ভবঘুরেকথা
ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই

-তপন বসু

বিখ্যাত বাউল সাধক ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই এপ্রিল মঙ্গলবার মাগুরা জেলার সদর থানাধীন উত্তর নোয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা চন্দ্রকান্ত বসু ও মাতা শান্তিলতা বসু।

কিশোর বয়স থেকেই মনোরঞ্জন বসু ছিলেন সংসার বিবাগী। তিনি প্রায়শঃ বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা করতেন। আবার কিছুদিন পরে ফিরে আসতেন। এভাবে তিনি নেপালসহ অখণ্ড ভারতের নানা অঞ্চল দীর্ঘসময় ধরে ভ্রমণ করেন।

এভাবে তিনি বহুবিচিত্র জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসেন। তাদের ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিতি হন। সংসারের বন্ধন মুক্ত হওয়ার ফলে তার মন প্রসারিত হয়, দৃষ্টিভঙ্গী হয় উদার। শাস্ত্রীয় ধর্মের বন্ধন মুক্ত হয়ে তিনি জগৎ ও জীবনের এক উন্মুক্ত প্রান্তরে নিজেকে আবিষ্কার করেন।

কিশোর বয়সে তার নিজগ্রামে অনুষ্ঠিত এক সাধুসঙ্গের অনুষ্ঠানে এক মোল্লা একজন বাউলকে নিষ্ঠুরভাবে অপমান করে। এই ঘটনা তার সংবেদনশীল মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তিনি বাউল ধর্ম তত্ত্বের শিকড় সন্ধানে প্রবৃত্ত হন। হিন্দু-বৌদ্ধ, খ্রিস্টান-মুসলমান, জৈন-জরথ্রুস্ট প্রভৃতি ধর্মের গ্রন্থগুলো তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন।

১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘আয়ুর্বেদ শাস্ত্রী’ এবং ১৯৭০ সালে ‘ভিষগ রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিজস্ব গবেষণায় তিনি বেশকিছু জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির ঔষধ উদ্ভাবন করেন। এভাবে চিকিৎসক হিসাবে তিনি অত্যন্ত সাফল্য অর্জন করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘মেসার্স শান্তি ঔষধালয়’ আজও তার চিকিৎসা ক্ষ্যাতি বহন করে চলেছে।

এরপর তিনি অধ্যয়ন করেন গুরুবাদী বিভিন্ন লৌকিক ধর্ম। যেমন- আউল-বাউল, সুফিবাদ, সহজিয়া, কর্তাভজা ইত্যাদি। অবশেষে তিনি লালনের মতাদর্শে, যা বাউল ধর্ম নামে পরিচিত, গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। এর যুক্তি, উদারতা ও মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে।

এই ধর্মমতে দীক্ষিত হবার জন্যে তিনি একজন সদ্-গুরুর সন্ধানে বিভিন্ন আখড়া ও আশ্রমে ঘুরে বেড়ান। অবশেষে তিনি লালন সাঁইজির প্রশিষ্য কোকিল সাঁইজিকে গুরু বলে গ্রহণ করেন ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে।

লালন মতে দীক্ষিত হবার পর তিনি লালনের গান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সাঁইজির মতাদর্শে তাঁর সংগীতের মাঝে প্রচারিত কিন্তু তিনি দেখলেন, এই সংগীতের কোনো প্রামাণ্য পুস্তক না থাকায় সেগুলো নানাভাবে বিকৃত হচ্ছে। যেমন- শিল্পীদের উচ্চারণ বিকৃতি, মতলববাজদের নিজস্ব তত্ত্ব প্রক্ষেপণ এবং বিশেষজ্ঞদের ভুল ব্যাখ্যা ইত্যাদি।

তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে এই বিকৃতি ও বিভ্রান্তিগুলো তুলে ধরেন তার লেখা বই ‘বাউল মতের শিকড় সন্ধানে’ যেটি পড়লে এই সত্য বোধগম্য হয়।

পেশাগত জীবনে মনোরঞ্জন বসু ছিলেন একজন আয়ুর্বেদতাঙ্গ পণ্ডিত ও চিকিৎসক। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন ‘বোর্ড অফ ইউনানী এন্ড আয়ুর্বেদিক সিস্টেমস অফ পাকিস্তান’ তাকে চিকিৎসক হিসাবে রেজিঃস্ট্রেশান প্রদান করে এবং তিনি ওই বছর থেকেই ঝিনাইদহে কবিরাজি চিকিৎসা শুরু করেন।

১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘আয়ুর্বেদ শাস্ত্রী’ এবং ১৯৭০ সালে ‘ভিষগ রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিজস্ব গবেষণায় তিনি বেশকিছু জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির ঔষধ উদ্ভাবন করেন। এভাবে চিকিৎসক হিসাবে তিনি অত্যন্ত সাফল্য অর্জন করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘মেসার্স শান্তি ঔষধালয়’ আজও তার চিকিৎসা ক্ষ্যাতি বহন করে চলেছে।

তিনি আগেপিছে কিছু না ভেবেই পকেট থেকে ১০টাকা বের করে দিলেন। তারপরে তিনি খাঁচার দরজা খুলে দিলেন। পাখিরা হুরহুর করে বাইরে বেড়িয়ে এলো। মুক্তির আনন্দে দিশেহারা সেই পাখিরা দলবেধে আকাশে উড়ে গেলো। মনোরঞ্জন বসু তন্ময় হয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন সেই মুক্ত বিহঙ্গের উড্ডয়ন দৃশ্য।

দেশ বিদেশের অনেক বাউল বিশেষঙ্গ ও অনুরাগী তার তত্ত্ব ও তথ্যে সমৃদ্ধ হয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ‘হারামনি’ খ্যাত ড. মনসুর উদ্দিন,নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য ড. আনোয়ারুল করিম, কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. অরুণ বসু, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৃপ্তি বর্মণ, Berlin Cultural Institute এর পরিচালক Dr Mandrin William, আমেরিকার লালন গবেষক Dr Caral Salman, লন্ডন প্রবাসী লালন গবেষক সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় ও তার ইরাণী স্ত্রী প্রসাদ প্রমুখ।

মনোরঞ্জন বসু ছিলেন যথার্থ মানবতাবাদী। এর অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে একটা মাত্র উল্লেখ করলেই যথার্থ হবে- ১৯৬৩ সাল, মনোরঞ্জন বসু তখন সপরিবারে যশোরে কঠিন দারিদ্রের মধ্যে দিনাতিপত করছেন। দু’দিন প্রায় অনাহারে কাটানোর পর বহু কষ্টে অর্জিত দশটি টাকা নিয়ে তিনি বাজারে যাচ্ছিলেন, সঙ্গে ছিল তার ৮/৯ বছরের বড় মেয়ে।

এই হলেন মনোরঞ্জন বসু, যার নাম ক্রমবিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়ে আজ ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই এ পরিণত হয়েছে। অসংখ্য ভক্ত ও অনুরক্তের অন্তরে যিনি ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই রূপে মহিমান্বিত।

মেরো মন্দিরের কাছে গিয়ে তিনি দেখলেন এক লোক খাঁচায় পুড়ে অনেকগুলো বাবুইপাখি বেঁচতে এসেছেন। বাবুইপাখির মাংস নাকি খুব সুস্বাদু। যশোর শহরে তখন প্রায়ই বিক্রি হতে দেখা যেতো। তিনি পাখি বিক্রেতাকে দাম জিজ্ঞেস করলেন। সে বললো এক খাঁচা দশ টাকা।

তিনি আগেপিছে কিছু না ভেবেই পকেট থেকে ১০টাকা বের করে দিলেন। তারপরে তিনি খাঁচার দরজা খুলে দিলেন। পাখিরা হুরহুর করে বাইরে বেড়িয়ে এলো। মুক্তির আনন্দে দিশেহারা সেই পাখিরা দলবেধে আকাশে উড়ে গেলো। মনোরঞ্জন বসু তন্ময় হয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন সেই মুক্ত বিহঙ্গের উড্ডয়ন দৃশ্য।

অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য তার মেয়েটিও দেখেছিল। কিন্তু পাখিদের মুক্তির চেয়ে সে বরং ভাবছিল তাদের ক্ষুধার্ত সংসারটির কথা। অনেকক্ষণ নিরবতার পর সে অস্ফুট কণ্ঠে বললো, ‘বাবা, এখন কি হবে? তুমি বাজার করবে কি দিয়ে?’

তিনি স্নেহার্দ্র কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘ওই টাকাটা থাকলে আমরা একদিন ক্ষুধার কষ্ট থেকে বাঁচতে পারতাম। কিন্তু এতোগুলো প্রাণী বাঁচতো না। এই দৃশ্য নিশ্চয়ই আমাদের চিরদিনের আনন্দের উৎস হয়ে থাকবে।’

এই হলেন মনোরঞ্জন বসু, যার নাম ক্রমবিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়ে আজ ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই এ পরিণত হয়েছে। অসংখ্য ভক্ত ও অনুরক্তের অন্তরে যিনি ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই রূপে মহিমান্বিত।

……………………………….
তপন বসু
[ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই-এর পুত্র]
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ
প্রফুল্ল সিং আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ, মাগুরা।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………………………….
আরো পড়ুন:
ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই
আমার দেখা কবিরাজ গোঁসাই

মরমী সাধক মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী
একজন লালন সাধকের কথা
আমার পিতা ভক্ত মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর দর্শন

মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -এক
মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -দুই
মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -তিন

মনোরঞ্জন গোঁসাই: স্বরূপ সন্ধানী দার্শনিক
মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর জীবন দর্শন
দরবেশ লালমিয়া সাঁই
সহজ মানুষের পূর্ণ ঠিকানা ‘খোদাবক্স ফকির’
ফকির গণি শাহ্
ফকির জাফর মস্তান

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!