মতুয়া সংগীত

প্রেম প্রকৃতি হইয়া

শ্লোক
কা চিন্তা ভো মৃত্যুপতে অহং প্রকৃতি ভবান্।
শোষিতং শোষিতং প্রেম চৈতন্যং কিং করিষ্যতি।।

পয়ার
শোষিব শোষিব প্রেম প্রকৃতি হইয়া।
কি করিতে পারে একা চৈতন্য আসিয়া।।
বলে কলি শুন বলি ধর্ম নরমনি।
আমি দিব গৌরাঙ্গের সব ভক্ত আনি।।
ধরিব বৈরাগ্য বেশ মুখে রেখে দাড়ি।
ভেকধারী সাধু হ’য়ে ফিরিব বাড়ী বাড়ী।।
চৈতন্যের তত্ত্ব যাতে কেহ নাহি মানে।
শিখাইব এই তত্ত্ব সুযুক্তি বিধানে।।
যম কলি প্রভাব এ গ্রন্থ বিরচিত।
জীব গোঁসাই সেই গ্রন্থ গোস্বামী লিখিত।।
নানা মত করি কলি জীব ভুলাইল।
শাস্ত্র ছাড়া মত কত কলি দেখাইল।।
মাতা পিতা না মানে না মানে গুরুজন।
নারী বাধ্য পিতা করে পুত্রে বিসর্জন।।
আর দেখ গৌরাঙ্গের মত যত ছিল।
তাহার মধ্যেতে কলি কত মত দিল।।
গৌরাঙ্গের মত প্রায় লোপ হয়ে যায়।
নরোত্তম শ্রীনিবাস এসে এ সময়।।
দুই প্রভু শেষ লীলা করিল উজ্জ্বল।
মধুর মাধুর্য প্রেম প্রকাশি সকল।।
আবার হইল লোপ কলির মায়ায়।
গোস্বামীর ধর্ম বলি বিপথে লওয়ায়।।
প্রকৃতি হইয়া প্রেম করিল শোষণ।
চমকিত হইল যত সাধকেরগণ।।
বীরভদ্র প্রিয় শিষ্য চারিজন ছিল।
প্রতিজ্ঞা করিয়া তারা কহিতে লাগিল।।
যথাকার বিন্দু মোরা তথায় পাঠাব।
প্রকৃতির স্থানে বিন্দু কিছু না রাখিব।।
বনচারী অখিলচাঁদ সেবা কমলিনী।
হরি-গুরু এই চারি সম্প্রদায় জানি।।
পূর্ব পূর্ব মহাজন যে ধর্ম যাজিল।
বীরভদ্র সেই ধর্ম শিষ্যে জানাইল।।
প্রকৃতি আশ্রয় করি সিদ্ধিপ্রাপ্ত হ’ল।
সে কারণ চারিজন প্রতিজ্ঞা করিল।।
আধুনিক সেই ধর্ম শুনিয়া শ্রবণে।
প্রকৃতি আশ্রয় লোভে শিক্ষাগুরু জানে।।
গৃহধর্ম ত্যাগ করি পচা গৃহী হয়।
করয় প্রকৃতি সঙ্গ ধর্ম নাহি রয়।।
বুঝিতে না পারে ধর্ম করে নারীসঙ্গ।
হাতে তালি দেয় কলি দেখিয়া সে রঙ্গ।।
বিধবা হইল কোন যুবতি রমণী।
গর্ভবতী হ’লে তারে ভেক দেয় আনি।।
পচাগৃহী শিষ্য করি রাখে যে তাহারে।
সেই গর্ভে পুত্র হ’লে সেবাইত করে।।
জাতিতে বৈরাগী তার হয় পরিচয়।
করতালি দেয় কলি দেখিয়া তাহায়।।
শ্রীগৌরাঙ্গ প্রভু যবে প্রেম প্রকাশিল।
সভক্তি দুর্লভ প্রেম জীবে শিক্ষা দিল।।
চরিং চিরাৎ যেই প্রেম ছিল অনর্পিত।
বিরিঞ্চি বাঞ্চিত প্রেম নামের সহিত।।
বিলাইল সেই প্রেম নাম রসে মাখা।
তাহা দেখি চিত্রগুপ্ত ছেড়ে দিল লেখা।।
যমরাজ ছাড়ে ধর্মাধর্মের বিচার।
অবসর হ’য়ে কহে গেছে অধিকার।।
তাহা শুনি কলিরাজ ছয় রিপু লয়ে।
যম চিত্রগুপ্ত স্থানে উত্তরিল গিয়ে।।
কলিরাজ ডাকে মহা মায়াকে স্মরিয়া।
মহামায়া এল কলি সপক্ষ হইয়া।।
কলি কহে ধর্মরাজ কেন অবসর।
চিত্রগুপ্ত লেখা ছাড়ে কেমন বর্বর।।
চিত্রগুপ্ত বলে খাতা রাখিব কি জন্য।
লেখা পড়া দু’টা মোর পাপ আর পুণ্য।।
পাপ গেল পুণ্য গেল লেখা গেল মোর।
এবে কি লিখিব যা বিধির অগোচর।।
যম কহে অধিকার গিয়াছে আমার।
পাপ পুণ্য শুন্য কার করিব বিচার।।
কলি কহে মম অধিকার যদি রয়।
তোমার এ অধিকার থাকিবে নিশ্চয়।।
লোভ কহে আমি লোভাইব সব সাধু।
প্রেমমধ্যে দেখাইব নারীমুখ বিধু।।
এককালে লোভাইব বৈরাগী সকল।
পঞ্চরসিকের ক্রিয়া দিয়া নারীকোল।।
গৌরাঙ্গের সঙ্গে হরি কীর্তন ভিতরে।
নারী আর পুরুষ মাতাব একেবারে।।
দুইরূপ বৈরাগীর গৌড়িয়া বাতুল।
জাতি ল’য়ে দলাদলি ভুলাইব মূল।।
মদ কহে মাৎসর্য্য জন্মাব দম্ভসহ।
নামে প্রেমে মন মজা’তে নারিবে কেহ।।
কাম কহে বৈস গিয়া তব রাজপাটে।
তব অধিকার দিব প্রেম নিব লুটে।।
মহাজনী পথ বলি দেখাইব পথ।
চৈতন্যের মত ভুলি ডুবিবেক সৎ।।
শিবের চৌষট্টি নিশা দ্বাদশ পাগল।
ইহাদিগে লইয়া বলা’ব হরিবোল।।
পরাৎপর ব্রজরস প্রভু নিজ ধর্ম।
বেদাতীত গূঢ়ত্ব যা বিধির অগম্য।।
তাহা দেখাইয়া ভুলাইব কতগুলি।
নারী লুব্ধ করাইব মজা’ব সকলি।।
শ্রীনিবাস চৈতন্যের মত গোড়াইব।
তার মধ্যে অন্য অন্য মত চালাইব।।
সেই মত মাতাইব সকল জগৎ।
চৈতন্যের মত ছাড়ি ডুবিবেক সৎ।।
সংঘট ঘটাব মঙ্গল আর শনিবারে।
বার বার ‘বার’ বানাইব বারে বারে।।
বিল্ববৃক্ষ তুলসী মাহাত্ম্য লোপাইব।
হিজলিকা শড়াজিকা বার সাজাইব।।
চৈতন্যের মত বারে ক্রিব আসক্ত।
মজাইব চৈতন্যের আত্মসুখী ভক্ত।।
মাধুর্য্যের ভক্তে মোর নাই অধিকার।
ঐশ্বর্য্য ভক্তের ভক্তি দিব ছারখার।।
রোগাভক্তি করাইয়া মাতাইব সব।
এদিকেতে করিব রোগের প্রাদুর্ভাব।।
মত প্রচারিয়া মোর মতে আকর্ষিয়া।
তোমার দক্ষিণ দ্বার দিব পোষাইয়া।।
হ্রদে দহে তড়াগে প্রয়াগ প্রচারিব।
কূপে গঙ্গা প্রচারিয়া তীর্থ বানাইব।।
কুলজার কুলাচার ধর্ম নষ্টাইব।
বিধিভক্ত নৈষ্ঠিকের ধর্ম ভ্রষ্টাইব।।
প্রচারি পৈশাচী সিদ্ধি সাধুত্ব জানা’ব।
ভূত ভাবি বর্তমান তাহারে বলা’ব।।
কন্দর্পের দর্পে মোহাইব কতজন।
কিয়ৎক্ষণ মোহাইব মোহান্তের মন।।
কৃষ্ণভক্তি ছাড়ি পৈশাচিক মত ল’বে।
এতে তব অধিকার ক্রমেই বাড়িবে।।
তাহা শুনি যম বলে ধন্য ধন্য কলি।
যমদূত সবে নাচে দুইবাহু তুলি।।
কলি বলে ভক্ত মধ্যে বহুত পাষণ্ড।
বহিরঙ্গ ভক্ত যত সব হ’বে ভণ্ড।।
কূপজলে দেখা’ব আশ্চর্য্য বিভীষিকা।
লোক সংঘটন হবে নাহি লেখাজোখা।।
নদী পার নিব নাবিকের নায় নিয়া।
নাবিক ছাড়িবে কর্ণ অসাধ্য হইয়া।।
গোছাল রুধির ক্লেদ টিপ্পনী তরণী।
মুচির নৌকায় পার হইবে ব্রাহ্মণী।।
হাড়ি মুচি যবন ব্রাহ্মণ আদি করি।
যাতায়াতে ফেলাইব পথ রুদ্ধ করি।।
শ্রাদ্ধোৎসর্গ তণ্ডুল পরশে প্রেম শূন্য।
অজালোম পরশনে ভক্তি হয় চূর্ণ।।
অজারক্ত খাওয়াইব কূপজলে ধুয়ে।
যাজনিক ব্রাহ্মণেরে দোকানী বানায়ে।।
তাহার মিষ্টান্ন খাওয়াইব বাজারেতে।
যাতে ভক্তি লোপ হয় তব কল্যাণেতে।।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে রয়েছে নিশানা।
পাপপূর্ণা বসুন্ধরা শস্য জন্মিবেনা।।
গাভী হবে দুগ্ধহীনা ফলহীন বৃক্ষ।
নদী-নদ খাল বিল ক্রমে হবে শুষ্ক।।
মারুতির ক্রোধ ছিল তাহা কোথা যাবে।
সেই শাপ মনস্তাপ অবশ্য ভূঞ্জিবে।।
মাতৃ পিতৃ ভাতৃ ভাত খাইবে যাচিয়া।
নরকে মজিবে ধর্ম পালিতে নারিয়া।।
রাবনের চেড়ি করে সীতাকে পীড়ণ।
তাহা দেখি কুপিলেন পবন নন্দন।।
সেইকালে আছাড়িয়া লইত জীবন।
তাহা না করিল শুনি সীতার বারণ।।
জন্মান্তরে তাহারা হইবে রোগযুক্ত।
তাহারা হইবে সব কূপতীর্থ ভক্ত।।
সধবা বিধবা সব ডুবা’বে সে কূপে।
এই দশা হবে হনুমান বীর কোপে।।
নৈষ্ঠিক প্রেমিক ভক্ত পদশিরে ধরি।
গৌরাঙ্গ হাটে গিয়া বলা’ব হরি হরি।।
না মানিবে শিব দুর্গা কৃষ্ণপ্রেমে বাম।
হরিনাম না লইবে বলি মরা নাম।।
এরূপ দুষ্কৃতি কর্মে ধর্ম কর্ম ক্ষয়।
বিস্তারি লিখিতে গেলে পুথি বেড়ে যায়।।
এরূপে বৈষ্ণব ধর্মে পড়ে গেল ত্রুটি।
সেহেতু ঘুচাতে বৈষ্ণবের কুটিনাটি।।
যুগে যুগে করে প্রভু ভূ-ভার হরণ।
দুষ্কৃতি বিনাশ আর ধর্ম সংস্থাপন।।
ব্যাসের কলমে আছে ভাগবতে শ্লোক।
স্বয়ং এর মুখ বাক্য প্রতিজ্ঞাপূর্বক।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!