ভবঘুরেকথা
গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু চৈতন্য নিমাই বৈষ্ণব

মাতৃগর্ভ মহাপদ্মে মহামন্ত্র মুপাশ্রিতা:।
তন্মন্দ্রো বিস্মৃতি যেন গর্ভাবাসং পুন:পুন:।।

মাতৃগর্ভে জীব যবে সঞ্চার করয়।
পশ্চম মাসেতে জীব দেহ পুষ্ট হয়।।
ষষ্ঠ মাসে ভুগে যত গর্ভের যন্ত্রণা।
বলিব বিশেষ কিবা চৈতন্য থাকে না।
সপ্তম মাসেতে পরমাত্মা মহাগুরু।
জীবকে চৈতন্য দেয় মহামন্ত্র সুরু।।
চৈতন্য পাইয়া জীব চক্ষু মেলি চায়।
পরমাত্মা প্রভু সেই সম্মুখে দাঁড়ায়।।
আত্মাজ্ঞানে পূর্ণ জীব থাকয়ে তখন।
গর্ভের যন্ত্রণা যত হয় নিবারণ।।
পরমাত্মা দেখি জীব স্তুতিবাদ করে।
শত জনমের কথা মনে তার পরে।।
জীবের শুনিয়া স্তুতি পরমাত্মা বলে।
গর্ভবাস কষ্ট যাবে জন্মুদ্বীপে গেলে।
জীব বলে জম্বুদ্বীপে যাইতে চাহি না।
কতবার সেই দেশে পেয়েছি যন্ত্রণা।।

জন্বুদ্বীপে যাইবার শক্তি নাহি আর।
হেথা থাকি নিরখিব শ্রীরূপ তোমার।।
যতেক যন্ত্রণা ছিল এখানে আমার।
সর্ব্বজ্বালা দূরে গেল দর্শনে তোমার।
কতকাল চুরাশীতে করেছি ভ্রমণ।
কভু তব সঙ্গে দেখা নহে নারায়ণ।
বহু কষ্টে বহু জন্মে পেয়েছি তোমায়।
তোমাকে ছাড়িয়া যেতে মন নাহি চায়।
জম্বুদ্বীপে গেলে প্রভু তোমা না পাইব।
সংসার জ্বালায় সদা জ্বলিয়া মরিব।।
জম্বুদ্বীপে লোক সব মায়াবাদী হয়।
মায়াপাশ গলে বান্ধি দিবে যে নিশ্চয়।।
মায়াতে মোহিত হয়ে তোমাকে ভুলিব।
মায়াবাদী লোকসঙ্গে মায়াতে মজিব।।
অনিত্য আচারে আমি অন্যায় শিখিব।
নিত্য বস্তু তোমা ধনে তাতে ধনে তাতে পাশরিব।।

জম্বুদ্বীপে লোক সব থাকিয়া অজ্ঞানে।
পরমাত্মা পরম ব্রহ্ম কিছু নাহি জানে।।
হেন আজ্ঞা না করিও প্রভু তুমি তারে।
এমন দেশেতে আমি যাই কি প্রকারে।।
তাদের অজ্ঞানী আমি বলি কি কারণ।
সেই কথা প্রভু আমি করি নিবেদন।।
পঞ্চভুত আরদ্ধেতে ধান্যাদি জন্মায়।
সেই ধান্যে তন্ডুলাদি প্রস্তুত যে হয়।।
তন্ডুল করিয়া পাক জীবে অন্ন খায়।
নানামতে ভুক্তদ্রব্যে দেহ রক্ষা পায়।।
অসারেতে মলমূত্র শুক্রাদি সারাংশ।
মাতা ঋতুবতী কালে পিতৃ শুক্র স্পর্শে।।

সন্তান জন্মায়ে তাতে শুন নারায়ণ।
মায়াবাদী লোকে বলে আমার সন্তান।।
এমন অজ্ঞানী দেশে আমি ত যাব না।
বহুবার পাইয়াছি সংসার যাতনা।।
ত্রিতাপ যন্ত্রণা আর ভুগিতে না চাই।
এই নিত্য স্থানে তোমা হেরিব সদাই।।
এতশুনি পরমাত্মা জীব প্রতি কয়।
শুন ওহে জীব মোর বচন নিচয়।।
এই গর্ভবাসে তুমি না পার থাকিতে।
প্রসব না হলে তার মরণ নিশ্চিতে।।
নারীবধ পাপ তব হইবে তাহাতে।
পুনশ্চ নরকে তুমি যাবে সে পাপেতে।।
পূর্ব জন্মার্জিত যত ছিল পাপচয়।
মোর দরশনে সব পরিত্যাগ হয়।।
সেই পাপ গ্রহণ না করহ আবার।
জম্বুদ্বীপে ত্বরান্বিতে যাহ একবার।।

জীব কহে জম্বুদ্বীপে তোমা নাহি পাব।
সে দেশের পাপ পুণ্য কিসেতে নাশিব।।
পরমাত্মা বলে শুন আমি সাধু বেশে।
জীব নিস্তারিতে সদা ঘুরি জম্বু দেশে।।
যদি কভু সাধুসঙ্গ হয় গো তোমার।
তার কাছে জিজ্ঞাসিহ সংবাদ আমার।।
এইসব দেহতত্ত্ব বলিবারে পারে।
তুমি তবে গুরু স্বীকার কর সে সাধুরে।।
তার মুখে মহামন্ত্র শুনিবে তখন।
মন্ত্রার্থে চৈতন্যরূপে পাবে দরশন।।
মহামন্ত্র স্মৃতি পুন: যদি না হইবে।
চুরাশী লক্ষটা যোনি আবার ভ্রমিবে।।
পরমাত্মা স্থানে জীব হেন আজ্ঞা পায়।
স্বীকার করিয়া তবে জম্বুদ্বীপে যায়।
জীব যবে দ্বীপ যাত্রা করিল স্বীকার।
পরমাত্মা প্রভু তবে হয়ে গেল পার।
মহামন্ত্র সে অবধি জীব জপ করে।
পাপ তাপ ভুলি থাকে আনন্দ মাঝারে।।

কালক্রমে যবে হল প্রসব সময়।
জীব আসি জম্বুদ্বীপে জন্ম লভয়।।
জন্মমাত্র নারী সবে উলুধ্বনী করে।
ভুলি মহামন্ত্র জীব কাঁদে উচ্চৈ:স্বরে।।
লোকে নাহি বুঝে শিশু কাঁদে কি কারণ।
ক্রন্দন কারণ হেতু করায় স্তনপান।।
ক্রমে ক্রমে শিশু যবে বয়োধিক্য হয়।
মায়াবাদী মায়াকর্ম্ম শিখাইয়া লয়।।
মায়াহেতু কর্ম্মবদ্ধ থাকি নিরন্তর।
পরমাত্মা কথা ভুলি রয় স্বতন্তর।।
ভাগ্য ফলে সাধুসঙ্গে পায় আত্মজ্ঞান।
জ্ঞানস্মৃতি ফলে দেখে আত্মা ভগবান।
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে আছে প্রকাশিত।
বদ্ধ আর মুক্ত জীব আছে দুই মত।।
অজ্ঞানান্ধকার আছে সংসারে আসক্ত।
তাকে বলে বদ্ধজীব শাস্ত্রে আছে ব্যক্ত।।

নিষ্কাম হইয়া কর্ম্ম সংসারেতে বয়।
সেইজন মুক্তজীব জানিহ নিশ্চয়।।
বদ্ধজীব মায়াচ্ছন্ন ভুগিছে সংসারে।
মুক্তজীব শ্রীকৃষ্ণ ভজন অধিকারে।।
আত্মজ্ঞানে নাহি হয় আত্মার চেতন।
কৃষ্ণপ্রাপ্তি দূরে থাক সংসারে পতন।।
সংসারাদি পাপ পূণ্য থাকিতে দেহেতে।।
না হইবে কৃষ্ণপ্রাপ্তি জানিহ নিশ্চিতে।।
পরমাত্মা সহ জীব বাক্যাবদ্ধ রয়।।
বাক্যভ্রষ্ট অপরাধী মুক্ত কিসে হয়।।
ঈশ্বরে প্রত্যয় ভিন্ন ব্রজভাব নিলে।
বিকর্ম্মে নরক লভ্য হইবে মরিলে।।
সে জ্ঞান চৈতন্যহীনে মনন করয়।
মননতা সিদ্ধি তার কোন কালে নয়।।
মহানির্ব্বাণ তন্ত্রেতে যে বলে পঞ্চানন।
শুনহ পার্ব্বতী গর্ভবাসের কথন।।
শুন শুন সাধুজন সেই ইতিহাস।
ভবিষ্যতে কর যেন সাধু সঙ্গে বাস।।
বামন হইয়া চাহি পর্বত লংঘিতে।
অজ্ঞান হইয়া চাহি জ্ঞান উন্মেষিতে।।
পরমাত্মা প্রতি ভক্তি হতে মোর আশ।
পয়ার প্রবন্ধে কহে শ্রীচরণ দাস।।

……………………………………..
তত্ত্বরসামৃত জ্ঞানমঞ্জরী
-শ্রীশ্রী চরণ দাস

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!