ভবঘুরে কথা
বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী

-সাজ্জাদুর রহমান লিমন

মানুষের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য যুগে যুগে যেসকল ওলি আল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছে তার মধ্যে মাহবুবে সোবহানী গাউছে আজম কুতুবে রাব্বানী বড় পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ) অন্যতম।

ইসলাম ধর্মের আধ্যাত্মিক এই পুরুষ ১লা রমজান ৪৭১ হিজরীতে ইরানের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ‘জিলান’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করায় তাঁর নামের সাথে জিলানী যুক্ত করা হয়।  তার বাবা বিশিষ্ট বুজুর্গ ব্যক্তি হযরত আবু সালেহ মুসা (র) একজন উঁচু স্তরের ওলী ছিলেন। তার মাতা পুণ্যবতী মহিলা উম্মুল খায়ের বিবি ফাতেমা (র)। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র) হযরত ইমাম হাসান (র) এবং হযরত ইমাম হোসেন (র) এর বংশধর ছিলেন। তিনি মাতৃগর্ভে থাকতেই ১৮ পারা কোরআন মুখস্ত করে ফেলেন বলে জনশ্রুতি আছে। শৈশবকাল থেকেই তিনি ছিলেন সংযত এবং গম্ভীর প্রকৃতির।

আঠার বছর বয়সে উপনীত হলে আবদুল কাদের জিলানী উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বাগদাদ গমনের ইচ্ছে পোষণ করেন। বাল্যকালেই তার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। তার স্নেহময়ী মাতা তাকে পরম স্নেহে লালন-পালন করে বড় করে তোলেন। তাঁর মা পুত্রের উচ্চশিক্ষা লাভের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে আবদুল কাদের জিলানীকে বাগদাদ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

তিনি সেকালের শ্রেষ্ঠ আলিম ফকীহ্ ও মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্যে থেকে ইলমে জাহিরের তাবৎ বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ইলমে তাসাওউফে সর্বোচ্চ কামালাত হাসিল করেন। তিনি প্রথমে ইলমে তাসাওফের তা’লীম গ্রহণ করেন বিখ্যাত সূফী হযরত আবুল খায়ের মুহাম্মদ হাম্মাদ আদ্দাব্বাস রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে। হযরত আবুল খায়ের মুহাম্মদ আদ্দাব্বাস তাঁর রুহানী শক্তির ঔজ্জ্বল্য অবলোকন করে মন্তব্য করেন যে, তিনি এক সময় সর্বশ্রেষ্ঠ সূফী হবেন।

হযরত আবদুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি পরবর্তীকালে তাসাওউফের সামগ্রিক জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করার স্বীকৃতিস্বরূপ সূফী হযরত শায়খ আবূ সাঈদ মুখররিমী রহমাতুল্লাহি আলায়হির কাছ থেকে সনদপত্র বা খিলাফতনামা প্রাপ্ত হন।

গাওছুল আযম হযরত আবদুল কাদের জীলানী (র) একই সঙ্গে শরীয়ত ও তরীকতের মহান সাধক ছিলেন। তাঁর আরবী ভাষায় রচিত কাসীদা-ই-গওসিয়া তাঁর রুহানী ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পবিত্র কোরআন ও মহানবী (স)-এর সুন্নাহ ছিল তাঁর মহান আদর্শ। তাঁর হাতে হাজার হাজার ইহুদী-খ্রিস্টান, মোশরেক তথা বিধর্মীও ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হন।

তিনি একাধারে ৪০ বছর পর্যন্ত ইশার নামাজের অযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। প্রত্যহ শেষ রাতে পাঠ করতেন, আল মুহিতুল আলমে, আর রাব্বুশ শহীদ, আল হাসীবুল ফায়্যায়িল খাল্লাকি, আল খালিকু, আল বারিউ, আল মুসাব্বিরু। উক্ত দোয়া পাঠ করার সাথে সাথে লোকচক্ষুর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। জানা যায়, তিনি রাতের একটা সময় জিকির ও মোরাকাবা করে কাটাতেন। যৌবনের অধিকাংশ সময় রোজা রেখে কাটিয়েছেন।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র) বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। মুসলামানকে ভ্রান্তির বেড়াজ্বাল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কোরআন সুন্নাহ ভিত্তিক মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। মানুষকে আল্লাহ ও রাসূল (সা) মুখী করার জন্য বিভিন্ন আমল বাতলিয়ে দিতেন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র) যখন দুনিয়ার জীবনত্যাগ করে পরপারে যান। তখন হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র)-এর ভক্ত অনুসারীরা তাঁর আমল ও চরিত্রকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কাদেরীয়া তরিকা প্রবর্তন করেন। সে সময়কাল থেকে কাদেরীয়া তরিকার প্রচলন। পৃথিবীর বহুদেশের মতো ভারতবর্ষেও এই তরিকা ছড়িয়ে পরে। বাংলাদেশেও এই তরিকার বহু ভক্ত-অনুসারী রয়েছে। রয়েছে এই তরিদার দরবার শরীফ।

বেলায়াতের উচ্চস্তরের গাউসূল আজম সারা জাহানে প্রত্যেক জামানায় ৩১৩ জন ওলি জমিনে বিদ্যমান থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর শান-মান প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকেন। সূফীতাত্ত্বিক পরিভাষায় তাঁদের আখইয়ার বলা হয়। ৩১৩ জন ওলির মধ্যে ৪০ জন আবদাল, ৭ জনকে আবরার, ৫ জনকে আওতাদ, ৩ জন নকীব, ৪ জন নুজবা ও ১ জন গাউসূল আজম থাকেন। যাকে কুতুবুল আউলিয়া বা সুলতানুল আউলিয়া বলা হয়। বাকিরা অন্যান্য সাধারণ পর্যায়ের ওলি। তৎজমানায় গাউসগণের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত, বেলায়েতে ওজমা ও গাউসিয়তে কোবরার সুমহান আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি হচ্ছেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র)।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র) রুহানী ও প্রত্যক্ষ নির্দেশে ইসলামের প্রচার প্রসারে ৩৪২ জন আউলিয়া সারা বিশ্বে আল্লাহর সৃষ্টির খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে মক্কা-মদিনাতে ১৭ জন, ইরাকে ৬০ জন, সিরিয়াতে ৩০ জন, মিশরে ২০ জন, পশ্চিমাদেশে ২৭ জন, পূর্বদেশীয় অঞ্চলে ২৩ জন, আবিসিনিয়াতে ১১ জন, ইয়াজুজ মাজুজের প্রাচীরাংশে ১৭ জন, লংকাতে ১৭ জন, কুহেকাফে ৪০ বাহরে মুহীতে ৪০ জন।

হিজরী ৫৬১ সালের ১১ রবিউসসানী আব্দুল কাদের জিলানী (র) পরলোক গমন করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাঁর ওফাত দিবস সারা বিশ্বের সূফীরা প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকেন এবং তার মৃত্যুবার্ষিকী ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে ইরাকের বাগদাদ শহরে তাঁর মাজার শরীফ রয়েছে।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!