মতুয়া সংগীত

বিকালে করিল যাত্রা

স্বামী মহানন্দের ভক্তাশ্রমে ভ্রমণ।
পয়ার

বিকালে করিল যাত্রা কুন্দসী হইতে।
দীঘলিয়া আসিলেন সন্ধ্যার পরেতে।।
কেহ কেহ র’ল বেণী পালের আলয়।
যজ্ঞেশ্বর বাটীতে কেহ গিয়া রয়।।
বলাইর ভগ্নী লক্ষ্মী সাধনার শিষ্য।
সেই ঘরে কতক থাকিল হ’য়ে হর্ষ।।
কতক থাকিল ভীম বলাইর বাড়ী।
কতক থাকিল গিয়া গ্রাম আড়াবাড়ী।।
সেই খানে রাত্রিভোর নাম গান গেয়ে।
প্রভাতে করিল যাত্রা শ্রীহরি স্মরিয়ে।।
ঘসিবেড়ে গ্রামে ভাগ্যধর পাল ছিল।
তার বাড়ী কতক আসিয়া উতরিল।।
গোপীনাথ সাহা ছিল মতুয়া প্রেমিক।
ভাগ্যধর গুরু ভাবে বাসে প্রাণাধিক।।
সেই বাড়ী কেহ থাকে কেহ আর বাড়ী।
অষ্টাদশ ঘর পাল সব বাড়ী জুড়ি।।
সব বাড়ী বাড়ী বাল্য সেবা হইতেছে।
সব বাড়ী স্ত্রী পুরুষ নামে মাতিয়াছে।।
মাধ্যাহ্নিক সেবা দিল নামে বাবু রাম।
বিকালে সকলে পহুঁছিল শুক্তা গ্রাম।।
গোলোকচাঁদের বাটী হ’ল মহোৎসব।
সেই বাড়ী মহোৎসব করিতেছে সব।।
শুক্তাগ্রামে গোলোক পালের এক কন্যে।
দিলেন কতক ব্যয় মহোৎসব জন্যে।।
সে বাড়ীতে রাত্রি হ’ল নাম সংকীর্তন।
মহাভাবে মেতে হ’ল নিশি জাগরণ।।
দ্বিপ্রহর রাত্রে সব ভোজন করিল।
রাত্রি ভোর পুনশ্চ কীর্তন আরম্ভিল।।
হইতেছে নর্তন কীর্তন অতিশয়।
প্রেমে মেতে হইয়াছে জ্ঞানশূন্য প্রায়।।
পদ গায় প্রাণ হ’রে নিল নিল নিল।
আসিয়া অক্রুর মুনি প্রাণ হরে নিল।।
রে অক্রুর রথ রাখ হেরি কেলেসোনা।
পায় ধরি পদে পড়ি যত ব্রজাঙ্গনা।।
গান গায় বসে পালেঙ্গার চাক ঘরে।
কেহ চাক ঘুরায় কেহ বা টেনে ধরে।।
বৈশাখে পালের চাক কভু নাহি ঘুরে।
বেড়া হেলানেতে ছিলে ঘরের ভিতরে।।
এক ঠাই ছিল সেই চাক তিনখানা।
কীর্তন সময় দৃষ্টি করে কয় জনা।।
চক্র দেখে হ’ল ব্রজ ভাব উদ্দীপন।
বিস্মিত মূর্ছিত কেহ গায় আর জন।।
চণ্ডী গোস্বামীর পদ গায় কোন জনা।
রাখ রাখ অক্রুর নিওনা কেলেসোনা।।
যখন গায় অক্রুর প্রাণ নিল নিল।
প্রেমাবেশে কেহ কুম্ভ চক্রটি ধরিল।।
চাক দিয়া পাক দিল আলের উপরে।
রাখ রাখ বলি কেহ চাক টেনে ধরে।।
তাহা দেখি ঘূর্ণপাক পাগল ধরিল।
নিওনা বলিয়া চাকে মাথা পেতে দিল।।
মাথায় তুলিল চাক প্রেমেতে বিহ্বল।
অষ্টধারে বহিল যুগল চক্ষে জল।।
সে চাক চতুঃপার্শ্বে মস্তকে রাখিয়ে।
ঘুরাতে লাগিল চাক জড়াজড়ি হ’য়ে।।
এইরূপে ধরিলেন আর দুই চাক।
সবে বলে ওরে রথী রথ রাখ রাখ।।
হা কৃষ্ণ বলিয়া কেহ পড়িল ধরায়।
মূর্ছিত হইল কেহ চাকের নীচায়।।
পাগলের শির গিয়া ঠেকিয়াছে চাকে।
মাটি দিয়া ধুমা উঠে দেখে সব লোকে।।
তাহা দেখি সব লোক পড়িল হুতাশে।
চমকিত হ’য়ে বলে ধুমা উঠে কিসে।।
চাকা ধরি পালেরা লইল পালেঙ্গায়।
মূর্ছাপ্রাপ্ত যারা তাহাদের ধরে লয়।।
সবে দেখে পাগল পড়িয়া ধরণীতে।
ধুম্র উঠিতেছে পাগলের অঙ্গ হ’তে।।
বাড়ীপরে পালেঙ্গা পশ্চিমের পোতায়।
সেই ঘরে যাদব পাগলে ধরি লয়।।
সনাতন নবীন বসু ছিলেন তথায়।
তাহারা পাগলে ধরিলেন সে সময়।।
ধুমা কেন উঠিতেছে পাগলের গায়।
দাহ হ’য়ে পাছে বা পাগল মারা যায়।।
তোরা সব থাকরে উপায় আর নাই।
দক্ষিণ পালেঙ্গাতে পাগলে ল’য়ে যাই।।
পাগলে তদ্রূপ দেখি সবার হুতাশ।
সেই ঘরে ল’য়ে যেতে করি অভিলাষ।।
এতশুনি সর্বজনে পাগলে তুলিল।
দক্ষিণ পালেঙ্গা ঘরে ধরিয়া লইল।।
অনর্গল ধুমা উঠে পাগলের গায়।
লোমকূপে ধুমা উঠে ছিদ্র কণ্ডু প্রায়।।
লোমকূপে ছিদ্র সব বিকশিত হ’য়ে।
ধুমা উঠিতেছে শূন্যে বেগেতে ধাইয়ে।।
ক্ষণে ধুমা উঠে হয় অন্ধকারময়।
ক্ষণে পাগলের অঙ্গ লক্ষ্য নাহি হয়।।
লোম উর্দ্ধ কেশ উর্দ্ধ নেত্র উর্দ্ধ শ্বাস।
ন ভূত, ন ভবিষ্যতি, ভাব অপ্রকাশ।।
মুখমধ্যে রক্তিম বরণ যায় দেখা।
মুখের উপরে উঠে অনলের শিখা।।
ঘরের মধ্যেতে আর ঘরের চৌদিকে।
হরি হরি হরি বলে নাচে গায় লোকে।।
পাগল বৈবর্ণ অঙ্গ ধুম্র সম্বরিল।
আস্তে ব্যাস্তে ত্রস্তে পাগলেরে কোলে নিল।।
তৈল মেখে পাগলেরে করাইল স্নান।
করা হ’ল সকলের সেবার বিধান।।
যবে পাগলের হ’ল সম্বিত বিধান।
সবে মৃতদেহে যেন পুনঃ পেল প্রাণ।।
প্রেমময় পাগলের অলৌকিক কাজ।
রচিল তারকচন্দ্র কবি রসরাজ।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!