আচার্য শঙ্করাচার্য

আচার্য শঙ্করাচার্য: তিন

একবার বর্ষাকালে কয়েকদিন ধরে প্রবল বর্ষণ হওয়ার ফলে নর্মদা নদীতে বন্যা দেখা দেয়। নদীর জল ফুলে উঠতে থাকলো প্রতি মুহূর্তে। নদীর জলস্রোত কূল ছাপিয়ে ওঙ্কারনাথ পাহাড়ের গায়ে ক্রমাগত ধাক্কা মারতে লাগলো।

এদিকে যোগীবর গোবিন্দপাদজী তখন তাঁর নিজস্ব গুহার মধ্যে সমাধিমগ্ন হয়েছিলেন। তখন তাঁর কোন বাহ্যজ্ঞান ছিল না। বন্যার অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে পরেন শিষ্যরা। বন্যার জল বাড়তে বাড়তে গুহার মুখের কাছে এসে পড়েছে।

এরপর জলস্রোত গুহার ভিতরে ঢুকে সমাধিস্থ গুরুদেবের জীবন বিপন্ন করে তুলবে। বন্যার আগ্রাসী স্রোতের গতি রোধ যেমন সম্ভব নয় তেমনি সমাধিস্থ গুরুদেবের ধ্যান ভাঙ্গিয়ে তাঁকে পাহাড়ের ঊর্ধ্বতন কোন স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।

এই সব দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন শিষ্যরা। আচার্য শঙ্কর সবকিছু লক্ষ্য করে শেষে এগিয়ে এসে বললেন, আপনারা উদ্বিগ্ন হবেন না। আমাদের গুরু মহারাজ ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ। তার উপর তিনি এখন সমাধিমগ্ন। এ অবস্থায় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাঁর কোন অনিষ্ট সাধন করতে পারবে না। মহাযোগীর সঙ্গে প্রকৃতি সহযোগিতা করতে বাধ্য। তাছাড়া তাঁর আশীর্বাদে এ বন্যার গতিরোধ আমিই করতে পারব।

এই বলে একটি মাটির বড় কলসী এনে কাত করে গুহার মুখের কাছে রেখে দিলেন তিনি। এরপর দেখা গেল বন্যার ঢেউগুলি প্রবল উচ্ছ্বাসে গুহাদ্বারে এগিয়ে আসতে সেই কলসীর মুখে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কোথায়।

স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে ঢেউগুলির সব উচ্ছ্বাস। দেখতে দেখতে বন্যার সব জলোচ্ছ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। জলের বিপদ সীমানা থেকে আশ্চর্য ভাবে রক্ষা পেয়ে গেল সেই সাধনগুহাটি‌। এ ব্যাপারে কিশোর শঙ্করের যোগশক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁকে সাধুবাদ দিতে লাগলেন শিষ্যরা।

গুরু গোবিন্দপাদের সমাধিভঙ্গ হবার পর সব কিছু শুনে প্রসন্ন হয়ে শঙ্করকে বললেন, আমার আশীর্বাদ তুমি লাভ করেছ। আমার আশীর্বাদে তুমি আত্মকাম হয়ে উঠেছ। সর্বশাস্ত্রের তত্ত্ব ও সর্বজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে যোগ বিভূতি করতলগত হয়েছে তোমার। আর কিছু প্রার্থনা থাকে তো বল।

গুরুদেবকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে করজোড়ে শঙ্কর বললেন, প্রভু! আপনার কৃপায় আমার সকল অভাব দূর হয়েছে। আমার প্রার্থনার আর কিছুই নেই। আপনি কৃপা করে আমায় অনুমতি দিলে এবার সমাধিস্থ হয়ে এই মরদেহ ত্যাগ করে ব্রহ্মের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিতে চাই।

গোবিন্দপাদ কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, বৎস! দেহত্যাগের সময় তোমার এখনো আসেনি। যে যুগ-প্রয়োজনে তুমি এসেছ সে কাজ তোমার এখনো শেষ হয়নি।

অদ্বৈত ব্রহ্মের জ্ঞান নতুন করে প্রচার করতে হবে তোমায়। লুপ্ত তীর্থগুলি উদ্ধার করতে হবে। সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে যে পাপ ও অনাচার ঢুকেছে তার সংস্কার সাধন করে এদেশের অধ্যাত্ম জীবনকে পুনর্গঠিত করে তুলতে হবে। দেশের ঈশ্বরবিমুখ জনসমাজকে ঈশ্বরমুখী করে কল্যাণের দিকে নিয়ে যেতে হবে তোমাকে।

শঙ্কর তেমনি করযোড়ে বললেন, আদেশ করুন কি আমায় করতে হবে।

গুরুদেব বললেন, তোমার মধ্যে অদ্বৈতজ্ঞানের আলো জ্বলে উঠেছে তা ছড়িয়ে দিতে হবে দিকে দিকে। আমি তোমার জন্যই প্রতীক্ষায় ছিলাম। আমার কাজ শেষ হয়েছে। এবার আমি নিশ্চিন্ত মনে মরদেহ ত্যাগ করব‌। তুমি এখন চলে যাও কাশীধামে।

সেখানে বিশ্বেশ্বরের নির্দেশ মত তোমার কর্মব্রত উদযাপন করবে একে একে। শিষ্যদের কাছে বিদায় নিয়ে যোগ সমাধিতে নিমগ্ন হলেন গুরু গোবিন্দপাদ। সে সমাধি তাঁর আর ভঙ্গ হয় নি কোনোদিন।

গুরুর আদেশমত ওঙ্কারনাথ পাহাড় থেকে সোজা কাশীধামে চলে এলেন আচার্য শঙ্কর। সঙ্গে নিয়ে এলেন কিছু সুযোগ্য শিষ্যকে‌। কাশীধামে এসে মণিকর্ণিকা ঘাটের কাছে আসন পেতে বসলেন। সেকালে কাশীধাম ছিল সারা ভারতের ধর্মজীবনের কেন্দ্রস্থল এক মহাতীর্থ।

এই তীর্থে দণ্ডী সন্ন্যাসী, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ও পরিব্রাজকদের চলত নিরন্তর আনাগোনা। সব সময় শাস্ত্রালাপ, মন্ত্রোচ্চারণ ও স্তবগানে মুখরিত হত এই পবিত্র নগরীর পথঘাট। যত সব নূতন ধর্মমতের প্রচার ও নূতন শাস্ত্রব্যাখ্যা রচনার উৎসস্থল ছিল এই বারাণসী।

মণিকর্ণিকা ঘাটের পাশে আচার্য শঙ্কর আসন পেতে বসলে বহু প্রবীণ দণ্ডী সন্ন্যাসী ও শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ঘিরে ধরলেন তাঁকে। তিনি তখন বলিষ্ঠ যুক্তির দ্বারা প্রতিপক্ষের সব মত খণ্ডন করে অদ্বৈত সিদ্ধান্ত স্থাপন করতে লাগলেন। তেজঃপুঞ্জকলেবর এই তরুণ সন্ন্যাসীর জ্যোতির্ময় দেহটিকে দর্শন করার সঙ্গে সঙ্গেই ভক্তিভাব জাগে সকলের অন্তরে।

সাধারণ নরনারীরাও তাঁকে দর্শন করতে এসে সমস্ত বন্ধন হতে মুক্ত হয়। তাঁর লোকোত্তর তত্ত্বজ্ঞান ও যোগশক্তির ঐশ্বর্যে অভিভূত হয়ে যায় সমস্ত কাশীধাম।

একজন চোলদেশীয় ব্রাহ্মণ যুবক আচার্য শঙ্করকে দর্শন করতে এসে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে। এই নবাগত যুবকই কাশীধামে শঙ্করের প্রথম শিষ্য। পরবর্তীকালে ইনিই এক অসামান্য যোগবিভূতির অধিকারী হন।

সেকালে আচার্য গৌড়পাদ ছিলেন অদ্বৈতবাদ ও পরব্রহ্মতত্ত্বের প্রধান উৎস। স্বামী গোবিন্দপাদ ছিলেন তাঁরই শিষ্য। শঙ্কর তাই তাঁর গুরুর গুরু পরমগুরু গৌড়পাদের অদ্বৈতবাদের ব্যাখ্যার জন্য প্রথমে মাণ্ডব্যকারিকা রচনা করলেন। অনেকে বলেন, আচার্য গৌড়পাদ ছিলেন গৌড়দেশীয় ব্রাহ্মণ।

সেদিন অদ্বৈতবাদের যে ধারা ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল ভারতে সেই ধারাকে এক নূতন প্রাণশক্তি দান করে উজ্জীবিত করে তুলতে চাইলেন আচার্য শঙ্কর। তিনি ঘোষণা করলেন, ব্রহ্মই একমাত্র সত্যবস্তু। জগৎ একেবারে মিথ্যা, স্বপ্নের মত অলীক। সকল জীব ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এই ব্রহ্মের মধ্যে কোন শক্তি নেই।

তিনি আরও বললেন, ব্রহ্ম নিরাকার, নির্গুণ ও নির্বিশেষ। এই নির্বিশেষ ব্রহ্মই একমাত্র পরমার্থতত্ত্ব। মুমুক্ষু মানুষকে একথা জানতে ও উপলব্ধি করতে হবে। সাধারণ নরনারীর এসব তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা নেই। তাছাড়া ব্রহ্মের কোন শক্তি যদি না থাকে তাহলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কে কিভাবে চালাচ্ছে তা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না।

একদিন তাই কাশীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী অন্নপূর্ণা নিজে ছদ্মরূপ ধারণ করে আবির্ভূত হয়ে এ বিষয়ে সচেতন করে দিলেন শঙ্করকে। মণিকর্ণিকা ঘাটে সেদিন স্নান করতে যাচ্ছিলেন শঙ্কর। ঘাটে যাবার জন্য এক সংকীর্ণ পথ দিয়ে হেঁটে চলেছিলেন তিনি। এমন সময় দেখতে পেলেন এক সদ্যবিধবা তরুণী যুবতী তার মৃত স্বামীর দেহ কোলে নিয়ে পথরোধ করে বসে ভিক্ষা চাইছে পথচারীদের কাছ থেকে। মৃতদেহ সৎকারের টাকা নেই তার।

সামনে পথ বন্ধ, পাশ কাটিয়ে যাবার রাস্তা নেই। শঙ্কর তাই বিনীতভাবে বললেন, মা, শবটিকে এমন আড়াআড়িভাবে না রেখে সোজা করে শুইয়ে দাও। তাহলে আমরা পথ চলতে পারি। কিন্তু তরুণীটি স্বামীশোকে আকুল হয়ে কেবল কেঁদে যেতে লাগল। শঙ্করের কথায় কোন কান দিল না।

এদিকে গঙ্গায় স্নান করতে যাবেন বলে বারবার সেই নারীর কাছে একই মিনতি জানাতে লাগলেন শঙ্কর। অবশেষে তরুণীটি বিরক্ত হয়ে বলল, সন্ন্যাসী! আমাকে কিছু না বলে তোমার মিনতি যা জানাবার তা এই শবের কাছেই জানাও‌। সে সরে যায় তো যাবে।

শঙ্কর ভাবলেন, স্বামীর শোকে মেয়েটির হয়ত মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তা না হলে এই অবান্তর কথা বলবে কেন।
শঙ্কর তাই তেমনি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, কিন্তু মা, শব কি কখনো শুনতে পায়, না নড়তে চড়তে পারে? সে সরে যাবে কি করে আর আমার কথা শুনবেই বা কি করে?

বিধবা তরুণীটি তখন বলল, আচার্য! শক্তিহীন ব্রহ্ম জগতের স্রষ্টা‌। জগতের কর্তা- একথা আপনি প্রচার করে থাকেন। তা যদি সত্য হয় তাহলে এই শক্তিহীন শব কেন নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবে না?

আশ্চর্য হয়ে গেলেন শঙ্কর। এই তরুণী তাঁর সম্বন্ধে এত কথা জানলো কি করে এবং সমালোচনার জ্ঞান কোথায় পেল সে?

কিন্তু পরক্ষণেই শঙ্কর দেখলেন, সেই শব বা বিধবা তরুণী সেখানে নেই। মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেছে কোথায়। প্রকৃত ব্যাপারটি কি তা বোঝার জন্য ধ্যানস্থ হলেন শঙ্কর। ধ্যানযোগে জানতে পারলেন তাঁকে সগুণ ব্রহ্মতত্ত্ব সম্বন্ধে শিক্ষা দেবার জন্যই স্বয়ং অন্নপূর্ণা এই লীলা করে গেলেন এক সদ্যবিধবা তরুণীরূপে।

তিনি বোঝাতে চাইলেন সাধারণ মানুষ নির্গুণ নির্বিশেষ পরব্রহ্মতত্ত্ব বুঝতে পারে না। একমাত্র শক্তিমান সাধকরাই সে তত্ত্ব বুঝতে পারে। সাধারণ মানুষের পক্ষে সগুণ ব্রহ্মতত্ত্বই বিশেষ উপযোগী।

আর একদিন গঙ্গার ঘাটে স্নান করতে গিয়ে দেখেন শঙ্কর, সামনে এক ভীষণাকৃতি চণ্ডাল কয়েকটা কুকুর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চণ্ডালরা সাধারণত শ্মশানের নোংরা ঘেঁটে বেড়ায়। তারা অন্ত্যজ শ্রেণীরও অস্পৃশ্য। শঙ্কর তাই সাবধানে চণ্ডালের স্পর্শ এড়িয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাকে বললেন, পথ থেকে সরে গিয়ে ওধারে গিয়ে দাঁড়া।

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল চণ্ডাল। অনর্গল ধারায় সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি করে যেতে লাগল। সামান্য এক চণ্ডালের মুখে জ্ঞানগর্ভ শ্লোকগুলি শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন শঙ্কর।

সেই শ্লোকগুলির অর্থ হলো, এই যে আচার্য, আপনি কাকে সরে যেতে বলছেন? আমার দেহকে না আত্মাকে? যে আত্মা সর্বব্যাপী, নিষ্ক্রিয় নির্গুণ, সে কোথায় সরে যাবে? কেনই বা সরে যাবে? আত্মার কাছে তো শুচি অশুচি বলে কোন জিনিস নেই। গঙ্গার জলের উপর যে চাঁদ প্রতিফলিত হয় সেই চাঁদই মদের মদের পাত্রেও প্রতিফলিত হয়।

এই দুই চাঁদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তাছাড়া আপনি যদি আমার দেহকে সরে যেতে বলেন তাহলে দেহ কি করে সরে যাবে? কারণ দেহ তো জড়পদার্থ। আপনি সন্ন্যাসী, আত্মজ্ঞানী ব্রহ্মজ্ঞানী আচার্যরূপে আপনার খ্যাতি আছে। কিন্তু এখন দেখছি আপনি লোককে মিথ্যা উপদেশ দিয়ে প্রবঞ্চনা করেন। কথাগুলো শুনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন শঙ্কর। সহসা তাঁর চোখের সামনে চণ্ডালের পরিবর্তে ভেসে উঠল দেবাদিদেব মহাদেবের মূর্তি।

এবার ভুল নিজেই বুঝতে পারলেন শঙ্কর। তিনি বুঝতে পারলেন, যুগাচার্যের ভূমিকায় তাঁর নিশ্চয় কোন ত্রুটি ছিল। সেই ত্রুটি সংশোধনের জন্যই কাশীধামের পরম দেবতা বিশ্বেশ্বর স্বয়ং কৃপাপরবশ হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন তাঁর সামনে। অপলক চোখে সেই মূর্তির দিকে তাকিয়ে রইলেন শঙ্কর।

বিশ্বেশ্বর এবার মধুর কণ্ঠে বললেন, বৎস! সব সংস্কারের ঊর্ধ্বে প্রকৃত অদ্বৈত তত্ত্বকে উপলব্ধি করে তার ধারক ও বাহক হও। জগতের কল্যাণ সাধনের জন্য এই তত্ত্বের প্রচার করতেই হবে। একমাত্র এই অদ্বৈত তত্ত্বই সব ভেদজ্ঞান দূর করতে পারে। তার আগে তোমাকে করতে হবে উপনিষদ ও ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য রচনা‌। জ্ঞানসাধনায় সঞ্চার করতে হবে এক নতুন প্রাণশক্তি।

সঙ্গে সঙ্গে আপন কর্তব্য স্থির করে ফেললেন শঙ্কর। তিনি স্থির করলেন হিমালয়ের নির্জন প্রদেশে কোন ব্যাসদেবের পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত ও তপস্যাপূত স্থানে আসন পেতে বিশ্বেশ্বরের আদেশ মত গ্রন্থ রচনা করে চলবেন। এই সংকল্প সাধনের জন্য আর বিলম্ব না করে বেরিয়ে পড়লেন শঙ্কর কাশীধাম হতে‌।

সঙ্গে সনন্দন ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ শিষ্যকে নিলেন। প্রথমে হৃষীকেশ গিয়ে উঠলেন তারা। সেখানে গিয়েই হারানো বিষ্ণুর বিগ্রহটি উদ্ধারের চেষ্টা করতে লাগলেন শঙ্কর। এই প্রাচীন বিগ্রহটি বহুকাল আগে আক্রমণকারী ভীল দস্যুদের ভয়ে পাণ্ডারা গঙ্গার গর্ভে লুকিয়ে রাখে। তারপর দীর্ঘকাল সে বিগ্ৰহের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

শঙ্কর একদিন ধ্যানাবিষ্ট হয়ছে দেখতে পেলেন কোথায় বিগ্রহটি আছে। তিনি তখনি সবাইকে ডেকে জলের তলা থেকে মূর্তিটি উদ্ধার করলেন। বদ্রীধামে বদ্রীনাথের বিগ্রহটিরও সেই অবস্থা ছিল। বদ্রীধামে গিয়ে শঙ্কর দেখলেন, বদ্রীনাথের আসল বিগ্রহের পরিবর্তে একটি শালগ্রাম শিলাকে পূজা করা হয়। সীমান্ত হতে দস্যুরা মাঝে মাঝে এ স্থান আক্রমণ করত বলে বিগ্ৰহের পবিত্রতা রক্ষার জন্য সেটিকে জলকুণ্ডের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়।

একদিন মন্দিরের পাণ্ডাদের ডেকে শঙ্কর বললেন, নারায়ণের সেই প্রাচীন বিগ্রহ মূর্তিটি আজ আমি উদ্ধার করব বলে স্থির করেছি। আপনারা বিগ্ৰহের অভিষেক ও প্রতিষ্ঠার আয়োজন করুন।

পাণ্ডারা ও স্থানীয় লোকরা শঙ্করকে বলল, এই জলকুণ্ডের তলায় পার্বত্য নদী, অলকানন্দার যোগ আছে। তার ফলে এই জলকুণ্ডের তলায় প্রচণ্ড স্রোত আছে। তাই এই জলকুণ্ডে ডুব দিয়ে অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। আপনি ডুব দেবেন না।

কিন্তু তরুণ আচার্য শঙ্কর কারো কোন কথা শুনলেন না। এক আধ্যাত্মিকভাবে আবিষ্ট হয়ে ধীর পায়ে নেমে গেলেন তিনি সেই ভয়াবহ জলকুণ্ডের মধ্যে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পদ্মাসনে উপবিষ্ট নারায়ণের চতুর্ভুজ মূর্তিটি হাতে নিয়ে উপরে উঠে এলেন। সকলে ধন্য ধন্য করতে লাগল। আনন্দে ও বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল সকলে। চারিদিক কাঁপিয়ে জয়ধ্বনি দিতে লাগল বদ্রীনাথের, বদরী বিশাল লালা কি জয়।

এর পর শিষ্যদের নিয়ে শঙ্কর চলে গেলেন ব্যাসতীর্থে। মহামুনি ব্যাসদেবের সুপ্রাচীন আশ্রমটি ছিল অলকানন্দা ও কেশবগঙ্গার সঙ্গমস্থানের উপরে হিমালয়ের কোলে। ধ্যানগম্ভীর এক দিব্য ভাবের স্পন্দনে অভিস্পন্দিত হয়ে আছে এখানকার পরিবেশ, এখানকার আকাশ বাতাস। সেই পরিবেশের মধ্যে নির্জন গিরিগুহাটি দেখে পছন্দ হয়ে গেল শঙ্করের।

এই গিরিগুহায় থেকে ভাষ্য রচনার কাজ শুরু করে দিলেন শঙ্কর। এইখানে বসেই চার বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ষোলখানি ধর্মগ্রন্থের ভাষ্য রচনা করেন তিনি। অলৌকিক প্রতিভার স্বাক্ষরে ভাস্বর এই সব ভাষ্যগুলিতে অনেক নিগূঢ় তত্ত্ব ব্যাখাত হয়েছে। অদ্বৈতবাদের এই সব ব্যাখ্যা এক বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে ভারতের সাধকসমাজের মধ্যে।

আচার্য শঙ্করের অলৌকিক শক্তি ও প্রতিভার পরিচয় পেয়ে জ্যোতিধামের রাজা মুগ্ধ হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই রাজশিষ্যের সাহায্য শঙ্করের ভাষ্যগ্রন্থগুলির হাতে লেখা অনুলিপি বহু জায়গায় প্রচারিত হয়।

শঙ্কর এবার অক্লান্ত চেষ্টার দ্বারা লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার ও অদ্বৈতবাদের প্রচার করে যেতে থাকেন। উত্তরাপথের বৌদ্ধ ও তাত্ত্বিকপ্রধান আশ্রমগুলিতেও বৈদিক ধর্ম ও বৈদিক আচার প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

আচার্য শঙ্করের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় বহু সাধু সন্ন্যাসী ও শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ভিড় করতে থাকে ব্যাসগুহার আশ্রমে।

(চলবে)

…………………………………
আরো পড়ুন:
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: এক
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: দুই
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: তিন
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: চার
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: পাঁচ
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: ছয়

………………………………..
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে:
পুণঃপ্রচারে বিনীত-প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!