মতুয়া সংগীত

কি ধন্য প্রভুর

পয়ার
কি ধন্য প্রভুর লীলা এই কলিযুগে।
সব লীলা হ’তে ধন্য হ’ল ভক্তিযোগে।।
দশরথ গৃহে জন্ম লইয়া শ্রীরাম।
ভূভার হরণ পূর্ণ ভক্ত মনস্কাম।।
বৈকুণ্ঠ নায়ক হরি হৈল লীলাকারি।
নন্দের নন্দন কৃষ্ণ গোলোক বিহারী।।
ভূভার হরণ ভক্ত মনোরম্য কারী।
ভক্ত সঙ্গে প্রেম রস মধুর মাধুরী।।
তিন শক্তি একত্র হইয়া ভগবান।
দেবকীর বায়ুগর্ভে দুই শক্তি যান।।
ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে মিমাংসা র’য়েছে।
যশোদার গর্ভে মহাবিষ্ণু জন্মিয়াছে।।
চারি শক্তি একযোগে হয় কৃষ্ণ লীলা।
ভাগবতে শুকদেব মিমাংসা করিলা।।
বহুত প্রমাণ লাগে সে সব লিখিতে।
অন্যান্য প্রমাণ গ্রন্থে র’য়েছে বর্ণিতে।।
চৈতন্যচরিতামৃত তাহার প্রমাণ।
বহু যুগ গত পরে এল ভগবান।।
নন্দসূত ব’লে যারে ভাগবতে গাই।
সেই কৃষ্ণ অবতীর্ণ চৈতন্য গোঁসাই।।
বহুত দ্বাপর কলি আসে আর যায়।
স্বয়ং এঁর অবতার তাতে নাহি হয়।।
অষ্টাবিংশ মন্বন্তর শেষ যেই কলি।
অবতীর্ণ ভক্তবৃন্দ লইয়া সকলি।।
যে দ্বাপরে অন্য শক্তি বিবর্জিত হ’য়ে।
গোলোকবিহারী লীলা গোলকে আসিয়ে।।
দ্বাপরের শেষ সেই কলির সন্ধ্যায়।
শ্রীগৌরাঙ্গ রুপে প্রভু জন্ম নদীয়ায়।।
এই সেই কলি এই সেই অবতার।
অনর্পিত প্রেম ভক্তি অর্পিল এবার।।
সেই তো গৌরাঙ্গ প্রভু এই কলিকালে।
অবতীর্ণ নদীয়াতে হরি হরি বলে।।
উৎকলেতে লীলা সাঙ্গ অল্পেতে করিল।
মনের কামনা বহু মনেতে রহিল।।
চৈতন্যচরিতামৃত মঙ্গলাচরণে।
প্রভুর মনের কথা লিখিল যতনে।।
দাস্য সখ্য বাৎসল্য মধুর চারি রস।
চারি ভাবে ভক্ত হত কৃষ্ণ তার বশ।।
আপনিও এই ধর্ম করিব যাজন।
ইহা দ্বারা করাইব ভক্তের শিক্ষণ।।
সন্যাস করিল প্রভু এই ধর্ম লয়ে।
রাগানুগা প্রেমভক্তি হাটে বাহুড়িয়ে।।
গৌড়িয়ার ভক্ত তার নাহি পায় লেশ।
শুদ্ধাচার সেবা ভক্তি নাম ভাবাবেশ।।
আটচল্লিশ বর্ষ পরে প্রভু দিল ফাঁকি।
এই ত প্রতিজ্ঞা এক রহিলেক বাকী।।
কাশিতে বসিয়া সনাতনে শিক্ষা দিলা।
সনাতনে শিক্ষাকালে অনেক কহিলা।।
অকামনা প্রেম ভক্তি কেবলার রীতি।
আপনি বা তাহা কই পারিল বর্তাইতি।।
কেবলার রীতি এই কৃষ্ণেতে ঐকান্তি।
তার আগে ভক্তি মুক্তি সকলি অশান্তি।।
কৃষ্ণ গত প্রাণ হ’বে কৃষ্ণ সুখে সুখী।
কার দেহ লয়ে প্রভু মারে ঝাঁকি ঝুকি।।
কৃষ্ণতে অর্পিত দেহ এদেহ কৃষ্ণের।
আছুক অন্যের কার্জ নিজে হৈল ফের।।
হাত পা বাহির হ’য়ে সন্ধিকল ছুটে।
কচ্ছপ আকার হ’য়ে ক্ষণে পৈশে পেটে।।
যদ্যপি প্রভুর মনে থাকে কোন ভাব।
যা দেখিনু তা লিখিনু গ্রন্থের যে ভাব।।
তবেত প্রভুর মনে কামনা রহিল।
অকামনা প্রেম ভক্তি কই পাওয়া গেল।।
কামনা রহিল আছে দৃষ্টান্ত তাহার।
অদ্বৈতেরে করে ধরি বলে বার বার।।
বৈকুণ্ঠাদ্যে নাহি সেই লীলার প্রচার।
শেষ যে করিব লীলা মোরে চমৎকার।।
তুমি আমি নিত্যানন্দ এই তিন জন।
করিব নিগুড় লীলা রস আস্বাদন।।
তুমি হ’বে রামচন্দ্র আমি শ্রীনিবাস।
দাদা নিত্যানন্দ হবে নরোত্তম দাস।।
শেষ লীলা তিন জন করিল আসিয়া।
প্রচারিল প্রেম ভক্তি খেতর যাইয়া।।
নিগুড় ভজন লীলা করে তিন জন।
ভাগ্যবান ভক্ত যারা করে দরশন।।
তাদের ভজন গ্রন্থ পড়ে দেখ ভাই।
অকামনা প্রেম ভক্তি তাতে বর্তে নাই।।
উদ্দেশ্য থাকিল পুনঃ আসিয়া ধরায়।
ঐ প্রেম আস্বাদিবে তিন মহাশয়।।
সে কারণ অবতার হৈল প্রয়োজন।
সফলানগরী যশোমন্তের নন্দন।।
শচীর নন্দন যবে পড়ে পাঠশালে।
পড়ুয়ার সঙ্গে সদা হরি হরি বলে।
যে জন না বলে হরি কর্মসুতে মরে।।
ঠেঙ্গা লয়ে যায় প্রভু তারে মারিবারে।
সেই গিয়া করে সায় পাষণ্ড সঙ্গেতে।
মারিব মিশ্রের সুতে আইলে মারিতে।।
অন্তর্যামী ভগবান জানিলেন চিতে।
এরুপে না পারিলাম হরিনাম দিতে।।
একবার মাতাকে দিলাম পরিচয়।
গ্রহণের বেড়ি গড়ি দিল মোর পায়।।
স্বীয় পরিচয় তাহে দিবার কারণে।
উদয় হইনু হাত গণকের স্থানে।।
সে মোরে গণীয়া বলে নন্দের নন্দন।
এবে শচীসুত জীব উদ্ধার কারণ।।
কর্মসুত্রে বদ্ধ জীব না চিনিল মোরে।
গণীয়া দেখিয়া বলে একি হ’তে পারে।।
প্রভু কন তার পূর্ব জন্মে কে বা আমি।
ঠিক করি গণনা করহ দেখি তুমি।।
গণক বলেন ছিলে অযোধ্যায় রাম।
কৌশল্যা জননী পিতা দশরথ নাম।।
তুমি ছিলে রামচন্দ্র জগতের মূল।
ফিরে বলে এ গণনায় হইয়াছে ভুল।।
বদ্ধ কর্মসুত্রে জীব উদ্ধারি কেমনে।
কাঙ্গাল হইব আমি তাহার কারণে।।
কেশ মুড়ি কড়া ধরি হইব কাঙ্গাল।
ঘরে ঘরে মেগে খাব হইয়া বেহাল।।
কাঁদিয়া কাঁদিয়া পুরাইব মনস্কাম।
হাতে ধরি পায় ধরি দিব হরিনাম।।
কাঙ্গাল দেখিয়া মোরে দয়া উপজিবে।
চিত্ত দ্রবিভুত হ’য়ে হরিনাম ল’বে।।
মুকুন্দমুরারী আর নিত্যানন্দ ল’য়ে।
কহিলেন মনকথা নিভৃতে বসিয়ে।।
পরে কহিলেন শচী মাতাকে কাঁদিয়া।
তাহা শুনি শচীরাণী অধৈর্য হইয়া।।
কহিলেন শচীমাতা বাছারে নিমাই।
ছেড়ে যদি যাও রাখিবার সাধ্য নাই।
অনেক প্রলাপ মাতা করিল তাহাতে।
সান্তনা করিল মাকে মধুর বাক্যেতে।।
শচী বলে তুমি যদি মোরে ছেড়ে যাবে।
এ ব্রহ্মাণ্ডে তবে আর মাতা কে মানিবে।।
এ সময় গৌরাঙ্গ করিল অঙ্গীকার।
তোমাকে ছাড়িতে মাতা শক্তি কি আমার।।
শোধিতে নারিব মাতা তব ঋণধার।
জন্মে জন্মে তব গর্ভে হব অবতার।।
ধর্ম সংস্থাপন আর জীবের উদ্ধার।
এই রূপে লইব জন্ম আর দুইবার।।
তারপর শ্রীনিবাসরূপে জন্ম নিল।
নরোত্তমরূপে নিত্যানন্দ জন্মিল।।
আর এক জন্ম বাকী রহিল প্রভুর।
এই সেই অবতার শ্রীহরি ঠাকুর।।
মহানন্দ চিদানন্দ রচিতে পুস্তক।
পয়ার প্রবন্ধ ছন্দে রচিল তারক।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!