হরিচাঁদ ঠাকুর

মতুয়াদের ভগবান কে?

-জগদীশচন্দ্র রায়

তোমাদের এই কুলে হরি অবতার।
দয়া করে নম:শূদ্রে করিল উদ্ধার।।
তাঁর পূজা কর সবে তাঁর ভক্ত হও।
নিজ ঘরে ভগবান ফেলে কোথা যাও?
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-৫২৯)

তোমাদের ঈশ্বর বা অবতার যা-ই বলো না কেন, তিনি হচ্ছেন হরিচাঁদ ঠাকুর। তিনিই তোমাদের উদ্ধারকর্তা। তাই তোমরা তাঁর পূজা কর। তবে এই পূজা শুধুমাত্র ফুল, বেল পাতা, চিনি, বাতাসার নয়; এই পূজা হরিচাঁদ ঠাকুরের কর্ম ও আদর্শের পূজা।

যে পূজার ফলে জাতি, সমাজ ও দেশের মঙ্গল হবে। কিন্তু মতুয়ারা নিজেদের ভগবানকে চিনতে না পেরে বৈদিকতার জালে ফেঁসে আছে। হরিচাঁদ ঠাকুর নিজেই যেখানে ‘বেদ-বিধি শৌচাচার নাহি মানি’ বলে ঘোষণা করেছেন, সেখানে বেশির ভাগ মতুয়া বৈদিকতা নিয়েই মেতে আছেন।

আর হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরকেও সেই বৈদিকতার মধ্যে গুলিয়ে দিচ্ছেন। যদিও মতুয়াদর্শনে আছে, যে হরিচাঁদের নির্দেশ মেনে চলবে, সে- ‘না ডাক হরিকে, হরি তোমাকে ডাকিবে।’

সেজন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর তাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন- তোমরা তোমাদের নিজের ঘরের ভগবানকে ফেলে রেখে অন্য কোথায় যেতে চাইছো? এতো স্পষ্ট করে বলার পরেও আজ মতুয়ারা বিপথগামী কেন??

গুরুচাঁদ ঠাকুরের মনোবেদনা প্রকাশ ও মুক্তির সঠিক দিশা নির্দেশ-

কি বলি দু:খের কথা বুক ফেটে যায়।
শত্রু কি বান্ধব এরা চেনে না’ক হায়।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-১৭০)

গুরুচাঁদ ঠাকুর সারাজীবন পিছিয়ে পড়া সমাজের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করার পরও তিনি এক সময় অনেক দু:খের সঙ্গে জানিয়ে ছিলেন- ‘এতো সব সমাজ শিক্ষার কথা বলার পরেও যাদের প্রগতির উদ্দেশ্যে এই নীতি কথাগুলো বললাম, করে দেখালাম, কিন্তু তারা এতোই অজ্ঞানী যে, শত্রু কে আর মিত্র কে? সেটাই চিনলো না।

এ বিষয়ে দেখে নেওয়া যাক শত্রু ও মিত্রকে চেনা বা জাগৃত হওয়ার পাঁচটি নিয়ম-

১. যে শত্রুকে সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারবে তাকে জাগৃত মনে করা হবে।
২. যে প্রকৃত মিত্রকে চিনতে পারবে তাকে জাগৃত মনে করা হবে।
৩. শত্রুর শক্তি এবং তার দুর্বলতার সম্পর্কে জানা দরকার।
৪. নিজের বা নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার অনুধাবণ হওয়া দরকার।
৫. সঠিক ইতিহাস জানা একান্ত দরকার।

এই পাঁচটি বিষয়ে যিনি জেনে, মেনে, বুঝে অগ্রসর হন তাঁকে জাগ্রত ব্যক্তি বলা হয়। কেউ কেউ উচ্চ পদাীদকারী হতে পারে। তাই বলে তাকে জাগ্রত বলা যাবে না। কারণ জাগৃতির সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। জাগৃতির সঙ্গে একাডেমিক শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই।

গুরুচাঁদ ঠাকুর কোন্ উচ্চ শিক্ষা পেয়েছেন? তিনি তো বলতে গেলে একাডেমিক শিক্ষিত নন। কিন্তু তিনি জাগ্রত ছিলেন। তাই তিনি সমাজ পরিবর্তন করার কাজ করেছেন। তিনি উপরের পাঁচটি নিয়ম সঠিক ভাবে জেনে, বুঝে, মেনে ছিলেন বলেই সমাজ পরিবর্তনের কাজ করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন।

এ বিষয়ে আর একটি কথা বলি, আপনারা হয়তো জানেন, গান্ধিজী, চিত্তরঞ্জন দাসের মাধ্যমে গুরুচাঁদ ঠাকুরকে পত্র লিখে স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগদানের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু গুরুচাঁদ ঠাকুরের আসল শত্রু ও মিত্রের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছিল। যার জন্য তিনি গান্ধিজীর সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে উল্টো জানিয়ে দিয়েছিলেন-

সত্যকথা দেশবন্ধু করি নিবেদন।
এই পথে স্বাধীনতা আসে না কখন।।
সমাজের অঙ্গে আছে যত দুর্বলতা।
আগে তাহা দূর করা আবশ্যক কথা।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-৪১৪)

প্রকৃত দরদ যদি জেগে থাকে মনে।
কুলেতে উঠান সবে হাতে ধরে টেনে।।
‘অষ্পৃশ্যতা মহাপাপ’ করুন রটনা।
প্রকৃত দরদ নিয়ে জাগান চেতনা।।
গান্ধীকে তাই জানাই বারতা।
ভাবিয়া দেখেন যেন তিনি মোর কথা।।
পল্লী যদি জাগে তবে জাগিবে ভারত।
অবশ্য সুগম হবে স্বাধীনতা পথ।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-৪১৫)

গুরুচাঁদ ঠাকুর চিত্তরঞ্জনের মাধ্যমে গান্ধিজীকে জানান, এইভাবে সকলের স্বাধীনতা অর্জন হতে পারে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হতে পারে। সকলের স্বাধীনতা চাইলে অস্পৃশ্যতাকে দূর করে এদের ভাই বলে গলে লাগান।

পল্লী জাগলে ভারত জাগবে। স্বাধীনতার পথ সুগম হবে। কিন্তু বাস্তবে কাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সেটা পাঠকগণ ভালো বুঝতে পারছেন। গুরুচাঁদ ঠাকুরের বাণী বর্ণে বর্ণে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এক শ্রেণীর মুষ্টিমেয় লোকেরা দারিদ্রের চরম সীমায় পৌঁছে গেছে।

আবার গোদের উপর বিশ ফোড়ার মতো তৈরি হয়েছে নাগরিত্ব আইন। দেশের মূল নিবাসীরা আজ নাগরিত্ব হীনতার আশঙ্কায় ভুগছে।

শয়ণ ভোজন আর পুত্রকন্যা-জন্ম।
তোদের জীবনে মাত্র দেখি এই ধর্ম্ম।।
ইতর পশুরা আছে বেঁচে যেই ভাবে।
তোরাও তাদের মত কাজ কি স্বভাবে।।
এমন জীবনে বল বেঁচে কিবা ফল?
আকারে মানুষ বটে পশু একদল।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২২১)

মানুষ যদি কোনো কিছু না বোঝে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা যায়। কিন্তু সেটা যদি জানানোর পরও একই ভুল করে তাহলে সমস্যা আরো গভীর হয়। ধর্মহীন পতিত জাতিকে উদ্ধার করার জন্য হরিচাঁদ ঠাকুর ধর্ম দিলেন। তাদের বৈদিকবাদী কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য গুরুচাঁদ সারাজীবন সংগ্রাম করলেন।

শিক্ষার আন্দোলন করলেন। বিভিন্ন সমাজ সংস্কার নিজে হাতে করে দেখালেন। সারাজীবন এই অবহেলীতদের চেতনার জাগরণ ঘটানোর জন্য কঠোর সংগ্রাম করে একটা পর্যায়ে তোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু যাদের জন্য এই সংগ্রাম, তাদের চেতনা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল। (বর্তমান যুগেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রকাশ পাচ্ছে)।

তাই গুরুচাঁদ ঠাকুর অতি দু:খে বলতে বাধ্য হলেন- ‘আমি যে কাজ করলাম সাাজীবন, তাতে এক গাছা ছাতাও ফেলতে পারলাম না’ অর্থাৎ অশিক্ষার অন্ধকার, বৈদিকবাদের শৃঙ্খল যেভাবে সমাজকে আঁকড়ে আছে জগদ্দল পাথরের মতো তার থেকে মুক্ত করতে পারলেন না।

শরীরের ময়লাকে গ্রাম্য ভাষায় ‘ছাতা’ বলা হয়। কিন্তু যাদের শুধু শরীর নয়, মাথায় অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার ও বৈদিকতার অলীক গল্পের ময়লা জমেছে সেটা তুলে ফেলা সবচেয়ে কঠিন কাজ। যার জন্য গভীর দু:খের সঙ্গে ঠাকুর বলতে বাধ্য হলেন-

‘তোরা তো পশুর মতো শয়ন, ভোজন আর সন্তান উৎপাদন করিস। তোদের এইভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ হবে! তোরা মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে যদি পশুর পর্যায়েই থাকতে চাস তাহলে আর বেঁচে থাকার কোনো দরকার আছে কি?’

এই কথাগুলো বর্তমান দিনেও কম প্রযোজ্য নয়। কারণ বিশেষ করে বেশিরভাগ মতুয়ারা হরি-গুরুচাঁদের নাম নিলেও তাদের প্রদর্শিত পথে চলে না। তাদের নির্দেশিত কাজ করে না। এই বিষয়ে মহারাষ্ট্রে একটা প্রবাদ আছে- বাবা সাহেব আম্বেদকরকে মান্য করে সকলে, কিন্তু বাবা সাহেব আম্বেদকর ‘কি’ মানে না।

অর্থাৎ বাবা সাহেবের নামে জয় জয়কার করে। কিন্তু বাবা সাহেব যেটা করতে বলেছেন, যে সবের জন্য তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, সে সবের ধার ধারে না অনেকেই। এই একই দশা হয়েছে হরি গুরুচাঁদের বেশির ভাগ ভক্তের-

বিদ্যার কারণে দান দানের প্রধান।
বিদ্যাহীন নর দেখ পশুর সামান।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-৫৩০)

আমরা বৈদিকবাদী গ্রন্থে দেখতে পাই, ব্রাহ্মণকে যদি দান করো তাহলে তোমার স্বর্গের রাস্তা প্রসারিত থাকবে। এই জন্মে যে ভালো কাজ করবে পরজন্মে তার ফল ভোগ করতে পারবে ইত্যাদি। মৃতের অনুষ্ঠানে মৃতকে কাল্পনিক স্বর্গে পাঠানোর জন্য বস্ত্র, জমি, গরু, আসবাসপত্র, অর্থ ইত্যাদি দান গ্রহণ করে মৃতের পরিবারকে ইমোশনাল ব্লাকমেল করে।

এই ধরনের লুট চলে আসছে এক শ্রেণীর স্বার্থাস্বেষীদের কারণে। তারা কখনো সমাজকে জাগ্রত করতে চায় না। কারণ সমাজ জাগ্রত হলে তাদের এই ভণ্ডামি ধরা পড়ে যাবে। আর এই ভণ্ডামি বন্ধ হবার উপক্রম হবে। তারা তাদের এই ভণ্ডামির ব্যবসাকে নিরন্তর চালু রাখার জন্য সমাজের মানুষদের শিক্ষা, সম্পত্তি ও হাতিয়ারের অধিকারকে প্রথমেই হরণ করে নিয়েছিল।

কিন্তু গুরুচাঁদ ঠাকুর সেই অধিকারকে ফিরিয়া দেবার জন্য, অজ্ঞানতা থেকে মুক্তির জন্য দৃপ্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছেন যে, সবচেয়ে বড় দান হচ্ছে, বিদ্যাদান। যিনি বিদ্যা লাভ করেছেন, তিনি যদি অন্যকে সেই বিদ্যা দান করেন তাহলে সেই দানের ফলে দেশ, সমাজ ও জাতির প্রগতি হবে। সমস্ত বাঁধার অন্ধকার দূর হয়ে জ্ঞানের আলো ফুটে উঠবে।

তিনি বিদ্যাহীন মানুষকে পশুর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য খাবার গ্রহণ করে, তার জন্য অর্থ উপার্জন করে, আর অবশেষে মারা যায়। যদি শুধু মারা যাবার ভয়ে খাবার খেতে হয় তাহলে এরকম বেঁচে কী লাভ? কারণ এরকম জীবন তো পশুদের। তাহলে মানুষের সঙ্গে পশুর পার্থক্য কী?

পার্থক্য এটা হচ্ছে যে, পশুর, মানুষের মতো বুদ্ধি নেই। মানুষ সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে সর্বাধিক বুদ্ধিমান। কিন্তু সেই বুদ্ধির অধিকারী হয়েও যদি পশুর মতো জীবন অতিবাহিত করে তাহলে পার্থক্য কোথায়? সেজন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর সকলকে শিক্ষিত হতে আহবান জানিয়েছেন।

শিক্ষিত হলে সমাজের এই যে অন্ধ ধর্মীয় শৃঙ্খল, তার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করা যাবে। গোলামি থেকে মুক্ত হওয়া যাবে-

কান্দাকান্দি নাহি চাই কাজ-ছাড়া কান্দা ছাই
‘অকেজো কান্দুনে’ সব নাম্।।
কান্দাকান্দি ঢলাঢলি কতকাল করে এলি
কিবা ফল পেলি তা’তে বল?
কর্ম্ম ছেড়ে কান্দে যেই তার ভাগ্যে মুক্তি নেই।
হ’বি নাকি বৈরাগীর দল?
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২০৮)

মতুয়া ধর্ম ‘আচার’ নয় ‘কর্ম’ বাদে বিশ্বাসী। যার জন্য বলা হয়েছে- ‘হাতে কাম, মুখে নাম’। কিন্তু কাজ না করে যদি শুধু কিছু পাওয়ার আশায় কান্দাকান্দি করা হয় তাতে কি কিছু পাওয়া যাবে? যদি পাওয়া যেতো তাহলে তো সারাদিন মাইক লাগিয়ে একের পর এক কান্না করলে সব পেয়ে যেতো। সেটা অসম্ভব।

কর্মই ধর্ম। কর্ম না করে ধর্ম নিয়ে পড়ে থাকলে পেটে ভাত জুটবে না। তাই গুরুচাঁদ ঠাকুর এই অকেজো কান্দুনেদের সতর্ক করে দিতে এই কথাগুলো বলেন। কারণ মতুয়ামতে ভেকধারী বৈরাগীদের মতো অকর্মাদের কোনো স্থান নেই।

কুসংস্কার আছে যত দূর কর’ অবিরত
বিদ্যা শিক্ষা কর ঘরে ঘরে।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-১১৯)

গুরুচাঁদ ঠাকুর এবার সরাসরি এই অশিক্ষিত অবুঝদের নির্দেশ দিলেন, ‘তোমাদের যেমন বিদ্যাবুদ্ধি নেই; তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কুসংস্কার। যেটা তোমাদের আরও অধ:পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই তোমরা সব সময় এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করবে।

আর এর জন্য অবশ্যই শিক্ষিত হতে হবে। যদিও তৎকালীন সময় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষার আলোতে আলোকিত হয়ে অনেকে চাকরি পেয়ে বাড়ি, গাড়ি, অর্থ, সম্পদ, বিলাস, ঐশ্বর্যে জীবন অতিবাহিত করছে; কিন্তু কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

গুরুচাঁদ ঠাকুরের এ দু:খ আর কবে এরা মোচন করবে! এই প্রসঙ্গে বলা যায়, ‘ব্রাহ্মণরাই কুসংস্কারের পৃষ্ঠপোষক। কুসংস্কার ঘণীভূত করে তুলতে তারাই ইন্ধন জোগায়। কারণ কুসংস্কার ও গোঁড়ামি তাদের ধনার্জন ও মর্যাদার উৎস।

ধর্মের গূঢ় রহস্য তাদের করায়ত্ত, এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে লোকে তাদের শ্রদ্ধাভক্তি করে এবং দাণ-দক্ষিণা দ্বারা তাদের সম্পদশালী কর তোলে।’ (অন্বেষণ, প্রথম খণ্ড, শিপ্রা বিশ্বাস; পৃ: ২২২-২২৩)

তাই বলি ভাই মুক্তি যদি চাই
বিদ্বান হইতে হবে।
পেলে বিদ্যাধন দু:খ নিবারণ
চির সুখি হবে ভবে।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-১৩০)

মুক্তি এখানে কোন মুক্তি? মুক্তি হচ্ছে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞানের আলোতে মুক্তি। সেই মুক্তির জন্য আমাদের বিদ্বান হতে হবে। তাহলে মুক্তি পাবেন। আর সব দু:খের নিবারণ ঘটবে। আপনি চিরসুখী হ’তে পারবেন।

কিন্তু আপনারা এই মুক্তিকে উপভোগ করেও জীবনের পরপারে মুক্তি চাইছেন। ওখানে কোনো মুক্তি নেই। আছে গোলামি আর নিরর্থক অর্থব্যয়। প্রকৃত মুক্তি পেতে হলে নিচের মুক্তি সূত্রকে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। হরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর তথা সকল মহামনবই চান এই ভাবে মুক্তি।

মুক্তির সূত্র-

প্রতিবিপ্লবের পর ব্রাহ্মণরা শিক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলো কেন? এর উদ্দেশ্য কি ছিল? তার উদ্দেশ্য ছিল-

শিক্ষা থেকে বুদ্ধির বিকাশ ঘটে। বুদ্ধির বিকাশ ঘটলে বিবেক জাগ্রত হয়। বিবেক জাগ্রত হলে বিচার বোধ জাগে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জন্মায়। অর্থাৎ ভুলকে ভুল ও সত্যকে সত্য বলে বোঝার ক্ষমতা জন্মায়। পৃথিবীতে যত মহান কাজ হয়, তার পেছনে থাকে নির্ণয় বা সিদ্ধান্ত।

অন্য কথায়, বিচার বা সংকল্প। এই সিদ্ধান্তে বুদ্ধি থেকে আসে। বুদ্ধি আসে শিক্ষা থেকে। অর্থাৎ শিক্ষা থেকে বুদ্ধি এবং বুদ্ধি থেকে সিদ্ধান্ত। এটাই হলো মনোবিজ্ঞান। বুদ্ধির বিকাশ না ঘটলে নির্ণয় বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জন্মায় না। সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে নেতৃত্ববোধ জন্মায় না।

অর্থাৎ নেতা তৈরি হয় না। যে সমাজে নেতা নেই। সে সমাজের মানুষকে সহজে নেতিয়ে দেওয়া যায়। যে সমাজে নেতা নেই, সে সমাজে আন্দোলন গড়ে ওঠে না। আন্দোলন না হলে বিপ্লবও হয় না। বিপ্লব না হলে মুক্তি আসে না।

সুতরাং সর্বশেষ পরিণাম সূত্র-

শিক্ষা > বুদ্ধি > বিচারবোধ > সিদ্ধান্ত > নেতৃত্ব > আন্দোলন > বিপ্লব > মুক্তি। এই জন্যই বৈদিকবাদীরা মূল নিবাসীদেরকে শিক্ষার অধিকার হনন করেছিল। আর হরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর তথা অন্যান্য মহামানবেরা এটা বুঝতে পেরে শিক্ষা তথা সমাজ জাগরণের কাজ করেছিলেন।

এবার আপনাদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে আপনারা বৈদিকতা থেকে মুক্ত হয়ে মুক্তির সূত্রে কাজ করবেন না কি মুখে হরি-গুরুচাঁদের নাম নেবেন আর তাঁদের নির্দেশিত পথের ধারে কাছেও না গিয়ে বৈদিকতার গোলামি করবেন? নিজের স্বার্থে সব আত্মমর্যাদাকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের জাতি ও সমাজকে বিকিয়ে দেবেন?? নির্ণয় আপনাকেই নিতে হবে।

……………………………
গুরুচাদ ঠাকুরের সমাজসংস্কার ও মুক্তির দিশা

……………………………
আরো পড়ুন:
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: এক
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: দুই
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: তিন

শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: দুই
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: তিন

তারকচাঁদের চরিত্রসুধা
অশ্বিনী চরিত্রসুধা
গুরুচাঁদ চরিত
মহান ধর্মগুরু হরিচাঁদ নিয়ে প্রাথমিক পাঠ
হরিলীলামৃত
তিনকড়ি মিয়া গোস্বামী
শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর

……………………………
আরো পড়ুন:

মতুয়া ধর্ম দর্শনের সারমর্ম
মতুয়া মতাদর্শে বিবাহ ও শ্রদ্ধানুষ্ঠান
মতুয়াদের ভগবান কে?
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: এক
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: দুই
মতুয়া মতাদর্শে সামাজিক ক্রিয়া

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!