ভবঘুরে কথা
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ

কল্যাণীয়েষু
স্নেহের বাবা, চষা জমিতেই বীজ বুনিতে হয়, যেখানে সেখানে বীজ ফেলিলে বীজে অঙ্কুর নাও গজাইতে পারে। তত্ত্বাবধানযোগ্য সুরক্ষিত ভূমিতে বীজ না বুনিলে অঙ্কুরিত হইবার পরে পাখিতে খাইয়া ফেলে। খেতের আইলে বেড়া বা পাহাড়া না -িলে গরু-ছাগলে সব নষ্ট করে। এইগুলি ভুলিয়া গিয়া কাজ করিও না। পাঠ,কীর্ত্তন ও উপাসনার সহায়তায় চতূর্দ্দিকের জমি নিয়ত কর্ষিতে থাক। তোমাদের নিজেদের অন্তরের উন্মাদনা দিয়া দিকে দিকে দিব্যভাবের উম্মেষ সাধন কর।আত্মত্রানের চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে জগৎত্রানের সাধনাকে সুসমঞ্জস করিয়া লও।
-ইতি
আশীর্ব্বাদক
স্বরূপানন্দ
(ধৃতং প্রেম্না, পঞ্চম খন্ড, পত্র নং-৫৪, কলিকাতা-২০শে আষাঢ়, ১৩৬৫)

কল্যাণীয়াষু
স্নেহের মা- প্রাণভরা স্নেহ ও আশিস জানিও।
তোমার পত্র পাইয়া বড়ই সুখী হইলাম। একনিষ্ঠার চেয়ে বড় সদগুন সাধক-সাধিকার পক্ষে আর কিছু নাই। হাজার দেবমূর্ত্তির পূজা না করিয়া একটীতে মন বসাও। তাহাতে সকল দিক দিয়া কুশল হইবে। আমি কোনও মতের কোনও পথের সাধন-পদ্ধতির প্রতিই শ্রদ্ধাহীন নাহি। কিন্তু একনিষ্ঠার চাইতে বড় সহায় যে সাধন-জীবনে আর কিছু নাই, ইহা মনে রাখিও।
ইতি-
স্বরূপানন্দ
বারাণসী
২৫শে শ্রাবণ, ১৩৬৫, ধৃতং প্রেম্না, ষষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ৭২, পত্র নং-৩১

কল্যাণীয়েষু
স্নেহের মা- তোমরা সকলে আমার প্রাণভরা স্নেহ ও আশিস নিও। এক মাস ষোল দিন পরে তোমার পত্রখানার উত্তর দিতে বসিয়াছি। কারণ, সময় করিতে পারি নাই। এত রকমের কাজ আমাকে করিতে হয় যে, পত্রখানা যে লিখিতে পারিলাম, ইহ-িস্ময়কর ব্যাপার।
তুমি ওখানে একা দীক্ষা নিয়াছিলে, তোমার স্বামী নেন নাই, লিখিয়াছ। দুজনে একত্র নিলে নিশ্চই ভাল হইত, কিন্তু আমাদের দেশের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারনা আছে যে, পতিব্রতা সতীর সাধনার সৎফলের অধিকারী তার স্বামীও হন। সুতরাং এই দিক দিয়া আপাততঃ তোমার আফসোষ করিবার কিছু নাই। সময়, সুযোগ ও রুচি হইলে যথাকালে তাঁহার দীক্ষা হইতে পারিবে।
মঙ্গলকুটীর, পুপুনকী আশ্রম
৫ই পৌষ, ১৩৮১
ধৃতং প্রেম্না-ত্রয়স্ত্রিংশতম খন্ড, পত্র নং-৩৪

কল্যাণীয়েষু
স্নেহের বাবা- তোমরা সকলে আমার প্রাণভরা স্নেহ ও আশিস নিও।

তোমার পত্র পাইয়া সুখী হইলাম। লিখিয়াছ, তুমি আমার কোনও কাজ করিতে পার না বলিয়া লজ্জিত ও দুঃখিত। লজ্জা এবং দুঃখ এক্ষেত্রে দোষের নহে। কেননা, যাহার লজ্জা আছে, সে একদা আমার কাজ কিছু না কিছু করিবেই। যাহার এই জন্য দুঃখবোধ আছে, সে ত’ কোনও প্রকারেই আমার কাজ না করিয়া পারিবে না। কিন্তু আমার জিজ্ঞাস্য এই যে,

আমার কোনও কাজই তুমি করিতে পারিতেছ না কেন?

সময়ের অভাব বলিয়া?

না, কোনটা আমার কাজ, তাহা বুঝিতে পার নাই বলিয়া?

আমি তোমাদের কাছে কাজ চাহি। ইহা সত্য। ‘তোমরা আমার বাহু হও’- একথা আমি বহু বৎসর ধরিয়া কহিয়া আসিতেছি। কিন্তু কেহই হয়ত বুঝিতেছ না যে, আমার কাজটা কি, আমার কাজ বলিতে কি কাজকে বুঝিতে হইবে।
সদবুদ্ধি- লইয়া মূর্খ, অশিক্ষিত, অজ্ঞানকে এক ক্ণা জ্ঞান কি দিতে পার?

ক্ষুধার্তকে পেট ভরিয়া না খাওয়াইতে পার ত’ অন্ততঃ এক মুঠা ভাতও কি দিতে পার?
ক্রুদ্ধ, রুষ্ঠ, মনোব্যধিগ্রস্থ ব্যক্তির মনকে একটুখানি শান্ত করিবার জন্য দুটি মিষ্টি কথা কহিতে পার?

পাপের জ্বালায় যে জ্বলিয়া মরিতেছে, তাহাকে কি মুখের কথা দিয়াও একটু আশ্বাস দিতে পার যে, ঈশ্বর আছেন, তিনি সকল জ্বালা দূর করিয়া নিশ্চিতই দিবেন, শুধু একটু-াপন্ন হওয়াই প্রয়োজন?

এসব নানাবিধ সরল সহজ কাজের একটাও কি তুমি কখনো করিতে পার না?
স্কুলের ছোট ছোট ছেলেদের কি ডাকিয়া বলিতে পার না, – ভাই সংযমী হইও, ব্রহ্মচারী হইও, মিতভাষী হও, মিতব্যয়ী ও মিতাহারী হইও,- মদ্যপান করিও না, ধুমপান করিও না, অশ্লীল কথা উচ্চারণ করিও না। নিশ্চয়ই পার। তাহা যদি পার এবং কর, তবেই ত’ আমার কাজ করা হইল। আমার কাজ করিতে হইলে তোমাকে দশ মন তেল পুড়াইতে হইবে না, লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করিতে হইবে না। সবাই যদি একটুকু একটুকু করিয়া এই সব -জ কর, তবে আম- মতন সুখী মানষ জগতে আর কে আছে?
ইতি-
আশির্ব্বাদক
স্বরূপানন্দ

কল্যাণীয়েষু
স্নেহের বাবা, আমার প্রাণভরা স্নেহ ও আশিষ জানিও।
তোমার অসুস্থতা দ্রুত দূর হউক, এই আশীর্ব্বাদ করি।
অসুখে পড়িয়া শরীরের বিশ্- পাইয়াছ। এই সময়ে মনটাকে একাগ্র করিয়া ভগবানের পায়ে লাগাও। এই সময়ে বাজে সংসারী চিন্তা করিয়া নিজেকে উৎপীড়িত করিও না। সুস্থ অবস্থায় তোমরা প্রত্যেকেই এই অভিযোগ করিয়া থাক যে সংসারের সহস্র ঝামেলায় পড়িয়া ভগবানের নাম করিবার সময় মিলে না। অতীতের কর্ম্মক্ষয় করিবার জন্য যখন ভগবানের ইচ্ছায় অসুখেই পড়িয়া গিয়াছ এবং শরীর যখন ইচ্ছা সত্ত্বেও আর কোনও কাজে লাগিতেছে না, তখন মনটাকে নামের সঙ্গ ধরাও। এমন করিয়া ভগবন্নামের সঙ্গ কর যেন অসুখ সারিয়া যাইবার পরে-তাঁর নাম তোমার নিত্য – নিয়ত অভ্যাসগত থাকে। আগন্তুক বিপদকে এই ভাবে সুকৌশলে সম্পদে রূপান্তরিত কর।
ইতি-
আশির্ব্বাদক
স্বরূপানন্দ

এই প্রেমের বাণীই আমি সাঁতালিতে ছড়াইয়া গেলাম। সত্য অবিনশ্বর। মিথ্যা এবং অপপ্রচার যেখানে কর্ম- দিয়াছে বাধা,-খানেও সত্য তাহার অমোঘ বিক্রম যথাকালে প্রকাশিত করিবে। তোমরাও সত্য ও প্র-হও অকপট বিশ্বাসী। চালাকী ও চালবাজি দ্বারা জগতে কোনও মহৎকার্য্য সম্পন্ন হইতে পারে না। নিজেরাও চালাকীতে বিশ্বাস করিও না, অপরের চালাকীকেও বৃথা মূল্য দিও না। সত্যের প্লাবনে মিথ্যা ভাসিয়া যাইবে। পরমেশ্বরে অকপট ভক্তিই জগতে নিত্যজয়যুক্ত হইবে।
-আশির্ব্বাদক
স্বরূপানন্দ

আমাতে প্রেম থাকিলে আমাকে তোমরা সব বস্তুতেই দর্শন করিতে পারিবে। আমাকে সশরীরে দর্শন করা যতটুকু পুন্যজনক, আমাকে সর্ব্বজীবের মধ্যে দর্শন করা তার চেয়ে কম পুন্যকর নহে।
আশীর্ব্বাদক
স্বরূপানন্দ
(ধৃতং প্রেম্না- ষষ্ঠ খন্ড-৫১)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!