মুনি ব্যাসদেব বেদ ঋষি সাধু গুরু

গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

চার
শাক্ত সম্প্রদায় হলো কালীর সাধক। মা কালী হলেন আদ্যাশক্তি; অর্থাৎ সৃষ্টির আদি দেবী/শক্তি বা কারণ, পরমেশ্বরী। শাক্ত মতে, কালী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। তন্ত্র অনুসারে কালী দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পূর্বে সকল কিছুই ছিল শূন্য। সকল কিছুই ছিল অন্ধকার। সকল কিছুই ছিল কালো এবং সময়ের ঊর্দ্ধে।

মহাবিস্ফোরেণের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মাণ্ড প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ যাত্রা শুরু করে। অর্থাৎ সময়চক্র গতিময়তা পায়। সময়চক্র সৃষ্টির আদিতে সকল কিছুই ছিল অন্ধকারময়-কালের ঊর্দ্ধে অর্থাৎ ‘কালী’। যা কাল শব্দ থেকে এসেছে।

শাক্ত সম্প্রদায়ের প্রধান ২টি উপসম্প্রদায় বিদ্যমান- শ্রীকুল সম্প্রদায় ও কালীকুল সম্প্রদায়। শ্রীকুল সম্প্রদায়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ত্রিপুরাসুন্দরী। এই ধারার সাধক ছিলেন আদি শঙ্করাচার্য। আর কালীকুল সম্প্রদায়টি বঙ্গদেশে বিস্তার লাভ করে। কালীকুল সম্প্রদায়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন কালী।

শাক্তদের আদিগুরু হলো চণ্ডী। চণ্ডী মূলত মা দুর্গা তথা কালীর আরেক রূপ। আর এই চণ্ডী থেকেই জগতের সৃষ্টি। সৃষ্টির আগেও ছিল চণ্ডী। তাই তারা চণ্ডীর নামেই গুরুমন্ত্র নিয়ে থাকে। তাদের প্রধান ক্রিয়া-ভজন-সাধন অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে হলেও গুরুপূর্ণিমা তাদের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তারাও ঘটা করে নানা ফল-ফুল-নৈবদ্য দিয়ে গুরুপূর্ণিমা পালন করে থাকেন।

বৌদ্ধধর্ম মতে, গয়ায় বোধিবৃক্ষের নীচে মোক্ষলাভের পাঁচ সপ্তাহ পর এই পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম বাণী দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এই দিনই গুরু হিসেবে বুদ্ধদেবের প্রথম আত্মপ্রকাশ। তাই বৌদ্ধরা এই পূর্ণিমাকে বিশেষ মর্যাদায় পালন করে থাকে।

ঈশ্বরের রাজ্যে প্রত্যেকেরই প্রত্যেকের নিকটে শিক্ষার্থী হওয়া আবশ্যক হয়। কোনও মানুষ সর্ব্ববিষয়ে সম্পূর্ণরূপে অভ্রান্ত নহেন, অথবা কেহই সর্ব্ববিষয়ে শিক্ষা দান করিতে সমর্থ নহেন। ব্রাহ্মধর্ম্ম অভ্রান্ত গুরুবাদ অথবা ‘মন্ত্রদাতা গুরুর’ মত স্বীকার করেন না। গুরুর নিকটে ‘মন্ত্র’ গ্রহণ, গুরু দ্বারা ‘শক্তি সঞ্চার’, গুরুবাক্য অবিচারে পালন, প্রভৃতি হইতে ব্রাহ্ম সযত্নে দূরে থাকিবেন।

জৈনরা বিশ্বাস করেন, এই দিনেই মহাবীর তাঁর প্রথম শিষ্য হিসেবে গান্ধারের গৌতম স্বামীকে স্বীকার করেন। তীর্থঙ্কর মহাবীরের গুরু হিসেবে আত্মপ্রকাশের এই দিনটি তাদের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিং ১৬৯৯ সালে পাঞ্জাবের আনন্দপুরে স্রষ্টার সেনাদল হিসেবে ‘খালসা’ প্রবর্তন করেন। ধর্ম, জাতি, কুল ইত্যাদি বিবেচনা না করে, সকলে একই স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে সকলকে আশ্রয়, পালন ও রক্ষা করা এই সেনাদলের কাজ বলে নির্ধারণ করেন।

তিনি প্রথমে পাঁচজন বীরকে ‘খালসা’ বা পবিত্র ধর্মে দীক্ষা দেন। পরে এই ‘পঞ্চ পিয়ারে’ দ্বারা গুরু গোবিন্দ সিং দীক্ষিত হন। তিনি পরবর্তীতে আরও অনেক শিখকে ‘খালসা’ হিসাবে দীক্ষা দেন। ‘খালসা’ হিসাবে দীক্ষা গ্রহণকারীদের বলা হয় ‘অমৃতধারী’।

সকল শিখ গুরুর জন্মদিনে গুরদুয়ারায় গুরুর নামে গুরুপরব উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তবে গুরু নানক ও গুরু গোবিন্দ সিং এর গুরুপরব উৎসব বিশেষভাবে পালিত হয়।

গুরু গোবিন্দ সিং এর শেষ নির্দেশ হলো- আর গুরু নয়, তাঁর পর থেকে সকল ধর্মাদেশ গুরুগ্রন্থসাহিব থেকেই নিতে হবে। গুরুকে ভালবাসবে, সকলকে সমান ভাববে, সবার জন্য সমবেদনা, গর্ব নয়, অহঙ্কার নয়, বিনয় ব্যবহারেই ধর্ম পালিত হবে। সাধক কবীর তাঁর দোঁহায় বলছেন-

‘ত্যাজো অভিমানা, শিখ জ্ঞানা,সৎগুরু সংগত তরতা হৈ।
কহই কবীর কই বিরলহংসা,জীবতোহি যো মরতা হই।’

অর্থাৎ অভিমান (অহং) ত্যাগ করে জ্ঞান শিক্ষা করো। সৎ গুরুর সঙ্গ পেলেই পরিত্রাণ।

সকলে না পালন করলেও অনেক শিখরাই গুরুপূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে বিশেষ অনুষ্ঠানাদি করে থাকে। এই দিনে গুরু নানক ও গুরু গোবিন্দ সিং সহ মান্য অন্যান্য গুরুদের ভক্তি ভরে স্মরণ করে। দেয়া হয় নিরন্ন মানুষকে অন্ন সেবা।

অন্যদিকে ব্রহ্মাসমাজ মতাদর্শে উল্লেখ আছে, যাঁহার নিকট হইতে ধর্ম্মবিষয়ে শিক্ষা অথবা সাহায্য লাভ করা যায়, তিনিই গুরু। তাঁহার নিকটে সে জন্য অবনত মস্তকে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা উচিত।

ঈশ্বরের রাজ্যে প্রত্যেকেরই প্রত্যেকের নিকটে শিক্ষার্থী হওয়া আবশ্যক হয়। কোনও মানুষ সর্ব্ববিষয়ে সম্পূর্ণরূপে অভ্রান্ত নহেন, অথবা কেহই সর্ব্ববিষয়ে শিক্ষা দান করিতে সমর্থ নহেন। ব্রাহ্মধর্ম্ম অভ্রান্ত গুরুবাদ অথবা ‘মন্ত্রদাতা গুরুর’ মত স্বীকার করেন না। গুরুর নিকটে ‘মন্ত্র’ গ্রহণ, গুরু দ্বারা ‘শক্তি সঞ্চার’, গুরুবাক্য অবিচারে পালন, প্রভৃতি হইতে ব্রাহ্ম সযত্নে দূরে থাকিবেন।

আবার বৈষ্ণব মতে বলা আছে, যিনি অজ্ঞানী জীবকে, মাতৃগর্ভের সপ্তম মাসে সেই পারমার্থিক তত্ত্ব জানাইয়া জীবন মুক্ত করেন, নাম ও মন্ত্র দ্বারা নববিধ ভক্তি জানাইয়া চেতন করাইয়াছেন, তাহাই শ্রীচৈতন্য গুরুর চরণ আশ্রয়।

তত্ত্বরসামৃত জ্ঞানমঞ্জরী শ্রীশ্রী চরণ দাস লিখছেন-

‘ব্রাহ্মাণ্ডেতে যাহা আছে ভাণ্ডে তাহা পাই।
গুরুকৃপা হলে তাহা জাবিবে সবাই।।’

‘সর্ব্ব তত্ত্বাতীতে গুরু জীবের জীবন।
হেন গুরু না ভজিয়া জন্ম অকারণ।।’

‘নির্ভর করিয়া লও গুরু পদাশ্রয়।।
অবশ্য হইবে জ্ঞাত ঘুচিবে সংশয়।।’

‘জীবের নিস্তার লাগি ভগবান হরি।
ধরাতে প্রকাশ হন গুরুরূপ ধরি।।
মহিমাতে গুরু কৃষ্ণ সমতুল্য জান।
গুরু আজ্ঞা হৃদে তাই সত্য করি মান।।

গুরুদেব যার প্রতি অসন্তুষ্ট হন।
রক্ষিতে না পারে তারে দেবতা কখন।।
কৃষ্ণ রূষ্ট হলে গুরু পারে রক্ষিবারে।
গুরু রূষ্ট কৃষ্ণ কভু না রাখে তাহারে।।

গুরুকে মনুষ্য জ্ঞান করো না কখন।
গুরুনিন্দা যেন কর্ণে না কর শ্রবণ।।
গুরুনিন্দা যথা হয় তথা না যাইবে।
গুরু নিন্দুকের মুখ কভু না দেখিবে।

শ্রীগুরু চরণ পদ্ম হৃদে করি আশ।
পয়ার রচিয়া কহে শ্রীচরণ দাস।।’

‘গুরুবিনা নিস্তারিতে কেবা আছ আর।
হরিভক্তি বিলাসেতে আছয়ে বর্ণন।
মন দিয়া সেই কথা শুন ভক্তগণ।।

গুরুতে আসক্তি হয় বলবান যার।
শাস্ত্র পড়ি কৃষ্ণভক্তি লাগে না তাহার।।
গুরু পাদপদ্মে নিষ্ঠা আছে যার মন।

কোন শাস্ত্র না পড়িয়া পণ্ডিত সে জন।।
যথা তথা পাও যদি গুরুর দর্শন।’

বৈষ্ণব মতে বলে,

‘গুরু রেখে যে গোবিন্দ ভজে, তার দেহ নরকে মজে।’

অর্থাৎ গুরুকে ভক্তি না করে যে দেবতার পুজা প্রার্থনায় রত থাকে তার নরক নিশ্চিত।

একথাও বলা হয়-

‘কৃষ্ণ রুষ্ট হইলে গুরু রাখিবারে পারে,
গুরু রুষ্ট হইলে কৃষ্ণ রাখিবারে নারে।”

অর্থাৎ ভগবান রুষ্ট হলে শ্রীগুরু রক্ষা করতে পারেন- কিন্তু শ্রীগুরু রুষ্ট হলে ব্রহ্মাণ্ডের কেউ রক্ষা করতে পারে না।

বৈষ্ণব সমাজে গুরুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। বৈষ্ণব মতে আদিগুরু বা প্রথমগুরু হলেন কৃষ্ণ। কারণ কৃষ্ণই ভগবান। হস্তিনাপুরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি বন্ধু-সারথি-গুরু-ভগবান হয়ে শিষ্য অর্জুনকে দান করেছিলেন জগতের গুরুজ্ঞান। দিয়েছিলেন নর থেকে নারায়ণ হওয়ার শিক্ষা।

শৈশবে মা যশোধাকে নিজ মুখের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড দেখিয়ে শ্রীকৃষ্ণ জগতকে বুঝিয়েছিলেন তিনিই ভগবান-তিনিই নারায়ণ। তার থেকেই জগৎ সৃষ্টি। আবার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দান করে নিজ ভগবান মূর্তি ধারণ করে দেখিয়েছিলেন। যে রূপ সাধারণ চোখে দেখবার সাধ্য নেই কারো।

তাই সেই আদিগুরু শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে গুরুপূর্ণিমা তারাও বেশ জমকালোভাবে পালন করে। কৃষ্ণকে ভক্তি দিয়ে, ব্যাসদেবকে ভক্তি দিয়ে তারপর নিজ নিজ গুরুকে ভক্তি দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয়। সাজানো হয় পূজার নৈবেদ্য। ভক্তদের মাঝে বিলানো হয় প্রসাদ।

গুরুবাদী নাথদের মধ্যে গুরুপূর্ণিমা পালনের রীতি দেখা যায়। তারা মূলত গোরক্ষনাথ ও নিজ নিজ গুরুকে ভক্তি নিবেদন করে। তারা তন্ত্র সাধক হওয়ায় তাদের সাধন-ভজন রীতি যেমন আলাদা তেমনি তাদের বেশভূষাও ভিন্ন।

আবার বৈষ্ণবদের মধ্যে অনেকে ফাল্গুনের গৌড় পূর্ণিমাকে গুরুপূর্ণিমা হিসেবে চিহ্নিত করেন। শ্রীচৈতন্য দেবের এই আবির্ভাব তিথিটি তার ভক্ত ও অনুসারীরা বিশেষ ভক্তিপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় পালন করে থাকে। কারণ গুরু-শিষ্য পরম্পরায় চৈতন্যদেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন গুরু। এই পূর্ণিমা ‘দোল পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত।

যিনি গুরুভক্তিতে গুরুতে লীল হওয়ার সহজ-নান্দনিক-শৈল্পিক পথ প্রবর্তন করেন। নৃত্য-গীত-বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে ভক্তি নিবেদনের মধ্য দিয়ে গুরুর মাঝে লীন হওয়ার এই পথ হলো সহজ-শুদ্ধ প্রেমের পথ।

অন্যদিকে গুরুবাদী নাথ ধর্মের প্রবর্তক যোগী মীননাথ। তিনিই তাদের প্রথম গুরু। এ ধর্মে কোনো ঈশ্বর নেই। নাথ সাধনার কেন্দ্রবিন্দু হলো গুরু। নাথ ধর্মের প্রথম গুরু মীননাথের যোগ্য শিষ্য গোরক্ষনাথের প্রচেষ্টায় এই ধর্মমত প্রতিষ্ঠা পায়।

ড মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার বাঙলা সাহিত্য কথা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘নাথপন্থা যে বৌদ্ধ মন্ত্রযান হইতে উদ্ভূত বা প্রভাবিত তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই। এই নাথ পন্থা বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান শাখার শূন্যবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত।’

নাথ সাধনে ছয়মাস কঠিন সংযমাদি পালন করতে পারলে শিষ্য গুরুর দীক্ষা প্রাপ্তির উপযোগিতা লাভ করে। দীক্ষাগ্রহণের পর গুরুর নিদের্শিত বেশভূষা ধারণ করতে হয় শিষ্যকে। দীক্ষাগ্রহণের পর যোগী গুরুর নির্দেশে আজীবন ব্রহ্মচর্যা বা গার্হস্থ্যধর্ম পালন করতে পারে।

গুরুবাদী নাথদের মধ্যে গুরুপূর্ণিমা পালনের রীতি দেখা যায়। তারা মূলত গোরক্ষনাথ ও নিজ নিজ গুরুকে ভক্তি নিবেদন করে। তারা তন্ত্র সাধক হওয়ায় তাদের সাধন-ভজন রীতি যেমন আলাদা তেমনি তাদের বেশভূষাও ভিন্ন।

পাঁচ
বৈদিক ভারতে তপোবন-কেন্দ্রিক আশ্রমভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। যার মূল ভিত্তি ছিল ‘গুরুকুল’, ‘গুরু-শিষ্য পরম্পরা’ ও ‘সম্প্রদায়’ প্রথা। এই পরম্পরায় গুরু শুধু একজন শিক্ষকই নন। তিনি নিজেই গোটা একটি প্রতিষ্ঠান।

সেসময় শিক্ষার্থীরা কেবল শিক্ষাগ্রহণের জন্যই নয়, জীবনের নিগূঢ় সত্য উপলব্ধির উদ্দেশ্যে গুরুর চরণে নিজেকে সমর্পিত করত। গুরুই একমাত্র আরাধ্য, গুরুর নির্দেশই শেষ কথা মেনে শিক্ষার্থীকে গুরুর আশ্রয়ে যেতে হতো। এটাই ছিল শিক্ষার মূল ধারা।

বলা হয়, গুরু স্বয়ং ত্রাতা। এই বিশ্ব চরাচরের সমস্ত সৃষ্টির উৎস বা কারণ হলেন স্রষ্টা। স্রষ্টা থেকেই ব্রহ্মাণ্ডের সকল সৃষ্টির উদ্ভব; সকল সৃষ্টিই তার অংশ মাত্র। তাই প্রত্যেক সৃষ্টিরই আছে তার স্রষ্টাকে-তার পূর্ণতাকে জানবার পূর্ণ অধিকার। নিজের অজান্তেই প্রত্যেক সৃষ্টিই সেই পরম স্রষ্টাতে অর্থাৎ নিজের পূর্ণাতাতে লীন হয়ে যাওয়ার গোপন বাসনা লালন করে।

সকল সৃষ্টির মধ্যে মানবদেহে জন্ম নেয়া প্রাণেরই থাকে সর্বোচ্চ সম্ভবনা সেই পরমের দর্শন লাভ করার। আশিক হয়ে তাঁর দিদারে লীন হয়ে যাওয়ার। কিন্তু সরাসরি স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক তৈরি করা সকলের জন্য সহজ নয়। তার জন্য প্রয়োজন হয় একজন পথপ্রদর্শকের। আর সাধন পথে সেই পথপ্রদর্শকই পরিচিত ‘গুরু’ নামে।

গুরুগীতায় বলা হয়েছে-

গুকারশ্চান্ধকারঃ স্যাদ্ রুকারন্তন্নিরোধকঃ।
অন্ধকারনিরোধিত্বাৎ গুরুরিত্যভিধীয়তে।।

অর্থাৎ গুরু শব্দে ‘গু’ অর্থ অন্ধকার আর ‘রু’ অর্থ আলোকিত। যিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিশা দেখান তিনিই গুরু।

যিনি মানব জীবনের জাগতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক এই তিন স্তরের অন্ধকার দূরীভূত করেন তিনিই প্রকৃত গুরু। জন্মজন্মান্তর ধরে মানুষ যে সংস্কারের বোঝা সঞ্চয় করে চলে। তার ফলে সে যে পরমেরই অংশ সেই স্মৃতি, বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে ফেলে। আর এই ভুলে যাওয়ার ফলেই দেহ ধারণ করে পুনপুন জন্মেই চলতে হয় জীবকে।

আর এই জীবকে উদ্ধার করতে। সেই ভুলে যাওয়া স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে। স্রষ্টার সাথে পুন সংযোগ করিয়ে দেয়ার ভূমিকা রাখেন সদগুরু। মানুষ বদ্ধজীব হিসেবে সহস্র-লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে মানবদেহ ধারণ করে। সকল জন্মের মানুষ পিতা-মাতা-শিক্ষক-ভাই-বন্ধু-সঙ্গী পায়। কিন্তু অন্ধকারাচ্ছন্ন মন আলোকিত হয় না। গুরু হচ্ছেন সেই জন যিনি মুক্তির পথ দেখান। এ প্রসঙ্গে চৈতন্যমঙ্গলে বলা হয়েছে-

সকল জন্মে পিতামাতা সবে পায়।
কৃষ্ণ গুরু নাহি মিলে, ভজহ হিয়ায়্।।

মাতৃগর্ভ থেকেই মানুষ জ্ঞান লাভ করতে শুরু করে। তাই ভূমিষ্ঠ হবার পর মা’ই হয় মানুষের প্রথম গুরু- মাতৃগুরু। এরপরে পিতা হন পিতৃগুরু। এরপর মানুষ জীবনের বিভিন্ন সময় প্রাপ্ত হয় শিক্ষাগুরু, কুলগুরু, দীক্ষাগুরু প্রমুখ।

(চলবে…)

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………….
আরো পড়ুন:
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: এক
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: দুই
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: তিন
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: চার
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: পাঁচ
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: ছয়

গুরুপূর্ণিমা
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন

 

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!