মতুয়া সংগীত

ওড়াকাঁদি গোলোক

ভক্ত গোলোক কীর্তনিয়ার ঠাকুরালী
পয়ার

ওড়াকাঁদি গোলোক কীর্তুনে আসে যায়।
ঐকান্তিক ভক্তি হরি ঠাকুরের পায়।।
একদা শ্রীহরি বসি পুষ্করিণী তীরে।
গোলোক বসিল গিয়া ঠাকুর গোচরে।।
ঠাকুর গোলোকে কহে কি কাজ করিলি।
গান করি চিরদিন লোকেরে শুনালি।।
এমন মধুর রাম নাম শুনাইয়ে।
বিলালী অমূল্য ধন অর্থ লোভী হ’য়ে।।
যে ধনের মূল্য নাই তাহাই বেচিলি।
অমূল্য ধনের মূল্য কিছুই না পাইলি।।
কাঁদিয়ে কীর্তুনে কহে ঠাকুরের ঠাই।
আজ্ঞা কর কি কার্য করিব শুনি তাই।।
ঠাকুর কহেন বাছা ধর্ম কর্ম সার।
সর্ব ধর্ম হ’তে শ্রেষ্ঠ পর উপকার।।
কীর্তনিয়া বলে হে তারকব্রহ্ম হরি।
আমি কি পরের ভাল করিবারে পারি।।
মহাপ্রভু বলে বাছা বলি যে তোমায়।
কেহ যদি ঠেকে কোন আদি ব্যাধি দায়।।
ওঢ়াকাঁদি আসিতে যে করয় মনন।
এ পর্যন্ত আসিতে দিও না বাছাধন।।
আমাকে ভাবিয়া যাহা তোর মনে আসে।
তাহাই বলিয়া দিস মনের হরিষে।।
তাহাতে লোকের হ’বে ব্যাধি প্রতিকার।
ইহাতে হইবে তোর পর উপকার।।
যে রোগের বৃদ্ধি যাতে তাই খেতে দিস।
হরিনামে মানসিক করিতে বলিস।।
রোগমুক্ত হ’লে সেই মানসার কড়ি।
আমাকে আনিয়ে দিস ওঢ়াকাঁদি বাড়ী।।
রোগাভক্তি কলিতে হ’য়েছে বড় ব্যক্ত।
রোগমুক্ত হ’বে সবে হ’বে হরিভক্ত।।
কহিয়া সারিও ব্যাধি ভাবিয়া আমারে।
অর্থ দণ্ডে পাপদণ্ড নামে পাপ হরে।।
নিজে না হইও লোভী অর্থের উপর।
তাহা হ’লে করা হ’বে পর উপকার।।
শুনিয়া গোলোক বড় হরষিত হ’য়ে।
সারাতে লাগিল ব্যাধি হরিনাম দিয়ে।।
অনেক লোকের ব্যাধি হইয়া মোচন।
হরিভক্ত হ’য়ে করে হরি সংকীর্তন।।
রাউৎখামার আর মল্লকাঁদি গ্রাম।
চারিদিকে সবলোকে করে হরিনাম।।
এইরূপ ভক্ত সব হইতে হইতে।
প্রকাশ হইল ধর্ম দক্ষিণ দেশেতে।।
বর্ণী বাশুড়িয়া দলোগুণী আটজুড়ি।
পাতগাতী কলাতলা গ্রাম বড়বাড়ী।।
গঙ্গাচর্ণা গ্রামমাঝে শম্ভুনাথ বাড়ী।
প্রহরাষ্ট থাকে তথা যেন বাসা বাড়ী।।
তাহাতে অনেক লোক হইল বিমনা।
অই বাড়ী ছেড়ে কেন গোঁসাই লড়ে না।।
চারিযুগে সৎকার্য আছে বিড়ম্বন।
অনেক ভাবেতে ফিরে অনেকের মন।।
ঠাকুর নিকটে সবে নানাভাবে কয়।
শম্ভুনাথ ওঢ়াকাঁদি হইল উদয়।।
ঠাকুর জিজ্ঞাসা করে গোলোক কি করে।
বিশ্বাস কি অবিশ্বাস তাহার উপরে।।
শম্ভু কহে বিশ্বাস করেছি আমি যারে।
আর নাহি অবিশ্বাস করিব তাহারে।।
ঠাকুর কহেন আর নাহি অবিশ্বাস।
কেটে গেছে বাছা তোর কর্মবন্ধ ফাঁস।।
ঠাকুর বলেন মোরে যে দিয়াছে মন।
মোর মনে দোষ কার্য করে না কখন।।
প্রভু তবে পাগল গোলোকচাঁদে কয়।
যা দেখি গোলোক তুই গঙ্গাচর্ণা গায়।।
নিজামকাঁদির ভক্ত গোবিন্দ নামেতে।
সদাকাল থাকে সেই গোলোকের সাথে।।
তাহার নিকট মহানন্দ জিজ্ঞাসিল।
ইতি উতি ভাবে কত অনেক কহিল।।
মহানন্দ কহে তাহা গোস্বামী পাগলে।
পাগল কহেন তবে মহানন্দ স্থলে।।
আমাকে যাইতে সেই গঙ্গাচর্ণা গ্রাম।
শ্রীমুখে বলেছে প্রভু থাকিয়া শ্রীধাম।।
সেই হ’তে যা’ব যা’ব ভাবিতেছি মনে।
না যাইয়া অপরাধী হৈনু প্রভু স্থানে।।
এই আমি চলিলাম ঠাকুর ভাবিয়া।
যা কর তা কর মম সঙ্গেতে থাকিয়া।।
গোস্বামী চলিল তবে দিয়া হরিবোল।
শম্ভুনাথ গৃহে গিয়া বসিল পাগল।।
গোস্বামীর শব্দ শুনি সে রাইচরণ।
প্রণমিয়া বলে চল আমার ভবন।।
শম্ভুনাথ ভার্যা ব’সে পাগলের ঠাই।
মা! মা! বলিয়া তারে ডেকেছে গোঁসাই।।
পাগল বলেন যাব তোমার আলয়।
মা যদি করেন আজ্ঞা তবে যাওয়া যায়।।
শুনিয়া রাইচরণ হইল উন্মনা।
গোসা করি ফিরে এল পাগলে ডাকে না।।
বিমর্ষ হইয়া রাই নিজ গৃহে গেল।
চেয়ে দেখে গৃহ মধ্যে বসেছে পাগল।।
রাইচরণের ভার্যা কদমী নামিনী।
অপরে দোসরা তার নাম কাদম্বিনী।।
পাগলের নিকটেতে বসিয়া রয়েছে।
পাদ ধৌত করে সেবা শুশ্রূষায় আছে।।
তাহা দেখি রাই সুখী হইল সন্তোষ।
ঘুচে গেল মনেতে যা হ’য়েছিল দোষ।।
রাইচরণকে ডেকে কহিছে গোঁসাই।
গোলোকেরে ডাকিয়া আনহ মম ঠাই।।
তাহা শুনি ভাবে রাই এ আর কেমন।
কীর্তনিয়া আসিবেক কিসের কারণ।।
যার দ্বারা মনের ঘুচিয়া যাবে কষ্ট।
তাহার দ্বারায় মন আরো হয় নষ্ট।।
মনে ভাবে ডাকিব সে যাহাতে না আসে।
সে ভাবে সংবাদ দিল গোলোকের পাশে।।
কীর্তনিয়া নাহি এল পাগল যথায়।
এল না বলিয়া রাই সংবাদ জানায়।।
গোস্বামী বলেন রাই বুঝিয়াছি মনে।
আসিতে দিলেনা তুমি সে আসিবে কেনে।।
রাই তাই শুনিয়া বিস্মিত হৈল মনে।
মনে যা ভেবেছি প্রভু জানিল কেমনে।।
পাগল বলেন রাই মনে কি ভাবিস।
এই সব উল্টা কল তুই কি বুঝিস।।
লক্ষ্মীকান্ত টিকাদার ছিল সমিভ্যরে।
ক্রোধেতে পাগল তারে দুই লাথি মারে।।
মার খেয়ে লক্ষ্মীকান্ত ভভাবে হ’য় ভোর।
বলে হারে দুষ্ট ভাল শাস্তি হৈল তোর।।
রাইচরণকে কহে পাগল তখন।
করহ কদলী তরু প্রাঙ্গণে রোপণ।।
কলাগাছ এনে ত্বরা ফেলিল সেখানে।
গর্ত করি রোপণ করিল সে উঠানে।।
পাগল কহিছে তুই মানুষ বিদিক।
এ কার্য করিতে রাই নাহি পাবি ঠিক।।
লক্ষ্মীকান্ত টিকাদার ছিল যে সঙ্গেতে।
তাকে বলে কলাগাছ রোপণ করিতে।।
লক্ষ্মীকান্ত করিতেছে মৃত্তিকা খনন।
রাই কহে পাগল ইহা করে কি কারণ।।
লক্ষ্মীকান্ত বলে করি পাগল যা বলে।
বোধ করি এখানে হইবে রাসলীলে।।
এ হেন সময় শম্ভুনাথের ভবনে।
অনেক লোকের আগমন সেইখানে।।
কীর্তনিয়া মহাশয় সঙ্গেতে তাহারা।
নাম সংকীর্তন করে হ’য়ে মাতোয়ারা।।
হুঙ্কার করিয়া হরি বলেছে পাগল।
জয় হরি বল রে গৌর হরি বল।।
শম্ভুর বাটীতে যত লোক সমারোহ।
জ্ঞানশূন্য অচৈতন্য সবে গেল মোহ।।
আরোপিল রম্ভাতরু উঠানের পাশে।
চতুর্দিক বেড়ি ঘুরে মনের হরিষে।।
লক্ষ্মীকান্ত বলে রাই করহ বিশ্বাস।
বিশ্বাস করহ যদি এই মহারাস।।
শম্ভুর বাটীতে সবে যাইয়া দেখহ।
কীর্তন করিতে সবে হইয়াছে মোহ।।
তথা দিয়ে দেখে সবে মোহ হইয়াছে।
রাই কাঁদি কহিলেন পাগলের কাছে।।
পাগল যাইয়া শম্ভুনাথের ভবনে।
হরি বলি সবাকার করা’ল চেতন।।
গঙ্গাচর্ণা মহারাস পাগলের কাজ।
রচিল তারকচন্দ্র কবি রসরাজ।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!