তাড়না

“প্রতিটি মানুষেরই জন্ম হয়েছে একটা নির্দিষ্ট কাজের জন্য আর সেই কাজটি তার হৃদয়ের মাঝে লালিত হয়। প্রতিটি মানুষ ভেতর থেকে ঠিক সেই কাজটি করার জন্যই তাড়না অনুভব করে।” ল্যাপটপের স্ক্রিনে চকচক করতে থাকা এই লাইন দুটি গত কিছুদিন ধরে আমাকে অন্য কোনো কাজেই ডুবতে দিচ্ছে না। প্রতিদিন কত শত হাজার লক্ষ শব্দ পড়ছি কিন্তু এমনভাবে আটকে যাইনি কখনো। মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী এই অল্প কয়টা শব্দ দিয়ে আমাকে এমনভাবে বাঁধবে তা কি ভেবেছিলাম কখনো? ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে সেই কত কত বছর আগে সেই ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া এই সাধক কি বলে গেছে এতোবছর পরও তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমার কেবল জানতে ইচ্ছে করে এই প্রশ্নের উত্তরটা কি আমি ছাড়া অন্য সকলেই জানে? সকলের কাছেই কি এই প্রশ্নটা আমার মতো এতো মূল্যবান হয়ে ধরা দেয়? নাকি এটা নিছকই এটা প্রশ্ন মাত্র। যা নিয়ে না ভাবলেও চলে? প্রশ্নটার উত্তর কার কাছে কেমন করে আছে সেটাই আমাকে ভাবাচ্ছে বেশি।

বছরের শেষ মাস হলেও শীতটা তেমন জাকিয়ে বসেনি। গ্রাম থেকে ফিরছি। পাশের সিটের যাত্রীটিকে বই পড়তে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। সময়ের অভাবে আজকাল বইপড়া হয়না তেমন; যতটা সময় পাই তাতে বড়জোর পিডিএফ পড়া যায়। কিন্তু পিডিএফ পড়তে বড্ড বিরক্ত লাগে। বেশিদূর এগুতে পারি না। তাই কেউ ছাপার বই পড়ছে দেখলে বেশ লাগে। যাত্রীটির রুচিরও তারিফ করতে হয়। তিনি রুমীর একটা অনুবাদ গ্রন্থ পড়ছেন। সিরাজগঞ্জে যাত্রাবিরতিতে শীত শীত রাতে কফি খেতে খেতে ভদ্রলোক আবৃত্তির সুরে সুরে এই লাইন দু’খানা শুনিয়েছিলেন। বাকি পথটায় আর কথা হয়নি। শেষরাতে কখন ঘুমিয়ে পরেছিলাম মনে নেই। ভদ্রলোক কখন কোথায় নেমে গেছেন তাও দেখা হয়নি। কিন্তু নাম না জানা মানুষটার মুখে শোনা বাণীটা আমাকে ছেড়ে যায়নি। ভদ্রলোক যেন সান্তা ক্লুজের মতো এসে এই উপহারখানা দিয়ে চলে গেলেন।

বাবা বলেছিল, ‘জীবনে যখন কোনো বিপ্লবই করতে পারলাম না তখন তোর নাম রেখে দিয়েছিলাম বিপ্লব। সবাই বিপ্লবের বাপ নামে ডাকবে এই ভেবে সুখ নিবো এই আর কি।’ বাবার এই কথাটা মনে পরলেই ভাবি, আমার যাবতীয় ব্যর্থতা দেখে বাবা কি বিপ্লবের ব্যর্থতা ভেবে দু:খ পান? নাকি ছেলে ঢাকা শহরে টিকে আছে, করেকেটে খাচ্ছে তা ভেবে সুখ পান? তার দিকে তাকিয়ে অবশ্য কিছুই বুঝিতে পারি না। মাঝারি মানের একটা পত্রিকার বিনোদন পাতায় লেখালেখি করছি অনেকদিন। অন্যপাতাতেও মাঝেমধ্যে লিখতে হয়, তবে সেটা উল্লেখ করার মতো কিছু না। পত্রিকার জন্য যা সব লিখি তা সবই প্রায় ডেকোরেটিভ লাইফের কথা। ওগুলোর সাথে আর যাই হোক জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। কেবল লেখার জন্য লেখা আরকি। খাবার সম্পর্কেই লিখি আর শীতের পোষাক নিয়েই লিখি তাতে কিছু যায় আসে না। তার সাথে নারীর সুরসুরে সূক্ষ্ম যৌনতার ছবি জুড়ে দিয়ে পাঠককে খাওয়ানোটাই এখানে শিল্প। প্রকাশক-সম্পাদক তাই চান। তাদের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে আমিও হয়তো আজ তাই চাই। এই জীবনটা যে খারাপ তা কিন্তু নয়। গ্ল্যামারাস মানুষের সাথে উঠাবসা হয়; জাকজমক পার্টিতে ঘোরাফেরা করা যায়। ভাব নিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করা যায়। পরিচিতরা কিঞ্চিৎ সম্মানটম্মানও দেয়। জীবন ভালোই কেটে যাচ্ছে। এইসব বস্তাপঁচা ফিচার পড়ে চারপাশে সবাই খুশি। পকেটে টাকা থাকলে আমিও খুশি।

সুন্দর ছিমছাম জীবনে করেকেটে খাচ্ছিলাম সেই কোন বালখ্‌ শহর জন্ম নেয়া রুমী আমার মহাসর্বনাশ করে দিলো। দাদী বলতো, মানুষ হয় দুই রকম। একরকমের মানুষ হয় সিপাহী পিপড়ার মতো। তারা সারাজীবন সামনের পিপড়াটাকে অনুসরণ করে জীবন কাটিয়ে দেয়। এদের সংখ্যাই সমাজে বেশি। আর দ্বিতীয় রকমের মানুষ হয় অলস প্রকৃতির যারা কোনো কাম কাজ করে না। এদের একমাত্র কাজ হলো মানুষের মাথায় পোকা ঢুকিয়ে দেয়া। আর এই পোকা যাদের মাথায় জুইত করে বসতে পারে তার জীবন ফাতাফাতা। তবে সমস্যা হলো এই পোকার গুণ সর্বক্ষেত্র ভালো নাও হতে পারে এই আর কি। দাদীর এই কথাগুলো আজকাল বারবার মনে পরে। আমার ধারণা রুমীও সেই গোত্রের মানুষ, যাদের জন্ম হয় মানুষের মাথায় পোকা ঢুকিয়ে দেয়ার জন্য। উন্নতজাতের পোকা। আর তার ঢুকিয়ে দেয়া উন্নতজাতের পোকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি।

লাইন দুটা মাথায় নিয়ে সেই যে ঘরে ঢুকলাম এখন পর্যন্ত তার থেকে মুক্তির কোনো পথ পাইনি। প্রথম কয়েকদিন উত্তর খোঁজার জন্য প্রাণপণ লড়েছি। আসলেই কি জন্মের আগে প্রতিটি মানুষের কর্ম নির্দিষ্ট করা থাকে আলাদা আলাদা করে? সেই কাজ কি কাজ? সবার কাজ নির্দিষ্ট!!! এটা কি করে সম্ভব? বংশবৃদ্ধি করাই মানুষের একমাত্র কর্ম নয়, প্রত্যেকের জন্যই আসলেই নির্দিষ্ট করা আছে প্রত্যেকের কাজ?? যতটা পড়াশোনা করেছি, যতটা জ্ঞান অর্জন করেছি তা দিয়ে এই প্রশ্নের কোনো কুলকিনারা করতে পরিনি। নিজেকে অসংখ্যবার ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রশ্নটা করেছি কিন্তু এমন কোনো উত্তর উদ্ধার করতে পারিনি। যে উত্তরটা সত্যি সত্যি মন থেকে গ্রহণ করা যায়। এইসব ভাবতে ভাবতে যখন নিজের উপর বিরক্তি চলে আসলো তখন এর থেকে বাঁচার চেষ্টাও করেছি। কিন্তু লাইনদুটি এতটাই শক্তিশালী এ যে সহজে ঘাড় থেকে নামবে না বুঝে নিয়েছি। যখন এ কথা বুঝে নিয়েছি তখন এর উত্তর খোঁজাই ভালো বলে মেনে নিয়েছি। তাই খোঁজ দ্যা সার্চ; আর সার্চ মানেই গুগল। গুগলেও আজকাল কোনোকিছু খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। সঠিকতথ্য পাওয়া বা যা খুঁজছি ঠিক তাইতাই পাওয়া দিনদিন জটিল হয়ে উঠছে। ওয়েবসাইট এসিও নামের মহাব্যাধি এমনসব তথ্যকে এমনসব সাইটকে সামনে নিয়ে আসে যার মধ্যে আদৌতে কোনো অথেনটিক তথ্যই নেই। কিন্তু প্রকৃততথ্য যেসব সাইটে পাওয়ার সম্ভবনা সেগুলো ওয়েবের বিশাল ভুবনে কোথায় লুকিয়ে থাকে তার অনুসন্ধান করা দুষ্কর। তারপরও গরীরের গুগল মামাই ভরসা। এই কয়দিন কতো সাইট ভিজিট করেছি তা বলে শেষ করা যাবে না। বেশকিছু শাস্ত্র পড়বারও চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো নিষ্পত্তিতে আসতে পারিনি। প্রায় সকল শাস্ত্রই ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বলে; কোনটাকেই মেনে নিতে পারিনি মন থেকে। আবার মনে হয়েছে আমি হয়তো সঠিকভাবে তাদের বুঝতেই পারছি না। কোথায় যেনো একটা প্রশ্নসূচক চিহ্ন থেকেই যাচ্ছে। রুমীর বেশকিছু অনুবাদগ্রন্থও যোগার করেছি। তা থেকেও আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে প্রায় কিছুই আবিস্কার করতে পারিনি। কিছু ভারি ভারি শব্দ সংগ্রহে জমেছে এই যা। তাই খোঁজার যাত্রা অব্যাহতই আছে।


প্রায় সকল শাস্ত্রই ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বলে; কোনটাকেই মেনে নিতে পারিনি মন থেকে। আবার মনে হয়েছে আমি হয়তো সঠিকভাবে তাদের বুঝতেই পারছি না। কোথায় যেনো একটা প্রশ্নসূচক চিহ্ন থেকেই যাচ্ছে। রুমীর বেশকিছু অনুবাদগ্রন্থও যোগার করেছি। তা থেকেও আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে প্রায় কিছুই আবিস্কার করতে পারিনি। কিছু ভারি ভারি শব্দ সংগ্রহে জমেছে এই যা। তাই খোঁজার যাত্রা অব্যাহতই আছে।

আমার এই সব পেরেসানির কথা ইতিমধ্যে রাষ্ট্র হয়ে গেছে। পরিচিত অনেকেই টিটকিরি করাও শুরু করছে। অবশ্য দোষটা আমারই। বোকা বোকা চেহারাটাতো জন্মসূত্রে পেয়েছিই আর বুদ্ধিটাও যে খানিকটা কম সেটা সবসময় মনেও থাকে না। বিষয়টা আলোচনা করেছিলাম; সেটাই কাল হয়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে অফিসে যে দেখে সেই ঠোঁট টিপে হাসে। অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলেও সকলে সকালসন্ধ্যা টাইম করে মনে করিয়ে দিচ্ছে আমার জীবনের একমাত্র কাজ নাকি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া। এজন্যই নাকি আমার জন্ম। বোঝ অবস্থা। এমনকি সম্পাদক সাহেব একদিন ডেকে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বেশ খানিকটা সময় দম ফাটিয়ে হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন কাজের চাপ না থাকলে তোমাকে ২/৩দিনের ছুটি দিতাম। তা তো হবার নয়। দেখ বিষয়টা নিয়ে একটা অনুসন্ধানী টাইপের রিপোর্ট করা যায় কিনা। যদি ছাপারযোগ্য হয় তাহলে সাপ্তাহিক বিশ্লেষণ পাতায় পাঁচ কলামের হাফ পৃষ্ঠা দিতে পারি। এখন ভেবে দেখো কি করবা। পত্রিকার লোকজন আর যাই হোক কোনো কিছুকেই খবর না বানিয়ে ছাড়ে না।

সব শুনে মনিকাই একমাত্র গুরুগম্ভীরভাবে বলেছে এইভাবে কিছু হবে না বুঝলি। বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো নমুনা সংগ্রহ করতে পারিস কিনা দেখ। যেটা দিয়ে ধাপে ধাপে প্রশ্ন থেকে উত্তরে যেতে পারবি। পরমার্শটার জন্য মনিকাকে ২২০ টাকা খরচ করে মোস্তাকিমের চাপ খাওয়াতে হয়েছে। পকেট থেকে কিছু টাকা খসেছে তাতে অবশ্য বিশেষ আপসোস নেই। উপায়টা মনে ধরেছে। অফিসের সিনিয়রদের দারস্থ হয়ে যেসব দলিল-দস্তাবেজ পেলাম তাতে মন ভরলো না। অগত্যা আবারো গুগল করা শুরু করলাম। কিন্তু বিধিবাম, আমার বিদ্যায় ধরে সেরকম কিছুই পেলাম না। আর যা পাই সেসব বিশাল বিশাল কঠিন কঠিন ইংরেজিতে লেখা আর্টিকেল পড়তে গেলে এক জীবনে আর এর উত্তর খোঁজা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সেই আর্টিকেলের মানে খুঁজতে খুঁজতেই জীবন যাবে। শেষে অফিসের আদি ও অকৃত্রিম দার্শনিক বিমল দা’র স্বরণাপন্ন হলাম। পাগলাটে হলেও উনি ব্যাপক জ্ঞানী। সব শুনে বিমল দা’ খেঁকিয়ে উঠে বললেন, বুদ্ধি নিতে আসছিস আর দক্ষিণা আনিস নি? এক প্যাকেট দামী সিগারেট দুই কাপ র’ চা আর ১২টাকা দামের তিনকোণা আকৃতির একখানা কেক খাওয়ার পর বিমল দা’ বললেন, ‘শোন এতো দৌঁড়ঝাপ না করে রুমী পড়া শুরু করে দে।’

তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, দাদা আসলে আমি এর উত্তরটা সরাসরি খুঁজতেছি না। আমি আসলে জানতে চাই এই প্রশ্নের উত্তরটাকি সকলের কাছে আছে? নাকি এই প্রশ্নটাই তারা শোনেনি বলে তা তাদের মনে জাগেনি? কিছু সময় সিগারেটে লম্বা লম্বা দম দিয়ে বিমল দা বলতে শুরু করলেন, যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর পাবি না তখন জরিপ করা শুরু করে দিবি, বুঝলি? এটাই নিয়ম। কাগজ কলম বা রেকডার নিয়ে নেমে পর। যখনি সময় পাবি যাকে পাবি তারই সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু কর। বাছবিচার করবি না। যাকেই পাবি তাকেই প্রশ্নটা করবি। জানার চেষ্টা করবি এই বিষয়ে কে কি ভাবে। আদৌ ভেবেছে কিনা। ভাবলে কি ভাবছে। এইসব আর কি। তুই তো এসব জানিসই। সবচেয়ে ভালো হয় কিছু প্রশ্ন তৈরি করে নে। তাহলে সুবিধা হবে।

বিমল দা’র বুদ্ধিটা ভালো কিন্তু সময়সাপেক্ষ। আমার মাথায় এমন বুদ্ধি আসে না কেনো? অফিসের নিচের চায়ের দোকানদার একবার বলেছিল, ‘দুনিয়া হইলো মামা বুদ্ধির জায়গা এইখানে বুদ্ধি কইরা চলতে হয়; নাইলে কুত্তার লেঞ্জার মতো লাড়তে লাড়তে জীবন শেষ।’

বিমল দা’ সিন্ধান্ত মাথা পেতে নিয়ে এই পর্যন্ত মনে মনে কেবল প্রশ্নই সাজিয়েই যাচ্ছি। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কাকে করবো কিভাবে করবো কবে করবো এই ভেবেভেবেই সময় যাচ্ছে। আজ আমার ডে অফ। হাতেও তেমন কোনো কাজ নেই। ভাবছি আজই সেই মহান দিন হতে পারে এই কাজের সূচনা করার। গত কয়েকদিন আলসেমিতে কাজটা শুরু করতে পারিনি। আজ আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একটা নতুন আইডিয়াও ইনভেন্ট করেছি। অবশ্য এই আইডিয়াটাও ধার করা, সরাসরি রূপকথার গল্প থেকে কপি করা। ব্যপারটা এমন যে, আজ যিনি প্রথমে এই রুমে প্রবেশ করবে তাকে দিয়েই শুরু করে দিবো। হিসেব মতে সকালে চায়ের কাপ হাতে পিচ্চি পলাশের আসার কথা, নাস্তা নিয়ে আসার কথা লালুর। বুয়ার আসার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনজনের কেউ আসেনি। এরকম অবশ্য প্রায়ই হয়। ওরা আমার কথা ভুলে যায়। তখন নিচে যেয়ে নাস্তা খেয়ে আসতে হয়। কিন্তু আজ তো পণ করেছি যে আসবে তার সাক্ষাৎকার নেব। তাই ঘর থেকে বের হতে পারছি না। হাত পুরিয়ে নিজেই চা বানিয়ে পান করছি। ইচ্ছে ছিল কফি খাবো কিন্তু তাতে অনেক ঝুক্কি। তারচেয়ে র’ চা বানানো সহজ। বিশাল মগে চা নিয়ে ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে দেয়ালের বোর্ডটায় লেখা রুমীর লেখাগুলো সকাল থেকে দেখেই যাচ্ছি… দেখেই যাচ্ছি…

আমার এই ঘরের একমাত্র দরজাটি এখন ঠিক আমার পেছনে। দরজাটি দিয়ে প্রথমে কে ঢুকবে? ডানপাশের দেয়ালে মাথা থেকে পা পর্যন্ত আয়নাটায় যে আমাকে দেখছি তাকে দিয়ে শুরু করতে হবে কিনা সেটা ভেবে খানিকটা উৎকণ্ঠিত। বেলা বারার সাথে সাথে ক্ষিদের তেজটাও বাড়ছে। পণ ভাঙব কি ভাঙব না এই যখন ভাবনার বিষয় ঠিক তখনই কানে আসলো-

-বিপ্লব নাইটগার্ডের টেকাটা দেও।

পাই করে মাথা ঘুরিয়েই দেখি দরজায় দাঁড়িয়ে আছে নাইটগার্ড রমিজ মিঞা। শুনেছি রমিজ মিঞা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি একাই এই পাড়ায় গত কযেক দশক ধরে নাইটগার্ডের কাজ করছেন। নাইটগার্ড হলেও তার মতো অলস মানুষ দ্বিতীয়টি দেখিনি। মাসের যেকয় দিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেতনের টাকা সংগ্রহ করেন সেই কয়দিনই তার মাঝে কিঞ্চিৎ চলাফেরার উৎসাহ দেখা যায়। বাকি দিনগুলোতে তাকে পাড়ার মোড়ে একই জায়গায় বসে খোসগল্প করতে দেখা যায়। লোকে বলে আশপাশের চোর-ডাকাত-নেশাখোর-ছিনতাইকারী সবাই নাকি তার বিশেষ ভক্ত। সেই সুবাদেই এই পাড়ায় তেমন অপকর্ম হয় না। কিঞ্চিত মদগাঁজা সেবনের বাতিক আছে রামিজ মিঞার। সেইসব একটু বেশিমাত্রায় গলায় পরলে মাঝরাতের দিকে রমিজমিঞা বেসুরো গলায় গেয়েও উঠেন। পাড়ার প্রায় সকলেই তাকে অজ্ঞাত কারণে সমীহ করে চলে। তবে ছেলেপুলে বলে রমিজ মিঞা নাকি সকলের হাঁড়ির খবর জানেন। সেই খবর রাষ্ট্র হলে সংসারগুলো পটাপট পটাপট করে ভেঙ্গে খানখান হয়ে যাবে। তাই তাকে কেউ ঘাটায় না।

-কিরে আমু ঘরে?

-আরে চাচা আসেন আসেন।

-নারে আমার হাতে সময় নাই। তাড়াতাড়ি টেকাটা দিয়া দে। হাতে অনেক কাম।

যদিও তিনি কোনো কাজই করেন না তারপরও এই কথাই বলেন সকলকে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শেষপর্যন্ত মিনিট দশেক সময় দিতে রাজি করিয়ে ফেলাম। তিনি কি উত্তর দেয় সেটাই চিন্তার বিষয়। শুরুটা ভালো না হলে মনটা খারাপ হয়ে যাবে।

-যা বলার তাড়াতাড়ি বইল্ল্যা ফেল। আমার সময় নাই। ঘুম পুরা হয় নাই। দুপুরের খাওয়া দাওয়া কইরা আরো ঘণ্টা দুয়েক ঘুমাইতে হইবো।

-আপনি আরাম করে বসেন, এখনি শুরু করছি।

আমি আগেই সব ঠিকঠাক করে রেখেছি। আরাম কেদারাটায় রমিজ মিঞাকে বসিয়ে দিলাম। মোবাইলের রেকর্ডার রেডি। কাগজ কমল রেডি। আমি নিজেও রেডি। খুব নিরবে দীর্ঘ একটা নি:শ্বাস নিয়ে বললাম,

-চাচা আপনি রেডি?

-রেডি হওনের কি আছে আমার কি বিয়া নাকি? যা কওয়ার কও।

-আপনাকে তো সবই বল্লাম; আবারো প্রশ্নটা করছি আপনি আপনার মতো করে বলবেন ঠিক আছে?

-তুমি তো মিঞা লোক ভালা না। এত্তো প্যাঁচাও কেন? যা কওয়ার কও না।

-ঠিক আছে, আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, আপনার কি মনে হয়? মানুষের জন্ম কি কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য হইছে? মানে প্রত্যেকটা মানুষের জন্য কি তার কাজ নির্ধারিত করা আছে? যা তার মনের ভেতর আছে আর সেটা করার জন্য মন ভেতর থেকে চায়? আপনার কি মনে হয়?

রমিজ মিঞা তার বিশাল উচ্চতার প্রায় বাঁকা হয়ে যাওয়া মজবুত শরীরটাকে ইজিচেয়ারে জুইত করে বসিয়ে হাতলে রাখা লাল রঙের সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ধরালেন। হালকা চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলেন। অনেকটাসময় নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,


-বিপ্লব কি বলমু আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারতেছি না। তোমার কথা আগামাথা আমি কিছুই বুঝতাছিনা। তয় আমি ছোটবেলায় হইতে চাইছিলাম বাত্তিওয়ালা। তুমি হয়তো দেখো নাই। একসময় এই শহরে মিনিসিপ্যালিটি আপিস থেইক্ক্যা সাইকেলে কইরা তেলের ডিব্বা লাইয়া লোক আসতো। তাগো আমরা কইতাম বাত্তিওয়ালা। তখন মহল্লার বড় রাস্তার খাম্বার উপরে বড় বড় কুপ্পি ঝুঁলানো থাকতো।

-বিপ্লব কি বলমু আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারতেছি না। তোমার কথা আগামাথা আমি কিছুই বুঝতাছিনা। তয় আমি ছোটবেলায় হইতে চাইছিলাম বাত্তিওয়ালা। তুমি হয়তো দেখো নাই। একসময় এই শহরে মিনিসিপ্যালিটি আপিস থেইক্ক্যা সাইকেলে কইরা তেলের ডিব্বা লাইয়া লোক আসতো। তাগো আমরা কইতাম বাত্তিওয়ালা। তখন মহল্লার বড় রাস্তার খাম্বার উপরে বড় বড় কুপ্পি ঝুঁলানো থাকতো। বাত্তিওয়ালারা সন্ধ্যার সময় আইসা চঙ্গা দিয়া খাম্বায় উইঠা কুপ্পিতে কেরোসিন দিত। এমন মাইপ্প্যা মাইপ্প্যা তেল দিতো যাতে সকালে তেল শেষ হইয়্যা আপনআপনি বাত্তি বন্ধ হইয়া যায়। তারপর আগুন জ্বালায়া ঢাকনা বন্ধ কইরা চইল্ল্যা যাইতো। রাইতে সেই বাত্তি ফকফক কইরা জ্বইল্যা থাকতো। আমি খালি ভাবতাম বড় হইয়া বাত্তিওয়ালা হমু। ভাবতাম সেইটাই আমার কাজ। কিন্তু দেহ কি হইলাম। হইলাম পাহারাদার। চোরের পাহারাদার। আচ্ছা আমার কাম কি এইটা আছিল কও? এইটা কি কোনো কাম হইতে পারে? চোরের পাহারাদার কি মাইনষ্যে হয়!!

মুখোমুখি চেয়ারটায় আমি বসে পরলাম। আলাপটা মোড় ঘুরে গেলেও ভালো দিকে এগুচ্ছে। আমি উদগ্রীব হয়ে শুনতে শুরু করলাম। রমিজ মিঞাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি টাইম ট্রাভেল করে অতীতে চলে গেছেন।

-আমরা ছিলাম অনেকগুলান ভাইবোন। বাপটা মইরা গেলো। দুই ক্লাস পরনের পর পড়া বন্ধ হইয়া গেলো। তখন তো আর গার্মেন্টস আছিল না। এতো চাকরি-বাকরিও না। মা এত্তোগুলান পোলাপান লইয়্যা বিপদে পইরা গেলো। আমি ছিলাম পাঁচনাম্বার পোলা। দুইবেলা খাইতে পারি না। সিনেমার রাজ্জাক আলমগীরের মতো নিজে কষ্ট কইরা ভাইবোন পালমু সেই পোলা আমি আছিলাম না। বাড়ি থেইক্ক্যা পলাইলাম। তারপর যে কত্ত রহমের কাম করছি তার শেষ নাই। কষ্ট আর কষ্ট। কষ্ট আর ছাড়ে না। শেষে চুরি করতে গিয়া এই মহল্লার সরদার সাহেবের পান্ডার হাতে ধরা খাইলাম। মাইর‌্যা খাম্বার লগে টানায়া রাখলো। যে খাম্বার বাত্তি জ্বালানের ইচ্ছা আছিল সেই খাম্বার লগে আমি বান্দা। তয় তখন মাইষ্যের মনে দয়া মায়া আছিল। সন্ধ্যা হইতেই মহল্লার মা বোইনেরা খাবার পাঠাইলো। সরদার সাহেবের ডরে কেউ বান্ধন খুইল্ল্যা দিতে পারে না। তয় খাওন দাওন ভালাই হইলো। রাইতে সরদার সাহেব ডাইক্ক্যা কইলো যে মহল্লায় চুরি করছোস আজ থেইক্ক্যা সেই মহল্লায় যাতে চুরি না হয় সেই দায়িত্ব তর। এর উল্টাপাল্টা হইলে মাইরা তক্ত বানায়া দিমু। সেই থেইক্ক্যা মহল্লা পাহারা দিয়া যাইতেছি। সরদার সাহেব মইরা গেলো তার পুলাও মইরা গেলো খালি আমি মরি না… আমি মরি না…

থমথমে পরিবেশ আমি আর রমিজ মিঞা চুপচাপ বসে আছি। পাশেরবাড়িতে কোনো পিচ্চি বাচ্চা একটানা কেঁদে যাচ্ছে। আরো দূরে কোনো বাড়ি থেকে হিন্দি সিরিয়ালের সাউন্ড ভেসে আসছে। নতুন কনস্ট্রাকশন হওয়া ভবনের নির্মাণ কাজের একঘেয়ে শব্দ, শ্রমিকদের চিৎকার চেচামিচি আমাদের চিন্তায় ব্যাঘাৎ ঘটাতে পারছে না। আমরা নিশ্চুপ হয়ে বসে আছি। মোবাইলে নিস্তবদ্ধতাও রেকর্ডিং হয়ে চলেছে। রমিজ মিঞার চোখ বন্ধ। ডান হাত দিয়ে বাম হাতটাকে বোলাচ্ছেন আলতো করে।

-বিপ্লব। কি বলমু কও তো? তুমি আমারে জিজ্ঞাইতাছো, মানুষের জনম হইছে কি কাম করনের লেইগ্গ্যা? আমি কেমনে কমু কও? আমিই তো জানি না কেমনে জীবন কাইট্ট্যা গেলো। পুলাপান গুলান বড় হইয়া গেলো, তারা বাপের পরিচয় দিতে সরমায়। অন্য মহল্লায় থাকে। দেহা পর্যন্ত করে না। সারাদিন ঘুমাই রাইতে চোরবাটপারের লগে খারাপ জিনিস খাই। এই তো জীবন আমার। তয় আমার কি মনে হয় জানো? আমার জন্ম এর লেইগ্গ্যা হয় নাই। আমার অন্য কোনো কাম করোনের কথা আছিল কিন্তু আমি সেটা ভুইল্যা গেছি। কিন্তু কি করার কথা ছিল সেইটাও জানি না। জানি না এটাও ঠিক না। আসলেই হালায় খুঁজিই নাই কোনোদিন। খালি মাঝেমাঝে মনে লয় সবকিছু ছাইড়া চইলা যাই। কিন্তু কই যামু তাও জানি না। তুমি জিগাইলা তাই অহন মনে হইতাছে বিষয়টা ভাবোন দরকার। আসলে আমার জন্ম কিসের লেইগ্গ্যা হইছে। আচ্ছা কোনো মানুষ কি জানতে পারে তার জন্ম কিসের লেইগ্গ্যা হইছে? আচ্ছা তুমি কি নাম কইলা রুমী… হ মাওলানা রুমী। সেই মাওলানা সহেব কি জানতো সে কি কাজ মাথায় লইয়্যা জন্মাইছে? তুমি কও তো মিঞা আমার অহনো কি ভাবোনের সময় আছে?

রমিজ চাচা চলে গেছেন অনেকক্ষণ; দেরি করে হলেও ঘরে সকালের নাস্তা এসেছে, চা এসেছে, বুয়া এসে কাজ করে চলে গেছে কিন্তু আমি এখনো সেই জায়গাতেই আছি। রুমী যে তাড়নাটা জাগিয়েছে তাতে ঘি ঢেলে দিয়েছে রমিজ মিঞা। কয়েকটা শব্দ আমাকে কোথায় এনে দাঁড় করালো, কোথায় নিয়ে যাবে আমি এখনো জানি না। তবে রুমী আমার মাথায় পোকাটা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন এটা অস্বীকার করার আর উপায় নেই। এই প্রশ্নের ভেতর দিয়ে মানুষের গল্পগুলো যদি ছুঁয়ে দেখতে পারি তাহলে হয়তো জীবনকে নতুন করে দেখবার সুযোগ পাবো। বাবার রাখা ‘বিপ্লব’ নামটা হয়তো কখনো স্বার্থক করে তুলতে পারবো না। তবে মানুষের মনের ভেতরের সুপ্ত প্রশ্নটা যদি জাগিয়ে দিতে পারি সেটাই বা কম কিসে।

আমরা যা হয়ে বা নিজেকে যা ভেবে এই যে ঘুরে বেড়াচ্ছি জগতময়; আসলে আমরা কি এই কাজ করার জন্যই জন্মেছি? এটাই কি আমাদের কাজ? একজন ডাক্তার কি আসলেই শুধু ডাক্তার হতে চেয়েছিল? জগতে কি তার এটাই কাজ? এই প্রকৃতি কি তাকে এটাই করতে চেয়েছিল? তেমনি একজন বাদাম বিক্রেতা কি বাদাম বিক্রি করার জন্যই জন্মেছে? এই আমি কেনো জন্মেছি? কেবল বস্তাপচা নিরর্থক ফিচার লিখবার জন্যই? নাকি আমাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে যা করতে পারলে বেঁচে থাকার পূর্ণ স্বাদ নিতে পারবো। জীবনকে নতুন করে চিনতে পারবো। শুধু পয়সা কামানোই জীবনের একমাত্র কর্ম নয় এটা বুঝতে পারবো? এমন কাজ করতে পারবো যাতে সংর্কীণ মানুষ হিসেবে নয়। কাজ করতে পারবো সকল মানুষের জন্য… ধরণীর জন্য… ধারিত্রীর জন্য… ব্রহ্মাণ্ডের জন্য…  এইসব রাশি রাশি প্রশ্নমালা মাথায় নিয়ে রুমীর কথাটা পুনরাবৃত্তি করেই শেষ করি- “প্রতিটি মানুষের জন্ম হয়েছে একটা নির্দিষ্ট কাজের জন্য আর সেই কাজটি তার হৃদয়ের মাঝে লালিত হয়। প্রতিটি মানুষ ভেতর থেকে ঠিক সেই কাজটি করার জন্যই তাড়না অনুভব করে।”

…..

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!