ভবঘুরে কথা
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ

শিলচর-মহাকাব্যের উপসংহার
হঠাৎ পুরকায়স্থ মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলে-কাল কি আপনি আমার গৃহে এসেছিলেন?
-না তো।
-আমি আপনাকে দেখেছি।
-কোথায়? কখন?
-আমার এই ঘরে। রাত দশটার সময়।
-না, আমি আসিনি। আমি শিলংপট্টিতে প্রতাপ বাবুর ঘরে বসে চিঠিপত্র লেখায় ব্যস্ত ছিলাম। আমি তখন আসব কি করে? আপনি স্বপ্ন দেখেছেন।
-না, আমি জাগ্রত ছিলাম। আপনি এসে বল্লেন, আমার এক জোড়া মোজা চাই, এক জোড়া খরম চাই। মোজা এবং খড়ম আমি কিনে রেখে দিয়েছি। কিন্তু মোজা পায়ে খড়ম পরবেন কি করে? আপনার এক জোড়া জুতোর প্রয়োজন। তার জন্য আমি দশটি টাকাও রেখেছি।
-খলখল হাসিতে ঘরখানা ভরিয়া দিয়া শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন, জুতোর টাকা নিব কিন্তু মোজা আর খরম আমার এখনি চাই। আমি যদিও আমার প্রয়োজনের কথা বলতে এখানে আসিনি, তবু শিলচর – মহাকাব্যের উপসংহার চমৎকার ভাবেই হ’ল।।
পুরকায়স্থ মহাশয় শ্রীশ্রীবাবামণির চরণদ্বয়ে মোজা জোড়া পরাইয়া দিয়া নূতন খড়ম জোড়া পায়ের কাছে রাখিয়া প্রণাম করিলেন।।
-হাইলাকান্দি (কাছাড়) -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (২৮ শে মাঘ, সোমবার ১৩৪১/১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫, অখন্ড সংহিতা ষোড়শ খণ্ড পৃষ্ঠা-১৫৫)

অভিক্ষার অর্থ
অভিক্ষাকে ব্রতরূপে গ্রহণ কত্তে গিয়ে এই কথাটি মনে রাখতে হবে যে, এই ব্রত স্বাবলম্বন-সাধনার ব্রত, কিন্তু অহঙ্কার-বৃদ্ধির, দর্পদম্ভ বৃদ্ধির ব্রত নয়। অভিক্ষা যদি কারো প্রতি তোমার অবজ্ঞা আনে, তবে জানবে তুমি অভিক্ষার-pirit ( মর্ম) বুঝ নাই। অভিক্ষার মানে হ’ল- ‘আমি যতটুকু শ্রম কর্ব্ব, তার স্বাভাবিক ফল্টুকুর অতিরিক্ত প্রত্যাশা করব না।’ অভিক্ষার প্রাণ হল ভগবানে বিশ্বাস। মহৎ কাজেই যদি নেমে থাকি, ভগবানের কি চোখ নাই, তিনি কি কাণা, না-ন্ধ? সময় মত যখন যা প্রয়োজন, তিনি দেবেনই, আমার উপর পরিশ্রমের ভার পড়েছে, শ্রমই আমাকে-‘রে যেতে হবে, কারো কাছে আমি অর্থ চাইব না। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ ( অখন্ড সংহিতা -থ খন্ড পৃষ্ঠা- ৩৩৭)

ভগবান তোমাকে জনতার মাঝখানে ফেলিয়া দিয়াছেন, বেশ ত’ যত জনের সঙ্গে পার পরিচয় স্থাপন কর। অন্তরের প্রেম দাও, প্রেম নাও, এক হও। ভগবান তোমাকে নির্জ্জন অরণ্যে প্রেরণ করিয়াছেন, বেশ ত’ পশুপক্ষী-বৃক্ষ-লতা-পাতার সঙ্গে কর পরিচয়। তাহাতেও অপার আনন্দ পাইবে। ভগবান তোমাকে পর্ব্বত-কন্দরে নিক্ষেপ করিয়াছেন, বেশ ত’ গুহাবাসী আদি মানবের সহিত কর আত্মায় আত্মায় বিনিময়। সকলকে চিনিয়া, সকলের কাছে চেনা দিয়া-কলকে লইয়া আনন্দের হাট বসাও। জগতে একচোরা লোগগুলি-ত দুঃখী কে? -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (পথের সঞ্চয়-৩৭৬)

চতুর্দ্দিকে অশান্তি দেখিয়া মন-মরা হইয়াছ। কিন্তু চতুর্দ্দিকে আমিও ত’ আমার প্রেমসুন্দর মূরতি লইয়া বিরাজ করিতেছি। আমাকে সর্ব্বত্র দেখ, সর্ব্ববস্তু আমাতে দেখ। তোমাকেও আমার ভিতরে নিমজ্জিত করিয়া দাও। তোমার সমগ্র অস্তিত্বে আ-কে দর্শন কর। আমাকে সব দিয়া সব পাও। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (পথের সঞ্চয়-৪১৬)

কোন আগুন্তুককেই উৎপাত বলিয়া মনে করিও না। আসিবে, আবার চলিয়া যাইবে। এই ভাবে আসিবে-যাইবে, যাইবে-আসিবে, করিতে করিতে হঠাৎ কেহ কেহ আসিবে আর যাইবে না, যাইবে আর আসিবে-া। তখন তোমার জীবন-কর্ম্মে সত্য সহযোগীকে চিনিয়া লইতে আর কষ্ট হইবে না। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (পথের সঞ্চয় -৪০৩)

ভুলভ্রান্তি মানুষ মাত্রেই করে। তবে ভুলকে ভুল জানিয়াও কোনও সত্যিকার মানুষ তাহাতে লাগিয়া থাকে না। ভুলকে সংশোধনের চেষ্টা সে করে। তুমিও নিজেকে মানুষ বলিয়া মনে করিও-বং বর্ত্তমান ও ভবিষ্যতের আচরণের দ্বারা অতীতের ভুল নির্ম্মূল করিয়া দিও। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (পথের সঞ্চয়-৩৯৮)

আমি তোমাদিগকে মহামিলনের মন্ত্র দিয়াছি, বিচ্ছিন্নতার বীজমন্ত্র দেই নাই। তোমরা – করিবে মিলনের মন্ত্র-র কাজ করিবে বিচ্ছিন্নতাবাদীর, ইহা চলিতে পারে না। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না, ৩৪ খন্ড, পত্র নং-৪৪)

আমি আশির্ব্বাদ করিতে পারি। কিন্তু সেই আশির্ব্বাদের যোগ্য থাকিবার জন্য তোমাদেরও সাধনের প্রয়োজন। সূর্য্য-চন্দ্র কিরণ দিতে কৃপণতা করে না কিন্তু যাহার গৃহাঙ্গন পরিচ্ছন্ন, সেখানেই সেই আলোকের প্রকৃষ্টতম প্রতিফলন। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (পথের সঞ্চয়-৩৯১)

আদর্শের প্রচার
বিদ্যালয়ের ছাত্রগুলিকে আমার চিন্তাধারার সহিত পরিচিত করিয়া দিবার দিকে তোমর-মন দাও। এই কাজটী নিখুঁত ভাবে সম্পাদন করিবার উপায় আবিস্কারে তোমরা চেষ্টিত হও। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না, ৩১ খন্ড, পত্র নং ১১)

নরকের সিঁড়ি
শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন, নরকের আবার সিঁড়ি আছে। এই সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে মানুষগুলি কেবলই নীচের দিকে নামতে থাকে। যত নামে, তত’ আরো নামতে ইচ্ছা যায়। ইচ্ছা আর তার হয় না যে, সে ফিরে আসে বা উঠে আসে। দৈবাৎ কারো হঠাৎ তেমন ইচ্ছা জাগলেও অন্য নরকগামীরা তাকে হাতে, কোমরে, ঘারে, পায়ে ধ’রে ধ’রে টেনে টেনে নামাতে থাকে। কারো ভাগ্যগুনে এমন কুসঙ্গীরা কাছে না থাকলেও নরক-পথের পিচ্ছিলতা তাকে টেনে তড়িতের গতিতে নীচে ঠেলতে থাকে। -রথম সিঁড়িটির নাম মদিরা। দ্বিতীয় সিঁড়িটির নাম জুয়া। তৃতীয় সিঁড়িটির নাম পরস্ত্রী। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, ১৭শ খন্ড)

শ্রীবিগ্রহে আরতি
আমার কোনও আশ্রমে কোনও সময়ে ওঙ্কার-বিগ্রহের পৃথক আরতির কোনও প্রয়োজন নাই-ক্তিভরে ‘জয় জয় ব্রহ্ম পরাৎপর’ স্তোত্র সমস্বরে গাহিলেই বিগ্রহের আরতি হইয়া গেল। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না, ৫ খন্ড, পত্র নং-৪৭)

মন্ডলীর অনুমোদন
মন্ডলী প্রতিষ্ঠারর পরে অনুমোদন অবশ্যই নিতে হইবে। প্রতিবৎসর নূতন কর্ম্মকর্ত্তা নিয়োগের পরেও নিয়মিত অনুমোদন নিতে হইবে। এই মন্ডলী অনুমোদন না পাওয়া পর্য্যন্-ন্ডলীই নহে, একটি আড্ডা মাত্র। মন্ডলী হইলে তাহাকে আমাদের নির্দ্দেশ পালন করিতে হইবে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না, ২৯শ খন্ড, পত্র নং-৩)

আনুগত্য অতুলন
Obedience is the first requisite of a disciple-শিষ্যের প্রথম প্রয়োজন আনুগত্যের, এই কথাটি তোমরা আমার নিকট বহুবার শুনিয়াছ। আমি শিষ্যদল চাহি না, কিন্তু যাহারা মন্ডলী গড়িবে, তাহাদের আনুগত্য সুনিশ্চিত চাহি। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না, ৩৩ খন্ড,পত্র নং-৪৪)

ভ্রূমধ্যে ফোঁটা
দুইটি চক্ষুর ঊর্দ্ধদেশে দুই ভ্রূ ধনুকের মত বাঁকাইয়া রহিয়াছে। ভ্রূ-চাপের দুই উচ্চতম স্থান বরাবর সরলরেখা টানিলে এবং নাসিকার ঠিক অগ্রভাগ হইতে দুই ভ্রূর মধ্যখান দিয়া একটি লম্বরেখা টানিলে যেখানে দুই রেখা মিলিত হইবে সেইটিই তোমাদের ধ্যানের ভ্রূমধ্য উপাসনালয়ে চন্দনের ফোঁটা দিতে ঠিক সেই স্থলে দিবে, নাকের ডগায়, নাকের গোড়ায় বা কপালের ঊর্দ্ধাংশে নহে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না, ২য় খন্ড, পত্র নং-২৫)

গর্ভাবস্থায় বিগ্রহ পূজা
গর্ভাস্থায় বিগ্রহ পূজা করা যায়। কেবল প্রসবের দিন হইতে একুশ দিন বা যাবৎকাল স্রাবাদি থাকে, তাবৎকাল বারণ। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না ১৭শ খন্ড,পত্র নং ৬১)

তুমি এক- মানবী মাত্র নহ, মানবী-বিগ্রহে তুমি জাগ্রত পরমাত্মা। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ

অখন্ড সংহিতা
অখন্ড সংহিতা বা অখণ্ডমণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের উপদেশ-বাণী ভারতের ধর্ম্ম সাহিত্যে যুগান্তর আনয়ন করিয়াছে। জীবনের এমন কোনও জটিল প্রশ্ন নাই,যাহার মীমাংসা এই মহাগ্রন্থের কোথাও না কোথাও না পাইবেন। উপন্যাসের ন্যায় চিত্তাকর্ষক, পড়িতে আরম্ভ করিলে ছাড়িবার উপায় নাই। গোপন,নিগূঢ় অথচ একান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ের শত শত সমস্যার সময়োচিত অপূর্ব্ব মীমাংসা রহিয়াছে। প্রত্যেক খন্ডই এক একখানা পৃথক গ্রন্থ। আগের খন্ডগুলি পড়ি নাই বলিয়া যে পরের খন্ডগুলি বুঝা যাইবে না বা লাভজনক হইবে না, তাহা নহে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অযাচক আশ্রম, ডি ৪৬/১৯বি, স্বরূপানন্দ ষ্টীট, বারাণসী-১০)

জাগরণের বাণী
আবাল্য আমি জাগরণের গীতিই গাহিয়া যাইতেছি, জাগরণের বাণীই শুনাইয়া আসিতেছি। একটী বালককে, একটী যুবককে আমি আমার বাণী না শুনিয়া আমার নিকট হইত-দুরে সরিতে দেই নাই, প্রেমের বাহু-বন্ধনে তাহাকে বাঁধিয়া লইয়া আমার পরম প্রেমময় প্রাণ-প্রভুর ধ্যানলব্ধ নির্দ্দেশ তাহাকে শুনাইয়া দিয়াছি-

অলস তন্দ্রায় আর
কাটায়ো না কাল
ওঠ জাগ, কর কাজ
মহিমা বিশাল।

এই বাণী কখনো বিফল হয় নাই, কখনো বিফল হতে পারে না। আমি যাহা প্রচার করিয়াছি, তোমরাও তাহা প্রচারের ভার লও। আমি যাহা একটি কন্ঠে কহিয়াছি, তোমরা তাহা সহস্র কন্ঠে কহিয়া যাও। যদি মনে কর তোমাদের কাহারও কন্ঠ আমার কন্ঠের তুল্য বল ধারন করে না, তাহা হইলে সকলে সমস্বরে বল, সমকন্ঠে বল,বারংবার বল। তাহাতেও ত’ কাজ হইবে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা ষোড়শ খন্ড পৃষ্ঠা -১৩৪)

আমার প্রাণ কাঁদিয়াছে
আমি যেঁ অবিরাম শ্রম করিতেছি, তাহা কোনও লাভের লোভে নহে।লাভের লোভে যে কাজ করে, সে সাফল্যে স্ফীত হইয়া উৎসাহিত হয় এবং অসাফল্যে হতাশ হয়, অলাভজনক কাজ ছাড়িয়া দেয়। আমি তরূণ কৈশোরে যে কাজ হাতে নিয়াছি, তাহা ছাড়িতে পারিতেছি না শুধু এই জন্য যে, তোমাদের সকলের জন্য আমার প্রাণ কাঁদিয়াছে, তাই নিজেকে জোর করিয়া ধরিয়া রাখিয়াও থামাইতে পারিতেছি না। যাহারা কাঁদে, তাহারা চিরকালই একটু অবুঝ। আমি অবুঝ বলিয়াই এত ছুটাছুটি করিতেছি, অবুঝ বলি-ই বক্তৃতা দিয়া আসিয়াই কোদাল ধরি, আবার কোদাল ছাড়িয়াই লেখনী ধরি, আবার লেখনী ছাড়িয়াই ভ্রমন শুরু করি। সবই তোমাদের মুখপানে তাকাইয়া করিতেছি,-আমার নিজের দেহ, স্বাস্থ্য, স্বাচ্ছন্দ্য, পরিতৃপ্তি, সাফল্য, যশ বা প্রতিপত্তির দিকে তাকাইয়া নহে। ছোটকালে ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করিয়াও আমি শেষের বেঞ্চে গিয়ে পুনরায় বসিতাম, আমি রঙ্গমঞ্চের দীপ্ত আলোকের সমক্ষে আসিতে চাহি না, নেপথ্যে আমার আত্মদান, অনেকেই ইহা জানিবে না, কাহারও জানিবার প্রয়োজন নাই। আমি যে তোমাদের জন্য কাঁদিয়াছি, ইহাই আমার জীবনের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ লাভ। কার জন্য কাঁদিয়াছি, কতখানি কাঁদিয়াছি, কেন কাঁদিয়াছি, না কাঁদিলে আমার কি ক্ষতি হইত, ইহার হিসাব আমি চাহি না, অপরে তাহা জানুক, তাহাও চাহি না। ক্রন্দনের এই বিগলিত অশ্রুধারা আমাকে সবল রাখিয়াছে, সুদৃঢ় করিয়াছে এবং আমৃত্যু কর্ম্মক্ষম রাখিবে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা- ষোড়শ খন্ড। পৃষ্ঠা-৭৮পৃষ্ঠা-৭৮)

তোমার পত্র পাইয়া হাসিলাম। জৈনক মহাপুরুষ নিজ অলৌকিক শক্তির প্রচার করিয়া কয়েকদিনে তোমাদের ওখানে দুই হাজার শিষ্য করিয়া গিয়াছেন শুনিয়া আমি বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হই নাই। আগরতলাতে আমি কি একমাত্র একদিনে চারি হাজার পঁচিশ জনকে দীক্ষা দেই নাই? আমার রেকর্ড ইনি ব্রেক করিতে পারেন নাই। অথচ আমার কোনও অলৌকিক শক্তি নাই, আমার অলৌকিকতাকে প্রচার করিবার কোনও অধিকার তোমাদের দেই নাই। তবে কেন অত ঘাবড়াইয়া যাইতেছ? আমার শরীর মরি- যাইবার অনেক পরেও আমি বাঁচয়া থাকিব। এ বাঁচা আদর্শের বাঁচা-মার একটা আদর্শ আছে, যাহার সম্পর্-আমারই রচিত ইংরেজি -কদা –
Ages shall proclaim the name, for long and worthy years” -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (১৩ই মাঘ,১৩৬৮)

মুখশুদ্ধি
আহারান্তে পরিস্কার জল দ্বারা মুখ অতি উত্তমরূপে -রক্ষালন করবে। তৎপর হরীতকী, আমলকী, ধনে প্রভৃতির দ্বারা মুখশুদ্ধি করিবে। তাম্বুল সেবন করিবে না, উহা আংশিক কাম-বর্দ্ধক। মৌরি এবং যোয়ান (যমানী) আংশিক-ক্র-ক্ষয়কারক, সুতরাং উদরের পীড়া না থাকিলে সাধারনতঃ ইহা দ্বারা মুখশুদ্ধি করিবেন। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (আত্ম-গঠন, পৃষ্ঠা -১২৮)

দুই কর্ণে মন্ত্রদানের উদ্দেশ্য
শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন, আমি তোমাদের দুই কর্ণেই এক অখন্ড -মহানামকে শুনিয়েছি। একথা শুনতে গেলে গ্রাম্য গোস্বামী – প্রভুরা নিশ্চয় তোমাদের সমা-চনা করবেন। তাঁরা বলবেন,-এক কর্ণে দীক্ষামন্ত্র দিতে হয়, অপর কর্ণে শিক্ষামন্ত্র দিতে হয়। এই হচ্ছে তাঁদের শাস্ত্রের প্রমাণ এবং শাসন। আমরা কিন্তু একটা পাঁঠার দুই দেবতার কাছে দুইবার বলিদান মানি না, একটা নারীর যুগপৎ দুই পতির সেবা বুঝি না, একই ব্যক্তি দ্বারা দুই মন্ত্রের সাধন হিতকর বা প্রয়োজন বলে জ্ঞান করি না। একই মন্ত্রে সাধন করে জীবনপাত কর, একই মন্ত্রের মর্ম্মভেদ করে পূর্ণ সত্যের সাক্ষাৎকার লাভ কর,-এই হল আমাদের লক্ষ্য, আদর্শ ও চেষ্টা। বহুমন্ত্র, বহু দেবতা, বহু-ুরু,বহু পূজা এবং বহু বিচরণকারী মন আমরা চাই না। বাইরে যেমন তোমার দুটি কর্ণ আছে, অন্তরে তেমন তোমার আরও একটি কর্ণ আছে। তোমরা লোকমুখে তৃতীয় নয়নের কথা শুনেছ, এই রকম তৃতীয় শ্রবনও আছে। একই মন্ত্র দুই কর্ণে শ্রবন করবার তাৎপর্য এই যে, এখন থেকে প্রাণপণ সাধন করে তৃতীয় কর্ণে নামের অমৃত মধুর ধ্বনি শোনাবার জন্য বদ্ধপরিকর হও। তৃতীয় শ্রবনে যেদিন নাম শ্রবন করবে, সেদিন নিখিল ভুবনের মত-পথের দ্বন্দ সহজে মিটে যাবে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, ত্রয়োদশ খন্ড, পৃষ্ঠা-৪১)

যে যত পবিত্র, সে তত সুন্দর
যে যত পবিত্র, সে তত সুন্দর। যে যত সুন্দর, সে তত আদরণীয়। প্রিয়জনের প্রেম যে পাইতে চাহে, তাহাকে পবিত্র হইতে হইবে, নির্ম্মল হইতে হইবে,-তুমি মা সে কথাটি ভুলিও না। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, নবম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৮৮)

বিনয় ও বিদ্যা
পরে শ্রীশ্রীবাবামণি পুনরায় বলিলেন, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই ‘বিদ্যা দদাতি বিনয়ং’ বলে অপেক্ষা না করে ‘বিনয়ো দদাতি বিদ্যাং’ কথাটাও মনে রাখা উচিত। বিদ্যার্জ্জনের জন্য দুর্ব্বিনয় বিদ্যাকে অবিদ্যায় পরিণত করে। বিনয় বিদ্যাকে যত সহজলভ্য করে, অন্য কিছুই তা করে না। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, নবম খণ্ড)

সম্প্রদায়ে নূতন রক্তের প্রয়োজন
শ্রীশ্রী বাবামণি বলিলেন, কিন্তু পরিপোষণের কথাও উপেক্ষা করার নয়। বাইরে থেকে নিয়ে এসে সম্প্রদায়ের ভিতরে নূতন রক্তের সঞ্চার করা প্রয়োজন। তাতে সম্প্রদায়ের জীবনীশক্তি বাড়ে। কিন্তু নূতন রক্তের সঞ্চার প্রয়োজন বলেই তুমি বিষাক্ত রক্ত নিয়ে আসতে পার না। নূতন বলেই শোণিতের কোন মূল্য হয় না, দোষ-বর্জিত হলেই তা’ জীবনীশক্তির উদ্দীপক হয়। যাকে তোমার পবিত্র পরিবেষ্টনীর ভিতরে নিয়ে আসছ, যদি তাকে সর্ব্বতোভাবে পরিশোধিত করে আনতে পার, তাহলেই বাইরে থেকে নিয়ে আসার সার্থকতা হবে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, দশম খন্ড)

অপরের মনে সংশয় সৃষ্টির দোষ
ঐ পত্রেই শ্রীশ্রীবাবামণি আরও লিখিল, “অবশ্য তোমার মনে একটী প্রশ্ন স্বতঃই উদিত হইবে যে, ভিন্ন-মতাবলম্বীকে স্বমতে আনয়নের জন্য এবং যেহেতু আমা-জ পথই জগতের শ্রেষ্ঠ পথ, সেই হেতু তাহাকে আমার স্বপথে আনয়নের দ্বারা জগতের শ্রেষ্ঠ সাধন-কৌশলের অধিকারী করিবার মহদুদ্দেশ্য নিয়া যদি অপরের মত ও পথের সমালোচনা দ্বারা তন্মত ও তৎপথ আশ্রয়কারীর অন্তরে সঙ্কা, সন্দেহ, সংশয় প্রভৃতির উৎপাদন করি, তবে তাহা কেন নিন্দনীয় হইবে? আমার উত্তর এই যে, এই ক্ষেত্রে তোমার আচরণ নিন্দনীয় হইবে এই জন্য যে,

প্রথমত তুমি অপরকে নিজ পথে ডাকিয়া আনিতে গিয়া নিজ ইষ্ট-সাধনার মূল্যবান সময়ের কিয়দংশ অপব্যয়িত করিতেছ,

দ্বিতীয়ত তুমি নিজ ইষ্টে সমগ্র মনঃপ্রাণ দিয়া লাগিয়া থাকিলেই বিনা চেষ্টায় ভিন্ন-মতাবলম্বীরা আসিয়া আপনা আপনি তোমার মতে দীক্ষিত হইতে বাধ্য হইবে,

তৃতীয়ত তোমার নিজ ইষ্টনিষ্ঠা ও সাধনানুরাগ বর্দ্ধনের জন্য তুমি নিজের মত ও পথের যেতুকু ব্যাখ্যা অপর মত ও পথের নিন্দা না করিয়া বা তাহাদের অবিরোধী ভাবে প্রচার করিবে, তাহা দ্বারাই তোমার ধর্ম্মসঙ্গে সমসাধকের সংখ্যা প্রত্যাশাতীত ভাবে বর্দ্ধিত হইবে,

চতুর্থত তোমার জীবনের দেদীপ্যমানা তপস্যা দর্শনে যাহারা তোমার মতানুবর্ত্তী হইবে, তাহারা বিনা তর্কে বিনা বিচারে তোমার উপলব্দ সত্যকে অনায়াস-প্রযত্নে গ্রহণ করিবে।।
জানিও, স্বমতাবলম্বী সাধকের সংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হউক, এরূপ কামনা দোষে-ে। বরং জগজ্জোড়া সকল নর-নারী প্রেমিক হউক, সাধক হউক, তপস্বী হউক, শ্রেষ্ঠপথাশ্রয়ী হউক, এই কামনা না করাই একটা নিদারুণ রকমের সঙ্কীর্ণতা। কিন্তু কাহারও মনে দ্বিধা-দ্বন্দ সৃষ্টি করার দায়িত্ব তুমি গ্রহণ করিতে পার না। একমতের প্রতি যাহার মনে সংশয় সৃষ্টি করিতে যাইতেছ, পরিণামে হয়ত জগতের সকল মতের প্রতিই তাহার মনে চিরস্থায়ী সংশয় সৃষ্টি হইবে এবং তাহাতে চিরকালের জন্য তাহার পরম ক্ষতি সাধিত হইবে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, একাদশ খন্ড, পৃষ্ঠা-২৮১)

অবিরাম নাম কর
অবিরাম নাম কর। নামের মধ্য দিয়ে প্রেম আহরণ কর। এই প্রেম বিশ্বজনে বিলাও। এই প্রেমের স্পর্শে সকল আত্মসুখী মানুষের সঙ্গীর্ণতা নাশ কর।এই প্রেমের মহিমায় কলহ-কোলাহলে অশান্তির ধরণীকে শান্তির আগারে পরিণত কর। নামের সেবার প্রত্যক্ষ ফল এই যে, নামে বিশ্বাস আসে, প্রেম আসে। সেই বিশ্বাস, সেই প্রেম বিশ্বজনীন হয়। নামের গুনে সমস্ত ব্রহ্মান্ড প্রেমময় হয়ে যায়। নামের গুনে পরমদয়াল ভগবান সর্ব্বভূতে আত্মপ্রকাশ করেন, সর্ব্বস্থানে শরণাগত ভক্তকে দর্শন দেন। নামের চেয়ে মহত্তর বান্ধব তোমার আর কেউ নেই, এই বিশ্বাস থেকে কদাচ স্খলিত হয়ো না। সুতরাং অবিরাম নাম কর, অবিশ্রাম নাম কর। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা-দশম খন্ড)
হয়ত তুমি আমাকে জান না বা আমার নামও শোন নাই। কিন্তু আমি তোমাকে জানি। ষাট-পঁয়ষট্টি বৎসর আগ হইতে আমি আমার জীবনের সমস্ত আয় কেবল অপরিচিতদের কাছে পত্র লেখার ব্যাপারে ব্যয় করিয়াছি। বৃদ্ধ হইলেও এখনো আমি তরুণ আছি এবং দৈনিক এইরূপ পঞ্চাশ হইতে একশতখানা পত্র ডাকে দেই। দেশবাসী আমার সেবাটুকু মুল্য দিয়াছেন আমাকে অফুরন্ত ভালবাসা দিয়া। বিচিত্র নহে যে, একদা তুমিও এই অপরিচিতকে কিছু ভালবাসা দিবে। তবে, ভালবাসা যেখানে সেখানে ফেলিবার জিনিস নহে। ইহা অপাত্রে অসময়ে ন্যাস্ত করিবার নহে। তোমার দ্বারা আমার কোনও স্বার্থোদ্বারের প্রয়োজন পড়িবে না। কারন, জগতে আমার লোভনীয় বস্তু অতি অল্প এবং অকিঞ্চিৎকর। তাহা আমার কাছে আপনা আপনি আসিয়া থাকে। কিন্তু আমাকে তোমার জীবনে হয়ত কোনও সময়ে প্রয়োজন পড়িবে। কারন, আমি মনুষ্যত্বের উন্নত আদর্শই দিয়া থাকি। আমি চাহি যে, তুমি একটী মানুষ হও অর্থাৎ মানুষের মত মানুষ হও। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (ধৃতং প্রেম্না, ত্রয়স্ত্রিংশতম খন্ড, পত্র-১২)

প্রণব-সাধনার যোগ্যতা
শ্রীশ্রীবাবামণি বলেছিলেন-দীর্ঘকাল তোমরা প্রণব-সাধনার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলে। প্রণব-সাধনার কৌশলও সুদীর্ঘকাল তোমাদের অপরিজ্ঞাত ছিল। কিন্তু ব্রাহ্মণরা সঙ্কীর্ণতাবশতঃই তোমাদের অধিকারসঙ্কোচ করেছিলেন, তা মনে করো না। তোমরাও উপযুক্ত হবার চেষ্টা কর নি। কেবল নিজের সার্থের জন্য তোমরা ভগবানকে ডেকেছ-কেউ চেয়েছে নিজের ধন, মান, রূপ, বল, যশ ও শত্রুবিমর্দ্দন, কেউ চেয়েছে কেবল একা একা মুক্তিলাভ করে দুঃখের নাগপাশ থেকে মুক্তিলাভ। জগতের সকল কূশল-চিন্তনকে তোমরা তোমাদের ভাবরাজ্য থেকে একেবারে নির্ব্বাসিত করে রেখেছিলে। তোমরা চাচ্ছিলে অবিরাম ইন্দ্রিয়সেবাজনিত সুখ আর তার সঙ্গে সঙ্গে ভগবানকে ডাকা। যার দৃষ্টিভঙ্গী এত সঙ্কীর্ণ, প্রণব-মন্ত্র ত’ তার জন্য নয়। তাই, তোমরা নিজেদের দোষেই এমন মহৎ মন্ত্রের সাধনাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছিলে। সাধকদের উদারতা অনেকবার তোমাদের হাতে এই অমৃত-ভান্ড তুলে দেবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু এই অমৃত পাবার পরেও তোমরা উদার হতে চেষ্টা করনি, একা একাই মুক্তির রস আস্বাদনের চেষ্টা করেছ। তারই ফলে দুদিন যেতে না যেতে তোমাদের সংখ্যাল্পতা ঘটেছে এবং চারদিন যেতে না যেতে, যাদের জিনিস, তাদের সিন্ধুকে গিয়ে কড়া পাহারায় আবার বন্দী হয়েছে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, ২য় খন্ড)

পুপুনকীর আদিম রূপ
সকলেই পুপুনকীর বিবরণ শুনিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিলে শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন, সমস্ত জমিটা জোড়া মোটা মোটা শাল গাছের গুড়ি,তার মধ্য থেকে ছোট ছোট শালের ফেঁকড়ী বেরিয়ে ভূমিতলে সূর্য্য-কিরণের আগমন-পথ রুদ্ধ করে রেখেছে,পলাশ, সিদা আর মঞ্চুরের ঝাড়-ঝোড়ে চারিদিকের দৃষ্টি হচ্ছে অবরুদ্ধ, পাথরের টুকরো আর কাঁকরের কণা সমস্ত জমিগুলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অন্তহীন প্রাচুর্য্যে, প্রায় প্রত্যেকখানা পাথরের তলায় উঁকি মেরে বসে আছে একটী দুটি পাঁচ-ছয় ইঞ্চি লম্বা কাঁকড়াবিছে, উচু-নিচু জমির ফাঁকে ফাঁকে অজস্র শুস্ক পাতা, আর সেই পাতার নীচ থেকে হঠাৎ আবির্ভাব মনসানন্দন খরিশ (গোখুরা) সাপের, এই হল পুপুনকীর বন।

ধর্ম্মব্যক্তি
শেষরাত্রে উঠিয়া শ্রীশ্রীবাবামণি পাট-শোলার কলম দিয়া যে মন্ত্রবাণীসমূহ লিখিলেন, তাহার একটিতে লেখা হইল, ধর্ম্মহীন ব্যক্তি আর পত্রহীন বৃক্ষ সমান শ্রীহীন। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ

রাত্রি এখন এক ঘণ্টার উপরে আছে। শ্রীশ্রীবাবামণি নিজ শয্যায় জাগ্রদবস্থায় উপবিষ্ট। এমন সময় বাহিরে আড়ালে কি রকম একটা শব্দ হইল, তিনি নিঃশব্দে বাহির হইলেন। দেখলেন, বেড়াতে মাথা রাখিয়া একটী তরুণ যুবক কাঁদিতেছে।
শ্রীশ্রীবাবামণি জিজ্ঞাসা করিলেন, ব্যাপার কিরে?
তরুণ বলিলেন, আমি আপনাকে চাই, আপনাকে ছাড়া আমার জীবন আর চলে না, আপনাকে না পাওয়া পর্য্যন্ত আমার জীবন মিথ্যা।
শ্রীশ্রীবাবামণি হাসিয়া বলিলেন, আয় কাছে আয়, আমার বুকের কাছে আয়।
তরুণ শ্রীশ্রীবাবামণির বক্ষঃসংলগ্ন হইলেন।
শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন, দেখ বাবা, তোরই মাঝে তুই হয়ে আমি নিরন্তর বাস কচ্ছি। বাইরে আমাকে খুঁজে কি হবে? তোর ভিতরে তুই আমাকে খোঁজ। খুঁজলেই পাবি।
তরুণ বলিলেন, আমার ভিতরে খুঁজে আমি কিছুই পাচ্ছি না। আমার ভিতরে একেবারে শুন্য! আমি নিজেকে একেবারে রিক্ত করে দিয়েছি।
শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন, তাতেও কিছু ভাববার নেই। ঐ রিক্ততার মাঝেই ভগবানের পরমকরুণায় অভিষিক্ত পূর্ণতার সিংহাসন। ঐ শুন্যের মাঝেই তাঁকে খোঁজ, যিনি পরমপূজ্য, পরমপূর্ণ। খুঁজলেই পাবি। যে খোঁজে সেই পায়। যোগ্যতার অযোগ্যতার বিচার নেই, যে চায়, তারই কাছে তিনি ধরা দেন।
তরুণ শান্ত হইলেন। মাইল দেড়েক দূর এক গ্রাম হইতে গভীর নিশীথে তিনি আসিয়াছিলেন, অরুণালোকে পথঘাট আলোকিত হইবার আগেই তিনি গৃহে ফিরিলেন।
যতদূর দৃষ্টি চলে, শ্রীশ্রীবাবামণি লোকটির পানে তাকাইয়া রহিলেন, পড়ে নিজে নিজে আবৃত্তি করিলেন,

‘তোমারে খুঁজিয়া মরি নিখিল ভুবন ভরি তবু হায় দেখা নাহি পাই,
আমারি ভিতরে তুমি আমি হয়ে দিবাযামি বিরাজিছ, খোঁজ তার নাই।
-শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ
শিবপুর (কুমিল্লা) অখন্ড সংহিতা, একাদশ খন্ড, ১৯ শে চৈত্র, ১৩৪০

প্রেম
সমবেত উপাসনা পরস্পরের মধ্যে প্রেমেরই সাধক। ইহা যদি অপ্রেম সৃষ্টি করে, তবে জানিবে, ইহা ঠিক ভাবে হইতেছে না।-শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ
প্রেমে শাসন আছে, রূঢ়তা নাই; সংযম আছে, তিক্ততা নাই। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ

প্রেমকে এককেন্দ্রিক কর
সকল ভালবাসার পরমকেন্দ্র শ্রীভগবান, মাত্র এই কথাটুকু ভুলিয়া যাইয়া জীব অবিরাম নিত্য নূতন দুঃখের ফসল চয়ন করিতেছে, জীবন ভরিয়া কেবলই হতাশা, মনস্তাপ আর দুর্ভাগ্য কুড়াইতেছে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ

প্রেম ও লালসা
ময়মনসিংহেরই অপর একটি যুবককে শ্রীশ্রীবাবামণি লিখিলেন, যে প্রেম নীচকে টানিয়া উর্ধে তুলিতে পারে না, ছোটকে বড় করিতে পারে না, ক্ষুদ্রকে ত্রিভুবন-বিস্তারী বিশাল প্রসার প্রদান করে না, তাহা প্রেম নহে। তাহা অন্ধ লালসা মাত্র। মনে রাখিও, লালসা তোমার অসর্কতার সুযোগ লইয়া ভূমিষ্ঠ ও পরিপুষ্ট হয়, আর এই অপার্থিব প্রেম তপস্যার কল্প-ললিকাতেই ফলিয়া থাকে। -শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ (অখন্ড সংহিতা, সপ্তম খন্ড)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!