ভবঘুরে কথা
জালাল উদ্দিন খাঁ

-রব নেওয়াজ খোকন

সৃষ্টিতত্ত্ব :
একেশ্বরবাদে সৃষ্টিতত্ত্বের মহিমা একমাত্র ঈশ্বরের। তিনিই আসমান, জমিন, আগুন, মাটি, হাওয়া, পানি প্রভৃতি মৌলিক উপাদানের সৃষ্টিকর্তা। এ সত্যকে উপজীব্য করে জালাল তাঁর সৃষ্টিকর্মে ভিন্ন মাত্রার নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। স্রষ্টা ও সৃষ্টি দুটি ভিন্ন সত্তা হলেও বরাবরের মতো দ্বৈতসত্ত্বাকে একিভূত করেছেন। সৃষ্টি হলো স্রষ্টারই আকারগত প্রকাশ। মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ দুটি সত্তা মূলত একসত্তারই ভিন্ন প্রয়াস। এ প্রসঙ্গটি জালাল বারবার এনেছেন তাঁর রচনায়। এদিক থেকে একেশ্বরবাদ পরিপূর্ণ স্বয়ংজাত তত্ত্ব হিসেবে প্রকৃত মর্যাদায় সিক্ত হয়েছে।

জালাল বুঝিয়েছেন, সৃষ্টিসামগ্রী স্রষ্টারই শৈল্পিক আত্মরূপ। সৃষ্টিতেই স্রষ্টার আত্মবিশ্লেষণ। আর এ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি বা প্রতিরূপ হল মানুষ। মানবরূপই স্রষ্টার প্রকৃষ্ট ও সার্থক প্রকাশ। এ রূপের মাঝেই তিনি নিজের প্রকৃষ্ট ও পরম নির্যাসকে লেপন করেছেন। আবার এ রূপ ধারণের মাধ্যমেই তিনি আত্মসন্ধিৎসু হয়েছেন।

নিজেকে সৃষ্টি হতে সন্তর্পণে সরিয়ে, অদৃশ্য সত্তায় অবগুণ্ঠিত করে স্বপ্রেমের মায়াজাল পেতেছেন। তাই বোধকরি একমাত্র মানবের মনেই স্রষ্টা প্রেমের বীজ অংকুরিত হতে দেখা যায়। আজন্মকাল মানুষ তার স্রষ্টাকে খুঁজে ফিরে। জালাল উদ্দীন খাঁর একটি বিখ্যাত গানে এ প্রেমের প্রতিরূপ ধরা পরে-

এ বিশ্ববাগানে সাঁই নিরঞ্জনে
মানুষ দিয়া ফুটাইল ফুল।।

আদমকে নিষেধ করে গন্দম খেওনা
গন্দমকে হুকুম করে পিছু ছেড়োনা
বুঝিতে তাঁর এই তালবাহানা
সংসারে এই গণ্ডগোল।।

যে গন্দম খেয়ে আদম হইলো গোনাগার
আজ পর্যন্ত আমরা সবে করিতেছি আহার
হজরত আদমের হাওয়া সে গন্দম
এই হলো সে কথার মূল।।

হাওয়া গন্দম ছিঁড়ে যখন বেহেশত খানায়
তিনফোঁটা খুনজারি তখন হয়ে যায়
একফোঁটা দিয়া মানুষ গড়িয়া
ভরেছে দুনিয়ার কোল।।

গন্দমের আঠা দিয়া বানায়ে লাল কালি
ছাপাখানার ঘরে কোরান দিতেছে তালি
আসল কথা যদি বলি
মুনশি-মোল্লায় বলবে বাতুল।।

গন্দমের বাহানা করে পাঠায় সংসারে
মানুষ দিয়া মানুষ বানায় মানুষের ঘরে
কোরান ছাপায় কোরান ধরে
লাগছে বিষম হুলস্থুল।।

জালাল উদ্দীন ভেবে ভেবে হয়ে পেরেশান
গন্দম গাছের তলে গেল পাইয়া ময়দান
গিয়া তথায় পড়িয়া ঘুমায়
নেশার ঝোঁকে ভাঙে না ভুল।।

মহাবিশ্ব হল স্রষ্টার ভালোবাসার বাগান। এখানে প্রতিনিয়ত ভালোবাসার চাষ হয়। আর মানুষ তাঁর ভালোবাসার প্রতীকী ফুল। মানুষকে মাধ্যম হিসেবে ধারণ করেই তাঁর প্রেমবিলাস ও প্রেমখেলা। এই প্রেমখেলায় রয়েছে বহুমাত্রিক রূপকতা ও রহস্যময়তা। যেমন, হজরত আদম (আ) এর সাথে সঙ্গিনী বিবি হাওয়াকে জুড়ে দিয়ে প্রথম নবী ও মানুষ হিসেবে প্রেরণ করেন। এবং শারীরিক মিলনের ব্যপারে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

যে মিলন ক্রিয়াকে শাস্ত্রীয় ভাষায় প্রতিকী অর্থে ‘গন্দম ফল’ হিসেবে দেখান হয়েছে। হজরত আদম (আ) প্রভুর দেয়া নির্দেশ পালনে যদিও ছিলেন বদ্ধপরিকর। কিন্তু বিবি হাওয়ার একান্ত সান্নিধ্য, মোহনীয় ভালোবাসা তাঁর সে সংকল্পকে গুঁড়িয়ে দেয়। অবশেষে স্রষ্টার দেয়া নির্দেশ অমান্য করে তাঁরা মহামধুর মিলনে প্রবৃত্ত হয়। সাধক জালালের মতে বিবি হাওয়ার মিলনমুখি তৎপরতার পেছনে ছিল স্রষ্টারই ইঙ্গিত। কেননা, সকল কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে তাঁর ইচ্ছার হাত রয়েছে।

তাই কবি বলেছেন, ‘আদমকে নিষেধ করে গন্দম খেও না, গন্দমকে হুকুম করে পিছু ছেড়ো না।’ স্রষ্টার এ বাহানা বোঝা বড় মুশকিল। কেননা, যে গন্দম খাওয়ার অপরাধে আদম স্বর্গচ্যুত হয়ে দণ্ডিত আসামী রূপে পৃথিবীর জেলখানায় প্রেরিত হলেন, ঠিক সেই গন্দমই আমরা আদম সন্তানরা নিয়ত খেয়ে চলেছি বৈধতার সনদ নিয়ে। আর এ সনদের অনুমোদক হলেন রহস্যময় স্রষ্টা। স্রষ্টার এ বিচিত্র নীতিবোধের বোধগম্যতা মানুষের পক্ষে এক বিশাল ধাঁধা। আর সেজন্যই সংসারে মত-পথের এতো ভিন্নতা, এতো গণ্ডগোল।

বেহেশতখানায় আদম-হাওয়ার জৈবমিলনের মাধ্যমে সূচিত হয় জন্মপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। এ প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলতে চলতে আজকের কোটি কোটি মানুষের পৃথিবী গঠিত হয়েছে। ‘গন্দমের আঠা দিয়া বানাইয়া লাল কালি/ছাপাখানার ঘরে কোরান দিতেছে তালি’-এ পংক্তিতে কবি গন্দমের প্রতিকী প্রসঙ্গকে জন্মপ্রক্রিয়ার আসল রূপ হিসেবে দেখিয়েছেন।

গন্দমের আঠা বলতে তিনি মানব-বীর্য বা শুক্র-ডিম্ব কোষকে বোঝাচ্ছেন। এ বীর্য থেকেই তৈরি হয় লাল কালি বা লাল রক্ত। আর লাল রক্তে রচিত হয় দেহ-কোরান। উল্লেখ্য যে, সাধুশ্রেণি বিশ্বাস করেন প্রকৃত এবং জীবন্ত কোরান হলো দেহ। দেহ-কোরান অধ্যয়নেই কেবল নিজেকে চেনা বা স্বচৈতন্যে উত্তরণ সম্ভব।

জালাল এ মত প্রকাশের ফলশ্রুতিতে বাস্তবিক পরিণতির কথাও উল্লেখ করেছেন। শরিয়তবাদী মুনশি-মোল্লারা তাঁর এ মতবাদকে কখনোই স্বীকৃতি দেবে না, এটা তিনি পলে পলে উপলব্ধি করেছেন। গন্দম ফলের বাহানা করে স্রষ্টা মানুষ দিয়ে মানুষ বানিয়ে এ সংসার ভরে তুলেছেন।

বস্তুত কোরান ধরে কোরান তৈরির কারখানা এ দুনিয়া। এ সৃষ্টি পদ্ধতির গুঢ় রহস্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে অজ্ঞ মানুষগুলো হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধায়। বিভেদের প্রাচীর গড়ে। সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। অশান্তির অবতারণা করে বিশ্ব চরাচরে।

সৃষ্টিরহস্য নিয়ে জালাল ভাবতে ভাবতে পেরেশান। এ ভাবনা অনন্ত! এর কিনারা পাওয়া স্বসীমের পক্ষে দুরূহ। তাই তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে গন্দম গাছের ছায়াকেই শেষ আশ্রয় হিসেবে নিয়েছিলেন। আজীবন নারীর সঙ্গ লীলায় মেতে থেকেছেন। অবশ্য বৈধ উপায়ে। এখানটায় খুঁজেছেন সৃষ্টিরহস্যের শিকড়।

সৃষ্টিতত্ত্বের আরেকটি গানে সাধক সৃষ্টির অমোঘ লীলাময়তাকে আরোও গভীরতায় অলংকৃত করেছেন-

বাসনায় বিভেদ্য জীব
নিবৃত্তি প্রাণ তুমিময়
তা-না হলে সারা বিশ্বে
আমি-তুমি কেবা কয়।।

জাগন্ত বাসনার বলে
তরুশাখে ফুলে ফলে
সজীব চেতন ভূমণ্ডলে
করো সৃষ্টি-স্থিতি-লয়।।

তুমি না জাগিলে প্রভু
আমি না হইতাম কভু
সাধ মিটে না তোমার তবু
বারে বারে করে ক্ষয়।।

আমারই ঐ জন্ম-মরণ
খণ্ড ভাবের সুনিদর্শন
পণ্ড হবে খণ্ড যখন
অখণ্ড সে কেবল রয়।।

আমি বলতে নাই কিছু আর
“সর্বংসত্ত্ব” বিশ্ব তোমার
আমায় নিয়ে জাগিসনে আর
লীলার ছলে দয়াময়।।

তোমার প্রেমের চাপায় পড়ে
কষ্ট পেলাম জীবন ভরে
সুখ দিয়ে দে জন্মান্তরে
অতীত প্রেমের বিনিময়।।

জালালে কয় হিসাব নিবে
শুনেছি তুই শাস্তি দিবে
তোর বিচার তুই করিবে
আমার কিবা আছে ভয়?

জীব সৃষ্টির দার্শনিক কারণ হিসেবে জালাল এখানে একটি মহাসত্যকে দাঁড় করিয়েছেন। সে কারণটি হল ‘বাসনা’। মূলত ইচ্ছে বা বাসনার তাড়নাই জীবকে মহাসত্তা থেকে আলাদা করেছে। কারণ বাসনার সাথে জড়িয়ে রয়েছে, অতৃপ্তির পিপাসা, প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা, যা জৈবিক দেহধারণে নিবৃত্তির প্রয়াস জাগায়।

সে কারণেই জীবাত্মা তার জীবদ্দশায় জৈবনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে পাওয়া-না পাওয়ার দোলাচলে আজীবন সুখ-দুঃখের পশরা সাজাতে ব্যস্ত। আর তারই উৎস পরমাত্মা নিবৃত্তি-প্রাণ হয়ে একক সত্তা হিসেবে জীবাত্মার প্রতিনিধিত্ব করে। আর এখানেই ‘আমি-তুমি’র বিভাজন।

বাসনার জাগরণের কারণে মহাসত্তার একটি অংশ সজীব চেতনা নিয়ে খণ্ডাংশ রূপে জগতে গড়ে তোলে হাসি-কান্না, মিলন-বিরহ, প্রেম-ভালোবাসা প্রভৃতির এক মহোৎসব। সৃষ্টি-স্থিতি-লয় এই ধারাবাহিকতায় চলতে চলতে একদিন সমাপিত হবে মহোৎসব। এটি সৃষ্টিকর্তারই এক বিরাট বিনোদনপর্ব।

জালাল বলেন, সৃষ্টিকর্তার এ জাগরণ না হলে ‘আমি’ সত্তার আবির্ভাব হত না। এ সত্তা তাঁরই অংশ বিশেষ। তাঁরই আত্ম বিভাজনে আমি সত্তার আবির্ভাব। প্রতিনিয়ত তিনি নিজেকে জৈবনিক মহিমায় উজ্জ্বল করছেন আবার জৈবনিক ক্ষয় বা ধ্বংসেরও মুখোমুখি করছেন। জন্ম-মরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি রাখছেন তাঁর খণ্ড ভাবের নিদর্শন। আর এ খণ্ড পণ্ড হবার পর তিনি হবেন অখণ্ড সত্তা।

‘আমি’ বলতে আর কিছুই নেই, এ সত্য উপলব্ধি করে জালাল বলছেন, তিনি ‘সর্বংসত্ত্ব’ বিশ্বস্রষ্টা। লীলার ছলে যেন তাঁকে আর জাগান না হয়। কেননা, এই জাগরিত জীবনে স্রষ্টার প্রেমে পড়ে কেবল দুঃখ-কষ্টই পেতে হয়েছে। স্রষ্টার কাছে তিনি চাইছেন প্রেমের বিনিয়ে মুক্তি।

আবার গানটির শেষাংশে সে মুক্তির প্রার্থনাও ফিরিয়ে নিয়েছেন তিনি। জন্ম-মরণের গুঢ় রহস্য বুঝতে পেরে তিনি বলেছেন- ‘জালালে কয় হিসাব নিবে/শুনেছি তুই শাস্তি দিবে/তোর বিচার তুই করিবে/ আমার কিবা আছে ভয়?’

মূল্যবোধ:
জালাল উদ্দীন খাঁ সৃষ্টিতত্ত্বকে দেখেছেন সৃষ্টিরহস্য হিসেবে। তাঁর সাধক জীবনে রহস্যের ধুম্রজাল ছিন্ন করার একটা দ্রোহবাদী প্রত্যয় ফুটে উঠেছিল। বস্তুত এ দ্রোহের উৎস হলো প্রেম ও অভিমানের সংমিশ্রণজাত আবেগ বিশেষ। পরম-প্রেমাসক্ত সাধকের আবেগময় উন্মাদনাকে অনেকেই নেতি বাচক হিসেবে দেখেছেন। সমাজের অজ্ঞদের কর্তৃক সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু প্রাজ্ঞ সমাজে তিনি শাশ্বত কাল অমর ঐশি-প্রেমিক হয়ে থাকবেন।

(চলবে)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!