মতুয়া সংগীত

প্রভুর চরিত্র কথা

ময়না পাখীদ্বয়
পয়ার

প্রভুর চরিত্র কথা মধুর বর্ষণ।
এবে শুন ময়না পাখীর বিবরণ।।
আশ্বিনে অম্বিকা পূজা গানের কারণে।
দলসহ ঢাকাধামে করিনু গমন।।
বাল্যকাল হ’তে সদা করি কবিগান।
প্রথমেতে যবে কৈনু দলের সাজান।।
কণ্ঠস্বর শ্রুতিকটু বদ অতিশয়।
গান শুনি সবে দূর করিয়া তাড়ায়।।
বিরস বদনে শেষে ওঢ়াকাঁদি যাই।
মনোকষ্ট জানা’লেম মহাপ্রভু ঠাই।।
গান করিবারে যাই কণ্ঠে নাহি সুর।
গান গাহি শুনে সবে করে দূর দূর।।
কি করিব দয়াময় বলুন উপায়।
পৈতৃক ব্যবসা মম আমা হ’তে যায়।।
মহাপ্রভু বলে বলি তোমার নিকটে।
এই কথা জানাইবা প্রতি হাটে হাটে।।
যারে দেখ তারে তুমি ব’ল বারে বারে।
মোর গান নাহি শুনে দেয় দূর করে।।
তাহা তুমি করিলে করিতে পার গান।
সাত হাট সেধে সেধে হও অপমান।।
তাহা শুনি সাত হাট করিলাম তাই।
তাহা করিলাম যাহা বলিল গোঁসাই।।
আশ্বিনে যাইব ঢাকা গান গাইবারে।
ভাবিলাম যাব প্রভু পদ দৃষ্টি করে।।
প্রভু বলে তারক ঢাকাতে তুমি যাও।
মোর জন্যে এন এক ময়নার ছাও।।
প্রভু আজ্ঞা শিরোধার্য করিয়া তখন।
ঢাকা গিয়া ঢাকেশ্বরী করিনু দর্শন।।
পাঁঠা মেড়া বলি দেখি দুঃখিত হইয়া।
সদলে আইনু ফিরে হরিধ্বনি দিয়া।।
হেনকালে পথে এক ময়না বিক্রেতা।
দুটি ময়নার ছাও ল’য়ে এল তথা।।
কত মূল্য চাহ বলিলাম তার ঠাই।
বিক্রেতা বলিল আমি নয় টাকা চাই।।
নয় টাকা দিয়া পক্ষী করিনু খরিদ।
গান করি বাড়ী যাই পাইনু সুহৃদ।।
ন’ড়াল নিবাসী রামকুমার বিশ্বাস।
শ্রীধামের সংবাদ শুনিনু তার পাশ।।
বলিলাম সবিনয় শ্রীরামকুমারে।
বড় নৌকা ল’য়ে ওঢ়াকাঁদি গেলে পরে।।
অনেক বিলম্ব হবে এই পাখী লও।
তুমি গিয়া শ্রীধামে প্রভুকে পাখী দেও।।
দুই পাখী মধ্যে যেটা ছিল হৃষ্ট পুষ্ট।
কুমারে দিলাম পাখী হ’য়ে অতি হৃষ্ট।।
পাখী ল’য়ে সুখী হ’য়ে কুমার চলিল।
বাটী গিয়ে ভবানীর কাছে পাখী দিল।।
কল্য প্রাতেঃ ওঢ়াকাঁদি যাব দুইজন।
রাখ দিদি এই পাখী করিয়া যতন।।
রাখিবার খাঁচা নাই কোথা রাখি পাখী।
হাঁড়ি মধ্যে রাখে সরা দিয়া মুখ ঢাকি।।
শ্বাস রুদ্ধ হ’য়ে পাখী রাত্রিরে মরিল।
প্রাতেঃ ওঢ়াকাঁদি যেতে আয়োজন কৈল।।
সরা তুলে দেখে পাখী মরেছে তখনে।
কুমার ভবানী বসে কাঁদে ভাই বুনে।।
কুমার বলেছে দিদি তোমারে জানাই।
মরা পাখী ল’য়ে চল ওঢ়াকাঁদি যাই।।
কাঁদিতে কাঁদিতে দোঁহে ওঢ়াকাঁদি গেল।
মৃত পাখী পদে রাখি সব জানাইল।।
প্রভু বলে এই পাখী মরিয়াছে নাকি।
মোর মন বলে ঘুম পড়িয়াছে পাখী।।
উঠ উঠ বলে প্রভু পৃষ্ঠে দিল হাত।
শ্রীঅঙ্গ পরশে প্রাণ পেল অকস্মাৎ।।
তাহা দেখি দু’জনের চক্ষে ঝরে নীর।
প্রেমে গদ গদ হ’ল রোমাঞ্চ শরীর।।
শ্রীপদে প্রণামী ভাই ভগ্নি বাড়ী গেল।
শ্রীধামে ময়না পাখী বহুদিন ছিল।।
রাম কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ শ্রীগৌরাঙ্গ বল।
হরি হরি বলিয়া নয়নে বহে জল।।
এদিকে তারক ল’য়ে ময়নার ছাও।
বলিত ময়না হরিচাঁদ গুণ গাও।।
ওঢ়াকাঁদি অবতীর্ণ ভব কর্ণধার।
হরি হরি হরি হরি বল বার বার।।
শিখাইল ষোল নাম বত্রিশ অক্ষর।
ওঢ়াকাঁদিগণ নাম শিখাইল আর।।
হীরামন গোলোক লোচন মহানন্দ।
শিখাইল হরিশ্চন্দ্র আর গুরুচন্দ্র।।
রাত্রি এক প্রহর থাকিতে নাম করে।
ক্ষান্ত করে সূর্য এলে প্রহরেক পরে।।
দুধ ভাত চা’ল ছোলা বুট মুগ আর।
ভোজনান্তে হরে কৃষ্ণ বলে বার বার।।
অন্য কোন লোকে যদি সে নাম শুনিত।
চিত্র পুত্তলিকা মত দাঁড়াইয়া র’ত।।
নাম ল’য়ে নয়নের জলে ভেসে যেত।
আড়া হ’তে খাঁচাপরে হইত মূর্ছিত।।
ক্ষণে ক্ষণে পক্ষগুলি উর্দ্ধ মুখ হ’ত।
মূর্ছিত হইলে পরে তাহা সম্বরিত।।
আড়াতে সংযুক্ত পদ গলা ধরে টান।
দুপাখা তুলিয়া করেন নামামৃত পান।।
তারক পরম সুখী পাখীর গানেতে।
পাঁচ সাত বর্ষ গত হ’ল এই মতে।।
একদিন সেই পাখী আহার করাতে।
বাহির করিয়াছিল সেই খাঁচা হতে।।
তারক বলিল পাখী খাঁচা মধ্যে দিয়ে।
শীঘ্র দেহ খাঁচার দরজা আটকায়ে।।
এইমাত্র কথা বার্তা তথা হ’য়েছিল।
ভ্রমে ক্রমে দরজা আটকান নাহি হ’ল।।
দরজা আটকান হ’ল না দিল খিল।
জীব জীবনের আশা নাহি এক তিল।।
দৈবে খাঁচা হ’তে পাখী বাহির হইল।
মাটিতে পড়িবা মাত্র বিড়ালে ধরিল।।
ডাকিতে লাগিল পাখী হইয়া অস্থির।
দন্তাঘাতে বিদ্ধ দেহ পড়েছে রুধির।।
দৌড়ে গিয়া সেই পাখী সকলে ধরিল।
মৃত প্রায় হ’য়ে পাখী দুই দিন ছিল।।
আর না করিল পাখী জল ফলাহার।
হরেকৃষ্ণ রাধাকৃষ্ণ বলে অনিবার।।
লোচন গোস্বামী বলে মম বাক্য লও।
ত্যাগ কর মমতা পাখীরে ছেড়ে দাও।।
পূর্বদিনে প্রহরেক বেলার সময়।
মার্জরে আঘাত করে সে পাখী গায়।।
সে হইতে সদা করে হরে কৃষ্ণ নাম।
হরি বল হরি বল নাহিক বিরাম।।
যদি সেই পাখী কেহ দেখিবারে যায়।
হরি বল হরি বল হরি বল কয়।।
কত হরিনাম করে নাহিক বিরাম।
হরি বলিতে বলিতে রুদ্ধ হয় দম।।
কোন দমে বলে হরি বিশ ত্রিশ বার।
দুনয়নে বহে অবারিত জলধার।।
হরে কৃষ্ণ হরি হরি বলিতে বলিতে।
অকস্মাৎ দেহ পাত পড়িল মহিতে।।
তারক স্বকরে করি সে পাখী ধারণ।
নবগঙ্গা জলে দেহ দিল বিসর্জন।।
ব্রজে ছিল যত পাখী নিকুঞ্জ কাননে।
রাধা শ্যাম মিলন দেখিত দুনয়নে।।
ওঢ়াকাঁদি প্রভু লীলা ঐশান্য কোণে।
এই সব ব্রজ পাখী এল সে কারণে।।
সেই সব পাখী এল ভকত সমাজ।
রচিল তারকচন্দ্র কবি রসরাজ।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!