সতীমাতা ভবেরগীত কর্তাভজা

কর্তাভজা সত্যধর্ম

কর্তাভজা সত্যধর্মের প্রবর্তক ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু। তিনি ‘ফকির ঠাকুর’ নামেও পরিচিত ছিলেন। ফকির ঠাকুর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। যতটুকু জানা যায় তারও প্রায় সবই অনুমান নির্ভর। তার মতের অনুসারীদের অনেকে মনে করে তিনি সাধারণে কাছে ফকির আর অনুসারিদের কাছে ঠাকুর নামে পরিচিত ছিলেন। কালক্রমে সেই দুই নাম একত্রিত হয়েই ফকির ঠাকুর নামে অধিক পরিচিতি লাভ করেন।

তার কাছে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টান জাত-পাতের কোনো ভেদ ছিল না। তিনি সবার মাঝেই দেখতেন একই জগৎ কর্তার প্রতিছবি। সকলকেই তিনি সেই কর্তা রূপে ভজন করতেন এবং করার উপদেশ দিতেন সেই থেকেই তার মত কর্তাভজা সত্যধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে। তার প্রধান ভক্ত সতীমা এবং সতীমাতার পুত্র দুলাল চাঁদ কর্তৃক অবিভক্ত বাংলার বহু জেলায় এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে কর্তাভজা ধর্ম ছড়িয়ে পরে।

ফকির ঠাকুরের প্রবর্তিত এই মত সতীমায়ের মত, ঘোষপাড়ার মত, ভগমেনে, ভগবজ্জন, সহজিয়া মত, সহজধর্ম, সত্যধর্ম ইত্যাদি নামে বিভিন্ন জায়গায় পরিচিত থাকলেও মূলত সবই কর্তাভজাই। জাত-গোত্র-ধর্ম-বর্ণ-এর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে পরম বা কর্তা ভেবে তাকে আরাধনা করার এই বিশ্বাসকে সর্বসাধারণ সহজ ভাবে মেনে নিবে না এটাই স্বাভাবিক। তাই কর্তাভজা সত্যধর্ম গুপ্ত মত হিসেবেই এর অনুসারিদের মাঝে যুগে যুগে থেকে গেছে। ভাবেরগীতে বলা হয়েছে-

“আদ্যের অনাদি সে আপনি এসেছে”
সেই হরি এই জীবের ভাগ্যে আপনি সদয় হয়েছে।
সহজ ভাবের সহজ মানুষ, স্বরূপে রূপ মিশিয়েছে।
(ভাবেরগীত, গীত নং- ৯০)

শ্রী চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রি:) বৈষম্যমূলক ব্রাহ্মণ্যবাদের বংশগত জাতিভেদের বিরুদ্ধে বৈষ্ণব মত প্রচারের মাধ্যমে যে সাম্যবাদের সামাজিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন, রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ সমাজ ও সমাজপতিদের বিরোধিতার ফলে আদর্শ পূর্ণ রূপে প্রতিফলিত না হওয়ায় পূণরায় তিনি আউলচাঁদ রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে কর্তাভজা সত্যধর্ম প্রচার করেন। কর্তাভজা অনুসারিদের এই বিশ্বাসের মূল কারণ হচ্ছে শ্রীচৈতন্যদেবের আদর্শ এবং ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভুর আদর্শ এক এবং অভিন্ন। শ্রী চৈতন্যদেবের আদর্শ চৈতন্য চরিতামৃতে উল্লেখ আছে-

নিচ জাতি নহে কৃষ্ণ ভজনে অযোগ্য,
সৎ কুল বিপ্রনহে ভজনের যোগ্য।
যেই ভজে সেই বড়, অভক্ত হীন ছার,
কৃষ্ণ ভজনে নাহি জাতি-কুলাদি বিচার।
(চৈতন্য চরিতামৃত – অন্ত্যলীলা, ৫১২ পৃষ্ঠা)

ঠাকুর আউল চাঁদ মহাপ্রভুর আদর্শ এভাবে ভাবেরগীতে উল্লেখ আছে-

দেখ ছত্রিশ বর্ণ চার জাতি কারু খান্ না তিনি,
বর্ণ মধ্যে কোন বর্ণ তা শুনি হন্ মানুষে নিশানি,
যে তার হুকুমে মকাম করে স্বকাম করে ত্যাগ
তারি হন্ তারি সেবা লন তাতেই অনুরাগ,
(ভাবের গীত- গীত নং- ৪২১, কলি- ৪)

গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের মতে যেমন শ্রীচৈতন্যদেব কলিযুগের অবতার রূপে আবির্ভূত হয়ে জাত-ধর্ম-গোত্রের ঊর্ধ্বে উঠে কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদের বিপক্ষে যেয়ে মানবপ্রেমকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন। তেমন ব্রিটিশ শাসনামলে আবার যখন সমাজ জাত-ধর্ম-গোত্রের নামে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল তখন ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভুর আবির্ভাব ঘটে।

জাতিভেদের অভিশাপ থেকে মুক্তি ও ধর্ম কর্মে সকলের সম অধিকার প্রতিষ্ঠা, একেশ্বরবাদ ও সাম্যবাদের প্রতীক কর্তাভজা সত্যধর্ম প্রচারের নিমিত্তে, ১১৫৯-৬১ বঙ্গাব্দে (১৭৫২-৫৫ খ্রি:) কোন এক সময় নদীয়া জেলার ডুবো পাড়ার গহীন অরণ্যে (বর্তমান নিত্যধাম ঘোষপাড়া, কল্যাণী, নদীয়া, পশ্চিম বাংলা) তার আবির্ভাব।

জানা যায়, ঠাকুর আউলচাঁদ বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেনন তবে উপযুক্ত ভক্ত না পাওয়ায় কোথাও তিনি নিজেকে প্রকাশ করেননি। শেষে গঙ্গানদীর তীরবর্তী ডুবো পাড়ার গহীন অরণ্যে আবির্ভূত হয়ে স্বরসতী (সতীমা) ও রামশরণের মাধ্যমে কর্তাভজা সত্যধর্ম প্রচার করেন। পরবর্তীতে সতীমাই এই মতকে অনেক বিস্তৃত করায় অনেকে এই মতকে সতীমার মত বলেই জানেন।

কর্তাভজা সত্যধর্ম হলো- উপাসনায় প্রার্থনায় এক জগৎকর্তার ভজন। অর্থাৎ প্রত্যেকের মাঝে পরমের অংশ হিসেবে যে পরম বাস করে তাকে ঠাকুর জ্ঞানে শ্রদ্ধাভক্তি নিবেদন করা। বৈষম্যমূলক ব্রাহ্মণ্যবাদের বংশগত জাতিভেদের পরিবর্তে গুণ ও কর্মগত গুরুবাদের সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই মতের সারকথা হলো- ‘একসত্য কর সার, ভব নদী হও পার।’

ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভুর উপদেশ বাণী- ‘কর্তা, ভজন, সত্য, ধর্ম’ এই নামের মধ্যেই কর্তাভজন সত্যধর্মের মূল নিতি-আদর্শ নিহিত আছে। কর্তাভজা বীজমন্ত্র হলো- সত্যনাম জয়গুরু সত্য। তোমার ছাড়া তিলার্দ্ধ নাই। জয়গুরু সত্য। এই সত্যনামে সর্বপ্রথম সতীমা ও রামশরণ স্বামী-স্ত্রী উভয়ে দীক্ষাগ্রহণ করেন, তাই সতীমা ও রামশরণ কর্তাভজা সত্যধর্মের ধারক।

…………………………………..
সূত্র ও কৃতজ্ঞতা: 
১. ভবের গীত
২. কর্তাভজা সত্যধর্ম

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
কর্তাভজা সত্যধর্মের ৩০ ধারা
রামশরণ ও সতীমার দীক্ষাগ্রহণ
সতী মা
কর্তাভজা সত্যধর্ম
কর্তাভজার দশ আজ্ঞা
গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আবির্ভাব
ডালিম তলার মাহাত্ম্য
বাইশ ফকিরের নাম
কর্তা
দুলালচাঁদ
কর্তাভজা সত্যধর্মের পাঁচ স্তম্ভ
সাধন-ভজন ও তার রীতি নীতি
ভাবেরগীত এর মাহাত্ম্য
কর্তাভজা সত্যধর্মের আদর্শ ও উদ্দেশ্য

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!