ভবঘুরে কথা
উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা ৭১ এর স্মৃতি : পর্ব তেরো

-পারভেজ চৌধুরী

বাবা গুরুতর আহত ও ১৯জন পাকিস্তানির মৃত্যু
বৃহস্পতিবার, ১লা এপ্রিল ১৯৭১, দুপুরবেলা প্রায় ১টার দিকে যখন জনতার সাথে মোগোলহাট লাইনের ইনার সিগন্যালের কাছে পৌঁছি তখন আরো কয়কজন আহত মানুষকে ধরাধরি করে নিয়ে যেতে দেখি। এখানে মূল রেললাইন কয়েকটি শাখায়(ব্রাঞ্চ লাইন) ভাগ হয়েছে ও কতগুলোতে খালি মালগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অনেকের সাথে আমিও সেগুলোর আড়ালে লুকাই। এসময় হাসনাতকে ফিরে পাই যাকে সকালে মাঠে হারিয়ে ফেলেছিলাম। দুইজনই ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত। একটু দূরে আমাদের সামনে আপ ইয়ার্ড কলোনী দেখা যায়। তবে পানির জন্য সেদিকে যাবার প্রয়োজন নাই। যদিও সেখানে কোন মানুষজন দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের পেলে তারা ছেড়ে দিবে না। আর একসাথে লাঠি বল্লম দা নিয়ে এতো মানুষজনকে দেখে তারাও নিশ্চয়ই আগাতে সাহস পাবে না। আমরা দূর থেকে ভেসে আসা গোলাগুলি ও মানুষজনের চিৎকার-স্লোগান শুনতে পাচ্ছি। আমার কাছে এটা পরিষ্কার হয় যে শুধু লাঠি-বল্লম দিয়ে রাইফেল-মেশিনগানের মোকাবেলা বোকামি হলেও কয়েক হাজার সশস্ত্র উত্তেজিত জনতার বেষ্টনী থেকে পাকিস্তানিদের বেরিয়ে যাওয়া সহজ নয়।

এখন ১২জন অস্ত্রধারী ইপিআরসহ সকল পুলিশ-আনসার মিলে তাদের মোকাবেলা করছে। আমরা যদি আবার সামনে জনতার বেস্টনীতে ফিরে যেতে চাই তবে উত্তরদিক দিয়ে আপ ইয়ার্ড কলোনীর বাইরে দিয়ে যেতে হবে। কিছুতেই কলোনীর ভেতরে বা কাছ দিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। অথবা শহরে ঢুকে সাপটানা রোড (পুরান বাজার রোড) দিয়ে ক্যাথলিক চার্চের মাঠের ভেতর দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারব। তাই আমরা আবার রেললাইন ধরে দক্ষিণে স্টেশনের দিকে হাঁটা শুরু করি, আমাদের সাথে আরো কয়েকজন একই দিকে চলছি, তারা রেল হাসপাতালে যাবে তাদের আহত মানুষজনদের দেখতে। আমি ও হাসনাত হাসপাতালের পেছনের সাপটানা সড়ক ধরেই চার্চের মাঠের ভেতর দিয়ে আবার খোলা জায়গায় জনতার বেস্টনীর কাছে চলে আসি। ফাঁকা জায়গা বলে পেছনে বহুদূর থেকে চার্চের খাড়া উঁচু চূড়া দেখা যায়।

ঠিক ঐ সময়ে আমদের জন্য একটা ভয় ও অবাক করা ঘটনা ঘটলো; যা আমরা এই মুহূর্তে আশা করি নাই! সাক্ষাৎ যম দেখার মতো সামনে ৬ফিট ৪ইঞ্চির বিরাট শরীরের বাবা দাঁড়িয়ে আছেন! তার সঙ্গে আছেন ওসি মোশাররফ হোসেন ও দুই তিনজন রাইফেলসহ জিআরপি কনস্টেবল। আমাদের রাশভারী বাবাকে সে আমলের সকল পরিবারের মতোই আমরাও ভয় পেতাম, আমাদের সকল সকল কথাবার্তা অভাব অভিযোগ হতো মায়ের সাথে। বাবার চোখের দিকে না তাকিয়েই বুঝলাম আমাদের এখানে দেখে বাবা কতোটুক রাগ বা বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু ওসি ও আপরিচিত কনস্টেবলদের সামনে বাবা তার রাগ সংবরণ করে শুধু তার ভরাট স্বরে জোর দিয়ে বললেন, ‘বাসায় যাও!’ আমি তাদের সমনে থেকে ঘুরতেই দেখি হাসনাত আমার আগেই সরে পড়েছে। আমি জানি হাসনাত আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত ও বাধ্য।

সেখান থেকে ফিরে যাবার সময় চিন্তা করি- আজ সকালে বাবা তার রোজকার নিয়মমাফিক পেছনের দরজা দিয়ে থানায় চলে যান ও সেখান থেকে জিআরপিতে যাবার কথা। তিনি সাদা পোশাকের গোয়েন্দা, আজও তিনি হাল্কা আকাশি টেট্রনের হাফ সার্ট ও ছাই রঙ্গের ট্রাউজার পরেছেন। আজ সকালে এমন কিছু হয় নাই যে তিনি তার ছোট সার্ভিস রিভলবার সঙ্গে নিয়ে বের হবেন। কিন্তু আজ বাবা এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে, তার কোমরে চকলেট রঙ্গের প্রায় নতুন চামড়ার বেল্ট-হোলস্টারসহ অনেক বড় সার্ভিস রিভলবার। যা আমি কখনো আগে দেখি নাই। আজ হয়তো তিনি থানা থেকেই এসব নিয়ে ওসির সাথে বের হয়েছেন। ওসি মোশাররফ হোসেন তার অস্ত্রসহ স্বাভাবিক পুলিশ ইউনিফর্ম পরেই আছেন। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় আবার চার্চের কাছে এসে হাসনাতকে পেয়ে যাই। এবার তার উপর আমার খুবই রাগ হয়। ও হয়তো বাবাকে আগেই দেখেছিল তাই কোনো শব্দ না করে পেছন থেকে সরে গেছে। আবার এমন হতে পারে রাতে বাসায় সে চুপচাপ ভদ্র সেজে থাকবে আর সব দোষ আমার ঘাঁড়ে আসবে। তার এই বেশি শান্ত ও বাধ্য ভাবের করণেই আমাকে আগেও দোষী ভাবে। আমি তাকে আবার ফিরে যেতে বললে সে রাজি হয় না, তার কথায় এবারে বাসায় ফেরাই ভালো। তার সাথে কথা বা ঝগড়া করতে করতে একসময় আমরা দুজন স্টেশনের কাছে এসে গেলাম। এখান থেকেও আমরা গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু দুজনই খুব ক্লান্ত ও পানির পিপাসায় কাতর। কাছেই স্টেশনের প্লাটফরমের ধারে টিউবয়েল, তাই দুজনে পানি খেয়ে নেই। কিন্তু তবুও হাসনাত বাসায় ফিরে যাবার জন্য ওভারব্রিজে উঠতে যায় আমি আবার তাকে থামালেও সে উপরে উঠতে থাকে। আমি নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে এক সময়ে আবার চার্চের দিকে হাঁটা শুরু করি।


আমি চমকে গিয়ে ববলাম হ্যা। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আরআইও সাহেব আহত হয়েছেন তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে! তুমি আমার সাইকেলে আস, আমি হাসপাতালে যাব।’ শুনে আমি কিছু না বুঝেই তার সাইকেলেই লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলাম।

এখন বেলা প্রায় সাড়ে তিনটা, রাস্তা জনমানবশূন্য, মানুষ হয়তো পাকিস্তানিদের ধাওয়া দেতে ব্যস্ত, আবার বাঙ্গালী-বিহারী দাঙ্গার পর থেকেই রোজই মানুষ শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। আমার হাতে যে লাঠিটা ছিল কখন বা কোথায় সেটা ফেলেছি জানিনা। হাসনাতের উপর রাগ নিয়ে একা চলতে ভয় হলেও জোরে জোরেই হেঁটে চলছি; যুদ্ধের উত্তেজনা শরীরে এখনো রয়েছে! চার্চের পাশ দিয়ে যখন মাঠের ভেতর দিয়ে আগেরস্থানে পৌঁছলাম। তখন সেই জনতাকে আর দেখতে পেলাম না। খোলা মাঠের মাঝে কিছু মানুষের জাটলা ছাড়া বেশি মানুষ নাই। একজন কৃষক জানালো, সবাই মেলেটারিগুলারে দাবড়ায়ে আরো পশ্চিমে নিয়া গেছে, মুই ওপাকে একটা মরা পরি থাইকেতে দেইখনু বাহে।

এখন আর বেশি গোলাগুলির শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। মরা মানুষ দেখার ইচ্ছা নাই। আমি বাসায় ফিরে যাবার সিধান্ত নেই ও স্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকি। যখন স্টেশনের কাছে এসে গেছি। সূর্য অনেক হেলে গেছে সময় হয়তো বিকাল সাড়ে চার বা পাঁচটা হবে। একজন লোক দ্রুত সাইকেলে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল কিন্তু একটু সামনে গিয়েই সাইকেল থেকে নেমে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি আরআইও সাহেবের ছেলে না?’ আমি চমকে গিয়ে ববলাম হ্যা। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আরআইও সাহেব আহত হয়েছেন তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে! তুমি আমার সাইকেলে আস, আমি হাসপাতালে যাব।’ শুনে আমি কিছু না বুঝেই তার সাইকেলেই লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলাম।

হাসপাতালের পেছনের মাঠে বহুমানুষের ভিড় ঠেলে পেছনের বারান্দার সিঁড়ির কাছেই তোফায়েলকে পেয়ে গেলাম। তার কাঁধে দুপুরে বাবার কোমরে দেখা সেই বেল্ট-হোলস্টারসহ রিভলবার রক্তাক্ত অবস্থায় ঝুলছে। সে সিঁড়ির ওপর বাসেছিল। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। জামা কাপড়ে রক্ত দেখে আমি চাইলাম, তুমিও কি আহত? তোফায়েল বললো, ‘নাহ্! এসব বাবার রক্ত, আমি কিছু দূরে ছিলাম। বাবাকে ধরাধরি করে রিক্সায় তুলে আমি হসপাতালে নিয়ে এসেছি।’

আমরা দুইভাই যখন বারান্দায় উঠি তখন একটা বড় লম্বা টেবিলের উপর ডাক্তার ও নার্সরা তার অপারেশন বা চিকিৎসায় ব্যস্ত, অনেক মানুষ টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার ৬ফুট ৪ইঞ্চি লম্বা শরীর ৫ফুট লম্বা টেবিলে জায়গা হবার নয়! তাই অপারেশনের সুবিধার জন্য টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষরা বাবার দুই পায়ের অংশ টেবিলের বাইরে শুন্যে ধরে রেখেছে। বাবার বাম কোমরে বেয়নেটের আঘাত লেগেছে, তাই তাকে ডান কাতে শোয়ানো হয়েছে, তার মুখটা দেয়ালের দিকে ফেরানো। আমাদের গলার আওয়াজ পেয়ে বাবা মাথা ঘুরাবার চেষ্টা করলে নার্সসহ সবাই মানা করতে থাকে। তার মানে বাবা স্বজ্ঞানে আছেন এবং সেই অবস্থাতেও বাবা ‘তুহফা ও তুহফা’ (বাবা তোফায়েলকে “তুহফা” বলে ডাকতেন) বলে ডাক দিয়ে বললেন, ‘আমি ঠিক আছি, ভালো হয়ে যাব, চিন্তা করোনা’। তিনি কথা বলতে পারছেন এটা আশার কথা! হাসপাতালের মূল অপারেশন রুমসহ অন্যান্য কামরাগুলো সকাল থেকে আসা আহতদের দিয়ে ভর্তি। বাবাকে তাই বাইরের বারান্দার টেবিলে রেখেই অপারেশন চলছে। এখনো আসছে আহতরা চিকিৎসার জন্য। এসব আহতদের মাঠেই সাধারণ মানুষজন যে যেভাবে পারছে সাহায্য করছে। সমগ্র হাসপাতাল এলাকায় একটা হাহাকার চলছে, এরমাঝে আছে সজনদের আহাজারি। আমাদেরকে কয়েকজন সান্ত্বনা দিয়ে টেবিলের কাছ থেকে সরিয়ে পেছনের মাঠে নিয়ে এলো, আমরা কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে ঘাসের উপর বসে পড়লাম। আল্লাহর অসিম রহমতে সন্ধ্যার আগেই অপারেশন শেষ হয় ও সকলে ধরাধরি করে বাবাকে একটি বেডে নিয়ে যায়।

বাবার পাসের বেডে থানার ওসি মীর মোশারফ হোসেনকে রাখা হয়েছে। নানা ঔষধের সাথে তাদের ঘুমের ঔষধ দেয়া হলেও  বাবা এখনো কথা বলে চলছেন। বাবা ডায়েবেটিকের রোগী তাই এই গভীর ক্ষত যেকোনো সময় গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। একটু পরে মা, তৌফীক ও হাসনাতকে নিয়ে কমরউদ্দিন চাচা ও প্রতিবেশী অবসরপ্রাপ্ত রেল কর্মচারী খন্দকার বেলায়েত হোসেন হাসপাতালে আসেন। সেই সাথে থানার সেকেন্ড অফিসার আব্দুল কাইউম ও এক কনস্টেবলকে নিয়ে আসেন মোশাররফ সাহেবের স্ত্রী ও ছোট ছোট ৬টি বাচ্চা। তবে তাদের সবচেয়ে বড় ১২ বছরের ছেলেটি লালমনিরহাটে আসে নাই। সে তার পাবনার নানা বাড়িতেই স্কুলে পড়ে। সবচেয়ে ছোট বাচ্চা মেয়ে সম্ভবত দেড় কি দুই বছরের। আমরা কে কাকে সান্তনা দিবো জানি না, সারা হাসপাতাল জুড়েই আহত মানুষের ছড়াছড়ি। হাসপাতালের একটা বড় কামরায় দরজার কাছের প্রথম বেডে বাবা তারপর মোশাররফ হোসেন এবং সবশেষে দেয়ালের কাছের বেডে একজন গুরুতর আহত বাঙ্গালী ইপিআর যার কোমরে গুলি লেগেছে। বাবার পর দরজার অপরদিকে আরো দুই বেডে দুইজন আহত বাঙ্গালী ইপিআর।

রেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় সব সাধারণ রোগীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেও গত দাঙ্গার কয়েকজন বিহারী এখনো একটি কামরায় আছে যাদের মধ্যে আগুনে আহত জীয়ারত আলী খানও আছে। তাই হাসপাতালের মেঝেসহ সামনের ও পেছনের বারান্দায় আরো অনেক আহত আছে যারা রেল কর্মচারী নয়। আমাদের মতো প্রায় সবার নিকটজন হাসপাতালে ভর্তি থাকায় এখন ভেতর বাইরে অনেক মানুষ। মা ও ওসি সাহেবের স্ত্রীর বসার জন্য কোনো চেয়ার বা টুল পাওয়া মুস্কিল। তাদের ছোট মেয়েটা ভয়ে মায়ের কোলে জড়িয়ে। থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সিলেটি ডাক্তার আব্দুর রকীব জাআয়গীরদারও বাবাকে দেখতে আসেন। জানা গেল তার ছোট থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও প্রচুর আহত মানুষ সারাদিন চিকিৎসা নিয়েছেন। সারাদিনের পরিশ্রমে তিনিও ক্লান্ত তবুও বিকালে তার আসতে দেরি হওয়ার কৈফিয়ত দিয়ে বারবার ক্ষমা চাইলেন। আমরা জানি সকালের গোলাগুলির সকল আহত প্রথমে তার ছোট হাসপাতালে গেছেন। ঔষধপত্র ও সরঞ্জামের অভাব সত্ত্বেও তিনি সারাদিন যথাসাধ্য চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। এখনো সেখানে অনেক রোগী আছে; তারমধ্য সকালের একজন মারা গেছেন। কুড়িগ্রাম মহকুমা শহর হোলেও লালমনিরহাটের এই রেলওয়ে হাসপাতালটি আকারে আয়তনে ও সুযোগ সুবিধায় মহকুমা সদর হাসপাতালের চেয়ে অনেক বেশি।


তোফায়েলের কথায় বাবার সকল সময়েই জ্ঞান ছিল ও কয়েকজন ধরে বেশ কিছুদূর হেঁটে আসার পর রিক্সায় উঠান হয়। ওসিকে অজ্ঞান অবস্থায় ধারাধরি করে রিক্সায় সরিয়ে আনার পথে জ্ঞান ফিরে পান।

সিলেটি ডাক্তার আব্দুর রকীব জায়গীরদার আসায় মা-বাবা উভয়েই যেন একটা বড় মানসিক শক্তি পেলেন। কারণ তারা এখন তাদের নিজ সিলেটি ভাষায় কথা বলছেন। আমি যদিও আগেই তোফায়েলের কাছ থেকে বাবার আহত হবার বিস্তারিত জেনেছি। ঐ সময় সে কয়েকজন জিআরপি কনস্টেবলের সাথে মাত্র ১৫০-২০০ গজ দূরে ছিল। তোফায়েলের কথায়, পাকিস্তানিদের সাথে থাকা বাকি ৬জন দলত্যাগ করে বাঙ্গালীদের সাথে যোগ দিলে ১৯জন পাকিস্তানি দুর্বল হয়ে যায়। বাঙ্গালীদের সাথে তখন একটি এলএমজিসহ ১২জন সশস্ত্র ইপিআর ও পুলিশ আনসার। পাকিস্তানিরা পশ্চিমে ঘাঠির দিকে দৌঁড়ে পালাবার সময় তাদের একজন দুইজন করে মোট ৮জন আহত ও পরে জনতাদের দ্বারা মারা যায়। বাকি ১১জন পাকিস্তানি সতি নদীর পূর্বে একটি বড় শুকনা ডোবায় লুকিয়ে যায়। সকালে তাদের পাকিস্তানি কমান্ডার ৬ বাঙ্গালীকে নিরস্ত্র করে হাঁড়িপাতিল ও জিনিসপত্র দিয়ে অগ্রবরতী দল হিসাবে পাঠিয়ে দেয়। যাদের সবাইকে জনতাসহ আমরা ধরে ফেলি। পরে যে ৬ বাঙ্গালী জনতার সাথে যোগ দেয়; তাদেরকে দিয়েও কমান্ডার বিওপির বাকি অতিরিক্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করাচ্ছিল। যার কারণে তারা জোরে দৌঁড়াতে পারছিল না এবং বেশ পেছনে পরে যায়।

যা জনতার জন্য সুফল হয়, অন্যদিকে ১৯জন পাকিস্তানির গোলাবারুদে সংকট শুরু হয়। এমন সময় তাদের গোলাবারুদ সম্ভবত শেষ হয়ে যায়। তাদের একজন সাদা রুমাল বা গেঞ্জি উড়িয়ে আত্মসমর্পণ করতে চায়। সেই সাথে বাবাও বাঁশের মাথায় সাদা কাপর উড়িয়ে তাদের আত্মসমর্পণ করতে আহ্বান করেন। ১১জন পাকিস্তানি লুকানো অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসে ও কোন গোলাগুলি না করে দিকে ধীর পায়ে বাবা ও ওসির দিকে এগিয়ে দিকে আসতে থাকে। দূর থেকেঁ হুড়াহুড়ি হইচইয়ের মধ্যে এটা হত কেউ লক্ষ্য করে নাই যে তাদের সকলের হাতেই তখন পর্যন্ত অস্ত্র ছিল ও প্রত্যেকটিতে বেয়োনেট লাগানো ছিল। (আত্মসমর্পণের মূল শর্তই হলো শত্রু তার অস্ত্র ফেলে দুই হাত মাথার উপর তুলবে)। তারা যখন খুবই কাছে এসে যায় তখনই কিছু বুঝে উঠবার আগেই তারা হঠাৎ করে নির্বিচারে বেয়োনেট চার্জ শুরু করে এবং বাবা ঐ সময়েই আহত হন। ধারণা করা হয়, বাবার শারীরিক উচ্চতাই তাকে বহুদূর থেকে পাকিস্তানিরা নিশানা করে ফেলে। যদিও দুই তিনজন কনস্টেবল বাবাকে তাদের কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করেন। পাশে থাকা উচ্চ রক্তচাপের রোগী ওসি মোশাররফ হোসেন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পরে যান ও জনতার পায়ের নিচে পিষ্ট হন। মুহূর্তেই ঐ সমস্ত ঘটনা ঘটে যায়। আর এর কিছু পরেই তোফায়েল ও কনস্টেবলেরা তাদের কাছে আসে। তোফায়েলের কথায় বাবার সকল সময়েই জ্ঞান ছিল ও কয়েকজন ধরে বেশ কিছুদূর হেঁটে আসার পর রিক্সায় উঠান হয়। ওসিকে অজ্ঞান অবস্থায় ধারাধরি করে রিক্সায় সরিয়ে আনার পথে জ্ঞান ফিরে পান।

চলবে…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

১ Comment

  • Parvez Elahi Chowdhury , বৃহস্পতিবার এপ্রিল ২৫, ২০১৯ @ ১২:০৯ পূর্বাহ্ন

    মানুষের জীবনে একন কিছু ঘটনা থাকে যা তার সারা জীবনেও বিসৃত হয় না । ধন্যবাদ ভবঘুরে কথাকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই সৃতিকয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরায় ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!