকে না পেলে কিছুই পাওয়া হলো না, তাকে না জানলে কিছুই জানা হলো না।

৬৪.
হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার ভেতর থেকে সকল কপটতাকে দূর করে দাও এবং কপট মানুষও যদি আমার সঙ্গ লাভ করে তবে তারা যেন সহজ সরল হয়ে যায়।

৬৫.
আমরা তাকে উপভোগ করতে চাই। তিনি প্রভু- আমি দাস। তিনি আমাদের ভালবাসে, তাতে আমাদের লাভ নেই। আমরা তাকে যত ভালবাসি, ততোই আমাদের লাভ।

৬৬.
আমার ছেলেবেলা থেকে ধারণা ছিল যে, কেষ্ট ঠাকুর কালো, কিন্তু যখন সন্ধ্যা-টন্ধ্যা করতে বসে তাঁকে দেখতাম, তখন দেখতাম বৌসন্ধ্যার যেমন রঙ, তাঁর গায়ের রঙও তেমনি।

৬৭.
যাদের চলা, বলা, করা, জানা ভগবানে অর্থান্বিত হয়ে উঠেনি, বাস্তবে, সমন্বয়ে, সামঞ্জস্যে তাদের জ্ঞান যাই হোক না কেন তা পল্লবগ্রাহী মাত্র, বিদ্যা অনেক দূরে তাদের থেকে।

৬৮.
সরল ব্যক্তি উদ্ধ্বদৃষ্টি সম্পন্ন চাতকের মত। কপটী নিন্ম দৃষ্টিসম্পন্ন শকুনের মত। ছোট হও, কিন্তু লক্ষ্য উচ্চ হোক; বড় এবং উচ্চ হ’য়ে নিন্ম দৃষ্টিসম্পন্ন শকুনের মত হওয়ায় লাভ কি?

৬৯.
জীব কৃষ্ণের নিত্য দাস যবে ভুলি গেলা, মায়া পিশাচী তার গলে দড়ি দিলা। মানুষ যদি ভগবানের বাঁধনে বাঁধা না থাকে, তাহলে শয়তানের বাঁধনে বাঁধা পড়বেই যেকোন না কোন রকমে।

৭০.
কেউ যদি তোমার নিন্দা করে করুক, কিন্তু খেয়াল রেখো তোমার চলন চরিত্রে নিন্দনীয় কিছু যেন কোনো ক্রমে স্থিতিলাভ করতে না পারে, তাহলে নিন্দা ব্যর্থ হয়ে উঠবে এমনিতেই।

৭১.
প্রাণে প্রাণে জাগিয়ে দিবি। শব্দে, ভাবে, ছলে, বলে, কলে, কৌশলে যেমন করেই হোক জাগিয়ে দিবি। ঐ সংকীর্তন একবার যদি জাগিয়ে দিতে পারিস, তখন বুঝবে যে এরাই আমার বন্ধু।

৭২.
কারো সাহায্য যখন তুমি না পাও, তখন পিতার কাছে যাও। সে তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকবে। কৃতজ্ঞতাবোধ থাকতে হবে নচেৎ অমানুষ সেই সন্তান।

৭৩.
দুর্ব্বল হৃদয়ে প্রেমভক্তির কোনো স্থান নেই। পরের দুর্দ্দশা, ব্যাথা দেখে পরের মৃত্যু দেখে নিজের দুর্দ্দশা বা মৃত্যুর আশঙ্কা করে ভেঙ্গে পড়া এলিয়ে পড়া বা কেঁদে আকুল হওয়া- ওসব দুর্ব্বলাত।

৭৪.
অর্থ, মান, যশ ইত্যাদি পাওয়ার আশায় আমাকে ঠাকুর সাজিয়ে ভক্ত হয়ো না, সাবধান হও-ঠকবে; তোমার ঠাকুরত্ব না জাগলে কেহ তোমার কেন্দ্রও নয়, ঠাকুরও নয়-ফাঁকি দিলেই পেতে হবে তা।

৭৫.
ভগবান, ঈশ্বর, ঠাকুর বললে কেমন জানী আকাশের কেউ বা শূন্য শূন্য মনে হয়,তার থেকে কৃষ্ণ বললে নিজের বা আমার কৃষ্ণ মনে হয়। তাই ভগবান, ঈশ্বর, ঠাকুর এর চেয়ে কৃষ্ণ বললেই ভাল হয়।

৭৬.
কীর্তনে ঢুকতে হলে ঘৃণা, লজ্জা, মান, অপমান সব ছেড়ে দিতে হবে। গান গাবি সব ভাববি ইষ্টদেব। যাহা দেখবি- ‘যাহা যাহা দৃষ্টি পড়ে,তাহা তাহা কৃষ্ণ স্ফুরে।’ ভাব অবস্থা আর কিছুই নারে ইচ্ছা।

৭৭.
ভগবানকে পেতে হলে সর্বহারা হতে হবে ভেবে ভয় করো না, তাকে পাওয়া মানে সবকে পাওয়া, ব্যাঙের বুদ্ধি ভয়ে প্রস্রাব করে পালান, তুমি কি তাই করবে? ব্যাঙই থাকবে? ব্যাঙ থাকে ব্যাঙেরই জগতে।

৭৮.
যারা শক্তিমান তারা যাই করুক, তাদের নজর নিরাকরণের দিকে যাতে ও-সব অবস্থায় আর না কেউ বিধ্বস্ত হয় প্রেমের সহিত তারই উপায় চিন্তা করা,- বুদ্ধদেবের যা হয়েছিল- ঐ হচ্ছে সবল হৃদয়ের দৃষ্টান্ত।

৭৮.
যার উপর যা কিছু সব দাঁড়িয়ে আছে তাই ধর্ম, আর তিনিই পরম পুরুষ। ধর্ম কখনও বহু হয় না ধর্ম একই আর তার কোন প্রকার নেই। মত বহু হতে পারে, এমনি কি যত মানুষ তত মত হতে পারে কিন্তু তাই বলে ধর্ম বহু হতে পারে না।

৭৯.
ভগবান সবার কাছে সমান। আমরা ভগবানকে ততখানি পাই যতখানি ভক্তি অনুরাগে তার দিকে অগ্রসর হই। আলোর কাছে যত যাব তত আলো অনুভব করব ও তাপ পাব। কম-বেশী বোধ হয় আমাদের এগোন-পিছোন অবস্থায় থাকার দরুণ।

৮০.
সমস্ত গীতার মধ্যে ঘুরে ফিরে ঐ ইষ্ট প্রাণ হওয়ার কথা, ঐ কৃষ্ণ প্রাণ হওয়ার কথা, সমস্ত মহাপুরুষদের কথাই ঐ, শিক্ষাই ঐ, কাজই ঐ। ঐ টুকুর অভাবেই তো জন্ম জন্মান্তরে কত কষ্ট। ভগবানকে যে বুকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় তার আবার পরোয়া কি?

৮১.
দ্যাখ এ বাজারে ভিক্ষা চাইবি কি জানিস? একবার প্রাণ ভরে, মনভরে হরিবোল হরিবোল গোবিন্দ গোবিন্দ বল। ভাই আমি সারাদিন খাইনি, আজ কেউ হরি বলেনি। তুমি একবার হরিবোল, হরিবোল বল। তবেই আমার পেট পুরে যাবে, এই ভিক্ষা চাই।

৮২.
এটা খুবই সত্য কথা যে, মনে যখনই অপরের দোষ দেখবার প্রবৃত্তি এসেছে তখনই ঐ দোষ নিজের ভিতরে এসে বাসা বেধেছে। তখনই কালবিলম্ব না করে ওই পাপ প্রবৃত্তি ভেঙ্গেচুড়ে ঝেঁটিয়ে সাফ করে দিলে তবেই নিস্তার, নইলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।

৮৩.
তোমার ভাষা যদি কুৎসা-কলঙ্কজড়িতই হয়ে থাকে, অপরের সুখ্যাতি করতে না পারে, তবে যেন কারো প্রতি কোনও মতামত প্রকাশ না করে। আর, মনে-মনে তুমি নিজ স্বভাবকে ঘৃণা করতে চেষ্টা কর এবং ভবিষ্যতে কুৎসা-নরক ত্যাগ করতে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হও।

৮৪.
তুমি লাখ গল্প কর, কিন্তু প্রকৃত উন্নতি না হলে তুমি প্রকৃত আনন্দ কখনই লাভ করতে পারবে না। কপটাশয়ের মুখের কথার সঙ্গে অন্তরের ভাব বিকশিত হয় না, তাই আনন্দের কথাতেও মুখে নীরসতার চিহ্ন দৃষ্ট হয়; কারণ মুখ খুললে কী হয়, হৃদয়ে ভাবের স্ফূর্তি হয় না।

৮৫.
হীরক যেমন কয়লা প্রভৃতি আবর্জ্জনায় থাকে, উত্তমরূপে পরিষ্কার না করলে তা জ্যোতি বেরোয় না, তিনি তো তেমনি সংসারে অতি সাধারণ জীবের মত থাকেন, কেবল প্রেমের প্রক্ষালনেই তাঁর দীপ্তিতে জগৎ উদ্ভাসিত হয়। প্রেমীই তাঁকে ধরতে পারে। প্রেমীর সঙ্গ কর, তিনি আপনিই প্রকট হবেন।

৮৬.
যা! তোর ভয় কিসের? তুই নাম নিয়েছিস তোর গুরু আছে, ভগবান আছেন, তুই সেই পথে চলবি। ভগবানকে ভালবাসবি, ভগবান কাউকে ছাড়েন না। তোরাও তেমনি কাউকে ফেলবি না, কাউকে ছাড়বি না। সকলকেই ভালবাসবি, তাদের সেবা করবি। খুব করে নাম করবি, স্ফূর্তিতে কাম করবি।

৮৭.
দুর্বল মন চিরকালই সন্দিগ্ধ- তারা কখনই নির্ভর করতে পারে না, তাই প্রায়ই রুগ্ন কুটিল ইন্দ্রিয়পরবশ হয়। তাদের নিকট সারাটা জীবন জ্বালাময়। শেষে অশান্তিতে সুখদুঃখ ডুবে যায়। কি সুখ, কি দুঃখ বলতে পারে না, জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলে, বেশ-তা-ও অশান্তি! অবসাদে জীবন ক্ষয় হয়ে যায়।

৮৮.
আত্ম-প্রতিষ্ঠার তাগিদে যারা শক্তিমান হয় তারা শক্তির দম্ভে সৎলোককে অবমাননা করতে শুরু করে। চাটুকার ছাড়া অন্য লোককে তারা বরদাস্ত করতে পারে না। বহু লোক তাদের আচরণে অন্তরে অন্তরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে আর তাই হয় তাদের কাল। অন্তত লোকের অন্তরে তাদের কোন আসন প্রতিষ্ঠিত হয় না।

৮৯.
সৎসঙ্গী হওয়া মানে সবার বাঁচা-বাড়ার সেবক হওয়া। অন্যের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়াকে অক্ষুন্ন ও অব্যাহত রাখিয়া জীবন ও বৃদ্ধিকে লাভ করিবার জন্য যাহারা যত্নশীল তাহারাই সৎসঙ্গী। আত্ননঃ সর্বেষাং হি জীবনবর্দ্ধনাধীগম পরো যঃ স এব সৎসঙ্গী অর্থাৎ আমি সৎসঙ্গী তার মানে আমি প্রতি-প্রত্যেকের জীবন বৃদ্ধির সঙ্গী।

৯০.
তুমি বলো না তুমি ভীরু, বলো না তুমি কাপুরুষ, বলো না তুমি দুরাশয়! পিতার দিকে নজর কর, আবগভরে বল- “ওগো! আমি তোমার সন্তান, আমার আর জড়তা নেই, আর দুর্বলতা নেই আমি আর কাপুরষ নই, আমি তোমাকে ভুলে নরকের দিকে ছুটে যাব না, আর তোমার জ্যোতির দিকে পিছন ফিরে আর ‘অন্ধকার অন্ধকার’ চিৎকার করব না।”

৯১.
পরনিন্দা করাই পরের দোষ কুড়িয়ে নিয়ে নিজে কলঙ্কিত হওয়া; আর পরের সুখ্যাতি করা অভ্যাসে নিজের স্বভাব অজ্ঞাতসারে ভাল হয়ে পড়ে। তাই বলে কোন স্বার্থবুদ্ধি নিয়ে অন্যের সুখ্যাতি করতে নেই। সে তো খোসামদ। সে ক্ষেত্রে মন মুখ প্রায়ই এক থাকে না। সেটা কিন্তু বড়ই খারাপ, আর তাতে নিজের স্বাধীন মত প্রকাশের শক্তি হারিয়ে যায়।

৯২.
তুমি লাখ miracle (অলৌকিকতা) দেখাও ক্ষতি নেই, যদি তাকে explain (ব্যাখ্যা) করতে পার। তার থেকে আচারে-ব্যবহারে সেবায় মানুষের মন জয় করে নিতে পার, তার প্রয়োজনের সময় তার কাছে দাঁড়াতে পার, তাহ’লে সব চাইতে বড় কাজ হয়। A friend in need is a friend is deed (প্রয়োজন-কালে বন্ধুই যথার্থ বন্ধু)।

৯৩.
ভক্ত যে, সে শুধু নৈর্ব্যক্তিক ধারণা নিয়ে খুশি থাকতে চায় না।সে চায় তার বাস্তব প্রকাশ। তাকে প্রীত করেই প্রীত হতে চায়, এর মধ্যই জীবনের সম্ভোগ। তাদের কাছে বাসুদেবই সব। সব কিছু তত্ত্ব ও বস্তুর সংহত পরিপূর্ণতা যা, তার থেকে কিছুই বাদ দিতে চায় না। তাই তারা বাসুদেবকেই আঁকড়ে ধরে। কারণ তার মধ্যেই আছে সবকিছু তত্ত্ব ও বস্তুর সুসঙ্গত কেন্দ্রায়িত সমাবেশ।

৯৪.
সর্বপ্রথম আমাদের দুর্ব্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে- সাহসী হতে হবে, বীর হতে হবে। পাপের জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি ঐ দুর্বলতা। তাড়াও যত শীঘ্র পার, ঐ রক্ত শোষণকারী অবসাদ-উৎপাদক ভ্যাম্পায়ারকে। স্মরণ কর তুমি সাহসী, স্মরণ কর তুমি শক্তির তনয়, স্মরণ কর তুমি পরমপিতার সন্তান- আগে সাহসী হও, অকপট হও, তবে জানা যাবে তোমার ধর্ম্মরাজ্যে ঢোকবার অধিকার জন্মেছে।

৯৫.
হটে যাওয়া বরং দুর্বলতা নয়কো, তুমি কোনো কিছু করতে প্রাণপণ চেষ্টা করা সত্ত্বেও যদি বিফল মনোরথ হও- ক্ষতি নাই, তুমি চেষ্টা ছেড়ো না, ঐ অম্লান চেষ্টাই তোমাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে। যে পরিমাণে দুঃখের কারণে মন সংলগ্ন হয়ে অভিভূত হবে, সেই পরমাণে হৃদয়ে ভয় আসবে ও দুর্বলতাগ্রস্ত হয়ে পরবে। যদি রক্ষা পেতে চাও, ভয় আর দুর্বলতা বলে কিছু রেখো না, সৎচিন্তা ও সৎকর্ম্মে ডুবে থাক।

৯৬.
যে শাশুড়ী মা সে কিন্তু তোমার অর্ধেক অঙ্গের মা অর্থাৎ তুমি আর তোমার স্বামী দুজনে মিলে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ অর্থাৎ তোমার ও মা। আর মা মানেই জগত জননী সর্বেসর্বা। বৌমা আসলে তার আস্তে আস্তে কর্তৃত্ব হরায়, আবার ছেলেকে হারানো ভয় থাকে ছেলেরা আগে মা ঘিরে থাকে বিয়ের পর আস্তে আস্তে কমে যায়। তাই একটু দোষ গুন ধরে একটু রেগে কথা বলে। হয়তো বা মনের কিছু দুঃখ অন্য কাউকে বলে। সব বিষয় গুলো যদি গভীর ভাবে ভাবো দেখতে পাবে মায়ের কোন দোষ নেই। তখন তাকেই মাথায় করে রাখবে তুমি গৃহিণীর কন্যা হয়েই থাকবে।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!