নববর্ষ

পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির মধ্যেই নববর্ষের উৎসব আয়োজনের রীতি প্রচলিত আছে। বর্তমানে ১লা বৈশাখ ও ১লা জানুয়ারি যথাক্রমে বাংলা ও ইংরাজি নতুন বছর আরম্ভ উপলক্ষ্যে উৎসবের অনুষ্ঠান অধিক লক্ষ্য করা যায়।

এই ভারতবর্ষেই প্রাচীনকালে বামন দ্বাদশীর দিন আগামী বৎসরের আরম্ভে প্রজাপুঞ্জ রাজা জমিদারদের গৃহে আসিয়া নানাপ্রকার উপহার দিত এবং বিশেষ সমারোহে ভোজনাদি অনুষ্ঠিত হইত। শাস্ত্র মতে, চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদে শকাব্দের আরম্ভ হয় এবং এই তিথিতে ব্রহ্মা জগৎ সৃষ্টি করিয়াছিলেন।

ইদানীং ভারতবর্ষে নববর্ষ মহাবিষ্ণুব সংক্রান্তির পর দিন মহাপুণ্য বৈশাখ মাসের প্রথম দিনেই প্রবৃত্ত হয় এবং এই ১লা বৈশাখেই নববর্ষ পুণ্যাহের উৎসবাদি সর্বত্র অনুষ্ঠিত হয়। শাস্ত্রে বিধান আছে, ‘প্রাপ্তে নূতন বৎসরে প্রতি গৃহং কুর্যাদ্‌ ধ্বজারোপণম্‌।’’

পতাকা উত্তোলন আনন্দ ও জয়লাভের সূচক আত্মীয় বন্ধু সকলে একত্র সম্মিলিত হইয়া ভোজনাদির অনুষ্ঠানে আনন্দে নিমগ্ন হন। বিবিধ গীতাবাদ্যাদির আয়োজন হয়। ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ের নূতন খাতায় শুভারম্ভের জন্য দেবপূজাদি করান।

প্রত্যেক গৃহী তাঁহার গার্হস্থ্যের আয় ব্যয়ের নূতন হিসাব খাতাপত্রাদি দেবতার সান্নিধ্যে রাখিয়া সেই পবিত্র খাতায় বৎসরের প্রথম দিন হইতে হিসাবাদি লেখেন। ব্যবসায়ী বৎসরের শেষে তাঁহার বাকি পাওনা আদায়ের জন্য ক্রেতার নিকট পুনঃ পুনঃ যাতায়াত করিয়া যতটা সম্ভব পাওনা আদায় করিয়া লন।

যাহা অনাদয়ে পরে তাহা নূতন খাতায় সেই ব্যক্তির নামে লেখা হয়। বিগত বর্ষের ব্যবসায়ে ও বাণিজ্যে সাধু বা অসাধু উপায়ে কে কত লাভ করিয়াছেন এবং কতটা লভ্যাংশ নূতন বৎসরের ব্যবসায়ে মূলধনে পরিণত হইতে পারিবে তাহা চিন্তা করিয়া ধনী উৎসাহের সহিত নিজ কর্মে অগ্রসর হইতে সংকল্প করেন।

দুরদৃষ্টবশতঃ গত বর্ষে যাঁহার ব্যবসায়ে ক্ষতি হইয়াছে তাঁহার হৃদয় দুঃখপূর্ণ হইলেও অতীতের অভিজ্ঞতা লইয়া তিনি নববর্ষে পুনরায় নবোদ্যমের সহিত কার্যারম্ভ করিতে সচেষ্ট হন।

এইরূপ ছোট বড় প্রত্যেক গৃহীই পূর্ববর্ষের আয় ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করিয়া কেহ আনন্দে উৎফুল্ল হন, কেহ বিষাদগ্রস্ত হন, কেহ বা ধৈর্যের সহিত সাবধানে চলিবার সংকল্প গ্রহণ করেন। সংবাদপত্র বিগত বর্ষের ঘটনাপঞ্জী বর্ষারম্ভে পাঠকের সম্মুখে তুলিয়া ধরে।

ভাবুক ব্যক্তি তাঁহার নিজ জীবনের সংবাদপত্রে বর্ষব্যাপী ঘটনাসমূহের কথা স্মরণ করিয়া হৃষ্ট, বিষণ্ণ বা বিস্মিত হইতে থাকেন। এই রূপে অখণ্ড কালের মধ্যে বর্ষের পর বর্ষ বিগত হইতেছে ও আসিতেছে। যাঁহাদের একটু চিন্তাশক্তি আছে তাঁহারা গতবর্ষের লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন বা জয়-পরাজয়ের কথা কিছুটা না ভাবিয়া থাকিতে পারেন না।

কেহ বা পঞ্জিকা খুলিয়া নববর্ষের ফলাফল আলোচনা করেন। জ্যোতিষীর নিকট গিয়া নূতন বৎসরটি কেমন যাইবে সে সম্বন্ধে গণনা করান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ মানবতার ভূমিকায় দাঁড়াইয়া আবেদন জানাইলেন- ‘‘বন্ধু হও শত্রু হও যেখানে যে কেহ রও, ক্ষমা কর আজিকার মতো। পুরাতন বরষের সাথে পুরাতন অপরাধ যতো।’’

কিন্তু এ সমস্ত গেল ব্যবহারিক জগতের কথা। এখানকার বিষয়সমূহ অনিত্য। বিষয়ের সহিত ইন্দ্রিয়ের সংযোগ হইলেই সুখ-দুঃখ শীত-গ্রীষ্ম কত প্রকার পরস্পর বিরোধীভাব ঘটে, কোন ভাবটিই স্থায়ী হয় না, আসে ও যায়। এ বৎসর যিনি রাজা পরের বৎসরে তিনি ভিক্ষুক, এ বৎসর যিনি দেশের প্রধান নায়ক পর বৎসরে তিনি আততায়ীর দ্বারা নিহত বা প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত।

মায়িক সংসারে সব দেশেই এইরূপ কতপ্রকার ভোজবাজী অনাদিকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। সুখ-দুঃখাদি দ্বন্দ্বের সম্বন্ধে ভগবান গীতায় বলিলেন, ‘তাং-স্তিতিক্ষস্ব ভারত’-অধীর না হইয়া সবই সহন করা উচিত। ‘‘সুখমাপতিতং সেব্যং দুঃখমাপতিতং তথা। চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ’’-এই সমস্তই অনাত্মবস্তুর কথা। নূতন বর্ষের আরম্ভে একবার পারমার্থিক আত্মরাজ্যে প্রবেশ করিয়া দেখা যাক বিগত বর্ষ কোনও সংবাদ মানসক্ষেত্রে ঘোষণা করে কি না।

…………………………..
পণ্ডিত প্রবর জ্যোতির্ময় নন্দের ‘জ্যোতির্ময় রচনাঞ্জলি ‘বর্তমান পত্রিকা’ থেকে সংকলিত।

আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে ভারতের সাধক-সাধিকা

পুণঃপ্রচারে বিনীত -প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!