সতীমাতা ভবেরগীত কর্তাভজা

কর্তাভজার দশ আজ্ঞা

প্রতিটা মত-পথ-ধর্ম-দর্শনে কিছু অবশ্য পালনীয় কর্তব্য থাকে। যা তার অনুসারীদের বিনা প্রশ্ন করে পালন করতে হয়। আর তা পালনের মধ্য দিয়েই সেই মত-পথকে তার অনুসারীরা সকলের মাঝে আপন মহিমা তুলে ধরে। তেমনি কর্তাভজা সত্যধর্মেও রয়েছে দশটি আদেশ। এই অবশ্য পালনীয় দশটি আদেশ পরিচিত দশ আজ্ঞা নামে-

১. সদা সত্য কথা বলবে।
২. কখনো মিথ্যা বলবে না।
৩. হিংসা করবে না (বধ্ করবে না)।
৪. উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করবে না।
৫. চুরি করবে না।
৬. ব্যভিচারী করবে না (পরস্ত্রী বা পরপুরুষে আসক্ত হবে না)।
৭. ডিম, মাংস খাবে না।
৮. মাদক সেবন করবে না।
৯. অহংকার করবে না।
১০. মানুষই ঠাকুর (সহজ ভাব) এই মান্যতা মেনে চলবে।

এই অবশ্য পালনীয় দশ আজ্ঞা বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে পালনের সাথে সাথে কিছু নিষেধাজ্ঞার কথাও চলে আসে। এই দশ আজ্ঞার সাথেই সেই নিষেধাজ্ঞাও যুক্ত হয়ে আছে। কর্তভজা সত্যধর্মে একই সাথে এই বিধিনিষেধ বর্ণনা করা হয়েছে- 

সদা সত্য কথা বলবে – কখনো মিথ্যা বলবে না:

সকল সময় সত্য কথা বলবে মানেই কখনো মিথ্যা কথা বলবে না। সত্যই ধর্ম আর মিথ্যাই অধর্ম। তাই ধর্মকে অধর্ম থেকে রক্ষা করতে হলে কোনো অবস্থাতেই মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে না। এমনকি বেঁচে থাকার প্রয়োজনেও মিথ্যা বলা যাবে না কারণ মৃত্যু অনিবার্য সত্য। মৃত্যু আসবেই মিথ্যাকে আকড়ে ধরেও যেহেতু চিরদিন বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তবে কেনো মিথ্যার আশ্রয় নেয়া? যে কোনো পরিস্থিতিই হোক না কেনো সত্যকেই আকড়ে ধরে থাকতে হবে।

এটাই কর্তভজা সত্যধর্মের অভিষ্ট লক্ষ। এর কোনো ব্যত্যয় হতে পারবে না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবেও মিথ্যা বলা যাবে না এমনকি মনে মনেও মিথ্যার বলার চিন্তা করবে না, অযথা বাক্য ব্যয় করাও উচিৎ নয়। অকারণে-অযথা বাক্য ব্যয় করলে মিথ্যা বলার প্রবনতা বাড়ে।

যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ সত্যের উপর অটল থাকে ততক্ষণ স্রষ্টা তার সহায় থাকে আর যখনই সত্য থেকে মানুষ সরে যায় অর্থাৎ এই গুরুবাক্য লঙ্ঘন করে তখনই মানুষ মিথ্যায় আছন্ন হয় অর্থাৎ তার সাধন-ভজন, জপ-তপ সব কিছুই নিষ্ফল হয়ে যায়। কিন্তু যে সাধক সত্যকে ব্রতী করে, যে কোনো পরিস্থিতিতে সত্যকে ধারণ করে অবিচল থাকে মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার কথা স্মরণও করে না সেই সাধকই বাকসিদ্ধ হবে তখন এক স্থানে বসেই সে আগম-নিগম সব কিছুই জানতে পারবে।

হিংসা করবে না – উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করবে না:

কোনো প্রকার হিংসাই করা যাবে না কারণ মনে রাখতে হবে অহিংসেই পরম ধর্ম। হিংসা যেমন আত্মাকে অধঃগতি দিকে নিয়ে যায় তেমনি অহিংসা মানবাত্মাকে উদার করে-মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটায়। তাই দেহ-মন-বাক্য কোনো কিছুর দ্বারাই কারো প্রতি কোন মতেই হিংসা করা যাবে না। শুধু প্রত্যক্ষ নয় পরোক্ষভাবেও অর্থাৎ মনে মনেও কারো অনিষ্ঠ চিন্তা করা যাবে না। হিংসা প্রবৃত্তি সাধকের প্রবৃত্তি নয়।

ভাবের গীত-এ বলা হয়েছে- ‘ভক্তি করিবে সর্ব জীবের প্রতি’ অর্থাৎ সকল জীবের মধ্যে পরমাত্মা রূপী ঈশ্বর আছেন এই জ্ঞান করতঃ জগৎ ব্রহ্মময় জ্ঞান করবে, রিপুর কু-মন্ত্রনায় বা আত্মইন্দ্রিয় সুখের জন্য ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে কোন জীবকে হত্যা করবে না। মনে রাখবে- মালিকের সৃষ্টি জীবকে ভালবাসা-ই মালিক কে ভালবাসা, ঈশ্বরের সৃষ্টি জীবকে হিংসা করে কোন দিন ঈশ্বরের কৃপা লাভ করা যায় না, মনে রাখবে- হিংসাতে সংঘাতের সৃষ্টি, সংঘাতে ধ্বংস অনিবার্য।

কখনো উচ্ছিষ্ট (এঁটো) খাবার ভোজন করা যাবে না কারণ এই মতের সাধকরা গুরুআশ্রিত। তাই যখনই ভোজেন সেবা নেয়া হবে তখন প্রথমে গুরুকে নিবেদন করে তারপর সেবা গ্রহণ করতে হবে। উচ্ছিষ্ট দ্রব্য কখনো গুরুর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা যাবে না তাই উচ্ছিষ্ট বা এঁটো খাবার কারোই গ্রহণ করা যাবে না। তাছাড়া অন্যের উচ্ছিষ্ট গ্রহণের মধ্য দিয়ে ছোঁয়াচে ব্যধিসমূহ ছড়িয়ে পরার সম্ভবনা থাকে তাই উচ্ছিষ্ট ভোজন সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ।

চুরি করবে না- ব্যভিচারী করবে না:

পরের দ্রব্য না বলে নিলেই চুরি করা হয়, চুরি করা মহৎ দোষ। তাছাড়া প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন-সম্পদ কুক্ষীগত করা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন-সম্পদ আহরণ করার চিন্তা করাকেও ধর্মীয় বিধান মতে চৌর্যবৃত্তি বলে। মানুষের আশার শেষ নেই, বিষয়ের আশা থাকলে ঈশ্বরে ভালবাসা হয় না, মনে রাখবে- অধিক আশা হতাশার কারণ, অতিরিক্ত বিষয় বাসনা মানবাত্মাকে অধঃপতন করে এবং সংসারে, সমাজে অশান্তি বয়ে আনে। ব্যভিচারের অর্থ চরিত্রহীন, ব্যভিচার করা মহাপাপ।

চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ অর্থের বিনিময়ে চরিত্র ক্রয় করা যায় না, চরিত্র গঠনের জন্য অবশ্যই ধর্মকে অবলম্বন করতে হবে। চরিত্রবান মানুষ সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হয়, তাই প্রত্যেক ধর্মপরায়ণ মানুষ-ই সৎচরিত্রবান হওয়া বিশেষ কর্তব্য, মনে রাখবে-চরিত্রহীন মানুষ পশুর সমান।

ডিম-মাংস খাবে না – মাদক সেবন করবে না:

খাদ্যবস্তু পানাহারের সাথে দেহের সম্পর্ক, দেহের সাথে মনের সম্পর্ক, মনের সাথে চিত্তের সম্পর্ক, চিত্তের সাথে ধর্মের সম্পর্ক, ধর্মের সাথে জীবাত্মার সম্পর্ক, জীবাত্মার সাথে পরমাত্মা অর্থাৎ মালিকের সম্পর্ক। এই কারণে খাদ্যের সাথে জীবনের-ধর্মের সম্পর্ক নিবিড়। এটাকে অস্বীকার কারার কোনো উপায় নেই। চিত্তশুদ্ধি না হলে আত্মশুদ্ধি হয় না, আত্মশুদ্ধি না হলে ঈশ্বরের কৃপা লাভ হয় না।

সাত্ত্বিক ভোজনের মাধ্যমে রিুপু-ইন্দ্রিয়ের সৎভাব জন্মে, তম গুণের ভোজনর ফলে রিপু-ইন্দ্রিয় নিস্তেজভাবে জন্মে আর রজ গুণের ভোজনের ফলে রিপু-ইন্দ্রিয়ের উগ্রতাভাব জন্মে, তাই ঈশ্বর উপাসনায় মনোনিবেশ করতে হলে চিত্তশুদ্ধি একান্ত প্রয়োজন। তাই ভোজন শুদ্ধিও জরুরী।

সকল প্রকার ভোজনেই দেহে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সাত্ত্বিক ভোজন দেহকে সতেজ রাখে; তামসিক ভোজন দেহকে নিস্তেজ করে আর রাজসিক ভোজন দেহকে উত্তেজিত করে তোলে। কর্তাভজা সত্যধর্মের সাধকদের জন্য সাত্ত্বিক ভোজন নির্দিষ্ট করা হয়েছে যাতে সর্বদা পরমের ধ্যান-জ্ঞান করতে পারে। তাই এই মতে যেমন রাজসিক-তামসিক ভোজন থেকে সাধককে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে তেমনি মাদকের মতো একই সাথে উত্তেজিত ও মতিচ্ছন্ন দ্রব্যকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

যে ভোজনে মনুষ্যত্ব লোপ পায়, মন বিচলিত হয় সে সব দ্রব্য নিষিদ্ধ। পরমের আরাধনা করতে হলে চিত্তশুদ্ধি একান্ত প্রয়োজন, এজন্য এই মতের অনুসারীদের পশু পাখীর মাংস ভোজন ও মাদক সেবন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই এর অনুসারিদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এরূপ পশু-পাখি গৃহে পালন করা নিষেধ।

অহংকার করবে না – মানুষই ঠাকুর:

পরম থেকে সৃষ্ট সকলেই পরমের অংশ। সকল মানুষের মাঝেই পরমের অবস্থান। মানুষ পরমেরই অংশ তাই মানুষই ঠাকুর বা পরম। তাই আমি মহান এই বেশি অহংকার করার কিছু নেই। সকলের মাঝেই পরমের অবস্থান তাই প্রত্যেককেই সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন করতে হবে। যে জ্ঞান পরমের নাম গুণগান কীর্ত্তন ধর্ম কথা আলোচনা, ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও শ্রবণ করা হয় সেই স্থান পবিত্র থাকে।

সে স্থানেই পরমের আবির্ভাব ঘটে তাই সেই স্থানকেও সম্মান জানাতে হয়। এমন কিছুই সেখানে করা উচিৎ নয় যাতে তার পবিত্রতা নষ্ট হয়। গুরুজনে ভক্তি ও বিনয়; সমবয়সীদের সাথে মিষ্টভাষ আর ছোটদের স্নেহ করে সকলের সাথে মিলে মিশে থাকাই এই মতের অন্যতম বার্তা

আউলচাঁদ মহাপ্রভূ সতীমা ও রামশরণকে সত্যনামে দীক্ষা দেওয়ার পর এই দশটি আজ্ঞা দিয়ে বললেন এই দশটি আজ্ঞা-ই গুরুবাক্য, এই গুরুবাক্য পরমসত্য জ্ঞান করতঃ যথাযথ ভাবে এর প্রতি পালন করলে নিশ্চয় সুফল ফলবে। যতক্ষণ এই পরম সত্যের উপর ভক্তি বিশ্বাস অটল থাকবে ততক্ষণ মালিক তোর সহায় থাকবে, আর যখন-ই এই পরম সত্য থেকে বিচ্যুতি হবে তখন-ই গুরুবাক্য লঙ্ঘন হবে, গুরুবাক্য লঙ্ঘন করলে সাধন ভজন, ধর্ম-কর্ম সব-ই বৃথা।

কর্তাভজন সত্যধর্মালম্বী মহাশয়গণ (ধর্মযাজকগণ) সত্যনামে দীক্ষা দেবার সময় এই দশটি আজ্ঞা যথাযথ ভাবে পালন করার জন্য ভক্তগণের বিশেষ ভাবে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। ভাবের গীত-এ বলা হয়েছে-

সে অটল বিনা কদাচিত থাকে না টলের কাছে

ভাবার্থঃ যে ব্যক্তির মন গুরুবাক্য ও ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বিশ্বাস অটল থাকে তিনি-ই অটল, মালিক সর্বক্ষণ তার সহায়, আর যে ব্যক্তির মন ভক্তি বিশ্বাসে অটল নয়, তিনিই টল, তার ধর্ম-কর্ম, সাধন ভজন সব-ই বৃথা।

…………………………………..
সূত্র ও কৃতজ্ঞতা: 
১. ভবের গীত
২. কর্তাভজা সত্যধর্ম

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
কর্তাভজা সত্যধর্মের ৩০ ধারা
রামশরণ ও সতীমার দীক্ষাগ্রহণ
সতী মা
কর্তাভজা সত্যধর্ম
কর্তাভজার দশ আজ্ঞা
গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আবির্ভাব
ডালিম তলার মাহাত্ম্য
বাইশ ফকিরের নাম
কর্তা
দুলালচাঁদ
কর্তাভজা সত্যধর্মের পাঁচ স্তম্ভ
সাধন-ভজন ও তার রীতি নীতি
ভাবেরগীত এর মাহাত্ম্য
কর্তাভজা সত্যধর্মের আদর্শ ও উদ্দেশ্য

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!