ভবঘুরে কথা

পুরান ঢাকায় তখনো মহল্লা বিষয়টা টিকে ছিল। ছিল প্রত্যেক মহল্লার একটা নিজস্বতা। নানারকম মজার মজার চরিত্র যেমন ছিল তেমনি ছিল প্রতিটি ইটের ব্লকে প্রতিটি ঘাসের ডগায় এক একটি কাহিনী। সেই সব ঘটনা হয়তো কখনো বলবো তবে আজ শুরু করতে চাই একেবারে ভিন্ন একটা ঘটনা দিয়ে। যদিও এই ঘটনার সাথে পুরানো ঢাকা সে হিসেবে কোনো যোগসূত্র নেই। তবুও তাই দিয়েই শুরু করলাম। শহরে বেড়ে ওঠার গল্পে ধান ক্ষেত, নদী, মেঠোপথের মতো রোমান্টিকতা হয়তো থাকে না কিন্তু তারপরও এর পরতে পরতেও লুকিয়ে থাকে হাজারো স্মৃতিকথা। যাক সে কথা।

ফকির রব শাহ্

যে কারণে পুরান ঢাকার কথা দিয়ে শুরু করলাম সে কথায় আসি। পুরান ঢাকার আর দশটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই সাদামাটা শৈশবে বেড়ে উঠছিলাম। সেই সময় ঢাকায় সুবেদারি-নায়েব-নাজিম-সরকার-জমিদারের আমল শেষ হয়ে চেয়ারম্যানের আমল শুরু হয়েছে বলা যায়। মহল্লায় মহল্লায় চেয়ারম্যানের পান্ডাদের মাস্তানি ছিল। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের শাসন ছিল। কলতলার ঝগড়া ছিল। কার ছেলে কার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেলো সেই সব রস গল্প ছিল। কে কার সাথে প্রেম করছে সেই কানাঘুষা ছিল। প্রচুর গালাগালি ছিল মারামারি ছিল। ধনী ছিল দরিদ্র ছিল। বারো রঙের মানুষ ছিল। এতোশত দলাদলি-মারামারি-গালাগালির মধ্য গলাগলিও ছিল-প্রেম ছিল-মমত্ব ছিল। সবাই সবাইকে চিনতো। মহল্লায় কে ঝাড়ু দেয় তাও সবাই জানতো। আমরা যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন চারপাশটা কিছুটা অস্থির হয়ে উঠছিল। রাজনীতির ঘোলাজল ঢুকে পড়েছিল মহল্লার চৌহদ্দির ভেতরেও। হয়তো আগেও ছিল তবে আমরা বয়সের দোষে তখন টের পেতে শুরু করছিলাম। রাস্তায় হাঁটতে হলে নিজের জায়গা করে নিতে হবে, স্বভাবে মাস্তানি বা মাস্তানি ভঙ্গিতে কি কি সুবিধা ততদিনে পরিবেশ-প্রকৃতি আমাদের জানিয়ে দিয়েছে। না চাইলে কিচ্ছুটি পাওয়া যাবে না তাও জেনে গেছি সময় মতো। বলা যায় বয়ো:সন্ধিকালেই একটা উগ্রতা ঢুকে পড়তে চাইছিল চারপাশের রীতি অনুযায়ী। যা হয় আর কি। প্রকৃতির সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে পারিপার্শ্বিক সংস্কার ঢুকে পড়ছিল চরিত্রে।


যখন হোটেল থেকে বেড়িয়ে রিকসা চড়ে মাজারে ফিরছিলাম। তখনকার আমি আর যে আমি মাজার থেকে বের হয়েছিলাম সেই আমি কি এক আমি? এই প্রশ্নটা আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বই পড়ে যে শিক্ষা আমি নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মহান সব কথা বাণী বইতেই লেখা থাকে। সেই রাতে সবকিছু মিথ্যা হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। জীবনের বড় বড় শিক্ষা মানুষের কাছ থেকেই নিতে হয় আমি সেই রাতের অন্ধকার রাতে রিকশা করে মাজারে ফিরতে ফিরতে একটু একটু করে বুঝতে শিখছিলাম-

আমার পরিবারে ধর্মপরায়ণতা থাকলেও সেই অর্থে কোনো মৌলবাদীতা বা রক্ষণশীলতা দেখিনি। তবে দাদা বাড়িতে আসলে পুজা দেখে বাড়ি ফিরলে তিনি গরম পানি দিয়ে গোসল করাতেন। সেই সব গল্প আরেকদিন বলবো। তবে পরিবার কখনো মুক্তচিন্তা করতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এইসব অস্থিরতার ভেতরে বই পড়ার নেশা ঢুকে পড়েছিল কোনো এক ফাঁকে। আর সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা হয়েছিল যখন কানে লালন ফকিরের গান ঢুকে বাসা বাধতে শুরু করে। এলাকায় বন্ধু বা বড় ভাইদের মাস্তানি, বাড়ির পাশের বস্তির গালাগালি, পাশের বাড়ির আড় চোখে তাকানো মেয়েটি, মাদকের হাতছানির ভেতরে বড় হতে হতে কখন যে মাথার ভেতর লালন ঢুকে পড়েছিল তার সঠিক সময় বা দিনকাল এখন আর মনে পড়ে না। বা লালনের কোন্ গানে বা কোন্ লেখায় তার প্রেমে পড়েছিলাম তাও জানি না। সেটা কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসের সেই বাউলের কণ্ঠে খাঁচার ভেতর অচিন পাখির গান? নাকি কোনো অডিও ক্যাসেটে শোনা বাড়ির পাশে আরশি নগর তাও মনে করতে পারি না আজ। তবে লালন মাথার ভেতরে বসে ছিল এটা ঠিক।

আর কি গৌর আসবে ফিরে

বিস্তারিত পড়তে…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!