ভবঘুরে কথা
উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা ৭১ এর স্মৃতি : পর্ব বারো

-পারভেজ চৌধুরী

লালমনিরহাটের প্রথম যুদ্ধ-
বৃহস্পতিবার, ১লা এপ্রিল ১৯৭১, ছোট শহর লালমনিরহাটে আমাদের আসার আজ ৯০ দিন পুরা হোল। যা ছিল মধ্য চৈত্রমাসের উজ্জল নীল আকাশের দিন। ১লা জানুয়ারি তারিখে আসার পর এখনো শহরের সবকিছু আমাদের অজানা, এই শহর ও তার মানুষজনকে ভালোভাবে জানা হয় নাই। যদিও বাবার কাছে শহর ও তার নেতৃত্ব স্থানীয় মানুষ আগে থেকে জানা, মহকুমা গোয়েন্দা অফিসার হিসাবে। গত ২৮ তারিখ রবিবারের দাঙ্গার পর শহর শান্ত হলেও পাকিস্তানি হামলার ভয়ে স্থানীয় অনেকেই শহর এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। দূর গ্রামে তাদের বাড়িঘর আছে বলে। দাঙ্গায় দুইজন নিহত হওয়ায় অনেকেই আর শহরে থাকা নিরাপদ মনে করছেন না যা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা শহর ছেড়ে কোথায় বা কতদূর যাব!

আজ আমরা হাবিলদার মোবারক চাচাকে পাবার জন্য অন্যদের চেয়ে অনেক আগেই মাঠে পৌঁছে গেলাম। তখন প্রায় সকাল সাড়ে নয়টা বাজে কিন্তু মোবারক চাচাকে পাওয়া গেল না। শুধু ভাঙ্গা রাইফেল দুইটা নিয়ে কয়েকজন আনসার সদস্য উপস্থিত, ছাত্রজনতা মিলে সংখ্যায় শ’খানেকের উপর নয়। আনসার সদস্যদেরকে আমাদের রাইফেল ট্রেনিং দলে নিতে বললে তারা জানালেন ট্রেনিং-এর দায়িত্ব সব আর্মির মানুষদের তারা আসলে ঠিক হবে। তারা আমদের সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, এখন যে কয়েকটি রাইফেল আছে তা দিয়ে সবাইকে একসাথে ট্রেনিং দেয়া সম্ভব নয়। তাই ভাগেভাগে ট্রেনিং হবে। যখনই সময় হবে তারা আমাদেরকে দলে নেবে। তাদের ভালো ব্যবহার আমাদের ভালো লাগল, আমরাও মেনে নিলাম। একটু পরে আরো আনসার ও অবসরপ্রাপ্ত আর্মির লোকজন রাইফেল নিয়ে মাঠে চলে এল। সে সাথে মানুষজন ও স্লোগান দিতে দিতে মাঠে জমা হতে থাকল।

সকাল তখন দশ বা সাড়ে দশটা মাঠে ট্রেনিং শুরু করার প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু হঠাৎ কিছু মানুষের হল্লাচিল্লায় সবার মনোযোগ ভঙ্গ হলো। কিছু লোক ‘ও বাহে মিলিটারি! ও বাহে ওপাক দ্যখো মিলিটারি মিলিটারি!’ বলে চিৎকার করছে। আমরা সবাই মাঠের উত্তর-পূর্ব দিকের ইটবিছানো রাস্তা ধরে ৫/৬ জন খাকি যুদ্ধের পোশাক পরা মানুষ বহুদূর থেকে হেঁটে আসছে। আমাদের প্রথমেই সন্দেহ হলো এইপথে পাকিস্তানি মিলিটারি আসার কথা নয়, কারণ রংপুর থেকে পাকিস্তানি মিলিটারি আসতে হলে তিস্তা নদী পার হতেই হবে। আর তিস্তা নদী বা তিস্তা রেলজংশন লালমনিরহাটের দক্ষিণে, তিস্তা রেল জংশনের সাথে টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ চালু আছে এবং সকাল পর্যন্ত সেরকম কোন খবর নাই। তারা এখনো অনেকদূরে তাই আমরা কিছুসময় তাদের উপর লক্ষ্য রাখি। তারা যখন আরো কাছে আসলো ও দৃশ্যটা পরিষ্কার হলে আমরা বুঝলাম তারা ইপিআর সদস্য এবং কোন বিওপি থেকে আসছে। কিন্তু তাদের সবার কাঁধে জিনিষপত্র যা তারা বাঁশের বাঁক ও শিকা দিয়ে বয়ে নিয়ে আসছে। তাই সবার সাথে আমরাও তাদের দিকে এগিয়ে যাই। ইপিআর সবাই বাঙ্গালী তাই জনতা তাদের ঘিরে ফেলে ও জয় বাংলা স্লোগান দিতে দিতে জনতার সাথে যোগ দিতে অনুরোধ করে। বাঙ্গালী ইপিআর স্টিল হেলমেটসহ পুরো যুদ্ধ পোশাকে থাকলেও তাদের কাছে কোন অস্ত্র ছিলো না। তার পরিবর্তে তারা কাঁধে বাঁশের বাঁক ও শিকায় রান্নার হাড়িপাতিল ও অন্যান্য জিনিষপত্র বহন করছিলো যা আমাদের কাছে বেশ অবাক লাগল। আমরা জানি ইপিআরদের একস্থান থেকে আরেকস্থানে বদলি হয় যা স্বাভাবিক এবং তার জন্য তারা গরুরগাড়ি বা অন্য কোন যানবাহন ব্যবহার করে, আর কাঁধে করে এভাবে মালপত্র বহন করতে হয়না বা সঙ্গে অস্ত্র থাকে। কিন্তু এখন তো স্বাভাবিক সময় নয় হয়তো তার কোন গরুরগাড়ি পায় নাই।

আন্যদিকে উত্তেজিত জানতার ভিড়, ধাক্কাধাক্কিতে তাদের মালপত্র মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়, তারাও একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভারি মালপত্র বয়ে হয়েছে ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত হতভম্ব ও বিরক্ত। আমরা বার বার তাদেরকে আমাদের সাথে যোগ দিয়ে ট্রেনিং দেয়ার অনুরোধ করলে আমার কাছাকাছি একজন বলে, তারা রংপুর যাবার জন্য রেল স্টেশনে যাবে। আমরা বলি যে রেলগাড়ি বন্ধ, আরো বলি তারা কি ঢাকার কোন খবর পায় নাই? মিলিটারি যে রাজারবগ পুলিশলাইন ও পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করেছে তার খবর কি তারা কিছুই জানে না? কিন্তু তারা জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকে! আবার অন্য একজন বলে ঘাঁটিতে (বিমান ঘাঁটি) যাবে। বোঝাই যায় তারা কেউই কোন সঠিক উত্তর দিচ্ছে না। আমাদের সাথে যোগ দিতে না চাইলে মানুষজন ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছে, নেতৃত্ব স্থানীয় কেউ উপস্থিত না থাকায় শুধুই হট্টোগোল বাড়ছে। একসময়ে তারা রাগান্বিত হয়ে চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল ‘আমাদের রাস্তা ছাড়!-আমাদের পেছনে বড় দল আসতেছে, তারা কিন্তু বাঙ্গালী নয়! তাদের কাছে অস্ত্র আছে! তারা তোমাদের এই সব হাংগামা পছন্দ করবেনা!’


আমরা যখন মাটিতে শুয়ে তখন ইপিআর দল লালমনিরহাট-মোগোলহাট রেললাইনের দিকে প্রায় দৌঁড়াতে থাকে! তারা কি আপ ইয়ার্ড কলোনীর দিকে যাবে? কারণ ঐ সময় কলোনীর বিহারিরা ও নারায়ে তকবীর- আল্লাহু আকবর বলে চিৎকার দিতে থাকে।

এরই মধ্যে পুলিশ পোশাকে হাবিলদার মোবারক চাচা প্রায় ২/৩জন আর্মড পুলিশ কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে মাঠে আসেন তার সাথে আরো ২/৩ জন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। তারা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং ঐ ৫/৬জন বাঙ্গালী ইপিআরদের জনতার কাছ থেকে উদ্ধার করেন। মোবারক চাচা ও আবসরপ্রাপ্ত সৈনিকগন কিছুসময় তাদের সাথে কথা বলেন। বোঝা গেল বাঙ্গালী ইপিআররা মোবারক চাচা ও আবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের দেখে ও কথা বলে অনেকটা আশ্বস্ত হয়ে শান্তভাবে তাদের সাথে কথা বলছে। পুলিশ আনসার ও বাঙ্গালী অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকরা তাদেরকে জনগণের সাথে যোগ দিতে বলেন, কিন্তু তারা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ থাকে। মনে হয় তারা একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব (Confusion) ও ভয়ের মাধ্যে আছে। তাদেরকে ছেড়ে দেবার অনুরোধ করে বলে তাদের উপর হুকুম আছে ঘাঁটিতে যাবার জন্য। মোবারক চাচা ও আবসরপ্রাপ্ত সৈনিকরা পরিষ্কার বুঝে গেলেন যে বিওপির পাকিস্তানি কমান্ডার এই সব বাঙ্গালী ইপিআরদের চালাকি করে নিরস্ত্র করেছে এবং ঐ সব মালপত্র বইবার কাজ দিয়ে অগ্রবর্তী দল হিসাবে পাঠিয়েছ। তারা নিশ্চয়ই আমাদের বিমান ঘাঁটির দখল নিতে চায়। সেকালে ইপিআর বাহিনীতে ১৫/২০% পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্য থাকতো আর অফিসারদের বেশিভাগই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর।

কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত হবার আগেই প্রায় ১১টায় আমরা দূরে ঐ ইটবিছানো রাস্তায় বাকি ইপিআর দলটিকে দেখতে পাই। আর তার সাথে সাথেই জয় বাংলা বলে জনগণ তাদের দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে সেই দিকে আগাতে শুরু করলো। অন্যদিকে মোবারক চাচা ও আবসরপ্রাপ্ত সৈনিকন্ বার বার চিৎকার দিয়ে তাদের থামানোর চেষ্টা করলেও কে শোনে কার কথা! প্রায় হাজারখানেক জনতা জয় বাংলা বলে ঐ পাকিস্তানি ইপিআর দলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। একসময় তারা এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। জনতা থমকে যায়, সবাই মাঠের নানাস্থানে রাখা ইটের স্থুপের আড়ালে মাটিতে শুয়ে পড়ি। কিছু সময় পর জনতা আবার তাদের পিছু নিলে ইপিআর দল উঁচু রাস্তা ছেড়ে নিচের জমিতে নেমে পশ্চিমদিকে চলা শুরু করে। আমরাও নিরাপদ দূরত্ব রেখে আবার তাদের পিছু নেই। তারা আগের মতো দ্বিতীয়বার ফাঁকা গুলি করে আমাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। জনতাও আগের মত মাটিতে শুয়ে যায়, তখনই আমদের কাছাকাছি একটা বন্দুকের গুলির শব্দ হয়, নিশ্চই জনতার কেউ একজন তার ব্যক্তিগত বন্দুক দিয়ে গুলি করে। সাথে সাথেই আমাদের হাতে ধরা পড়া ঐ বাঙ্গালী ইপিআররা চিৎকার দিয়ে বলে ‘থামেন ভাই থামেন, গুলি করিয়েন না গুলি করিয়েন না! ঐ দলে আমাদের লোকও আছে!’ তাদের কথায় ঐ দলে আরো বাঙ্গালী আছে! তাই আমরাও কিছুটা ধাঁধায় পরি সবকিছু একটা বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করে। আমরা যখন মাটিতে শুয়ে তখন ইপিআর দল লালমনিরহাট-মোগোলহাট রেললাইনের দিকে প্রায় দৌঁড়াতে থাকে! তারা কি আপ ইয়ার্ড কলোনীর দিকে যাবে? কারণ ঐ সময় কলোনীর বিহারিরা ও নারায়ে তকবীর- আল্লাহু আকবর বলে চিৎকার দিতে থাকে।

রাইফেলের দুইটি ফাঁকা গুলির শব্দ সারাশহরে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু শড়কি বল্লম রামদা ও বন্দুকসহ হাজার জনতা আবারো দূর থেকে তাদের পিছু নিলে এক সময় ইপিআর দল হালকা মেশিনগানের একসাথে ৫/৬ রাউন্ড গুলি চালায়। এবার জনতা ভড়কে গিয়ে সবাই মাটিতে শুয়ে গেলেও হাবিলদা মোবারকের সাথে থাকা আর্মড পুলেশের কেউ তার রাইফেলের পাল্টা গুলি চালায়। (রাইফেলের গুলি ও এই L.M.G ফায়ারিং এর শব্দ লালমনিরহাট থানা ও জিআরপি থানা থেকেও পরিষ্কার শোনা যায়। ঐ সময়েই থানা পুলিশ ও জিআরপির সব পুলিশরা আরমারি থেকে অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল)।

ট্রেনিং এর জন্য আনসারদের আনা ৫/৬টি রাইফেলের সাথে কোন গুলি ছিলনা, শুধু দাঙ্গার কারণে পুলিশদেরকে রাইফেলের সাথে গুলি ইস্যু করা হয়ছিল শহরের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য। (সেকালে পুলিশ কনেস্টেবল থানার ওসি, ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসকের হুকুম ছাড়া গুলি চালাতে পারত না, পুলিশের প্রতিটি গুলির হিসাব রাখা হোত। সৈয়দপুরে গত ১৯৭০ এর ৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিরক্ষা দিবসে রেলস্টেশন মাঠে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এক যুদ্ধাস্ত্রের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। তাতে তারা নানা ধরনের বন্দুক মেশিনগান কামান ইত্যাদির সাথে একটি হাল্কা মেশিনগান (L.M.G) দিয়ে মাটির গর্তের ভেতরে মাঝে মধ্যে গুলি করে উপস্থিত জনসাধারণকে প্রদর্শন করে, যা আমিও দেখেছি ও উপভোগ করেছিলাম, কিন্তু আজকের এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।) থানা পুলিশের ২/৩টি রাইফেলের সাথে থানা থেকে দেয়া গুলির সংখ্যা খুব বেশি হবার কথায় নয়। তিনটি রাইফেলে বোড় জোড় ৩০ বা ৪০ রাউন্ড। সময়ে সময়ে তাই তারাও জনতার সাথে মিলে পাল্টা গুলি চালাতে থাকে। আনসারদের আনা গুলি বিহীন রাইফেল গুলো বেকার হয়ে যায়। জনতার মধ্যে কয়েকজন আহত হয়ে মাটিতে পরে যায়। পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নেয়।

এইভাবে চলা জনতার ধাওয়া-গুলি-আবার ধাওয়া পরিস্থিতে আমি হাসনাত ও তোফায়েলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমি তখন ধানি জমি ও ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে হাসনাত ও তোফায়েলের নাম ধরে চিৎকার দিয়ে ডাকতে থাকি। কিন্তু ততক্ষণে গোলাগুলির শব্দে আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে আরো হাজার জনতা তাদের অস্ত্র নিয়ে গগনবিদারী “জয় বাংলা” শ্লোগান দিয়ে ইপিআরদের ঘেড়াও করতে যোগ দিয়েছে। দৌঁড়াতে থাকা ইপিআরদের কয়েকজন বেশ পেছনে পড়ে গেছে। পিঠে ভারি গোলাবারুদের ব্যাগ ও ঘাড়ে অস্ত্র নিয়ে উঁচুনিচু জমি ঝোঁপঝাড়ের দিয়ে দৌঁড়ে চলা সহজ নয়। কিন্তু জনতা জানে না দলের ভেতর কারা বাঙ্গালী আর কারা পাকিস্তানি! এতো দূর থেকে পোশাক ও মাথায় হেলমেটের কারণে তাদের কারো চেহেরা বোঝা যায় না!

দলটি লালমনিরহাটের উত্তরে আউটার সিগনালের দিকে গেলে উঁচু রেললাইন থেকে কারা যেন ইপিআর দলের উপর গুলি চালায়। তার মানে এবার জনতার সাথে রাইফেলধারী আরো পুলিশ যোগ দিয়েছে। এখন সবার উদ্দেশ্যে ঐ ইপিআর দলেকে কিছুতেই বিহারী আপ ইয়ার্ড কলোনীর দিকে যেতে না দেয়া। কারণ আপ ইয়ার্ড কলোনীর বিহারিরা তাদের আশ্রয় দেবে তখন আমরা আর টিকতে পারবো না।

আমি এখনো লাঠি বল্লমধারী জনতার সাথে যাদের কয়কজন আহত হয়ছেন। তাই আমি ভয়ে হাসনাত ও তোফায়েলের খোঁজে চিৎকার করে চারিদিকে ডাকতে থাকি। জনতার সাথে আমি ট্রেনিং মাঠ থেকে প্রায় মাইলখানেক উত্তর পশ্চিমে চলে এসেছি এবং আমার প্রায় ৫০০গজ ডানে লালমনিরহাট-মোগোলহাট রেললাইন উত্তর দিকে মোগোলহাট চলে গেছে। এতোক্ষণে লক্ষ্য করলাম আমার আশেপাশে জনতার সাথে বেশ কয়েকজন থানার পুলিশও তাদের রাইফেল নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিয়াছে। তার মানে তারা গোলাগুলির শব্দ শুনেই থানা থেকে রাইফেল নিয়ে রেরিয়ে গেছে। থানায় প্রায় ৪০জনের মত পুলিশ কনস্টেবল আছেন। তাদের অনেকেই যে, যেমন কাপড়ে ছিলেন তাড়াহুড়ো করে সেভাবেই জনতার সাথে যোগ দিয়ছেন। আমি জানি না জিআরপির পুলেশরাও যোগ দিয়েছে কি না। যদিও তাদের অনেকেই বিহারী ও ২৮ মার্চের দাঙ্গার পর থেকে ব্যারাক ছেড়ে বিহারীদের সাথে আপ ইয়ার্ড কলোনীতে থাকে। জিআরপির আরমারিতে ৮০টির মত রাইফেল আছে। হয়তো তারাই এখন উঁচু রেললাইন থেকে গুলি চালাচ্ছে।


বিহারীরা পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ চিৎকার দিয়ে পাকিস্তানি ইপিয়ারদের সমর্থন দেখাতেই থাকে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা কলোনীতে ঢুকতে না পেরে শহরকে বায়ে রেখে ঘুর পথে বিমানঘাঁটির দিকে যেতে থাকে।

এবার ইপিআরদল তাদের এলএমজি দিয়ে রেললাইনের উপরে থাকা পুলিশ বা জিআরপি পুলিশদের উপর সরাসরি গুলি শুরু করলে পুলিশরা রেললাইনের পশ্চিম ঢালে সরে যেতে বাধ্য হয়। এই সময়ে তাদের অগ্রবর্তী দলটিসহ যেই রেললাইন অতিক্রম করলেও অনেক পিছিয়ে পড়া ছোট দলটি তখনও ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।

আর তখনই আমাদের সাথে থাকা বাঙ্গালী ইপিআররা চিৎকার দিয়ে ছোট দলটিকে ডাকতে থাকে। তারা পাকিস্তানিদের থেকে আলাদা হয়ে যেতে ও জনগণকেও থামতে বলে দৌঁড়ে তাদের দিকে যায়। পিছিয়ে পরা দলটির  জন আর পশ্চিমে রেললাইন পার না হয়ে আমদের হাতে আগে ধরাপড়া ৬জন বাঙালি ইপিআরদের সাথে মিলিত হয়। এখন তারা সবমিলে ১২জন বাঙ্গালী ইপিআর জনতার সাথে যোগ দিলেও উত্তেজিত কিছু জনতা তাদেরকে মারপিট শুরু করলে সহজেই সবাই বুঝতে পারে যে এই ১২জন সবাই বাঙ্গালী ও তারা আমাদের সাথে যোগ দেয়। পিছিয়ে পরা  জন বাঙ্গালীদের কাছে একটি এলএল এলএমজি ও ৮টি রাইফেলসহ গোলাবারুদ ছিল (পাকিস্তানিরা তাদের দিয়ে বিওপির বারতি রাইফেল ও গোলাবারুদ বহন করাচ্ছিলো)। তাই জানতা এবার দ্বিগুণ উৎসাহে পাকিস্তানিদের আবার ধাওয়া শুরু করে। রেললাইনে আগে অবস্থান নেয়া পুলিশরা প্রথম অবস্থায় সরে গেলেও তারা রেললাইনের ধার দিয়ে থাকা নিচু গর্তে বা ডোবায় লুকিয়ে থাকে ও পাকিস্তানিদের আপ ইয়ার্ড কলোনীতে প্রবেশে বাঁধা দেয়। বিহারীরা পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ চিৎকার দিয়ে পাকিস্তানি ইপিয়ারদের সমর্থন দেখাতেই থাকে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা কলোনীতে ঢুকতে না পেরে শহরকে বায়ে রেখে ঘুর পথে বিমানঘাঁটির দিকে যেতে থাকে।

চলবে…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!