দুর্গা দুর্গতিনাশিনী

দুর্গা দুর্গতিনাশিনী

আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর। ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা। প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা। আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন। তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন। আজ চিচ্ছক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদশ্রীবিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।

আশ্বিনের শিউলি ফোটা সকালে, মর্তের বাসিন্দাদের প্রবল উত্‌সাহ-উদ্দীপনায় আর ভক্তদের আকুল ডাকে ও মন্ত্রোচারণে বিশ্বজননী আবির্ভূতা হন। আনন্দময়ীর আগমনে মেতে ওঠে এই ভুবনমণ্ডল। দেবী ‘দুর্গা’ এই নামটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিচিত এক দেবীমূর্তি।

তাঁর দশ হাতে দশরকম অস্ত্র, এক পা সিংহের পিঠে, এক পা অসুরের কাঁধে। তাঁকে ঘিরে থাকেন তাঁর চার পুত্র কন্যা। যথাক্রম- লক্ষ্মী-সরস্বতী আর কার্তিক-গণেশ। তবে জেনে রাখা ভালো যে শাস্ত্রমতে দেবীর আরও নানারূপ ও মহিমার কথা বর্ণনা করা রয়েছে।

সনাতনধর্মী বাঙালিরা মা দুর্গার যে মূর্তিটি শারদীয়া উৎসবে পুজো করে থাকেন, সেই মূর্তিটির শাস্ত্রসম্মত নাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা’। এছাড়া দেবীর অন্যান্য রূপের মধ্যে একটি বিশেষ রূপের কথাই আজ আলোচনা করব। দেবীর এই রূপের নাম দেবী ‘কাত্যায়নী’।

কাত্যায়নী দেবী দুর্গার একটি বিশেষ রূপ। প্রাচীন কিংবদন্তি অনুযায়ী, কাত্যবংশীয় ঋষি কাত্যায়ন দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দুর্গা কাত্যায়নের কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করে ‘কাত্যায়নী’ নামে পরিচিতা হন।

অন্য মতে ঋষি কাত্যায়ন প্রথম দুর্গাকে পুজো করেছিলেন বলে তাঁর পুজিত মূর্তির নাম হয়- ‘দেবী কাত্যায়নী’।

এই দেবীর রূপ অতি সুষমামণ্ডিত এবং দিব্য। ইনি চতুর্ভুজা। তাঁর ডানদিকের দুটি হাত বর ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করে, বাঁ দিকের দুই হাতে পদ্ম ও খড়্গ। দেবী সিংহবাহিনী। দেবীর গায়ের রং সোনার মতো উজ্জ্বল।

দেবী কাত্যায়নীর পুজো করলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই চার ফল লাভ হয়। শাক্তধর্ম অনুযায়ী, কাত্যায়নী মহাশক্তির এক ভীষণ রূপ এবং ভদ্রকালী বা চণ্ডীর মতো যুদ্ধদেবী রূপে পূজিতা।

পতঞ্জলির মহাভাষ্য গ্রন্থে তাঁকে মহাশক্তির আদিরূপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষ্ণ যজুর্বেদে দেবী কাত্যায়নীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। স্কন্দ, বামন ও কালিকা পুরাণ অনুযায়ী, মহিষাসুর বধের কারণেই দেবতাদের ক্রোধতেজ থেকে এই দেবীর জন্ম।

ভাগবত পুরাণে বলা আছে যে, বৃন্দাবনের গোপীরা কৃষ্ণকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য সারা মাঘ মাস জুড়ে কাত্যায়নী ব্রত পালন করেছিলেন। তাই মনমতো স্বামী লাভ করার প্রার্থনার জন্য এক মাস ধরে কাত্যায়নী ব্রত পালনের প্রথাও রয়েছে।

কাত্যায়নীই দেবী দুর্গা। নানারূপে, নানা অবতারে এই দেবী কখনও মাতৃরূপা, কখনও দানবনাশিনী, বিপত্তারিণী, সংকটবিনাশিনী জগন্মাতা। বিচিত্র রূপে তিনি ত্রিলোকবন্দিতা।

কাশীর আত্মবীরেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহের একহাত উচ্চতায় দেবী কাত্যায়নীর মূর্তি রয়েছে। অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি, কষ্টিপাথরে নির্মিত। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কাত্যায়নী পূজা প্রচলিত।

নবরাত্রির সময়ে বিশেষ ভোগ হিসেবে দেবীকে মধু নিবেদন করা হয়। আবার মকর সংক্রান্তির দিন উদ্‌যাপিত শস্য উৎসব ‘পোঙ্গল’ উপলক্ষে তামিলনাড়ুতে মেয়েরা সারা মাস ধরে বৃষ্টি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন।

ভিজে বালিতে খোদিত কাত্যায়নীর পুজো করেন তখন তারা। নবদ্বীপ রাসযাত্রায়ও কাত্যায়নী মায়ের পুজো হয়। প্রতিবছর রাসে আড়ম্বরের সঙ্গে এই পুজো পালিত হয়।

মহাভারতের স্থানে স্থানে উমা ও পার্বতীর কথা উল্লেখ আছে। আর আছে দক্ষযজ্ঞের বিবরণ। তাছাড়া যুধিষ্ঠির ও অর্জুনের দুর্গাস্তব উল্লিখিত আছে।

মহাভারতের বিরাট পর্বের ষষ্ঠ অধ্যায়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের দুর্গাস্তুতির কথা প্রথমে বর্ণিত। তারপর পাওয়া যায় ভীষ্মপর্বের চতুর্থ অধ্যায়ে। সেখানে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে কুরুক্ষেত্রে রণ আরম্ভের পূর্বে দুর্গার স্তব করেন অর্জুন।

বারো বছর বনবাসের পর এক বছর অজ্ঞাতবাসে পঞ্চপাণ্ডবরা যখন দ্রৌপদীসহ ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশ করেন, তখন তাঁদের যাতে কেউ চিনতে না পারে তাই প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠির বিপদ মুক্তির জন্য দীনতারিণী, সর্বভয় নিবারিণী দুর্গার স্তুতি করতে লাগলেন।

দুর্গার স্তুতি করতে গিয়ে এই মহাদেবীকে তিনি অভিহিত করেছেন মহিষাসুরনাশিনী, বিন্ধ্যবাসিনী, মদ-মাংস বলিপ্রিয়া হিসেবে। যুধিষ্ঠিরের স্তব-স্তুতিতে দেবী দুর্গা সেখানে আবির্ভূতা হয়ে প্রভূত বর প্রদান করে বললেন, বিরাট নগরে থাকলে পাণ্ডবগণ অপ্রচারিত থাকবে। এই বলে দুর্গা অদৃশ্য হয়ে জান।

মহাভারতে এরপরে দ্বিতীয়বার ভগবতীর যশোগাথার উল্লেখ আছে ভীষ্মপর্বে। ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে আসন্ন মহাযুদ্ধের ঠিক আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কৌরবাধিপতি দুর্যোধনের বিপুল সমরসজ্জা দেখে নিজ সখা নরোত্তম অর্জুনকে বিজয় ও মঙ্গলের জন্য শুদ্ধচিত্তে সিদ্ধিদাত্রী দুর্গাদেবীর শরণ গ্রহণে আদেশ দেন। ‘পরাজয়ায় শত্রুনাং দুর্গাস্তোত্র মুদীরয়।’

বাসুদেবের নির্দেশানুসারে তখন অখিলপ্রিয় তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন রথ থেকে নেমে নতজানু হয়ে করজোড়ে কাতর প্রার্থনা জানিয়ে দুর্গাস্তুতি পাঠ করেছিলেন দেবীকে বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত করে- ‘সিদ্ধসেনানি! হে আর্য! মন্দরবাসিনি! কুমারি! কালি! কাপালি! কপিলে! কৃষ্ণপিঙ্গলে! আপনাকে নমস্কার করি।’

‘হে ভদ্রকালি! আপনাকে নমস্কার, মহাকালি! আপনাকে নমস্কার, চণ্ডি! চণ্ডে! তারিণি! বরবর্নীনি! আপনাকে নমস্কার।’ অর্জুনের ভক্তিতে সন্তুষ্টা জগন্মাতা দুর্গা আকাশপটে উদিতা হয়ে ধনঞ্জয়কে সেই মহারণে শত্রুজয়ের বর প্রদান করে তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিতা হয়েছিলেন।

ভক্তকবি শ্রীলোচন দাস তাঁর কালজয়ী ‘শ্রীচৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যে বিরজা দুর্গার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। নীলাচল যাত্রার পথে রেমুনায় ক্ষীরচোরা মন্দির দর্শন করে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব সপার্ষদ পৌঁছলেন যাজপুর বিরজা ক্ষেত্রে।

পুণ্যতোয়া বৈতরণীর তীরে এখানে আছে অসংখ্য দেবালয়। যাজপুর একান্নপীঠের এক অন্যতম মহাপীঠ। এই বিরজা ক্ষেত্রে আদ্যাশক্তি মহামায়া সতীদেবীর নাভিদেশ পতিত হয়েছিল। এখানকার পীঠাধিষ্ঠাত্রী হলেন জগন্মাতা শ্রীশ্রী বিরজাদেবী। এই মহামাতৃকার মূর্তি দ্বিভুজা, সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী।

এই সর্বসিদ্ধিদায়িনী মহাবিদ্যা উৎকলে পরম ভক্তিতে আরাধিতা অনন্তকাল ধরে। ‘বিরজা ঔড্রদেশে চ’- এই শাস্ত্রবাণী আজও প্রতিধ্বনিত। এক পৌরাণিক আখ্যানে দেওয়া আছে প্রজাপতি ব্রহ্মা এই ক্ষেত্রেই বসে প্রথম এক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। সেই তপঃপ্রভাবে যজ্ঞকুণ্ড থেকেই বিরজাদেবীর আবির্ভাব। মহাভারতের বনপর্বে উল্লেখ আছে বৈতরণী কূলে বিরজা তীর্থে পাণ্ডবদের আগমনের সংবাদ। বিভিন্ন পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্র বিরজাতীর্থ প্রসঙ্গে মুখর। শ্রীচৈতন্যের সময়ও এই দেবী মন্দির ছিল কারুকার্যখচিত, ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও দর্শনীয়।

শ্রীমন্মহাপ্রভু স্বপরিজনসহ এখানে দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান সেরে আদি বরাহ মন্দিরে পুজো দিয়ে তারপর একাকী বেরিয়ে পড়লেন বিরজাদেবীর মন্দিরে। ‘সর্বলোকৈকপাবনী’ বিরজা মাতার মুখপদ্ম দর্শন মাত্রেই সন্ন্যাসী শিরোমণির আরক্ত নয়ন দুটি জলপূর্ণ হল।

সর্বদুর্গতিহরা দুর্গার দিব্যরূপ দর্শন করে শ্রীগৌরহরি প্রেমে উন্মত্ত হয়ে হাততালি দিয়ে মধুর স্বরে নাম করতে করতে বিহ্বল ভাবে নাচতে লাগলেন। শ্রীক্ষেত্রে নির্বিঘ্নে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের দর্শন পাওয়ার জন্য দেবীর কাছে ভক্তিভরে প্রণাম নিবেদন করে কৃপাভিক্ষা করলেন পরিব্রাজক শ্রীচৈতন্য।

তারপর উপস্থিত সবাইকে আলিঙ্গন করলেন। সেখানে শত শত মাতৃভক্তের মধ্যে প্রেমতরঙ্গ উত্থিত হল। আনন্দিত মনে তিনি আবার ফিরে এলেন নিত্যানন্দ প্রমুখ অপেক্ষমান পার্ষদদের কাছে।

শ্রীলোচন দাস তাঁর শ্রীচৈতন্যমঙ্গল’-এ এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “আনন্দে হৃদয়ে যায় বিরজা দেখিতে বিরজা মহিমা কেবা পারয়ে কহিতে। কোটি কোটি পাতক নাশয়ে দরশনে বিরজা দেখিয়া প্রভু হরষিত মনে।”

দেবী দুর্গার মাতৃরূপ ছাপিয়ে তাঁর শক্তিময়ী রূপ জ্বলে উঠেছে। আদরিণী কন্যা, প্রেমময়ী স্ত্রী ও স্নেহময়ী মাতৃরূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে সেই শক্তিময়ী রূপ। এই শক্তিই আধুনিক নারীর চালিকা শক্তি। দেবী দুর্গার আরাধনায় বারে বারেই ঘুরে ফিরে আসে সেই শক্তিময়ী রূপের বর্ণনা। আধুনিক নারী দুর্গার এই শক্তিময়ী রূপে অনুপ্রাণিত।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দুর্গাপুজো মহা সমারোহেই পালিত হয়। যত না তার ধর্মীয় গুরুত্ব, সামাজিক গুরুত্ব তার চেয়ে ঢের বেশি। তাই তো দুর্গাপুজো শুধু ভারতেই নয়, বিদেশেও মহা সমাদরে পালিত হচ্ছে।

দেবী দুর্গা নানা সাজে সজ্জিত হয়ে প্লেনে চড়ে বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছেন। সেখানকার বাঙালিরা তো বটেই, এমনকি কিছু বিদেশিও দুর্গাপুজোর আনন্দে অংশগ্রহণ করছে। তাঁদের নিত্যকার রুটিনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুযোগ-সুবিধা মতো দুর্গাপুজো পালিত হচ্ছে ধুমধাম করে।

দেবী দুর্গার কথা আজকের নয়, বহু যুগ থেকেই প্রচলিত। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে বিভিন্নভাবে দেবী দুর্গার আরাধনার বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। সেগুলিকে অবলম্বন করেই প্রকাশিত হয়েছে দেবী দুর্গার মাতৃরূপ, শক্তিরূপ, কন্যারূপ ইত্যাদি।

দুষ্টের দমনকারিণী বলিষ্ঠ, বীরাঙ্গনা নারীসত্তার কথাও সেখানেই পাওয়া যায়। আর এই বীরাঙ্গনা নারীসত্তাই আধুনিক নারীর জীবনযাপনের মূল মন্ত্র হয়ে উঠেছে।

দেবী দুর্গার সম্পর্কে একটু গল্প বলি। গিরিরাজ হিমালয় ও মেনকার কন্যা উমা তথা দেবী দুর্গা। বাবা-মায়ের আদরিণী কন্যাটির স্বামী হিসেবে পছন্দ হল গাঁজাখোর, ভিখারি, ভূতপ্রেত পরিবৃত শিব তথা মহাদেবকে। মা-বাবার তো তাঁকে জামাইরূপে গ্রহণ করতে বড্ড আপত্তি।

ওঁরা তো মহাচিন্তিত, কী করে তাঁরা তাঁদের যত্নে লালিত আদরিণী কন্যাকে ওইরূপ স্বামীর হাতে তুলে দেবেন। কিছুতেই তাঁরা মেয়েকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারলেন না। উমা তাঁর স্বনির্বাচিত স্বামীকেই গ্রহণ করতে অনড় রইলেন।

অবশেষে শিব-দুর্গার বিয়ে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গেই সম্পন্ন হল। উমা স্বামীর সঙ্গে কৈলাসে ঘর সংসার করতে চলে গেলেন।

ভিখারি স্বামীগৃহে উমার তো দারিদ্রে দিন কাটে। তবুও তিনি পতি প্রেমে মগ্ন। দারিদ্রের কারণে তাঁর সুখি দাম্পত্যে কোনও ব্যাঘাত ঘটল না। ওদিকে মেনকা তো মেয়ের কষ্টের কথা চিন্তা করতে করতে সর্বদাই চোখের জল ফেলেন।

রাশভারী স্বামী গিরিরাজের কাছে সরাক্ষণই অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন- ‘গিরিরাজ আমার উমা এনে দাও, সে যে বড় কষ্টে আছে।’ তাঁর এই আবেদনের ভাষাই জগৎ-সংসারে গানের রূপ নিয়ে প্রচলিত- ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী…’

এই যে বাপের বাড়ির সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে সুখে সংসার করার মনের জোর তাও মেয়েরা দুর্গার কাছেই শিখেছে। স্বামীর সংসারকে নিজের করে নেওয়ার শিক্ষাও পৌরাণিক দেবী দুর্গার কাছেই প্রাপ্ত। দেবী দুর্গা নিজ শক্তি, বলিষ্ঠতা ও ব্যক্তিত্বের জোরেই পথের নানান বিপদ দমন করতে করতেই এগিয়ে চলেন।

স্বামীর সম্মানই তাঁর সম্মান। স্বামীর অসম্মানে তিনিও অসম্মানিত। আমাদের সমাজেও বিবাহিত মেয়েদের এটাই মন্ত্র। বাপের বাড়ির দ্বারাও স্বামীর অসম্মান তাঁরা সহ্য করেন না। তাই বলে বাপের বাড়ির সঙ্গে বিবাহিত কন্যার সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে তাও নয়। বৎসরান্তে তাই দেবী দুর্গার মায়ের কোলে আসাই নরলোকে দুর্গোৎসবে পরিণত হয়েছে।

নারীর শক্তিময়ী ব্যক্তিত্ব, বলিষ্ঠতা ও বীরত্বের জন্যই দেবলোকেও তিনি আদৃতা। দেবগণও তাঁর ওপর ভরসা করতে বাধ্য হয়েছিলেন অসুর দমনের জন্য। দুর্গার অসুর দমনের মাধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিকা নারীর দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের শক্তি।

দেবতারা সিংহবাহিনী দেবী দুর্গার ওপর কতখানি ভরসা করতেন তার পরিচয় আমরা পুরাণের বিখ্যাত আখ্যান ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’র মধ্যেই পাই।

মহিষাসুর বধের আগেও দেবতারা তাঁদের সঙ্কটে দুর্গার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। দুর্গাও তাঁদের সে সকল সঙ্কট থেকে ত্রাণ করেছিলেন। এ জন্য কথিতই আছে দেবতা, নর, কিন্নর বা যে কেউ যদি সঙ্কটে পড়ে দুর্গাকে স্মরণ করেন তাহলে দুর্গা তাঁকে সঙ্কট থেকে রক্ষা করেন।

দেবী দুর্গার শক্তি ও ক্ষমতার ব্যাপ্তি যে কতখানি তা তাঁর দশ হাতের মুদ্রার মাধ্যমেও আমরা পেয়ে থাকি। তিনি শুধু ‘মা’ হয়ে আশীর্বাদই দেন না, যথাযথ বলিষ্ঠ ও সাহসী নারী হয়ে সকল বিপদের মোকাবিলা করার মতো পথনির্দেশও দেন।

এবার একটু বলি, আদরিণী কন্যা উমার কলহপরায়ণতার কথা। একে বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করেছিলেন, তার উপর সেই স্বামী ও তাঁর ভূতপেত্নী সঙ্গীদের নিয়ে পিতৃগৃহেই থেকে গেলেন। সংসারের কুটোটি না নেড়ে স্বামীকে নিয়ে আনন্দ উচ্ছ্বাসে মগ্ন রইলেন গৌরী।

একদিন মা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাঁকে দু’কথা যেই না শুনিয়েছেন, অমনি মেয়ে মাকে ঝাঁজিয়ে নানান কথা বলে স্বামী ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে পিতৃগৃহ ত্যাগ করে কৈলাসে স্বামীগৃহে চলে গেলেন। মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে পিতৃগৃহ ত্যাগ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পিতা-মাতাকে ভুলে যাননি। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

একবার পিতৃগৃহে বিরাট যজ্ঞ-উৎসব। উমা গিয়েছেন যোগ দিতে। আনন্দে মাতোয়ারাও হয়ে উঠলেন তিনি সেখানে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর স্বামীর সম্পর্কে নানান নিন্দনীয় কথাবার্তা শুনে বেসামাল হয়ে গেলেন। স্বামী নিন্দা সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞস্থলেই দেহত্যাগ করলেন। এই ঘটনা ‘সতীর দেহত্যাগ’ নামেই পরিচিতি লাভ করেছে।

ব্যোমভোলা শিবঠাকুর শ্বশুরালয়ে যেতেন না। তাই বলে স্ত্রী পিতৃগৃহে গেলে সর্বদাই তার ওপর দৃষ্টি রাখতেন। সতীর দেহত্যাগের কথা শুনে তিনি গেলেন চটে। উন্মত্ত হয়ে মহাদেব তাঁর শিবরূপী গাঁজাখোরের ভোল বদলে স্বরূপে প্রকাশিত হলেন।

দেখিয়ে দিলেন দুর্গার স্বামী নির্বাচন কতখানি যথাযথ। মৃত স্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে তাঁর উন্মত্ত নৃত্য থামাতে শেষে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের প্রয়োজন পড়েছিল। সেই আখ্যান আজও উজ্জ্বলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে ‘সতীর বাহান্ন পীঠ’-এর মাধ্যমে।

দুর্গাপুজো আসন্ন প্রায়। চারিদিকে পুজো পুজো ভাব। আমাদের শহর সেজে উঠছে মা দুর্গার আগমনে। এই উৎসব দিয়েই দেবী পক্ষের সূচনা। নারীশক্তির আরাধনা।

……………………………….
বিশেষ কৃতজ্ঞতা : বর্তমান পত্রিকা।
পুণঃপ্রচারে বিনীত : প্রণয় সেন

………………..
আরো পড়ুন:

অসুরবধ
দুর্গা পূজার দশ দিক
দুর্গা দুর্গতিনাশিনী
শুভ মহালয়া
বাঙালির প্রাণনাথ বেতারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র
মা দুর্গার ১০৮ নাম

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!