কাওয়ালির জনক আমির খসরু

কাওয়ালির জনক আমির খসরু

-নূর মোহাম্মদ মিলু

আজকের দিনের অধিকাংশ গায়কদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনি কী আমির খসরুকে চিনেন?” তারা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হয়তো বলবে আপনি কি কোনো রাজনীতিবিদের কথা বলছেন! তাদের সদয় অবগতির জন্যই আজকের ইতিহাসের পাতায় এই পোস্ট।

আমির খসরু ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ ও একজন সুফি সাধক। তাঁর জন্ম হয়েছিল উত্তর ভারতের পাতিয়ালি জেলায়। অসাধারণ গান ও কবিতার মাধ্যমে তিনি ভক্তদের কাছ থেকে উপাধি পেয়েছিলেন ‘তুত-ই-হিন্দ’ বা ‘ভারতের তোতা পাখি’ হিসেবে।

আমির খসরু একই সঙ্গে তুর্কি, ইরানী এবং ভারতীয় সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী ছিলেন। তৎকালীন ভারতীয় সংগীত ছিল গ্রিক সংস্কৃতি ও সংগীত প্রভাবিত। আবার ভারতীয় মুসলমানদের সঙ্গীতচর্চা ছিল পারস্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গীত দ্বারা প্রভাবিত। ভারতে গ্রিক সঙ্গীতের প্রভাব শুরু হয় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত বিজয়ের সময় থেকে। আমির খসরু এসব ধারার সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম ধারা প্রবর্তন করেন।

‘সেতারা’ ও ‘তবলা’র আবিষ্কারক বলা হয় আমির খসরুকে। মূলত প্রাচীন ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র ঢোল ও বীণা থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর খসরু সেতার ও তবলা সৃষ্টি করেন। সুফিদের গাওয়া ধর্মীয় সঙ্গীত কাওয়ালির জনক তিনি। তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে গজল সঙ্গীত ও কাব্যের প্রচার-প্রসার শুরু হয়।

আমির খসরু ভারতীয়, পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গীতের মধ্যে এমনভাবে সমন্বয় করেছেন যে, তা গানের জগতে উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত হিসেবে খ্যাতি পায়। তিনি পারস্য সংগীতে প্রচলিত বারো মোকাম, চব্বিশ শোবা ও আটচল্লিশ গোস্বা– সংমিশ্রণ করে দুটি পৃথক রূপকে একটি রূপের মধ্যে আনেন।

আরবি-পারসিক রাগ-রাগিণী যেমন- ইয়ামন, জিলফ, সনম, ঘনম, সাজগিরী, ঘার, সরফর্দ, ফিরুদস্ত, কাফি, বাহার ইত্যাদি এ দেশের সংগীতে পরিচিত করেন। বিভিন্ন তাল যেমন- যৎ, খামসা, সাওয়ারি, কাওয়ালি, ঝুমতাল, জলদ-ত্রিতাল, সুর-ফাক্তা, আড়া-চৌতলা প্রবর্তন করেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতে তেলেনা বা তারানা, খেয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তিনি আরও অনেক ধরনের গান জানতেন, যেমন– কলবানা, নকশ, নিগার, গুল, হাওয়া, বাসিত, সুলিহা ইত্যাদি।

আমির খসরুর আসল নাম আবুল হাসান ইয়ামিন আল-দিন মাহমুদ। পিতার নাম আমির সাইফ-উদ-দীন। চেঙ্গিস খানের আক্রমণের সময়ে সাইফ-উদ-দীন সমরকন্দের কাছে নিজ শহর কেশ থেকে বলখে চলে যান। তিনি তখন হাজারার শাসক ছিলেন। দিল্লির সুলতান সামস-উদ-দিন আলতামাস তাদের দিল্লিতে স্বাগত জানান।

গিয়াসউদ্দিন বলবনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজপুত রাওয়াত আরজ এর কন্যা বিবি দৌলত নাজ ছিলেন আমির খসরুর মাতা। মাত্র ৭ বছর বয়সে, ১২৬০ সালে আমির খসরু তাঁর পিতাকে হারান। এরপর তিনি তাঁর নানা ইমাদুল মুলকের তত্ত্বাবধানে দিল্লিতে বড় হন।

আমির খসরুর কাব্যচর্চা শুরু মাত্র ৮ বছর বয়সে। তখন থেকেই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তুহফাতুস সিগার’ প্রকাশিত হয়। ২০ বছর বয়সের সময়ে তার নানাও মারা যান। তখন তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের ভাইপো মালিক ছাজ্জুর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এ সময়ে তিনি তার কবিতা দ্বারা রাজ দরবারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

আমির খসরুর সংগীতের একটি বিশেষ ভঙ্গিকে বলা হতো ‘কাওল’। এটি ছিল দুই ভাষায় রচিত সংগীত, যেমন- ফার্সি ও হিন্দি। কাওল সংগীত গাওয়া হতো সুফি দরবেশদের মাহফিলে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। হযরত নিজামুদ্দিন আওলিয়ার দরবারে আমির খসরু সাধারণত কাওয়ালি গজল গাইতেন। এটি ছিল সহজ, বোধগম্য ও জনপ্রিয়।

কাওয়ালি শব্দটি এসেছে আরবি ‘কাওল’ বা ‘কাওলুন’ শব্দ থেকে, যার অর্থ কথা, বাক্য। বহুবচনে শব্দটি হয় ‘কাওয়ালি’। এই কাওয়ালি সংগীত আমির খসরুর নিজের উদ্ভাবিত সংগীত ধারা। ফলে তাকে ‘কাওয়ালির জনক’ বলা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে কাওয়ালি এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত।

কাওয়ালি সম্রাট আমির খসরু ছিলেন ভারত বিখ্যাত অলি ও দরবেশ হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার অন্যতম শিষ্য। হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া তার প্রিয় শিষ্য আমির খসরুকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তিনি ভক্তদের অসিয়ত করে যান- তার প্রিয় শিষ্য আমির খসরুকে যেন তার পাশেই কবর দেয়া হয়।

নিজামুদ্দিন আওলিয়ার সাথে আমির খসরুর সাক্ষাৎ নিয়ে বেশ কিছু উপকথা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত ঘটনাটি এরকম- আট বছর বয়সের সময়ে আমির খসরুকে তাঁর মা জোর করে নিজামুদ্দিন আওলিয়ার দরবারে নিয়ে যান কিন্তু আমির খসরু তখন মায়ের সাথে দরবারে প্রবেশ না করে দরজার সামনে বসে থাকেন। তিনি মূলত একটি পরীক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। দরজায় বসে মনে মনে তিনি একটি কবিতা রচনা করে তা আওড়াচ্ছিলেন। কবিতাটির ভাবানুবাদ হচ্ছে–

তুমি সেই সম্রাট, প্রসাদেরই রাজা
কবুতর গেলে যেথা হয়ে যায় বাজপাখি
গরিব পথচারী এসেছে সে দরজায়
ভেতরে ডাকবে- নাকি ফিরে যাব, জানাবে কি?

নিজামুদ্দিন আওলিয়া তৎক্ষণাৎ একজনকে দরজায় পাঠিয়ে বলেন, দরজায় যে বালকটি বসে আছে তাঁকে নিচের কবিতাটি পড়ে শোনাতে–

হে প্রাণের বন্ধু, ভেতরে এসো
সারাজীবন আমার বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে থেকো
বোকা মানুষ কেউ যদি আসতো
তাহলে না হয় সে খালি হাতে ফিরে যেত।

এই কবিতা শুনে বালক আমির খসরু বুঝতে পারেন, তিনি সঠিক জায়গায় এসে উপনীত হয়েছেন। সেই থেকেই আমির খসরু নিজামুদ্দিন আওলিয়ার প্রিয় শিষ্য ও বিশ্বস্ত বন্ধুতে পরিণত হন।

নিজামুদ্দিন আওলিয়ার প্রতি আমির খসরুর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অসীম। এই ভালোবাসা এতই গভীর ছিল যে, লক্ষণাবতীতে থাকাকালে তিনি তার শায়েখ নিজামুদ্দিন আওলিয়ার মৃত্যুর সংবাদ শুনে দ্রুত ফিরে আসেন এবং কবরে যেয়ে বিলাপ করতে করতে ধুলোয় গড়াগড়ি করতে থাকেন। শরীরের কাপড় পর্যন্ত ছিড়ে ফেলেন। শোকের তীব্রতায় শায়েখের মৃত্যুর ছয় মাসের মধ্যেই ১৩২৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

উপমহাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনায় আমির খসরুর অবদান চিরস্মরণীয়। আমির খসরুকে বলা হয় ভারতের প্রথম জাতীয় কবি। ভারতীয় উপমহাদেশের তিনিই একমাত্র মধ্যযুগীয় কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ, যার গান-কবিতার প্রভাব এখনও স্ব-মহিমায় বর্তমান আছে।

প্রাসঙ্গিক লেখা

1 Comment

  • জামির আব্দুল্লাহ , বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ ২০২০ @ ১১:০৬ অপরাহ্ন

    দেস বা দেস মে ঢুন্ড ফিরি হু, তোরা রাঙ্গ মান ভায়ো নিজামুদ্দিন…।

    মোহে আপনে হি রাঙ্গ মে রাঙ্গ দে।
    মোহে রাঙ্গ বাসান্তী রাঙ্গ দে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!