ভবঘুরে কথা
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

গুরুবাদী বিভিন্ন মত-পথে গুরুপূর্ণিমা বিশেষ গুরুত্ব বহন করলেও লালন মতে কি গুরুপূর্ণিমা আছে? লালন মতে পূর্ণিমা যোগ একটা বিশেষ লগ্ন হলেও ফকির লালন সাঁইজি কি এই পূর্ণিমাকে বিশেষ কোনো গুরুত্ব দিয়েছেন? তিনি কি পালন করতেন গুরুপূর্ণিমা? তার মতের অনুসারীরা কি পালন করে? করে থাকলে কি রূপে পালন করে? না করলে কেনো করে না? গুরুপূর্ণিমা নিয়ে এমনো হাজারো প্রশ্ন যখন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে তখন শাস্ত্র-কেতাব আর না ঘেঁটে সাধুগুরুদেরই স্মরণাপন্ন হলাম। কুষ্টিয়াসহ দেশের বেশ কয়েকজন সাধুগুরুর সাথে আলাপচারিতায় জানতে পারলাম এর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে। এই গুরুপূর্ণিমা পালন করা নিয়ে যেমন সাধুগুরুদের যুক্তি আছে যার যার মতো করে। আবার যারা পালন করেন না তারাও তাদের পরম্পরা মেনে তা করেন না।

সাধুগুরুদের প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুতে ভিন্নতা থাকলেও প্রত্যেকের কথাই মনোমুগ্ধকর। প্রত্যেকের কথার পেছনেই আছে যুক্তি-আছে বোধ। কেনো পালন করছেন বা কেনো পালন করছেন না গুরুপূর্ণিমা এ নিয়ে প্রকৃতপক্ষে বিরোধের কিছু নেই। আগে থেকেই কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হবারও কিছুই নেই। স্বয়ং ফকির লালন সাঁইজিই বলেছেন- “আগে বোঝ পরে মজ, নইলে দলিল মিথ্যা হয়।”

সে করণে প্রত্যেকের মতামত সমান গুরুত্ব নিয়ে জানতে হবে-বুঝতে হবে। তারপর মননে নিতে হবে। তবেই না সত্যের কাছে পৌঁছানো যাবে। নইলে হাপুর হুপুর ডুব দেয়াই সারা। তাহলে আর দেরি না করে চলুন জানার চেষ্টা করি বর্তমান লালন ঘরের সাধুগুরুরা কি ভাবছেন গুরুপূর্ণিমা নিয়ে-

ফকির নহির সাঁইজি:
গুরুপূর্ণিমা প্রসঙ্গে রব (বড় রব) সাঁইজির শিষ্য দৌলতপুরের প্রবীন লালন সাধক ফকির নহির সাঁইজি বলেন, আমরা কেউ এই পূর্ণিমা পালন করি না বাপু। যারা সাদা ফকির সাইজেছে তারা করে। মানে যারা ফকির সাইজেছে তারা পালন করে। লালন ঘরের কেউ পালন করে না। তবে যারা ফকির সাইজেছে তাদের মধ্যেও সবাই করে না। কেউ কেউ করে। তবে এ কথা সত্য পূর্ণিমা যোগ একটা মহাযোগের ব্যাপার। পূর্ণিমা যোগটা একটা গুরুত্বপূর্ণ যোগ। আত্মায় আত্মায় মিশে মানুষের মাঝে যে প্রেম সৃষ্টি হয় সেই প্রেমের বন্ধন সৃষ্টির তারিখ হইলো গুরু বার। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার। এই ‘গুরুবার’ পালন করা হয়। এটাকে বলে জাসমানি মেরাজ। ধরো তোমার সাথে পরিচিত যতটুকু আছি; একটা মাহফিলে বসে সাক্ষাৎ-দরশনের মাধ্যমে সেই পরিচিত আরেকটু বাড়বে না? দেখা সাক্ষাতের মাধ্যমে ভাব বিনিময় হবে-কথাবার্তা হবে; আত্মার সাথে আত্মার মিশেলের একটা সুযোগ থাকবে। প্রেম-মহব্বত সৃষ্টির একটা বিশেষ বার হলো গুরুবার; যেটা আসলে সম্মেলনের দিন। এই দিনে মহব্বত সৃষ্টির একটা বীজ বপন করতে হয়, যার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি হবে; আত্মার সমন্বয় হবে। আর সেই যোগটা হলো পূর্ণিমা যোগ। যতবার দেখা সাক্ষাৎ হবে-কথাবার্তা হবে; লালন সাঁইজির দর্শন নিয়ে আলাপ হবে। তত আধ্যাত্মিকতার গভীরে যাওয়া যাবে। একদিনে তো আর সব বোঝানো যাবে না। তাই যত সম্মেলন হবে মহব্বত তত গাঢ় হবে; তারপর যা হবে তা হলো অবিচ্ছেদ্য। এর একটা আধ্যাত্মিকতা আছে বাপ। গুরুপূর্ণিমা হলো আসলে একটা আধ্যাত্মিক সম্মেলনের দিন, সেদিন প্রেম-মহব্বত সৃষ্টি হয়। এটা হলো জাসমানি মেরাজ। মানে সাক্ষাৎ দরশনে যে আত্মায় আত্মায় মিলন হয়। আর স্বপ্ন যোগে যে দরশন হয় সেটা আশমানী মেরাজ

বৃহস্পতিবার হলো গুরুবার। এইদিনে আমরা একজায়গায় সকলে সম্মেলিত হই। সেখানে পরস্পর পরস্পরের দরশনের মাধ্যমে একটা মহব্বত সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকে একটা ভাবও সৃষ্টি হয়। অনেক কিছুই বিনিময় হয়। ভক্তি-শ্রদ্ধা-সেবা-সাধ্যি অনেক কিছু।

গুরু হইলো স্বচ্ছ আয়না। যার সামনে মনের সকল কথা বিনিময় হয় ; কোনো লুকুচুরি-কারচুপি নাই। যে নিজেকে চেনার সৎ পথ দেখায় সে হইলো স্বচ্ছ আয়না। সে আয়নার সামনে গেলে নিজকে চেনা যায়-নিজকে দেখা যায়। যেমন একটা আয়নার সামনে গেলে নিজেকে দেখা যায় তেমনি গুরুর সামনে গেলে নিজেকে দেখা যায়। তখন আর নিজেকে দেখার জন্য অন্য আয়নার দরকার হয় না।

ষোলকলায় পূর্ণ একটা ব্যক্তিত্ব হলো গুরু। যেখানে থাকবে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নীতি, চরিত্র, ইমান, একতা, শৃঙ্খলা এবং স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য স্বীকার। এই কার্যকলাপগুলো যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে তিনিই গুরু। দশটা আখলাক যখন কেউ জায়গা মতো বসাইতে পারে সেই হয় গুরু গোঁসাই। বিশ্বভ্রহ্মণ্ডের যেমন দশটা দিক আছে তেমনি একটা মানুষেরও দশটা দিক আছে। এই দশটা আখলাক হইলো- চরিত্র, নীতি, শৃঙ্খলা, সত্যবাদীতা, কষ্টসহিষ্ণুতা, একাত্ববাদ স্বীকার, সত্যে বিশ্বাস, সৎ সাহস, ত্যাগ-ধৈর্য্য এবং স্রষ্টার প্রতি ইমান থাকা। এইরকম দশটা দিক আছে। এই দশটা বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। আমি থাকবো না আমার বৈশিষ্ট্য থাকবে। এই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিই হলো একজন গুরু। আর এই গুরুকেই স্মরণ করতে হয় সকল সময়ে।

ফকির সামসুল সাঁইজি:
গুরুপূর্ণিমা নিয়ে গনি সাঁইজির শিষ্য সাঁইনগর রাজশাহীর ফকির সামসুল সাঁইজি বলেন, নাহ্ গুরুপূর্ণিমা বলে কোনো পূর্ণিমার কথা তো সাঁইজির কালামের মধ্যে নাই। সাঁইজির কোনো পদে তো আমি এটা পাইনি। তবে হ্যাঁ গুরুবার আছে। সপ্তাহের প্রধান ধরা হয় বৃহস্পতিবারকে অর্থাৎ সপ্তাহের গুরু বা প্রধান। সে হিসেবে বৃহস্পতিবার গুরুবার। সাধুগুরুসহ বিভিন্ন খানদান এটাকে পালন করে। হিন্দু সম্প্রদায় এই দিনটাকে মর্যাদা দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা করে। সাধুগুরুরা সেই তারিখে বসে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সাঁইজির কালাম গায়। সাধুগুরুদের মাঝে যারা ভিক্ষায় যায়, যারা ভিক্ষু তারা ঐ তারিখটাকে মান্য করে ভিক্ষায়ও যায় না। স্বাভাবিকভাবে যদি কোনো ভিক্ষুকও আসে তখন তারা বলে, এই তারিখে তোমরা ভিক্ষায় এসো না, আমরা এই দিনটাকে মান্য করে চলি। আরো অন্যান্য আচার-আচরণ আছে। তবে মূল কথা এটা সপ্তাহের গুরু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটা যে সাধুগুরুদের জন্য গুরুবার বলা হয় সেইটাও না। এটা আসলে সাপ্তাহিক গুরু। সপ্তাহের গুরু। এই গুরু শব্দটাকে ব্যবহার করতে যেয়ে অনেকে গুরুর দৃষ্টিতে বা গুরুর আচার-অনুষ্ঠানটাও করে।

কিন্তু গুরুবার বলতে গেলে সাধুগুরুর ক্ষেত্রে এই গুরু বলা হয়নি। এটা বারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। দিবসের ক্ষেত্রে। তবে সাধুগুরুরা গান-বাজনার মাধ্যমে এই দিনটাকে পালন করে। আর পালন করা মানেই গুরুকেই স্মরণ করা হচ্ছে। তবে গুরুপূর্ণিমা বলে কিছু আমার গুরুর কাছ থেকেও শুনিনি। আবার আমার কাকা গুরুরাও গুরুপূর্ণিমা বলে কোনো অনুষ্ঠানও তারা করেনি। আবার সাঁইজির কোনো কালামের মধ্যেও পাইনি। সাঁইজির ঘরের পর্যায়ক্রমে পরম্পরা হিসেবে আমরা যেটা পাইনি সেটাকে আমরা ঐভাবে পালন করার চেষ্টাও করি না। আর এমনি তো আমরা প্রতিদিনই বসি, সাঁইজির কালাম গাই। কালাম নিয়ে আলোচনা হয়। কেউ যদি সেই দিনটাকে বাধ্যতামূলকভাবে পালন করে থাকে তাহলে তারা সেটাকে গুরুত্ব দিয়েই করে থাকে। কিন্তু এই রকম গুরুত্ব দেয়ার কথা তো সাঁইজি বলেন নি।

সাত্তার ফকির:
এ প্রসঙ্গে কুষ্টিয়ার লালন সাধক সাত্তার ফকির বলেন, বাপু! এইসব কথা শুনি নাই কোনো দিন। এগুলান নতুন কইরা শুনতেছি কয়েক বছর ধইরা। আমরা লালনরে নিয়া আছি। গুরু যা শিখাইছে তা নিয়া আছি। তা নিয়াই থাকি। গুরু কোনোদিন এই সব বলে নাই। তাই এইসব নিয়া ভাবিও না। লালন বলছে, ‘গুরু সুভাব দাও আমার মনে।’ আমিও তাই কই। গুরু সুভাব দাও আমার মনে। এর বেশি জানিও না বুঝিও না। সাঁইজির গানই করি; আমিও গোটা কয়েক গান লিখছি। সেগুলান হইছে কিনা জানি না। সেগুলানও গাই। গুরুর জন্য আলাদা পূর্ণিমা-আমব্যসার কি আছে। সব শ্বাসই গুরুর। সবই গুরুর। আমি তো কেবল পালন কইরা যাই। আমি তো গুরু নিয়াই আছি বাপু। গুরু ছাড়া এক দণ্ডও থাকি না।

হৃদয় সাঁই:
গুরুপূর্ণিমা প্রসঙ্গে দৌলত সাঁইজির শিষ্য কুষ্টিয়ার হৃদয় সাঁই বলেন, লালন মতে আলাদা করে কোনো গুরু ভজনের পর্ব নেই। গুরুবার বলে একটা বিষয় আছে। সপ্তাহের বৃহস্পতিবারকে গুরুবার বলা হয়। এই দিনে গুরুকে নিবেদন করে ভক্তি প্রদর্শন করা হয়। তবে এ বিষয়ে আমার একটা দ্বিমত আছে, যেমন আমি আমার গুরুর কাছে দীক্ষিত হয়েছি বুধবার তাই আমার গুরুবার তো বুধবার। আবার আমার সাধনসঙ্গীনি অধরা ফকিরানী দীক্ষিত হয়েছে শুক্রবার। তাই তার গুরুবার হলো শুক্রবার। এটা নিয়ে তাই একটা সংশয় থেকেই যায়। লালন মতে আলাদা করে গুরুপূর্ণিমায় গুরুপূজার সেরকম কোনো আচার নেই।

তবে জ্যৈাষ্ঠ মাসে সাধুগুরুদের ফল সেবার একটা রীতি আছে। পাঁচ ফল দিয়ে সাধুগুরুদের সেবা দেয়া হয়। সেটা জ্যৈাষ্ঠ মাসের পূর্ণিমাতে পালন করা হয়। আমি সেটাকে পালন করি আষাঢ় মাসের গুরুপূর্ণিমাতে। সেটাতে আমি পঞ্চফলের পরিবর্তে এগারো পদের ফলাহার আর দুধের মিষ্টান্ন দিয়ে সাধুসঙ্গ করি। বছরের তিনশ চৌষট্টি দিন আমার ভক্তরা আমাকে গুরুজ্ঞানে ভক্তি দেয় আর এই গুরুপূর্ণিমার দিন আমি আমার সাধন সঙ্গীনিকে গুরুজ্ঞানে ভক্তি দেই। সেই সাথে আমার ভক্তরাও তাকে ভক্তি দেয় এই দিনটিতে। ফকির লালন সাঁইজির যুগল দেহতাত্ত্বিক সাধনায় সাধনসঙ্গীনির ভূমিকা ব্যাপক কিন্তু তাদের বিশেষ কোনো মর্যাদা দেয়া হয় না আলাদাভাবে। যদিও তাকে ভক্তরা গুরুমা বলেই অভিহিত করি। গুরুর সাথেসাথে তিনি ভক্তি পেলেও তারজন্য আলাদা পারস দেয়া হয় না। পারস হয় একটাই। তাই আমি এই গুরুপূর্ণিমার দিনে আমার ভক্ত-অনুসারীদের নিয়ে এই দিনটিকে সেই সাধনসঙ্গীনিকে ভক্তি দিয়ে পালন করে থাকি। দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পড়িয়ে গুরুকে ভক্তি দিয়ে শুরু হয় সাধুসঙ্গ। আমি অবশ্য এই দিনে সাধুগুরুদের নিমন্ত্রণ দেই না। আমার ভক্ত অনুসারী ও নতুন সাধকদের আমন্ত্রণ দিয়ে থাকি। আমার কাছে এটাই গুরুপূর্ণিমা। আমি গত কয়েক বছর ধরে এভাবেই গুরুপূর্ণিমা পালন করে আসছি।

আলাউদ্দিন আল-মিন সাধু:
গুরুপূর্ণিমা প্রসঙ্গে হুমায়ুন সাধুর শিষ্য কুষ্টিয়ার আলাউদ্দিন আল-মিন সাধু বলেন, এটা একটা যোগ; আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে গুরুপূর্ণিমা পালন করা হয়। ঐ দিনটাকে আমরা একটু সাধুসঙ্গ করি। আমরা বেশিদিন না পাঁচ বছরের মতো পালন করছি। অন্যান্য সাধুসঙ্গের মতো করেই পালন করা হয় ফুল-টুল দিয়ে। আর গুরু-শিষ্য সম্পর্কে একটা আলোচনা হয়। এই আলোচনাটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে আমরা প্রদ্বীপ জ্বালাই, মোমবাতি জ্বালাই, ফুল দেই সাধুগুরুদের আর গুরু-শিষ্যের পরম্পরা নিয়ে কথাবার্তা হয় সারারাত ভরে। গান হয়, যে গানগুলো গুরুপদের উপর লেখা সেই গানগুলোই হয়। লালন সাঁইজি এই পূর্ণিমা পালন করতেন না। তিনি পালন করতেন দোল পূর্ণিমা। লালন ঘরের কেউ এই পূর্ণিমা পালন করে না। এই পূর্ণিমা ততটা পরিচিতও না।

ফকির কোরবান শাহ্:
গুরুপূর্ণিমা নিয়ে কুষ্টিয়ার গনি সাঁইজির শিষ্য রাজশাহীর ফকির কোরবান শাহ্ বলেন, আমার গুরুকে কখনো পালন করতে দেখি নাই ; আর শুনিও নাই গুরুপূর্ণিমার কথা। লালন সাঁইজি দোল পূর্ণিমা পালন করতেন। আমরাও গুরুর মাধ্যমে সেই দোল পূর্ণিমাই পালন করে আসতেছি। শোন বেটা! গুরু যা বলে নাই তা আমরা করি না। গুরুর নাম নিয়া চলি। গুরু যা বলে গেছেন-লালন সাঁইজির কালামে যা বলা আছে তাই পালন করার চেষ্টা করি। তবে গুরুবার পালন করি। বৃহস্পতিবার এক জায়গায় বসি; সাঁইজির গান করি।

ফকির কেরামত শাহ্:
গুরুপূর্ণিমা নিয়ে কুষ্টিয়ার গনি সাঁইজির শিষ্য ঢাকার ফকির কেরামত শাহ্ বলেন, লালন সাঁইজির ঘরে কেউ কেউ গুরুপূর্ণিমা পালন করে তবে ইনজেনারেলি পালন করে না। গুরুপূর্ণিমা বিষয়ে ছেঁউড়িয়ায় কোনো কথাই শুনতে পাবেন না। ছেঁউড়িয়ার বাইরে কোনো কোনো সাধু পালন করে থাকে। যেহেতু সারাবিশ্বেই গুরুপূর্ণিমা পালন করে এ জন্যই করে আর কি। তবে হ্যাঁ গুরুবার পালন করা হয়। যারা ধর্ম পালন করে। তাদের প্রত্যেকেই যেমন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান প্রত্যেকেই দেখবেন বৃহস্পতিবার দিন সমবেত হয়। সমবেত হয়ে যার যার স্টাইলে গুরু নাম করে।

যেহেতু বৃহস্পতিবার দিন এই নাম করে তাই এর নাম হয়েছে গুরুবার। এছাড়া আর কিছু না। আর গুরু মানে হলো শুভ। আমি গুরুপূর্ণিমা পালন না করলেও আমার এক চাচা পালন করে। মানে আমার কাকাগুরু পালন করে। সেখানে আমাকে উপস্থিত থাকতে হয়। উনার নাম মনোরঞ্জন গোঁসাই। সাধারণভাবে যেভাবে সাধুসঙ্গ করা হয় সে ভাবেই সেই দিন অর্থাৎ গুরুপূর্ণিমার রাতে সাধুসঙ্গ করা হয়। গুরুপূর্ণিমাকে ঘিরে একটা সাধুসঙ্গ করা হয়; এছাড়া আর কিছু না। আলাদা কোনো রংঢং নাই। এটা আপনি আলাদা পাবেন বেদের মধ্যে যে শাক্ত, শৈব ও বৈরাগ্য আছে না? সেই বৈরাগ্য মধ্যে না শাক্ত ও শৈবর মধ্যে এই গুরুপূর্ণিমা নিয়ে হৈচৈ আছে, লাফালাফি আছে, মাতামাতি আছে, রঙের খেলা আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে মূল কথা হইলো যে যেভাবে আনন্দ এবেল করতে পারে আর কি।

ফকির বলাই শাহ্:
গুরুপূর্ণিমা প্রসঙ্গে রব (বড় রব) সাঁইজির শিষ্য ছেঁউড়িয়ার লালন সাধক ফকির বলাই শাহ্ বলেন, গুরুপূর্ণিমা বলে কিছু নাই লালনের ঘরে। লালন সাঁইজির গুরু মতবাদ, মানবধর্ম, গুরুবিশ্বাসী, গুরুমতবাদ, গুরুপরম্পরা। এই মতের অনুসারীরা এই মতের গুরুকর্ম করে। এই মতের কর্মটা একটু ভিন্ন আছে। এই মতের অনুসারীরা এই কর্ম করে আমিও করি।

আর আমরা গুরুপূর্ণিমা না, দোলপূর্ণিমা আর পহেলা কার্তিক সাঁইজির ওফাত দিবস পালন করি। এই দুইটাই লালন শাহ্’র হয়। আমি লালন ধর্ম করি গুরুপূর্ণিমা আমার দরকার নাই। যারা পালন করে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি এর মধ্যে নাই। তবে গুরুবার পালন করি। যেদিন গুরু ধরেছি সেদিন আমার গুরুবার। সেই দিনটা পালন করি। সেই দিনের কিছু কর্ম আছে তা আমি পালন করি। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সাধুগুরুদের সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। গুরুরে ভক্তি দেই। তবে এখন পাঁচ ঘরের সাধু মেলেই না। ২/৩ ঘরের সাধু মিললেও দুই ঘর মেলেই না। এভাবেই করি আর কি। যা পাইছি গুরুর কাছ থেকে।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!