মতুয়া সংগীত

চলিল গোলোকচন্দ্র

রুদ্র-উদ্ধার
পয়ার

চলিল গোলোকচন্দ্র উত্তরাভিমুখে।
বাসুড়িয়া গ্রামে যাব কহিল সবাকে।।
ভক্তগণ কতক চলিল সঙ্গে সঙ্গে।
হরি বলে হাসে কাঁদে নাচে গায় রঙ্গে।।
রাইচরণ মদনকৃষ্ণ কোটিশ্বর।
মহেশ শ্যামাচরণ শ্রীহরি পোদ্দার।।
সবে যায় হরিবোল বলিতে বলিতে।
উত্তরিল মধুমতী নদীর কূলেতে।।
বড়গুণীর পশ্চিমে ভৈরব নগর।
রুদ্র মণ্ডলের বাড়ী নদীর কিনার।।
বাড়ী হ’তে মধুমতী অতি দূরে নয়।
শত হস্ত পরিমিত যদি বেশী হয়।।
পরিষ্কার ঘাট তার বাড়ীর নিকট।
সবলোক তারে ব্যাখ্যা করে রুদ্রঘাট।।
মতুয়ারা হরি বলে যবে যায় হেঁটে।
মারিবার জন্য রুদ্র লাঠি ল’য়ে ছুটে।।
তাহা দেখি মতুয়ারা চুপ করে যায়।
কোনদিন তথা নাহি হরি নাম লয়।।
এইভাবে বহুদিন চুপে চুপে যায়।
অদ্য সেই ঘাটে গিয়া হইল উদয়।।
পাগল বলিছে সবে সেই ঘাটে গিয়া।
আজ সবে হরিবোল নাচিয়া নাচিয়া।।
যাহার শরীরে আছে যতটুকু শক্তি।
সেই শক্তি দিয়া নাম বল করে ভক্তি।।
তাহা শুনি যার যত ছিল নিজ বল।
সিংহের প্রতাপে সবে বলে হরি বল।।
তাহা শুনি রুদ্র এক ষষ্ঠি নিল হাতে।
যত হরিবোলাগণে আসিল মারিতে।।
মহাদস্যু মহাকায় মহা বলবান।
দেশের যতেক লোক ভয়ে কম্পমান।।
পাগল দেখিয়া রুদ্র আসিল মারিতে।
দৌড়িয়ে গেলেন সেই রুদ্রের সাক্ষাতে।।
ক্রোধভরে কহে তারে ওরে রুদ্র দাদা।
তোর ঘাটে হরিবলে এত বড় স্পর্ধা।।
হরি হরি হরি বলে ওরা মারে ডঙ্কা।
তুমি আমি দুই ভাই কারে করি শঙ্কা।।
হরি বলে ভণ্ডামী করিছে সব ভণ্ড।
আমি দিব উহাদের সমুচিত দণ্ড।।
রুদ্রের হাতের ষষ্ঠি লইল কাড়িয়ে।
আয় দাদা বলিয়ে চলিল বেগে ধেয়ে।।
তর্জন গর্জন করি গোস্বামী চলেছে।
পাগল চলিল আগে রুদ্র যায় পিছে।।
গোস্বামী বলিছে পাষণ্ডীর রক্ষা নাই।
কার ঘাটে হরি হরি বলিস সবাই।।
তর্জনে গর্জনে ধায় হরিবোলা দিকে।
মারিবারে বাড়ি হাকে রুদ্রের সম্মুখে।।
আগুলিয়া লম্ফ দিয়ে পিছে চলি যায়।
অধরোষ্ট কাঁপে রাগে কাঁপিতেছে কায়।।
বিমুখ হইয়া পড়ে হ’য়ে মাতোয়ারা।
রুদ্রকে ঘিরিয়া করে লাঠি পাইতারা।।
সঙ্গীরা ইঙ্গিতে হরি বলিতে বলিতে।
ধরিয়া রুদ্রের হস্ত লাগিল ঘুরিতে।
মধ্যে রুদ্র চতুর্দিকে নাচে ভক্তগণ।
নদী মধ্যে গোলা পড়ি হইল তেমন।।
তার মধ্যে হুহুঙ্কার ছাড়িল পাগল।
জয় হরি বল রে গৌর হরি বল।।
অচৈতন্য হ’য়ে রুদ্র হইল বিহ্বলা।
রুদ্রকে ঘেরিয়া হরি বলে হরিবোলা।।
সবে বলে হরি বল বল হরি বল।
রুদ্র সে চৈতন্য পেয়ে বলে হরি বল।।
হরিবলে রুদ্র গোস্বামীর পায় পড়ি।
কীর্তনের মধ্যে রুদ্র যায় গড়াগড়ি।।
রুদ্র বলে আমাকে বলিলে যদি দাদা।
এইভাবে তব মন থাকে যেন সদা।।
আমি তোর দাদা তুই মোর ভাই।
জনমে জনমে যেন হেন সঙ্গ পাই।।
ওঢ়াকাঁদি বাসী যত হরিভক্তগণ।
জানিলাম তারা সবে পতিত পাবন।।
যুগে যুগে যত পাপী করেছ উদ্ধার।
এমন পাষণ্ডী কোথা পেয়েছ কি আর।।
মহাপ্রভুগণ মহাপ্রভুর সমান।
আমি রহিলাম তার বিশেষ প্রমাণ।।
আমি যদি তব দাদা তুমি যদি ভাই।
তবে চল আমার বাড়ীর মধ্যে যাই।।
পাগলের হস্ত ধরি রুদ্র চলে যায়।
আগে রুদ্র পশ্চাতে পাগল দয়াময়।।
তাহা দেখি হরিবোলা মতুয়া সকলে।
রুদ্র মণ্ডলের প্রতি হরি হরি বলে।।
বাড়ীর উপরে নিয়া বলে যোড় করে।
সেবা কিছু কর ভাই বসে এই ঘরে।।
গোস্বামী যাইয়া দেখে রন্ধন শালায়।
পরিপূর্ণ এক হাঁড়ি অন্ন তথা রয়।।
গোস্বামী বলেন দাদা ল’য়ে চল ঘাটে।
মতুয়ার গণে আমি ইহা দিব বেটে।।
চলিলেন যথা আছে সঙ্গী ভক্তগণ।
হাঁড়ির মুখেতে দিল সরা আবরণ।।
সেই অন্ন হাঁড়ি ধরি জলে ডুবাইল।
জলমধ্যে বুড়বুড় করিতে লাগিল।।
যত মতুয়ারগণ বাড়ীতে লইয়া।
রুদ্র নাচে হরি বলি প্রেমেতে মাতিয়া।।
বাড়ীর মধ্যেতে রুদ্র লইয়া তখনে।
ভোজন করায় যত হরিভক্তগণে।।
তাহা দেখি আসিলেন রুদ্রের রমণী।
সব পাতে এনে দিল দধি আর চিনি।।
গলে বস্ত্র দিয়া তবে কহে দুইজন।
দয়া করি গৃহ মধ্যে চলহ এখন।।
ল’য়ে গেল পাগলেরে উত্তরের ঘরে।
নারীসহ হরিবোল বলে উচ্চৈঃস্বরে।।
রুদ্র কেঁদে কহে শুন ভাইরে পাগল।
ঘর বাড়ী পুত্র নারী তোমার সকল।।
মতুয়ারা হরিবলে নাচিয়া নাচিয়া।
নারীসহ নাচে রুদ্র প্রেমেতে মাতিয়া।।
মতুয়ারা সবে যায় এ ঘরে ও ঘরে।
হরি হরি হরি বলে ঘর বাড়ী ঘিরে।।
গোস্বামী বলেন দাদা যাই বাশুড়িয়ে।
বিশ্বাসের বাড়ী যাব নদী পার হ’য়ে।।
রুদ্র বলে অদ্য আমি পার করে দিব।
আজ পার না করিলে কিসে পার হ’ব।।
রুদ্র বলে দেও ভাই এ সত্য কড়ার।
আসিতে যাইতে দেখা দিবে একবার।।
দশ বিশ জন এস কিংবা এস একা।
আসিতে যাইতে মোরে দিয়া যাবে দেখা।।
বৈঠা ল’য়ে রুদ্র এসে নিজ হাতে বেয়ে।
পার করে দিল সবে নৌকায় উঠা’য়ে।।
রুদ্রের উদ্ধার পার করিল গোঁসাই।
রচিল তারকচন্দ্র হরি বল ভাই।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!