সতীমাতা ভবেরগীত কর্তাভজা

ভাবেরগীত এর মাহাত্ম্য

কর্তাভজন সত্যধর্মালম্বী ভক্তগণের কাছে ভাবেরগীত পবিত্র, পূজনীয় ধর্মীয়গ্রন্থ, এতে কর্তাভজা সত্যধর্মের নীতি আদর্শ, উপাসনা তত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, সাধন-ভজন, ব্রহ্মতত্ত্ব, মালিকতত্ত্ব, জীব-জগৎতত্ত্ব জ্ঞান কর্ম-ভক্তি যোগ, আত্মা-পরমাত্মা, আত্মজ্ঞান নির্ণয়, ও গুরুতত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে গীত আকারে বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দুলাল চাঁদ কর্তৃক রচিত ভাবেরগীত কর্তাভজা সত্যধর্মের একমাত্র অনুসরণযোগ্য গ্রন্থ।

এ গ্রন্থ ছাড়া এই মতে কোনো ব্যক্তির নিজস্ব মতামত, দিক নিদের্শনা, ব্যাখা-বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য নয়, এমনকি কোন গুরুদেবও যদি ভাবেরগীতের নীতি আদর্শ বহির্ভূত দিক নির্দেশনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে তাও গ্রহণযোগ্য নয়।

কর্তাভজা সত্যধর্মের ধর্মযাজক (গুরুদেব বা গুরুদেব) থেকে হলে তাকে অবশ্যই ভাবেরগীত সম্মন্ধে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে শুধুমাত্র গুরুদেবের পুত্র হলেই গুরুদেব হওয়া যায় না।

কর্তাভজা সত্যধর্মের প্রবর্তক ঠাকুর আউলচাঁদ আনুমানিক বাংলা ১১৫৯-৬১ সালের দিকে ফকির বেশে নিত্যধাম ঘোষপাড়ায় (কল্যানী, পশ্চিমবাংলা, ভারত) আবির্ভুত হন। তৎকালীন সমাজের ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্যবাদের বিপরীতে ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু জাতি-ধর্ম, বর্ণ গোত্র বিহীন অসম্প্রদায়িক একেশ্বরবাদ কর্তাভজা সত্যধর্মের প্রবর্তন করেন।

ঠাকুর আউলচাঁদের তিরোধানের পর কর্তাভজা সত্যধর্মের নীতি-আদর্শ সকল কিছুই ভক্তদের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, পরবর্তীকালে দুলাল চাঁদ মাতা সতীমায়ের অনুমতিক্রমে কর্তাভজা সত্যধর্মের সমস্ত তত্ত্ব গীত আকারে লিপিবদ্ধ করেন। এই গীতগুলিই বর্তমানে ভাবেরগীত নামে পরিচিত।

দুলাল চাঁদ গীতগুলি প্রথমে তালপাতায় তারপর কাগজে লিখে সংরক্ষণ করতেন। পরবর্তীতে ছাপাখানা স্থাপিত হলে ঠাকুর রসিকলাল দেব মহান্তের অনুমতিক্রমে পরম ভগবজ্জন রমেশ চন্দ্র ঘোষ দাসের অক্লান্ত চেষ্টায় বাংলা ১২৮৯ সালে প্রথম ছাপানো বাঁধানো মহাগ্রন্থ ভাবেরগীত প্রকাশিত হয়।

১৪টি সাটে ৪২৫টি গীতে বাংলা ভাষায় ভাবেরগীত রচিত। ভাবেরগীত ছাড়াও ঠাকুর দুলালচাঁদ ভজন ও সখী সংবাদ নামে শতাধিক গীত রচনা করেছেন। আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব, আমার শেষ পরিণতি কি? এই আত্মজ্ঞান অনুসন্ধানীদের কাছে ভাবেরগীত অত্যাধিক সমাদৃত। দুলালচাঁদ ভাবেরগীতে বলেছেন-

ভাবের গীতের ভাবুক যে সেই ভাব বুঝতে পারে।
ক্রমাগত অসাধারে রত সাধক বলি তারে,
দ্বৈতবাদী যে সে কি তা বোঝে, যে কথার নির্যাস আছে হৃদি সরোজে।
অমনি ভাই কেমন করে পাব ঠিকানা।

ভাবেরগীত এর পালনীয়-

ক) গৃহে ভাবেরগীত থাকলে দিনে অন্তত একবার গুরুদত্ত মহামন্ত্র সত্যনাম স্মরণ, ভাবেরগীত থেকে প্রার্থনা ও শ্রদ্ধা ভক্তি নিবেদন করা কর্তব্য।
খ) ভাবেরগীত সদা সর্বদায় সাধ্যমত পবিত্র অবস্থায় রাখতে হবে। কোন ক্রমে অবজ্ঞা-অবহেলা না করা।
গ) ভাবেরগীত পাঠের সময় প্রথমে গুরু প্রণাম ও গুরুপ্রদত্ত মহামন্ত্র স্মরণ পূর্বক শ্রদ্ধা-ভক্তি ও বিনয়ের সাথে প্রথমে সওয়াল পরে জবাব এইভাবে পাঠ ও কীর্ত্তন করতে হবে। পাঠের সময় দেহ মন-বাক্য সংযত রাখবে এবং কোন প্রকার নেশা জাতীয় দ্রব্য পানাহার করা যাবে না।
ঘ) ভাবেরগীত সম্মন্ধে না বুঝে কোন প্রকার ভাবেরগীতের অপব্যাখা বা কটুক্তি করা যাবে না। ভাবেরগীত সম্পর্কে জানতে বা বুঝতে হলে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ গুরুদেবের শরণাপন্ন থেকে হবে এবং সাধু সঙ্গ করতে হবে।
ঙ) ভাবেরগীত গুলো কোনটা ৩কলি কোনটা ৪কলি, ৫কলি, ১০কলিতে সম্পূর্ণ, ভাবেরগীত পাঠ করতে হলে প্রথমে ২য় কলি, তারপর ১মকলি তারপর ৩য়, ৪র্থকলি এইভাবে পাঠ ও কীর্ত্তন করতে হয়।
চ) ঠাকুর বংশের অনুমতি ও তত্ত্বাবধান ব্যাতীত ভাবেরগীত মুদ্রণ, প্রকাশ, বিক্রয় এবং খণ্ড খণ্ড কাগজে হস্তলিপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ, কর্তাভজা সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তগণ এই আজ্ঞা অদ্যাবধি মেনে চলে।

ভাবেরগীত কীর্ত্তন ও পাঠের সুফল:

যে ব্যক্তি প্রত্যেকদিন নিয়মিতভাবে ভাবেরগীত কীর্ত্তন পাঠ ও মালিকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হয় এবং উপাসনার কাজে বিপথগামী দশইন্দ্রিয়, পঞ্চভূত ও ষড়রিপু বশীভূত হয়ে মন মালিকমুখী হয়। মালিকের সৃষ্ট জীবকে ভালবাসাই মালিককে ভালবাসা, তাই যে ব্যক্তি মালিকের সৃষ্ট জীবকে ভালবাসে এবং মালিকের শ্রীচরণে নিজেকে সমর্পণ করে, সেই ব্যক্তিই পরমভক্ত বা ভগবজ্জন।

…………………………………..
সূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
১. ভবের গীত
২. কর্তাভজা সত্যধর্ম

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!