মতুয়া সংগীত

জয়চাঁদ হ’তে আছে

জয়চাঁদের যুদ্ধজয়।
পয়ার

জয়চাঁদ হ’তে আছে আর এক কার্য।
ঠাকুর মহিমা সেই বড়ই আশ্চর্য।।
কাছারীতে নতুন এক নায়েব আসিল।
ভূস্বামীর ভালবাসা নায়েব হইল।।
চৌগাছি নিবাসী বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস।
সুচরিত্র প্রবল প্রতাপে হ’ল যশ।।
নায়েবের নিজ জমিদারী ল’য়ে গোল।
বিপক্ষ পক্ষের সঙ্গে বাঁধিল কোন্দল।।
বিপক্ষে প্রধান জমিদার একজন।
মহা হুলুস্থল হ’ল বেঁধে গেল রণ।।
যে দিন হইবে যুদ্ধ তিনদিন অগ্রে।
বড় চিন্তাযুক্ত বাবু কিবা আছে ভাগ্যে।।
জয়চাঁদে কহে কেঁদে হইয়া কাতর।
বলে ওহে জয়চাঁদ কি হইবে মোর।।
তিনদিন পরে এই যুদ্ধ দিতে হবে।
যুদ্ধে না পারিলে মম বাড়ী লুঠে নিবে।।
সিপাহী লইয়া তুমি মম বাড়ী যাও।
এ বিপদ হ’তে তুমি আমাকে বাঁচাও।।
মোর দেশে সিপাহী আছে ত’ ভাল ভাল।
তবু মোর শান্তি নাই চিন্তা নাহি গেল।।
তাহা শুনি জয়চাঁদ করিল স্বীকার।
যা করেন হরিচাঁদ করিব সমর।।
আটজন সিপাহী লইয়া জয়চাঁদ।
যাত্রা করে জয়চাঁদ স্মরি হরিচাঁদ।।
চৌগাছি দিনের মধ্যে উতরিল গিয়া।
তিনদিন পরে রণ হইবে ভাবিয়া।।
নিরস্ত আছয়ে সে সিপাহী নয় জন।
অপর সিপাহী আর নাহি একজন।।
দুই দিন পরে রণ জনরব আছে।
দেশীয় সিপাহীগণ কেহ না এসেছে।।
একদিন অগ্রে বিপক্ষেরা দিল হানা।
রণোন্মত্ত কেহ কার নাহি শুনে মানা।।
মহারোল গণ্ডগোল সমরের ধ্বনি।
নায়েব হইল ত্রস্ত সেই ধ্বনি শুনি।।
অট্টালিকা পর গিয়া দেখিবারে পায়।
বিপক্ষের দল এসে হয়েছে উদয়।।
দুটি মত্ত হস্তী আর চারিটি তুরঙ্গ।
লোক পাঁচ ছয় শত করে রণরঙ্গ।।
এক হস্তী উপরে মাহুত একজন।
বন্দুক লইয়া করে আরও দুইজন।।
অশ্বোপরে অশ্বারোহী বন্দুক করেতে।
ঢাল তলোয়ার করে পদাতিক সাথে।।
তলোয়ার ভাজায়েছে সড়কী ঝাঁকিছে।
রবির কিরণে ঝিকিমিকি করিতেছে।।
তাহা দেখি নায়েবের উড়িল পরাণ।
জয়চাঁদে কহে কেঁদে গেল ধনপ্রাণ।।
তুমি মম ধর্ম বাপ কি কহিব আর।
দয়া করি কর মোরে বিপদে নিস্তার।।
জয়চাঁদ বলে মোর যা থাকে কপালে।
চেষ্টা করে দেখি বাবা হরিচাঁদ বলে।।
জয়চাঁদ রণসজ্জা করিল তখন।
কটিতে বাঁধিল এঁটে পিন্ধন বসন।।
ঢাল তলোয়ার সড়কী কিছু নাহি নিল।
হরিচাঁদ দত্ত ষষ্ঠি লইয়া চলিল।। (যষ্টি)
আর আটজনে নিল ঢাল তলোয়ার।
হরিচাঁদ বলে জয়চাঁদ অগ্রসর।।
সুত বাঁধা ভাঙ্গা লাঠি জয়চাঁদ নিল।
বাবা হরিচাঁদ বলে হুঙ্কার ছাড়িল।।
হাঁটু গাড়া দিয়া মুখ ভূমে নামাইয়া।
মহানাদ করে বাবা বলে থাবা দিয়া।।
দাঁড়াইয়া লম্ফ দিল কালের সমান।
লাঠি ভাজাইয়া যুদ্ধে হ’ল আগুয়ান।।
আয় আয় বলিয়া ছাড়িল ভীমনাদ।
দেখিয়া বিপক্ষ দলে গণিল প্রমাদ।।
অশ্ব, করী আরোহী বন্দুক পূর্ণ করি।
দোনালা বন্দুক মারে জয়চাঁদোপরি।।
লাঠিতে লাগিয়া গুলি ধুম অগ্নি হয়।
বিপক্ষের দল দিকে সেই গুলি ধায়।।
সুধন্বার বাণে যেন সুধন্বা সংহার।
সৈন্য ক্ষয় ফিরে যায় অশ্ব, করবির।। (করীবর)
বিপক্ষের দলেতে লাগিল মহামার।
বন্দুকের ধুমে হ’ল ঘোর অন্ধকার।।
সমরে বিমুখ হয়ে সৈন্যগণ ফিরে।
দৌড়িয়া পালায় সব টিকিতে না পারে।।
তুরঙ্গম চারিটি পালায় মহাবেগে।
করীবর পালায় শুণ্ডেতে গুলি লেগে।।
সক্রোধে মাহুত মারে অঙ্কুশের বাড়ী।
মাহুত ফেলিয়া হস্তী ধায় দৌড়াদৌড়ি।।
দৌড়িয়া সারিতে নারে কুজা হয় হাতী।
তুরঙ্গ মাতঙ্গ ভঙ্গ পলায় পদাতি।।
হস্তীর নিনাদে হয় রণস্থল কম্প।
হরিচাঁদ স্মরি জয়চাঁদ মারে লম্ফ।।
জয়চাঁদ দেখে এক মহাবীর সাথে।
সমরে কোমর বাঁধা লৌহদণ্ড হাতে।।
জয়চাঁদে ডেকে বলে মাভৈ মাভৈ।
নাহি ভয় ওরে জয় হ’লি রণজয়ী।।
কৃপাদৃষ্টি করি ষষ্টি যে দিয়াছে তোরে।
তোমার কারণে রণে সে পাঠাল মোরে।।
সেই হরি আবির্ভূত সম্মুখ সমরে।
তার কৃপা তব পরে তোর ভক্তি জোরে।।
জরাসন্ধ গদাঘাত করে ভীম শিরে।
সেই গদাঘাত নিজে গদাধর ধরে।।
এই রণে সেইরূপ রাখিল তোমায়।
গুলির আঘাত কি লাঠিতে ফিরে যায়।।
অদ্যকার রণ হ’ল তেমন প্রকার।
গৃহে ফিরে চল রণে কার্য নাহি আর।।
এতশুনি জয়চাঁদ ক্ষান্ত দিল রণ।
জয় জয় ধ্বনি করে সঙ্গে সঙ্গীগণ।।
রণ জয় জয় জয় হরিচাঁদ জয়।
জয় শ্রীগোলকচন্দ্র জয় মৃত্যুঞ্জয়।।
অই বেশে এসে বিষ্ণুচরণের ঠাই।
বিদায় মাগিল, বাবু মোরা দেশে যাই।।
তাহা শুনি বিষ্ণু বাবু বিদায় করিল।
সঙ্গী ল’য়ে জয়চাঁদ নিজ দেশে গেল।।
জয়চাঁদ রণজয় অপূর্ব কাহিনী।
হরিচাঁদ প্রীতে ভাই বল হরিধ্বনি।।
জয়চাঁদ রণজয়ী শুনে যেই জন।
সর্ব কার্য সিদ্ধি তার জিনিবে শমন।।
শ্রবণে পাপের নাশ প্রেম ভক্তি পায়।
রসনা কহিছে হরি কহ রসনায়।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!