ভবঘুরে কথা

এ যাবৎ প্রাপ্ত ঢাকার ইতিহাসে সাধারণ মানুষের কথা প্রায় নেই বললেই চলে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। আদি ইতিহাস রচয়ীতারা যেহেতু শাসকবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় ইতিহাস রচনা করেছেন তাই তাদের রচিত ঢাকার ইতিহাস গ্রন্থে শুধু শাসকদের ইতিহাসই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। শাসকদের গুণকীর্তণই এসকল ইতিহাসের মূল উপজীব্য। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকার যে সমস্ত ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হয়েছে সেগুলোতেও ঢাকার সাধারণ মানুষের ইতিহাস সেভাবে উঠে আসেনি। ঢাকার সাধারণ মানুষের ইতিহাস না পাওয়া যাওয়ায় এ শহরের যাতায়াত বা যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সে সকল পেশাজীবী জড়িত ছিল তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। দু-একটি ক্ষেত্রে অবশ্য এর ব্যাতিক্রমও রয়েছে যেমন ঢাকার ঘোড়া গাড়ির ও রিকসা চালক সম্পর্কে কিছু কিছু কথা জানা যায়। তবে ঢাকার একসময়কার প্রধান বাহন নৌকার মাঝিদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না।

কোন স্থান উন্নয়নের প্রধান শর্ত হচ্ছে তার যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন। স্থলপথে ঢাকার যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা থাকলেও জলপথে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই উন্নত ছিল যে মোগল শাসকরা বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে বেছে নিয়েছিল। সে সময় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ঘাটগুলোতে ভীড় করে থাকত নানা স্থানে যাতায়াতকারী বিশাল বিশাল নৌকা। আর সদা প্রস্তুত থাকত যুদ্ধ সাজে সজ্জিত রণতরীগুলো। প্রাক-মোগল ও মোগল শাসনালে ঢাকায় রাস্তাঘাটের সংখ্যা খুব কম ছিল বলে জলপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। তাই নৌকাকেই এ অঞ্চলের তৎকালীন প্রধান বাহন বলা যেতে পারে। সে সময় ছোট-বড় নৌকাগুলোই ছিল যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম।


…জলপথে নৌকাযোগে যাতায়াত অনেক সহজ ছিল। শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নৌকার ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত, যদিও শহরের মধ্যে অনেক জলপথ ছিল।

মুহাম্মদ ইব্রাহীম তার ইতিহাসের ঢাকা নগরী : প্রযুক্তি ও জনজীবন শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন- “সাধারণ লোকের জন্য ঢাকায় তখন নাগরিক সুবিধা বলতেও বেশি কিছু ছিলো না। যানবাহন শুধু ধনী লোকেরাই ব্যবহার করতো ঘোড়া অথবা পালকি। কোন রকম চক্রযানের প্রচলনই ছিলো না। মুঘল সাম্রাজ্যে গরুর গাড়ির ব্যবহার থাকলেও ঢাকার মানুষের যাতায়াত বা মাল পরিবহন কোনটির জন্য এটি ছিলো না। সাধারণ লোক শুধু হেঁটেই যাতায়াত করতো।”


…আশেক লেনের সে মেস্ হইতে আমাদের বৃষ্টির দিনে চারিজনে চারি আনা ভাড়ায় ঘোড়ার গাড়ীতে কলেজে যাইতাম। তখন ঢাকায় রিক্সা বা বাস ছিল না। মোটরগাড়ী ছিল পাঁচ-ছয়খানা। কলেজ ছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের নিকট।

ড আবদুল করিম তার দ্যা মোগল ক্যাপিটাল অব ঢাকা গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন- “…যদিও ভারতে মোগলদের পরিবহণ হিসাবে গরু বা মহিষের গাড়ির প্রচলন ছিল বলে জানা যায়, তবু ঢাকায় মানুষের যাতায়াত অথবা মাল পরিবহণের জন্য গরু বা মহিষের গাড়ির ব্যবহার সম্পর্কে কোনো তথ্য আমরা পাইনি। সাধারণত স্থলপথে পায়ে হেঁটে চলাচল করাটাই রীতি ছিল। …জলপথে নৌকাযোগে যাতায়াত অনেক সহজ ছিল। শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নৌকার ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত, যদিও শহরের মধ্যে অনেক জলপথ ছিল।”


“ঘোড়াগাড়িতে পর্দানশীল মহিলারা গাড়ির জাফরি তুলে দিয়ে যাতায়াত করত। আর ঢাকার নবাগত রিকশায় পর্দাশীল মহিলারা শাড়ির ঘেরাটোপ বন্দী হয়ে চলাফেরা করত।”

আবুয্ যোহা নূর আহমদ তার উনিশ শতকের ঢাকার সমাজ জীবন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- “…ঢাকা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হই ১৯২৫ সালে। আশেক জমাদারের গলিস্থ এক নোংরা কলেজ মেসে উঠিলাম। …আশেক লেনের সে মেস্ হইতে আমাদের বৃষ্টির দিনে চারিজনে চারি আনা ভাড়ায় ঘোড়ার গাড়ীতে কলেজে যাইতাম। তখন ঢাকায় রিক্সা বা বাস ছিল না। মোটরগাড়ী ছিল পাঁচ-ছয়খানা। কলেজ ছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের নিকট।”

মোহাম্মদ আবদুল কাইউম তার ঢাকাবাসীদের রসবোধ প্রবন্ধে লিখেছেন- “ঘোড়াগাড়িতে পর্দানশীল মহিলারা গাড়ির জাফরি তুলে দিয়ে যাতায়াত করত। আর ঢাকার নবাগত রিকশায় পর্দাশীল মহিলারা শাড়ির ঘেরাটোপ বন্দী হয়ে চলাফেরা করত।”

বিশেষ কিছু না জানা গেলেও ঢাকার কয়েকটি পরিবহণ ও পরিবহণ শ্রমিক সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যা গৌরবমণ্ডিত ঢাকার ইতিহাসের বিশেষ কিছুই প্রকাশ করে না। তবে দেখা যায়, যুগের সঙ্গে তার রেখে ঢাকার স্থল ও জল পথে ক্রমান্নয়ে যুক্ত হয়েছে যুগপোযুগি সব বাহন। মোগল শাসনামলে ঢাকার সড়ক পথের কিছুটা উন্নয়ন করা হলে স্থলপথের পরিবহনের প্রচলন শুরু হয়। তবে প্রথম দিকে স্থলপথের একমাত্র পরিবহণ ছিল পালকি। ধারণা করা হয়, একসময় ঢাকাতে গরুর গাড়ীরও প্রচলন ছিল তবে এর কোন সুস্পষ্ট তথ্যাদি পাওয়া যায় না। আদিতে জলপথে বিভিন্ন বাহন থাকলেও উনিশ শতকের পর থেকে স্থলপথে যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!