হযরত মোহাম্মদ

-নূর মোহাম্মদ মিলু

এই মহান ও দিনে স্রষ্টা এবং সৃষ্টি সকলে খুশিতে ছিল, কিন্তু ইবলিশ ব্যতীত। ইবলিশ এই দিনে চরম বিলাপ করেছিল।

সুহায়লী হতে বর্ণিত রয়েছে যে, ইবলিশ তার জীবনে চারবার বিলাপ করে কেঁদে ছিল-

১. অভিশপ্ত হওয়ার সময়।
২. জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়ার সময়।
৩. দয়াল নবী দুনিয়ার বুকে শুভাগমনের দিন।
৪. সূরা ফাতিহা নাযিলের সময়।

প্রথম দিনই মোহরে নবুওত দৃশ্যমান
হযরত আয়শা সিদ্দিকা বর্ণনা করে বলেন, এক ইহুদি মক্কায় বাস করত। সে সেখানে ব্যবসা বাণিজ্য করত। দয়াল নবী যে রাতে দুনিয়াতে শুভাগমন করেন, সে রাতে কোরাইশদের এক মজলিশে এসে বলল, আজ রাতে কি তোমাদের মধ্যে কারও কোন সন্তান জন্ম হয়েছে? জবাবে তারা বলল-

আল্লাহর কসম! আমরা এই রকম কিছুই জানি না। ইহুদি বলল, আল্লাহু আকবর! তোমাদের অজান্তে ঘটে থাকলে তো কোন অসুবিধা নেই। তবে তোমরা খোঁজ করে দেখো। এবং যা বলছি, তা স্মরণ রাখো।

এই রাতে আখেরী নবী ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তীস্থানে একটি চিহ্ন আছে। তা’তে কেশরের একগুচ্ছ চুল আছে। দুই রাত তিনি দুধ পান করবেন না।

ইহুদির কথা শুনে, লোকেরা মজলিশ ত্যাগ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পরে। তার কথায় সকলে হতভম্ব স্তম্ভিত। সবাই যার যার ঘরে গিয়ে পরিবারের লোকজনদেরকে এই খবর শুনায়। শুনে পরিবার পরিজনরা বলল-

আল্লাহর শপথ! আজ রাতে আব্দুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিবের একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। এঁরা তাঁর নাম রেখেছেন, মুহাম্মদ।

এবার তারা ইহুদিদের কথা ও এই নবজাতক শিশু সম্পর্কে কানাঘুষা করতে করতে ইহুদির কাছে যায়। আর আব্দুল্লাহ’র নবজাতক পুত্রের খবরটি জানায়।

তখন ইহুদি বলল, তোমরা আমাকে তাঁর নিকট নিয়ে চলো। আমি তাঁকে একটু দেখব। লোকেরা ইহুদিকে সাথে করে মা আমেনার ঘরে নিয়ে যায়।

তখন সবাই মা আমেনাকে বলল, আপনার নবজাতক পুত্রকে একটু আমাদেরকে দিন। তখন তিনি নূর নবীকে তাদের কাছে অর্পণ করেন। তারা সকলে মিলে নবজাতক শিশুর পিঠ থেকে কাপড় সরিয়ে নিলে ইহুদি কর্তৃক পূর্ব ঘোষিত নিদর্শনটি দেখতে পায়।

আর এই নিদর্শন দেখার সাথে সাথে ইহুদি লোকটি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। জ্ঞান ফিরলে লোকেরা তাকে বলল, কি ব্যাপার! আপনার কি হয়েছে! তখন ইহুদি বলল-

আল্লাহর শপথ! নবুওত বনী ইসরাইল থেকে বিদায় নিলো। আর এতে তোমরা আনন্দিত হও। হে কোরাইশ দল! আল্লাহর শপথ! তোমাদের সহায়তায় তিনি এমন বিজয় লাভ করবেন যে, প্রাচ্যে প্রতীচ্যে তাঁর সুসমাচার ছড়িয়ে পড়বে।

ইহুদিদের মধ্যে আলোচনা
হযরত আবু মালিক ইবনে সিনান বর্ণনা করে বলেন, “একদা আমি গল্প করার জন্য আবদুল আশহাল গোত্রে যাই। তখন আমরা তাদের সঙ্গে সন্ধি বদ্ধ ছিলাম।

সে সময়ে আমি শুনতে পেলাম যে, ইউশা নামক জনৈক ইহুদি বলছে, আহমদ নবীর আগমনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি হেরেম শরীফ থেকে বের হয়ে আসবেন।

এই কথা শুনে, খলিফা ইবনে ছালাবা আল আশহারী উপহাস করে জিজ্ঞাসা করল যে, তাঁর পরিচয় কি ওহে! ইহুদি বলল, তিনি হচ্ছেন, এমন এক মহামানব। যিনি না হবেন বেঁটে; আর না হবেন লম্বা। দুই চোখে তাঁর লালিমা থাকবে। তাঁর কাঁধে তরবারি ঝুলানো থাকবে। এই জায়গা (মদিনা তৈয়্যবা শরীফ) হবে, তাঁর হিজরতের স্থল।”

হযরত আবু মালিক ইবনে সিনান বলেন, ঐ ইহুদির কথায় অভিভূত হয়ে, আমি আমার স্বগোত্র বনু খাদরায় চলে গেলাম। ঐখানে আমার কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে এক ব্যক্তি বলে উঠল, এই কথা কি ইউশা একাই বলেছে? নাকি ইয়াসরিবের সব ইহুদির একই কথা?

হযরত আবু মালিক বলেন, এই ঘটনার পর, আমি বনু কুরায়যার কাছে চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম, একদল লোক আখেরী নবী সম্পর্কেই আলাপ আলোচনা করছিলেন।

কথা প্রসঙ্গে যুবায়র ইবনে বাতা বলল, সে লাল নক্ষত্রটি উদিত হয়ে গেছে। যা কখনও, কোন নবীর আগমন বা আবির্ভাব উপলক্ষ ছাড়া কোন দিন উদিত হয় না। এখন তা আহমদ ছাড়া আর কোন নবীর আগমনের বাকি নেই। আর এই ইয়াসরিব হবে, তাঁর হিজরতের স্থল।

হযরত আবু সাঈদ লেন, দয়াল নবী মদিনায় হিজরত করার পর আমার আব্বা তাঁকে এই ঘটনা শুনান।

আর তা শুনে দয়াল নবী বলেন, যুবায়র যদি মুসলমান হতো, তবে নেতৃস্থানীয় অনেক ইহুদিও মুসলমান হতো। কারণ, ওরা তার অনুগত ছিল।

হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত বলেন, বনু কুরায়যা ও বনু নযীর এর ইহুদি পণ্ডিতগণ হযরত নবী করীমের পরিচিতি সম্পর্কে আলোচনা করতেন।

অবশেষে লাল নক্ষত্র উদিত হয়ে গেলে, তারা ঘোষণা করে যে, ইনিই আখেরী নবী। এরপরে আর কোন নবী আসবেন না। তাঁর নাম আহমদ। তাঁর হিজরত স্থল হবে ইয়াসরিব।

কিসরা বাদশাহ ও তার রাজপ্রসাদ
হযরত হানী আল মাখযুমী বর্ণনা করে বলেন, দয়াল নবী যে রাতে দুনিয়াতে শুভাগমন করেন, ঐ রাতেই বাদশাহ কিসরার রাজপ্রসাদ প্রকম্পিত হয়ে উঠে। পারস্যের অগ্নিকুণ্ড নিভে যায়। অথচ, এর আগে এক হাজার বছরের মধ্যে কখনো তা নির্বাপিত হয়নি!

সাওযা হৃদ শুকিয়ে যায়। সিরিয়ার ধর্মযাজক মুবিযান স্বপ্ন দেখে যে, কতগুলো উট, কতগুলো ঘোড়াকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাড়া খেয়ে ঘোড়াগুলো দজলা নদী (টাইগ্রিস) অতিক্রম করে, তাদের জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে।

উপরোক্ত স্বপ্নের ঘটনায় বাদশাহ কিসরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে। ধৈর্যধারণ করার চেষ্টা করেও, তিনি স্থির থাকতে পারলো না।

(চলবে…)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!