মতুয়া সংগীত

ভোজন করিয়া ত্বরান্বিত

মহাপ্রভুর লালচাঁদের ভবনে উপস্থিত
পয়ার

তথা হ’তে ভোজন করিয়া ত্বরান্বিত।
লালচাঁদ ভবনেতে প্রভু উপনীত।।
পশ্চিম দুয়ারী ঘর পূবের পোতায়।
বসিলেন প্রভু সেই ঘরের পিঁড়ায়।।
ভক্তগণ কেহ কেহ বসেছে পিঁড়ায়।
কেহ কেহ বসিলেন তাহার নীচায়।।
ইতিপূর্বে এই লীলা প্রথম সময়।
পাগল বলিয়া খ্যাতি যা’দের ধরায়।।
পূর্ব পূর্ব মহাজন তা’দের বারতা।
স্বয়ং প্রভু কহিছেন সেই সব কথা।।
মহাপ্রভু কহে কথা শুনিতে মধুর।
মধুর হ’তে মধুর অতি সুমধুর।।
এইরূপে ইষ্ট গোষ্ঠ কৃষ্ণ কথালাপ।
আর যত এইদানি পাগল প্রস্তাব।।
প্রভু হরিচাঁদ কহে লালচাঁদ ঠাই।
তোর বাড়ী বেত আছে শুনিয়াছি তাই।।
লালচাঁদ কহে প্রভু ভাল বেত আছে।
লতিয়া উঠিছে বেত বড় বড় গাছে।।
অই সব বড় আম গাছ দেখা যায়।
বেত বেয়ে উঠিয়াছে গাছের আগায়।।
বসিয়া দু’জনে হইতেছে দেখাদেখি।
থলি থলি বেত ফল রহিয়াছে পাকি।।
এই বেত হ’তে দু’টি বেত দেহ মোরে।
আর এক ইচ্ছা বেত ফল খাইবারে।।
লালচাঁদ বলে বেত পাকিয়াছে ভারি।
টান দিলে বেত ফল যাইবেক পড়ি।।
ফলধরা বেত বড় ভাল নাহি হয়।
অফলা পুরান বেত দিব মহাশয়।।
ঠাকুর বলেন আগে বেত ফল আন।
তাহা শুনি মৃত্যুঞ্জয় করিল প্রয়াণ।।
ঠাকুর কহেন অই বেত বড় ভাল।
বেশী নহে মাত্র দু’টি বেত গিয়া তুল।।
দু’টি বেত তুলিয়া আনহ মম ঠাই।
বেত তোলা শেষ কথা আগে ফল চাই।।
মৃত্যুঞ্জয় দু’টি বেত কাটিল কেবল।
একটি নিস্ফল তার একটি সফল।।
ফল ধরা গাছ কাটি বলে মৃত্যুঞ্জয়।
তব ফল লাগিবেক প্রভুর সেবায়।।
সুপক্ক হ’য়েছে ফল পড়িও না তবু।
তোমাকে করিবে সেবা স্বয়ং মহাপ্রভু।।
মৃত্যুঞ্জয় কাঙ্গালী তারক তিনজন।
বেত টানি বাহির করিল ততক্ষণ।।
বেত ফল তুলি, ধরি লইল বাটীতে।
ঝাড়া দিল থলি ধরি পাত্র উপরেতে।।
এক ঝাড়া দিলে সব ফল পড়ি যায়।
অর্ধ অর্ধ খোসা মাত্র রহিল বোটায়।।
অবশিষ্ট অর্ধ খোসা বাছিয়া ফেলিয়া।
ঠাকুর সম্মুখে দিল কাসন্দ মাখিয়া।।
একমুষ্টি ধরি প্রভু দিলেন বদনে।
বলে মৃত্যুঞ্জয় ভাল খাওয়ালি এখনে।।
কোথা লাগে আম আর কোথা লাগে দুধ।
বেত ফল মিঠা যেন বিদুরের খুদ।।
আম ফল খাইতেছি দুই তিন দিন।
হঠাতে এ বেত ফল খাই বৈবাধীন।। (দৈবাধীন)
বিদুরের বাড়ী কৃষ্ণ খান একদিন।
সেই একদিন আর এই একদিন।।
প্রভু বলে দু’টি বেত কাটিলে যতনে।
একটা আনিলে ওটা গাছে রল কেনে।।
সেই বেত বাহির করিল তিনজনে।
মৃত্যুঞ্জয় কহিলেন কাঙ্গালীর স্থানে।।
ভাল ভাল বেত কত আছে এই গাছে।
দুটি বেত লই কেন কত বেত আছে।।
প্রভু আজ্ঞা দু’টি বেত আর এক ল’ব।
তাতে কি প্রভুর কাছে অপরাধী হ’ব।।
লাগিবে প্রভুর কার্যে মন্দ হবে কিসে।
তাই ভেবে আর এক বেত কাটে শেষে।।
বেত কাটি তিন জনে ধরি টান পাড়ে।
থাকমনে বেত পাড়া পাতা নাহি লড়ে।।
যারে দেখে তারে ডাকে হাট উঠাইয়া।
এক এক জন করি বেত টানে গিয়া।।
এক এক জন করি ধরিতে ধরিতে।
চৌদ্দ জনে বেত টানে না পারে নামাতে।।
নাহি ছিঁড়ে নাহি পড়ে না লড়ে না সরে।
আমের গাছের ডাল কড়মড় করে।।
রামচাঁদ চৌধুরীর বুদ্ধি বিচক্ষণ।
বলে বৃথা পরিশ্রম কর কি কারণ।।
চৌদ্দ জনে বেত টানি কিছুই না হয়।
এ হেন আশ্চর্য কেবা দেখেছে কোথায়।।
দুই বেত তুলিবারে প্রভু দেন বলি।
সে আজ্ঞা লঙ্ঘন ক’রে কেন বেত তুলি।।
চৌদ্দ জনে টানি বেত নাহিক বিরাম।
নিশ্চয় জানিও এই ঠাকুরের কাম।।
কেন মিছা টানাটানি পরিশ্রম কর।
চল গিয়া প্রভুকে জানাই সমাচার।।
কে যাবে কে যাবে সবে ভাবে মনে মনে।
সবে কহে তারকে পাঠাও প্রভু স্থানে।।
তারক দাঁড়ায় গিয়া প্রভুর সম্মুখে।
মৃত্যুঞ্জয় কিছুদূরে দাঁড়াইয়া থাকে।।
প্রভু কন একা কেন আসিলে তারক।
এক বেত ল’য়ে বুঝি হাসাইলে লোক।।
দু’টি বেত নিব আর নাহি আবশ্যক।
তিন বেত কাটিয়াছি কহিল তারক।।
ঠাকুর কহেন কেন এ কার্য করিলে।
সামান্য একটি কথা মানিতে নারিলে।।
যেমন লোভের বশ করিয়াছ তাই।
চৌদ্দ জনে হার কেন এক বেত ঠাই।।
ছোট এক বাক্য তাহা না পার মানিতে।
ধন্যবাদ দেই আমি সে বিন্ধ্য পর্বতে।।
এখন উঠিতে পারে রাখে কোন জনে।
উঠিতে না পারে মাত্র এক বাক্য মেনে।।
বাক্য না মানিতে পার কাপুরুষ হও।
সিংহের শাবক হ’য়ে ছাগ রীতি লও।।
তাহা শুনি তারক জুড়িল দুই হাত।
অপরাধ ক্ষমা কর অনাথের নাথ।।
কালীনগরের কর্তা বেত কাটিয়াছে।
অপরাধ করিয়াছি স্বীকার ক’রেছে।।
গুরুকার্য করি মোরা মনের হরিষে।
প্রভু কার্যে বেত নিব দোষ হবে কিসে।।
লঙ্কাদগ্ধে বন ভাঙ্গে বস্ত্র হরে হনু।
রাম কার্য রাম করে সমর্পিত তনু।।
এত বেত লালচাঁদ কি কার্যে লাগাবে।
আমরা লইলে বেত গুরুকার্য হ’বে।।
ইহা বলি এই বেত কেটেছেন তিনি।
ঠাকুর বলেন যাও সব আমি জানি।।
ধর গিয়া সেই বেত সেই তিন জনে।
চৌদ্দ জনে টান বেত কিসের কারণে।।
বেত ধরি টান দিল সেই তিন জন।
অমনি বাহির বেত হইল তখন।।
তিন জনে ছাঁটিয়া করিল পরিষ্কার।
তিন বেত প্রায় দুই বোঝা দু’জনার।।
এদিকে সকলে করে মাধ্যাহ্নিক ক্রিয়া।
স্নানাদি ভোজন করে হরিবোল দিয়া।।
প্রভু হরিচাঁদ স্নান করে প্রথমেতে।
অমৃত খাইনু হরি বলে আনন্দেতে।।
পরে অন্ন ভোজনে বসেন হর্ষ মনে।
ঘৃতপক্ক ডাল বড়া শাকাদি ব্যঞ্জনে।।
অমৃত অম্বল দধি দুগ্ধ আম্রসহ।
খাইলেন ভক্তসব বড়ই উৎসাহ।।
পায়স পিষ্টক আদি সেবা খাজা গজা।
ক্ষীর চুষি, ক্ষীরের লড্ডুক, সর ভাজা।।
ঠাকুরের বামদিকে আমপোরা ঝাকা।
প্রভু কন এত আম রাখ কেন একা।।
লালচাঁদ বলে এই আমগুলি চুকা।
মূলে টক দেখিতে সুন্দর যায় দেখা।।
প্রভু কহে মিঠা আম আর নহে চাই।
এ আম খেয়েছি আন ওই আম খাই।।
ভাল ভাল আম খেয়ে কি করিনু কাজ।
ভোজনের শেষ চুকা তাই খাব আজ।।
চুকা আম খাই নাই ওই আম খাব।
অই আম খেয়ে মন মালিন্য ঘুচা’ব।।
লালচাঁদ দেন আম্র ভকতি প্রচুর।
প্রভু ক’ন কই চুকা অতিব মধুর।।
মধুর হ’তে মধুর সুমধুর আম।
শ্রীমুখের মধুবাক্য তাই পরিণাম।।
যে গাছের চুকা আম্র খাইল ঠাকুর।
সে গাছের আম হ’ল সে হ’তে মধুর।।
ভক্তবৃন্দ সেবা কার্যে ছিল যতজনে।
তৃপ্ত হ’ল চুকা আম্রে মধু আস্বাদনে।।
সে কার্য করি হরি যাত্রা করিলেন।
লালচাঁদ বেত ল’য়ে সঙ্গে চলিলেন।।
অগ্রে অগ্রে ভোলা নামে কুক্কুর ধাইল।
ওঢ়াকাঁদি গোলোকের ঠাই উত্তরিল।।
পথ হ’তে আগুলিল গোস্বামী গোলোক।
শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত রচিল তারক।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!