হযরত মোহাম্মদ

-নূর মোহাম্মদ মিলু

অবশেষে, তিনি রাজ পরিষদকে ডেকে পাঠায়। অতঃপর, মাথায় রাজ মুকুট পড়ে, সিংহাসনে বসে, উপস্থিত পরিষদের উদ্দেশ্যে বলল, তোমরা কি জান? তোমাদেরকে কেন সমবেত করা হয়েছে? তখন সকলে বলল, না। আমরা কিছুই জানি না। আপনি অবহিত করলেই, তবেই আমরা জানতে পারবো।

ঠিক এই সময়ে, অগ্নিকুণ্ডের আগুন নির্বাপিত হওয়া সংক্রান্ত পত্র তাদের কাছে এসে পৌঁছে। এতে বাদশাহ কিসরার দুশ্চিন্তার মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এরপর, মুবিযান যা স্বপ্ন দেখেছিল, সে বিষয়ে এবং তার ভয়াবহতার কথা ব্যক্ত করে।

অতঃপর মুবিযান বলল, আল্লাহ! বাদশাহর রাজত্ব অটুট রাখুক। আজ রাতে আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। এই বলে, মুবিযান তার দেখা ঐ স্বপ্নের বিবরণ সকলের সামনে তুলে ধরে।

তখন বাদশাহ কিসরা জিজ্ঞাস করল, বলো তো দেখি মুবিযান! এই স্বপ্নের অর্থ কি হতে পারে? তখন মুবিযান বলল, আরবের কোন এক উপকষ্টে বিশেষ কোন একটি ঘটনা ঘটে থাকবে।

ধর্মযাজক কর্তৃক চিহ্নিত
দয়াল নবী দুনিয়াতে আমেনার কোলে শুভাগমনের দিন, নূর নবীর তাশরিফ আনায়নের সুসংবাদ যখন ঐ সিরিয়ার মাররুয যাহরানের ধর্মযাজক ঈসের কাছে পৌঁছানো হলো যে, মক্কা নগরীতে আবদুল মুত্তালিবের বংশে, হযরত আব্দুল্লাহর ঘরে এবং বিবি আমেনার কোলে বরকতময় আর নজিরবিহীন বৈশিষ্ট্যে এক নবজাতক এসেছেন।

তখন ধর্মযাজক বা ঐ পাদ্রী বলল, হে কাবার সেবক! আমার কামনাই ছিল যে, এই সেই ইতিহাসখ্যাত আর বহু কাঙ্ক্ষিত মহামানব নবজাতক যেন আপনাদের মধ্য থেকেই শুভাগমন করেন।

তখন পাদ্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলো- আপনি কি করে বুঝতে পারছেন যে, এই নবজাতকই, ঐ সেই কাঙ্ক্ষিত মহামানব! যা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ করা রয়েছে।

তখন ধর্মযাজক বলল, তিনটি লক্ষণে আমি বুঝতে সক্ষম হয়েছি যে, এই নবজাতকই ঐ যে মহা মানব আহমদ বা মুহাম্মদ । সে লক্ষণগুলো হলো-

১. গতরাতে তাঁর নক্ষত্র উদিত হয়েছে।
২. আজ তিনি ভূমিষ্ঠ হয়েছেন।
৩. তাঁর নাম মুহাম্মদ রাখা হয়েছে।

তখন পাদ্রীকে বলা হয়েছিল যে, আজ তো অন্য শিশুরও জন্ম হয়ে থাকতে পারে? তখন সে বলল, এই নবজাতকের নামের সাথে মুহাম্মদ নাম রাখা মিলে গেছে। আর আল্লাহ আলিমদের জন্য, তাঁর ইলমকে সন্দেহজনক করেন না। কারণ, তা হলো- অকাট্য প্রমাণ।

তাছাড়া, আরো একটি প্রমাণ হলো- এই নবজাতক ব্যথাগ্রস্ত। তাঁর এই ব্যথা তিনদিন পর্যন্ত থাকবে। এতে করে তাঁর ক্ষুধা প্রকাশ পাবে। অতঃপর, তিনি সুস্থতা লাভ করবেন।

পাদ্রীর কাছে আরো জানতে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, এই মহান নবজাতকের আয়ুষ্কাল কত হবে? তখন সে জানিয়ে দিয়ে বলেছিল, তাঁর আয়ুষ্কাল বেশি হোক বা কম হোক- সত্তুরে পৌঁছবেন না। সত্তুরের নিচে ষাটের উপরে যে কোন বেজোড় সংখ্যার বয়সে তাঁর ওফাত হবে। আর এই হবে, তাঁর উম্মতের গড় আয়ুষ্কাল।

ভ্রাতুষ্পুত্র আগমনে আবু লাহাব
আল্লাহর হাবীব প্রিয় নবীজী দুনিয়ার বুকে, মা আমেনার কোলে তাশরিফ আনায়নের পর, ছুয়াইবা নামের এক দাসী, তার মালিক আবু লাহাবকে এই সুসংবাদ দিলো যে, দুনিয়াতে তার ভ্রাতুষ্পুত্রের আগমন হয়েছে। আবু লাহাব তার নবজাতক ভাতিজা শুভাগমনের খোশখবরী পেয়ে এবং খুশি হয়ে শাহাদাত অঙ্গুলির ইশারায় আপন দাসী সে ছুয়াইবাকে আযাদ করে দিয়েছিল।

এর ৫৫ বছর পর আর বদর যুদ্ধের ৭ দিন পর প্লেগ রোগে আবু লাহাবের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর এক বৎসর পর, একদা হযরত আব্বাস তাঁর ভাই আবু লাহাবকে স্বপ্ন দেখেন। তখন তাকে বিমর্ষ অবস্থায় দেখেছিল। এই অবস্থায় দেখে, তিনি স্বপ্ন যোগে আবু লাহাবকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন তুমি কি অবস্থায় আছো? নবী মোস্তাফার সাথে দুশমনি করার পরিণতি এখন কেমন হচ্ছে?

তখন আবু লাহাব আফসোস করে বলল, এই পর্যন্ত আমি আমার কোন কল্যাণ চোখে দেখতে পায়নি। জাহান্নামে আমার স্থান হয়েছে। তবে, ভ্রাতুষ্পুত্র নবী করীমের জন্মের সুসংবাদ শুনে খুশি হয়ে, দাসী ছুয়াইবাকে শাহাদত অঙ্গুলির ইশারায় আযাদ করার কারণে এবং যেহেতু তিনি সোমবারই দুনিয়ার বুকে আসেন। তাই প্রতি সোমবার দিবসে আমার উপর আযাব হালকা হয় এবং সে শাহাদত অঙ্গুলি চুষে কিছুটা তৃষ্ণা নিবারণ করি।

হযরত আমেনা হতে দুধ পান
বিবি আমেনার কোলে নবজাতক নূর নবী আগমনের সুসংবাদ, দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে পৌঁছলে, দাদা নবজাতক নাতিকে কোলে করে বায়তুল্লাহ শরীফে নিয়ে গিয়ে, মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায় ও দোয়া করার পর, ঘরে ফিরে এসে নবজাতককে মা আমেনার কাছে অর্পণ করে, শিশু নূর নবীর জন্য দুধের ব্যবস্থা করতে বের হলেন।

ভ্রাতুষ্পুত্রের জন্মের সুখবর শুনে, আবু লাহাব তার যে দাসীকে আযাদ করে দিয়েছিল, সে আযাদকৃত ছুয়াইবা শিশু নূর নবীকে কয়েক দিন দুধ পান করিয়ে ছিলেন। সে জন্য হযরত রাসুলে করীম তাঁকে মা বলে সম্মান করতেন।

দয়াল নবী দুনিয়ার জমিনে শুভাগমন হতে ১৬/১৭ দিন পর্যন্ত পবিত্র গর্ভধারিণী মা মা আমেনার এবং মতান্তরে ছুয়াইবারও দুধ পান করেছিলেন।

৭ম দিনে আকিকা
নবজাতক শিশু হযরত নূর নবী দুনিয়ার জমিনে তাশরিফ আনায়নের সপ্তম দিনে আবদুল মুত্তালিব আকিকার ব্যবস্থা করেন। এতে কোরাইশদেরকে দাওয়াত দেয়া হয় ।

আহার আয়োজন শেষ করে, আবদুল মুত্তালিবের কাছে আগত মেহমানরা জানতে চাইলো যে নবজাতককে উপলক্ষ করে এই আয়োজন, সেই শিশু সন্তানের নাম কি রাখা হয়েছে?

তখন আবদুল মুত্তালিব বললেন, আমি তাঁর নাম রেখেছি, মুহাম্মদ ।

তা শুনে কোরাইশরা বলল, পরিবারের অন্যদের সাথে মিল রেখে নাম রাখা হয়নি যে?

তখন আবদুল মুত্তালিব বললেন, তা একান্ত আমার ইচ্ছা থেকেই। কারণ, যে মহান আল্লাহ স্বয়ং আর আসমান ও জমিনের সমস্ত সৃষ্টিকূল তাঁর প্রশংসা করবেন।

আরেক বর্ণনায় রয়েছে যে, আবদুল মুত্তালিব বলেন, মহান আল্লাহ আমার প্রতি ইলহাম করেছিলেন যে, তোমরা এর নাম রেখো, মুহাম্মদ ।

কারণ, এই নূরানি নবজাতকের মধ্যে যাবতীয় মহৎ গুণ বিদ্যমান। তাই নাম আর কাজেও যেন মিল হয়। আর যাতে নাম নামকরণের আকার ও তাৎপর্য সামুজজ্যপূর্ণ হয়।

দোলনায় চাঁদের সাথে কথোপকথন!
হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব নিজেই বর্ণনা করে বলেন, আমি একদিন বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার নবুওতের একটি আলামত দেখে, আমাকে আপনার দ্বীন কবুল করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

আর সেটি হলো- আমি দেখেছি, আপনি দোলনায় থাকাকালে, চাঁদের সাথে কথা বলতেন এবং নিজের আঙ্গুলি দিয়ে চাঁদের প্রতি ইংগিত করতেন!

আপনি আপনার আঙ্গুল দ্বারা চাঁদকে যে দিকে ইশারা করতেন, চাঁদ সেদিকে ঝুঁকে পরত! তখন দয়াল নবী এরশাদ করেন, আমি তখন চাঁদের সাথে কথা বলতাম এবং চাঁদ আমার সাথে কথা বলত! আমার কান্না ভুলিয়ে দিত! আর আরশের নিচে চাঁদের সিজদা করাকালে তার পতনের শব্দ আমি শুনতে পেতাম!

পিতৃগৃহে যত দিন দুধ পান
নবী দুনিয়ার বুকে তাশরিফ আনায়ন থেকে শুরু করে, বিবি হালিমা সাদিয়ার ঘরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মা আমেনার ঘরে ১৬/১৭ দিন ছিলেন। এই সময়টুকুতে নবজাতক নূর নবী মা আমেনা এবং ছুয়াইবার কাছ থেকে দুধ পান করেছিলেন।

দুধ মাতা হালিমা সাদিয়ার সাথে তায়েফে যাওয়ার আগ পর্যন্ত উম্মে আয়মান নামের এক খাদেমাও দয়াল নবীকে লালন পালন আর দেখাশোনা করতেন।

(সমাপ্ত)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!