মতুয়া সংগীত

পাগলের পেটে ছিল

শ্রীমদ্গোলোক গোস্বামীর মানবলীলা সম্বরণ
পয়ার

পাগলের পেটে ছিল দুরন্ত বেদনা।
সময় সময় হ’ত একান্ত যাতনা।।
ফুফুরা নিবাসী শ্রী ঈশ্বর অধিকারী।
পাগলের যাওয়া আসা ছিল সেই বাড়ী।।
চৈত্রমাসে সে বাড়ীতে গোস্বামী আসিয়া।
অধিকারী মহাশয় সঙ্গেতে মিলিয়া।।
সেই দিন অধিকারী বাটীতে ছিলেন।
উভয় মিলিয়া নদীকূলে আসিলেন।।
মধুমতী নদীকূলে ঘাট একখান।
পাগল করিত এসে সেই ঘাটে স্নান।।
অধিকারী মহাশয় মাতিলেন মতে।
বড় আর্তি হ’ল তার পাগলের সাথে।।
হরিচাঁদ প্রভু মোর ঈশ্বরাবতাংশ।
ঈশ্বরাধিকারী প্রভু পিতৃগুরুবংশ।।
প্রভু হরিচাঁদ হ’ন বাঞ্ছাকল্পতরু।
অধিকারী মহাশয় প্রভু-পিতৃগুরু।।
মতুয়া হইয়া গেল বলি হরিবোল।
নিজ পরিবার সহ মাতিল সকল।।
পূর্বাপর বংশ তাঁর সকল মহৎ।
ওঢ়াকাঁদি মুখ হ’য়ে করে দণ্ডবৎ।।
তাহার রমণী পাগলেরে বড় মানে।
ভক্তিযুক্ত চিত্ত সদা প্রাণতুল্য জানে।।
ঈশ্বরচন্দ্রের পুত্র শ্রীরাইচরণ।
জ্যেষ্ঠা কন্যা দেবীরাণী শ্যামলা বরণ।।
পুত্র কন্যা পরিবার সবে পুলকিত।
হরি হরি বলিতে শরীর রোমাঞ্চিত।।
দিবানিশি প্রেমোন্মত্ত বলে হরিবোল।
পাগলের জন্যে যেন হইল পাগল।।
পাগলে দেখিলে গললগ্নী কৃতবাসে।
হরি বলে নাচে গায় পরম হরিষে।।
অধিকারী ঠাকুরানীর কোলেতে বসিয়া।
মাই খায় পাগল ডাকেন মা বলিয়া।।
একদিন ঠাকুরানী সঙ্গেতে পাগল।
নদীকূলে ঘাটে বসে বলে হরিবোল।।
পাগল বলেছে মাগো হেন মনে লয়।
এই ঘাটে বসে যেন হ’য়ে যাই লয়।।
আর দিন অধিকারী সঙ্গেতে আসিল।
নদীকূলে সেই ঘাটে পাগল বসিল।।
পাগল বলেছে হ’ব এই ঘাটে লয়।
মনে ভাবি গঙ্গাদেবী লয় কিনা লয়।।
বলা কহা করি অধিকারীর সঙ্গেতে।
বলে আর ইচ্ছা নাই এদেশে থাকিতে।।
সময় সময় মোর উঠে যে বেদনা।
অসহ্য হয়ে উঠে বেদনা যাতনা।।
বেদনায় এ শরীরে নাহি সহে টান।
মনে বলে এইবার ত্যজিব পরাণ।।
এ সব বারতা তথা বলা কহা করি।
পরদিন পাগল চলিল নিজ বাড়ী।।
বাড়ী গিয়া জনে জনে বলিল সবারে।
পশ্চিমে যাইব আমি ভেবেছি অন্তরে।।
নবগঙ্গা নদী আমি বড় ভালোবাসি।
এইবার যা’ব ফিরে আসি কিনা আসি।।
মধুমতী পূর্বাপর প্রতি ঘরে ঘরে।
ভালোবাসা যত ছিল বলিল সবারে।।
সাতই বৈশাখ দিন ফুফুরা আসিয়া।
অধিকারী ঠাকুরকে বাড়ী না দেখিয়া।।
রাই দেবযানী আর মাতা ঠাকুরানী।
সবাকারে পাগল বলিল মিষ্ট বাণী।।
মনে মনে করিয়াছিলাম এই ধার্য।
এই ঘাটে আমি করিতাম এক কার্য।।
তাহা না হইল অধিকারী বাড়ী নাই।
তোমাদের কষ্ট হবে পশ্চিমেতে যাই।।
সকলে লইয়া নিশি বাঞ্চিলেন প্রেমে।
নিশি ভোর করিল মাতিয়া হরিনামে।।
তারাইল কবিগান করিল তারক।
সেই স্থানে উপনীত গোস্বামী গোলোক।।
মেলা মিলিয়াছে তারাইলের বাজারে।
সদলে তারক এল গান গাইবারে।।
একপালা হইয়াছে সাতই বৈশাখে।
আর একপালা হবে নয়ই তারিখে।।
গোলোক মাঝির বাড়ী বাসাঘর নিয়া।
প্রভাতে তারক আছে সেখানে বসিয়া।।
রামধন কীর্তনিয়া সূর্যনারায়ণ।
উত্তর পিঁড়ির পরে ব’সে দুইজন।।
তারক বসিয়া আছে উত্তরের ঘরে।
হরিনাম করিতেছে মৃদু মৃদু স্বরে।।
মন গেছে ওঢ়াকাঁদি উড়িয়া নগরী।
হরিচাঁদ পদভাবি বলে হরি হরি।।
গোলোক মাঝির বাড়ী গোস্বামী গোলোক।
একা আসিলেন সঙ্গে নাহি অন্য লোক।।
জয় হরি বল রে গৌর হরি বল।
হুহুঙ্কার করি এসে দাঁড়াল পাগল।।
প্রতিবেশী লোক সব শুনিতে পাইল।
পাগলে দেখিতে সবে দৌড়িয়া এল।।
বসেছেন রামধন সূর্যনারায়ণ।
পাগলে দেখিয়া তারা বলে দুইজন।।
পাগলে যেরূপ দেখি কৃশ কৃশ কায়।
বেশীদিন বাঁচে হেন বিশ্বাস না হয়।।
তারক সে কথা শুনি বলিল তখন।
বড় মর্মভেদী কথা কহিলে দু’জন।।
কথা শুনি গোস্বামী পাগল উঠে ঘরে।
বসিলেন গিয়া তারকের শয্যাপরে।।
তিনঘর বাড়ীতে দক্ষিণপোতা খালি।
উত্তরের ঘর ছেড়ে দিয়াছে সকলি।।
ঘর শূন্য পোতা আছে বর্ষ চারি পাঁচ।
পোতাঘেরা বন ভাণ্ডি আসালীর গাছ।।
তাহার দক্ষিণে আম কাঁঠালের বৃক্ষ।
শাখা শাখা পল্লবে পল্লবে হ’য়ে ঐক্য।।
বৃক্ষের তলায় স্থান অতি পরিষ্কার।
পল্লবের স্নিগ্ধ ছায়া মৃত্তিকা উপর।।
কয়টি দোহার ছিল গাছের তলায়।
পাগলের ধ্বনি শুনি আসিল তথায়।।
দেখিয়া পাগল বড় হরষিত অন্তর।
ঘর হ’তে আসিলেন তাদের গোচর।।
জয় হরি বল রে গৌর হরি বল।
নামে মহাধ্বনি করি উঠিল পাগল।।
মেলা দেখা লোক যত পূর্বমুখ ধায়।
পাগলে দেখিতে সবে সেই বাড়ী যায়।।
গোলোক মাঝির দুই পুত্র আর নারী।
পাগলে ঘেরিয়া তারা বলে হরি হরি।।
পাগল মাঝিরে ধরি বলে মিত মিত।
বল বল হরিনাম শুনিতে অমৃত।।
মাঝি বলে জেলেরে কেন বা বল মিতা।
তুমি হর্তা কর্তা হও সকলের পিতা।।
আমি মম নারী মেয়ে ছেলে গরু ঘর।
তুমি এর কর্তা, এরা সকল তোমার।।
এই মম পুত্র কন্যা এই মম নারী।
দিয়াছি তোমারে সব সমর্পণ করি।।
এক কন্যা বালিকা এ দুটি দুগ্ধ পোষ্য।
তুমি সকলের গুরু এরা সব শিষ্য।।
মা নাই সংসার ভুক্ত আছেন শাশুড়ি।
সন্তানের স্নেহে থাকে গোলোকের বাড়ী।।
পাগলে ধরিয়া পাগলের পায় পড়ি।
ধূলায় লুণ্ঠিতা হ’য়ে যায় গড়াগড়ি।।
যারে পায় তারে ধরি করে গড়াগড়ি।
এই মত পাগলামী করে দণ্ড চারি।।
লম্ফ দিয়া পড়ে গিয়া ভিটার উপর।
লতাপাতা ছিঁড়ে স্থান করে পরিষ্কার।।
তাহা দেখি দলে যত দোহারেরা ছিল।
সকলে ভিটার গাছ উঠাতে লাগিল।।
পাগল কহিছে তোরা হরি বলে নাচ।
আমি একা উঠাইব এ কয়টি গাছ।।
মুহূর্তেকে পরিষ্কার করিলেন ভিটা।
মেয়েদের বলিলেন আন জলঝাঁটা।।
যাহাকে বলেন যাহা তারা করে তাই।
লেপন করিল ভিটা মেয়েরা সবাই।।
যারে পায় তারে ধ’রে আনিল সত্বরে।
লোক বসাইয়া দিল ভিটার উপরে।।
সকলে মিলিয়া বলে বল হরি বল।
তার মধ্যে ফিরে ঘুরে নেচেছে পাগল।।
ভ্রমিতেছে প্রেমে মেতে না হয় সান্ত্বনা।
এমন সময় পেটে উঠিল বেদনা।।
সবাই অস্থির চিত্ত দিবা অবশেষ।
রাত্রিকালে কহে মোর বেদনা বিশেষ।।
এ দিকে পড়িল ডাক কবির খোলায়।
পাগল বলেন গান করগে ত্বরায়।।
গান গায় সবে মিলে মেলার বাজারে।
এক এক জন থাকে পাগল গোচরে।।
গান ভঙ্গ পরে সবে যাইয়া বাসায়।
অবস্থা দেখিয়া সবে কাঁদিয়া ভাসায়।।
হেনকালে হুঙ্কারিয়া পাগল দাঁড়ায়।
গোবিন্দ মাঝির বাড়ী দৌড়াইয়া যায়।।
তিনখানা গামছা করিয়া একত্তর।
গামছা ধরিয়া রাখে পেটের উপরে।।
থালা এক পার্শ্বে রাখে পেটের বাহির।
বলে অঙ্গ বেদনায় হ’য়েছি অস্থির।।
তারকেরে কহে থালে জল ঢালিবারে।
দেখি তায় ব্যাথা মোর শীতল নি করে।।
তখন তারকচন্দ্র বলে হরিবোল।
থালার উপরে ঢালে চারি ঘটি জল।।
চারি ঘটি পরিমাণ দশসের জল।
থালার উপর শুষ্ক হইল সকল।।
বেদনায় যাতনায় অগ্নিতাপ উঠে।
সেই তাপে জল সব শুষ্ক হ’য়ে’ পেটে।।
গোস্বামীর বক্ষঃস্থল সাপুটে ধরিল।
তারক সে গামছা উঠায়ে চিপাড়িল।।
জলবিন্দু না পড়িল গামছা হইতে।
মৃতপ্রায় পাগলেরে রাখিল শয্যাতে।।
বলিল গোবিন্দ মাঝি উপায় কি হবে।
গোস্বামী মরিলে বল মরা কে ফেলা’বে।।
তারক কহিছে ওরে হারাম জালিয়া।
মরিলে কি তোর বাড়ী যাবরে ফেলিয়া।।
তোর বাড়ী লীলা সাঙ্গ করা অসম্ভব।
ম’লে কি দেহ তোরে স্পর্শ করতে দিব।।
তোর এই বাড়ী ভরে কে করে প্রস্রাপ।
গোস্বামী কহেন তোর বাক্য হ’ল পাপ।।
এতবলি গোস্বামী উঠিল ক্রোধভরে।
দৌড়াইয়া গেল গোলোক মাঝির ঘরে।।
কহিছে গোলোক মাঝি আমার বাটীতে।
থাকুক গোস্বামী মোরা থাকিব সেবাতে।।
দিবা গেল রাত্রি গেল হইল প্রভাত।
গোস্বামী বলেন যাব তারকের সাথ।।
জয়পুর ঘাট আমি বড় ভালবাসি।
ইচ্ছা হয় নবগঙ্গা নদী মাঝে পশি।।
মনের যে কষ্ট মোর সব হবে দূর।
এখন অবশ্য আমি যাব জয়পুর।।
তারকের পানে চাহি কহিছে গোলোক।
তুমি যদি পুত্র মোর হইতে তারক।।
তুমি যদি হইতে আমার পুত্রধন।
তা’হলে অনেক কার্য হইত সাধন।।
আমি আর তোমারে যে বলিব না দাদা।
তারক বলিয়া আমি ডাকিব সর্বদা।।
গোস্বামী কহে তারক আর কিবা চাও।
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হোক তুমি পুত্র হও।।
তারক তারক বলি ডাকে বার বার।
এর মধ্যে দাদা বলে ডাকে আর বার।।
উহু উহু করি তবে উঠিল গোঁসাই।
ডাকিব তারক বলে তাহা মনে নাই।।
ভাবি যে তারক বলে ডাকিব সর্বদা।
মনে ভাবি পুত্র ভাব মুখে আসে দাদা।।
ভুলক্রমে যাহা কহি তাতে নাহি লাজ।
আমার আসন্ন কালে কর পুত্র কাজ।।
হেনকালে সূর্যনারায়ণ কেঁদে কয়।
আসন্ন সময় যদি ভাব মহাশয়।।
পুত্র আছে নিবারণ নারিকেল বাড়ী।
এ সময় কি জন্য তাহারে এলে ছাড়ি।।
দশরথ মহানন্দ আছে বর্তমানে।
পিতা হ’তে অধিক তাহারা সবে মানে।।
সেই দেশে জ্ঞাতি বন্ধু আছয় প্রচুর।
তাহা ছাড়ি কি জন্য যাবেন জয়পুর।।
গোঁসাই বলেন মোর জ্ঞাতিবন্ধু নাই।
মনের মানুষ যেই তার সঙ্গে যাই।।
গৃহিণী থাকিলে হয় গৃহস্থ তাহারা।
কেবা কার পুত্র হয় কেবা কার দারা।।
পুত্র বটে নিবারণ ভালোবাসি মনে।
মোর পুত্র আমি তাহা বলিতে পারিনে।।
আছে মহানন্দ দশরথ দু’টি ভাই।
এ সময় যাই যদি তাহাদের ঠাই।।
মহানন্দ আছে সেই একা কি করিবে।
এত উপদ্রব একা কেমনে সহিবে।।
তাই মনে ভাবি সবে না বুঝিবে ইহা।
জয়পুর যাইতে সেহেতু মনে স্পৃহা।।
হরিচাঁদ তরাইবে এই ভব সিন্ধু।
হরি মাতা পিতা ভ্রাতা পুত্র জ্ঞাতি বন্ধু।।
বাসনা দেখিতে বড় তারকের মুখ।
জয়পুর গেলে আমি পাই বড় সুখ।।
এত বলি খেপাচাঁদ উঠিল খেপিয়া।
কিসের বেদনা মোর গিয়াছে সারিয়া।।
বাটী হ’তে আসিলেন ঘাটে দৌড়াইয়া।
খোয়া নায় প্রাতেঃ এসে উঠিল লাফিয়া।।
লাফিয়া লাফিয়া যান সকল গুরায়।
বলে আমি পারে যাই কে কে যাবি আয়।।
পার হ’য়ে ক্ষণেক চলিল দ্রুতগতি।
ক্ষণেক হাঁটিয়া বলে নাহি গতিশক্তি।।
চলিতে লাগিল শেষে অতি ধীরে ধীরে।
বসিয়া পড়িল শেষে হোগলা ভিতরে।।
ঘুমাইয়া পড়িলেন বনের ভিতরে।
তারকের উরু পাতি দিলেন শিয়রে।।
ক্ষণ থাকি নিদ্রা অন্তে উঠিয়া দাঁড়ায়।
ইতিনা গ্রামের মধ্যে দৌড়াইয়া যায়।।
এক বৃক্ষতলে বসি কহিছে গোঁসাই।
উঠে যাইবার শক্তি আর মোর নাই।।
বেদনা উঠিল পেটে নাহি সরে বাক্‌।
ফুলিয়া উঠিল পেট মধ্যে এক চাক।।
তারক কহিছে তবে এস মোর কোলে।
জনম স্বার্থক করি দেশে যা’ব চলে।।
পাগলে করিয়া কোলে তারক চলিল।
গোঁসাই কহিছে মোর শ্বাস বন্ধ হল।।
তারপর তারক গোলোকে নিল স্কন্ধে।
বলে মোর মাথা ধরি থাকহ আনন্দে।।
স্কন্ধে করি কিছু পথ চলিল হাঁটিয়া।
গোঁসাই কহিছে যেন যাই শূন্য হৈয়া।।
তাহা শুনি পাগলেরে ভূমে নামাইল।
সঙ্গে যত বস্ত্র ছিল পেটে জড়াইল।।
কটির উপরে রাখিলেন উচ্চ করি।
গোস্বামীকে বসাইল তাহার উপরি।।
অতি সাবধানে তারপরে বসাইয়ে।
হেলিয়া গোঁসাইজীকে পৃষ্ঠেতে তুলিয়ে।।
হাঁটিয়া চলিল পৃষ্ঠপরে রাখি ছাতি।
চলিছেন হরি বলি অতি দ্রুতগতি।।
ইতিনা ছাড়িয়া যান করফার মাঠে।
সম্মুখে মল্লিকপুর গ্রামের নিকটে।।
হেনকালে পৃষ্ঠ হ’তে লম্ফ দিয়া পড়ি।
পুনঃলম্ফ দিল হরি বলে ডাক ছাড়ি।।
হরি হরি বলিয়া মারিল পুনঃলম্ফ।
পদভরে সেই স্থানে হৈল ভূমিকম্প।।
দৌড়াইয়া যায় যেন ঘূর্ণ বায়ু পাক।
দেখিয়া পথিক লোকে হইল অবাক।।
তারক দৌড়িয়া যায় উর্দ্ধমুখ হ’য়ে।
কোথায় গোস্বামী গেল না পায় খুঁজিয়ে।।
বড়ই বিমর্ষ হ’য়ে লাগিল হাঁটিতে।
অন্য এক ভদ্রলোক এসে নিকটেতে।।
সে বলিল এক ব্যক্তি অতি দৌড়াদৌড়ি।
বলিল যাইব আমি তারকের বাড়ী।।
আসিতেছে তারক কহিও তার স্থান।
লইয়া তিনটি আম্র যেন বাড়ী যান।।
অমনি বাজারে গিয়া তিন আম্র ল’য়ে।
বাড়ী গিয়ে দেখে আছে গোস্বামী বসিয়ে।।
অমনি দিলেন আম গোস্বামীর ঠাই।
পাইয়া অমৃত ফল খাইল গোঁসাই।।
পাড়া হ’তে নারীগণে ডাকিয়া আনিল।
আত্মবন্ধু বর্গ যত মেয়েলোক ছিল।।
তারক বসন গলে বিনয় করিয়া।
সবার নিকটে কহে কাঁদিয়া কাঁদিয়া।।
যখন তোমরা পাও কাজে অবকাশ।
আসিয়া সকলে থেকো গোস্বামীর পাস।।
পায় ধরি সবে এসে এখানেতে তিষ্ঠ।
আমার গোঁসাই যেন নাহি পায় কষ্ট।।
তারকের ভার্যা নাম চিন্তামণি সতী।
বিধবা পিস্তত ভ্রাতৃবধূ সরস্বতী।।
সাধনা নামিনী নব মণ্ডলের কন্যা।
হরিচাঁদ ভক্তি পাত্রী সেবিকা সুধন্যা।।
ধর্মনারায়ণের স্ত্রী ঈশানের মাতা।
সীতানাথ মাতা প্রাণ কৃষ্ণের বণিতা।।
দিনমণি তার নাম পাটনীর মেয়ে।
এইসব দিল পরিচারিকা করিয়ে।।
এই কথা বলিয়ে দিলেন জনে জনে।
অন্য অন্য যত মেয়ে আসে সেই স্থানে।।
গোঁসাই যখন যাহা চাহিতে আশায়।
মন জেনে যোগাইবা তোমারা সবায়।।
যদি বল মন মোরা জানিব কেমনে।
নিপুণ করিয়া মন রাখিও চরণে।।
যদি মন নাহি জান যখন যা চায়।
জ বলিতে জল এনে দিও সে সময়।।
হুঁকা চাহিবারে যদি করেন আশায়।
হুঁ বলিতে হুঁকা এনে দিও সে সময়।।
তৈল চাহিবার যদি করেন মনন।
ত বলিতে তৈল এনে করিও মর্দন।।
এই রূপে যখন যে দ্রব্য চাহিবেন।
দিবা রাত্রি কাছে থাকি সকলে দিবেন।।
এইরূপে সবে থাক গোঁসাই সেবায়।
রাত্রিকালে চারিজন সর্বক্ষণ রয়।।
চিন্তামণি সরস্বতী তারক সাধনা।
দিবারাত্রি সর্বকাল রহে চারিজনা।।
কেহ আসে কেহ যায় কেহ উঠে বসে।
কেহ নিদ্রাবশীভুতা চক্ষের নিমিষে।।
বারশ ছিয়াশী সাল ঊনত্রিশে বৈশাখ।
সকলকে বলে তোরা হরি বলে ডাক।।
প্রভু বলে মোরে যদি ভালই বাসিস।
আজ তোরা মোর কাছে কেহ না আসিস।।
বৈকাল বেলায় দেড় প্রহর থাকিতে।
সকলকে তুষিলেন সুমিষ্ট বাক্যতে।।
আমার এ ঘর ছাড়ি অন্য স্থানে যাও।
দূরে নহে নিকটে নিকটে সবে রও।।
তাহা শুনি চারিজন রহে স্থানান্তরে।
তাহার নিকটে রহে গোস্বামী যে ঘরে।।
দক্ষিণের ঘর পরিষ্কার পরিপাটী।
পশ্চিম দক্ষিণ দিকে বেড়া আঁটাআঁটি।।
নূতন নির্মাণ ঘর দেখিতে সুন্দর।
গোঁসাই দেখিয়া বলে এ ঘর আমার।।
তোমার যে বড় ঘর ও ঘরে না যাব।
এই ঘরে থেকে আমি ঠাকুর দেখিব।।
সেই ঘরে গোস্বামীর শয্যা করে দিয়া।
উত্তরের বেড়া দিল চাটাই ঘেরিয়া।।
এগারই তারিখে জয়পুর আসিলা।
সেই দিন রহিলেন আম্রবৃক্ষ তলা।।
বারই বৈশাখ দিনে সে ঘরে প্রবেশে।
শুশ্রূষা করেন সবে মনের হরিষে।।
বেদনা যখন উঠে হয়েন অস্থির।
দুঃখেতে সবার চক্ষে ঝরে অশ্রুনীর।।
পাগল বলিল সবে ঘর হ’তে যাও।
যদি মোরে ভালোবাস মোর কথা লও।।
ঘরের বাহিরে গেল যত নরনারী।
গুণ গুণ রবে সবে বলে হরি হরি।।
কেহ বা নিকটে যায় গোস্বামী দেখিতে।
হস্ত তুলে মানা করে নিকটে যাইতে।।
উত্তরের বেড়ে বেড়া ঠেলিয়া চাটাই।
হরি বলে ভূমি তলে পড়িল গোঁসাই।।
সীতানাথ তাহা দেখি ডাক দিয়া কয়।
পাগল ঢলিয়া পল এস কে কোথায়।।
অমনি তারক গিয়া দৌড়িয়া ধরিল।
জ্ঞানশূন্য অচৈতন্য কোলেতে করিল।।
সান্ত্বনা করিব বলে ধরিল যতনে।
অতি ধীরে কোলে করি আনিল প্রাঙ্গণে।।
সীতানাথের জননী বলিল তখনে।
অচেতন পাগল দেখনা তুমি কেনে।।
পাগলেরে হরি নাম করাও শ্রবণ।
এ বার গোঁসাই বুঝি ত্যাজিল জীবন।।
যার যা উচিৎ তাহা করহ এখন।
উচ্চৈঃস্বরে হরিনাম কর সর্বজন।।
হেনকালে গোস্বামী দিলেন অঙ্গঝাঁকি।
হস্ত পদ লোম কেশ উঠিল চমকি।।
গোস্বামীর মুখ হ’তে উঠে এক জ্যোতি।
চিকমিক ঠিক যেন বিদ্যুতের ভাতি।।
তারকের মুখে বুকে লাগিল সে জ্যোতি।
আর শূন্যে উঠে মহানন্দ দেহে স্থিতি।।
গোপাল নামেতে একজন লোক আসি।
কাষ্ঠ করে হৃষ্ট মনে হ’ল রাশি রাশি।।
তাহা দেখে সাধনা সে বলিল অভীষ্ট।
কি কারণে তোমরা করেছ এত কাষ্ঠ।।
গোস্বামীর অগ্নিকাষ্ঠ করা বড় দায়।
এ কার্য করিতে মম মনে লাগে ভয়।।
বেদনায় গোস্বামীর জ্বলে গেছে দেহ।
একরূপ গোস্বামীর তাতে হ’ল দাহ।।
ল’য়েছে অগ্নির শেক ব্যথায় অস্থির।
তাতে আর এক দাহ হ’য়েছে শরীর।।
ঠাকুরের লীলাসাঙ্গ হ’ল যে অবধি।
সে দারুণ আগুনে পুড়েছে নিরবধি।।
পোড়া দেহ পুনঃ কেন করিবা দাহন।
নব গঙ্গা জলে দেহ, দেহ বিসর্জন।।
গঙ্গার কামনা পূর্ণ গোস্বামীর আশা।
গঙ্গার শীতল উভয়ের ভালোবাসা।।
মনে বলে এর যদি কর বিপর্যয়।
তোমার বিপদ হ’বে জানিও নিশ্চয়।।
কেহ বলে পরোয়ানা এসেছে থানায়।
জলে কদাচার কিছু করা নাহি যায়।।
জলেতে প্রস্রাব কেহ করিবারে নারে।
মলত্যাগ করিলে চালান দেয় ধরে।।
দুই তিন জনের হয়েছে জরিমানা।
নদীকূলে মরাদাহ করিবারে মানা।।
জরিমানা তুচ্ছ কথা বড়ই আটক।
সাক্ষী বিনা হয় তার ছ মাস ফাটক।।
তারা বলেন আমি পড়িয়া এসেছি।
খেয়াঘাটে বিজ্ঞাপন লেখা দেখিয়াছি।।
মরা জলে দিলে দুই মাস জেল লেখা।
জরিমানা ছাড়া পঞ্চায়েত নেয় টাকা।।
তাতে নাহি ভয় হয় হউক ফাটক।
এ কার্য হইলে মম জীবন স্বার্থক।।
খুন কি ডাকাতি পরদারী হিংসা চুরি।
তাতে জেল হলে কলঙ্কের ভয় করি।।
গোস্বামীকে জলে দিয়া যাইব ফাটকে।
স্বর্গ সুখ অনুভব করি সে আটকে।।
দিব যদি এতে দিতে হয় জরিমানা।
অক্লেশে করিব সহ্য পুলিশ যাতনা।।
বলিল সাধনা দেবী ইহা যদি কর।
প্রভাতে লাগিবে টাকা কি আছে যোগাড়।।
তারক কহিল যদি না থাকে যোগাড়।
ঘর বেচি দিব নয় খাটিব চাকর।।
নগদ চল্লিশ আছে আর কিবা ভাব।
যদি আরো কিছু লাগে নৌকা বেঁচে দিব।।
তাহা শুনি সাধনা কহিছে ভাল ভাল।
শীঘ্র তবে গোস্বামীকে ঘাটে লয়ে চল।।
তারক করিল কোলে পদ পড়ে ঝুলে।
সাধনা শ্রীপদ ধরি তুলে নিল কোলে।।
গোস্বামীকে ঘাটে এনে নৌকা পরে রেখে।
ঘৃত মেখে সলিতার অগ্নি দিল মুখে।।
বৈশাখী পূর্ণিমা ঊনত্রিশে শনিবার।।
গোস্বামীকে লয়ে গেল গঙ্গার ভিতর।।
হেনকালে পূর্ণচন্দ্র গগনে উদয়।
নিশিতে দেখায় যেন দীপ্তকার ময়।।
গোধূলি উত্তীর্ণ রাত্রি দন্দেক সময়।
দশ দণ্ড উপরেতে শশাঙ্ক উদয়।।
চন্দ্রিমায় নীলাকাশ চিত্র বিচিত্রিত।
শ্বেত লাল সবুজ হরিদ্রা নীল পীত।।
তার অধোভাগে হ’ল মেঘ গোলাকার।
নবগঙ্গা মধ্যে হ’ল ঘোর অন্ধকার।।
তার চতুর্দিকে জ্যোৎস্না আলোময়।
মধ্যে অন্ধকার কিছু লক্ষ্য নাহি হয়।।
তারকের কোলে গোস্বামীর পুত দেহ।
পাঁছনায় বৈঠা বায় গোপাল উৎসাহ।।
গোস্বামীর সিদ্ধ দেহ ছাড়িলেন জলে।
বুড় বুড় শব্দ তাতে তুফান উঠিলে।।
তার মধ্যে পাক হ’ল পাগলে লইয়া।
সেই পাকে গোস্বামীকে দিলেন ছাড়িয়া।।
জল হাতে লয়ে দোঁহে দিল করতালি।
হরি বলে মস্তক উপরে হাত তুলি।।
এড়েন্দার হাটুরিয়া নৌকা দুইখান।
লোক দুই নৌকায় নব্বই পরিমাণ।।
হরিধ্বনি শুনিয়া তাহারা বলে হরি।
জলে স্থলে সবে বলে হরি হরি হরি।।
মেঘ গেল চন্দ্রমণ্ডলে শোভা প্রকাশে।
দণ্ড অন্ধকার থাকি পূর্ব শোভা হাসে।।
এদিকে শ্মশানে আছে কাষ্ঠের পাঁজাল।
সাধনা কহিছে র’ল একটি জঞ্জাল।।
শ্মশানে থাকিলে কাষ্ঠ ভাল না দেখায়।
কাষ্ঠ জ্বালাইয়া শীঘ্র এস দুজনায়।।
তারক গোপাল দোঁহে নৌকা বেয়ে গেল।
কূল দিয়া গ্রন্থ আর সাধনা চলিল।।
কাষ্ঠেতে আগুন দিয়া বলে হরি হরি।
দু’জন পুরুষ আর দুইজন নারী।।
দুই কূলে দেখা যায় লোক সারি সারি।
জলে স্থলে সকলে বলেছে হরি হরি।।
হেন মতে চারিজন আসিলেন ঘরে।
মহোৎসব করিবেন কহে গোপালেরে।।
গোস্বামীর হুঁকা যষ্ঠি জয়পুর ছিল।
রজনী প্রভাতে ওঢ়াকাঁদি পাঠাইল।।
সদ্য সদ্য মহোৎসব করিতে বাসনা।
গোপালকে কহিলেন মনের কামনা।।
দুইটি পূজারী আর ট’লো ছয়জন।
ভেকধারী দ্বাবিংশতি বৈষ্ণব সুজন।।
জয়পুর কৃষ্ণপুর নারায়ণদিয়া।
কুন্দসীর নমঃশূদ্র স্বজাতি লইয়া।।
গোস্বামীর স্বর্গার্থে করেন মহোৎসব।
হরিবোল বলিয়া ভোজন হ’ল সব।।
যত লোক পরিমাণ আয়োজন ছিল।
অভ্যাগত লোক তার দ্বিগুণ হইল।।
দুইশত লোক পরিমাণ আয়োজন।
লোকের সমষ্টি হ’ল চারিশত জন।।
দুঃখী লোক অবশিষ্ট প্রসাদ পাইল।
শতাধিক লোকের প্রসাদ বিলি হ’ল।।
রন্ধন হইল যে তণ্ডুল দুই মণ।
পরিতোষ পরিচ্ছন্ন হইল ভোজন।।
দক্ষিণা লইয়া সবে বিদায় হইল।
আয়োজন জিনিসের অর্ধ ফুরাইল।।
লীলা সাঙ্গ গোস্বামীর ত্যজিয়া ভূলোক।
পুত্ররূপে মহোৎসব করিল তারক।।
এই কার্য পরিচর্যা অন্য যত কার্য।
গোপাল অধ্যক্ষ হয়ে করিল সাহায্য।।
পূর্বেতে গোপাল বড় পাষণ্ড ছিলেন।
এই সব কার্য অতি যত্নে করিলেন।।
গোস্বামীর ক্রিয়া অন্তে হইল প্রেমিক।
রসিকের ধর্ম লয়ে হইল রসিক।।
হরি বলে সাধুসঙ্গ করে নিরবধি।
শেষে তার সরকার হইল উপাধি।।
সাধুনাম খ্যাত হৈল বৈষ্ণব সমাজে।
রচিল তারকচন্দ্র কবি রসরাজ।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!