ভবঘুরেকথা
মতুয়া

-জগদীশচন্দ্র রায়

গুরুচাঁদ ঠাকুরের জীবনের ব্রত ছিল সমাজের অশিক্ষা, বৈদিকবাদ, কুসংস্কারের নিকষ কালো অন্ধকারকে ভেদ করে শিক্ষা, যুক্তিবাদ ও সামাজিক সংস্কারের আলোর প্রবেশ ঘটানো। তাই তিনি যেখানেই যেতেন, যে কাজ করতেন বা যে কথাই বলতেন তার মধ্যে এই আলোর কিরণ ছড়িয়ে পড়ত।

সামাজিক অনেক বাঁধার মধ্য দিয়েও তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতেন। তিনি মৃতের উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠান বা বিবাহ অনুষ্ঠান অথবা শ্রীহরিবাসরে অর্থাৎ হরিচাঁদ ঠাকুরের ধর্ম দর্শন উপলক্ষ্যে প্রচারিত অনুষ্ঠানে গিয়ে সকলকে সামাজিক জাগরণের কথা বলতেন।

শিক্ষিত হতে বলতেন। আর জানাতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যে অত্যধিক ব্যয় করা হয় সেটা পরিবার তথা সমাজের উন্নতিতে মারাত্মকভাবে বাঁধা দান করে।

শ্রাদ্ধের আসরে কিংবা শ্রীহরি বাসরে।
দয়াময় গুরুচাঁদ বলে সকলেরে।।
বোকা জাতি নম:শূদ্র নীতি নাহি জানে।
শ্রাদ্ধেতে বিবাহে ব্যয় করে অকারণে।।
ঘরে নাই অন্ন যার দেনা বহুতর।
পিতৃশ্রাদ্ধে করা চাই ‘দানের সাগর’।।


শ্রাদ্ধ নহে পেট-পূজা সাজাইয়া লয়।
এত যে কষ্টের কড়ি সব করে ক্ষয়।।
শ্রদ্ধা হলে শ্রাদ্ধ হয় শ্রাস্ত্রের প্রমাণ।
মূলতত্ত্ব নাহি জানে যতেক অজ্ঞান।।

তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় পণপ্রথা ছিল সমাজের একটা গম্ভীর সমস্যা। যদিও বর্তমানে এর সমূলে বিনাশ হয়েছে সেটা বলা যাবে না। বিবাহে পণপ্রথার বলি হয়ে গরিব সংসারের পিতামাতার দৈন্যতা আরো প্রকট হয়ে উঠত, যে ব্যবস্থা ছিল সমাজের প্রগতির পক্ষে অন্তরায়। তাই গুরুচাঁদ ঠাকুর এই পণপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন সমাজকে সঠিক দিশা দেওয়ার জন্য।

তিনি বলতেন, যারা এই সব অনুষ্ঠানে সাধ্যাতীত ব্যয় করে, আসলে তারা বোকা লোক। দুটো পরিবারের দুটো জীবন একত্রে চলার জন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে যেখানে, সেখানে তাদের সেই দাম্পত্যের বন্ধন কীভাবে সুদৃঢ় থাকবে, তারা কীভাবে সংসার জীবন সুখে শান্তিতে অতিবাহিত করবে, তাদের মিতব্যয়িতায় কীভাবে একটা সুন্দর পরিবার গড়ে উঠবে, সেসব বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা যেতে পারে।

কিন্তু নিজের ইচ্ছায় হোক বা সমাজের চাপে হোক, বিবাহের কাজে নিজেদের সামর্থ্যের ঊর্দ্ধে গিয়ে ব্যয় করে। যার পরিণতি স্বরূপ ঐ পরিবার চরম আর্থিক অনটনের কারণে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যার প্রভাব পরিবার ও সমাজের প্রতি পড়ে। সেজন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর এই সব অনুষ্ঠানের ব্যয় কমানোর জন্য উপদেশ দিতেন।

মৃতের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ (শ্রদ্ধা) অনুষ্ঠানে মান্যগণ্য ব্যক্তি হিসাবে গুরুচাঁদ ঠাকুরকে উপস্থিত থাকতে হত। কিন্তু সেখানের অনুষ্ঠানের ব্যয়বাহুল্য দেখে তিনি সামাজিক ভাবনায় ভারাক্রান্ত হতেন। তিনি জানতেন বৈদিক গ্রন্থগুলো তৈরি হয়েছে বর্ণবাদীদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য।

কারণ মৃতের স্মৃতির উদ্দেশ্যে যে অপ্রতুল ব্যয় করা হয় সেটা পরিবার ও সমাজের প্রগতির জন্য প্রতিবন্ধক। এর থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানাতেন এই বর্ণবাদী ব্যবস্থা বিলোপের জন্য।

মৃতের প্রতি অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তিনি (মৃত ব্যক্তি) জীবন ভরে যেসব কাজ করেছেন, সেটা পরিবার সমাজের জন্য কতটা উপযোগী; তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে পরিবার ও সমাজের কি গ্রহণীয় সেসবের আলোচনা করা দরকার।

মৃতের উদ্দেশ্যে বৈদিক ধর্ম গ্রন্থ অনুসারে জমি, গরু, সোনো, গয়না, অর্থ, খাট পালঙ্ক, বিছানাপত্র ইত্যাদি যতকিছু দান করা হত বা দান করার জন্য মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হত সে সবই পেত পূজার ব্রাহ্মণ। সেগুলো মৃতের নামে গ্রহণ করে ভোগ করত পূজারী।

যার জন্য প্রতিবাদ স্বরূপ গুরুচাঁদ ঠাকুর এই দানকারী ব্যক্তিদের বোকা বলেছেন। কারণ একটু সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করলে বোঝা যায় যে ঐ সব দানের বস্তু কিছুতেই সেই পরিবারের মৃতের কোনো উপকারে আসবে না। তবুও সেটা দান করার অর্থ অকারণে অর্থ ব্যয়।

এই বোকা ব্যক্তিবর্গ নিজেদের অবস্থাকে বিবেচনা না করেমৃতের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানে এমনভাবে ব্যয় করে যে, যা দেখে মনে হয় যেন, ‘দানের সাগর’ সেজেছে। আসলে সেটা মৃতের প্রতি তো কোনো শ্রদ্ধা জানানো হয় না, শুধু ‘পেটপূজা’র আড়ম্বরতাই হয়।

মৃতের প্রতি অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তিনি (মৃত ব্যক্তি) জীবন ভরে যেসব কাজ করেছেন, সেটা পরিবার সমাজের জন্য কতটা উপযোগী; তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে পরিবার ও সমাজের কি গ্রহণীয় সেসবের আলোচনা করা দরকার।

কারণ প্রতিটি মানুষের মধ্যে কি না কিছু ভালো দিক থাকে সেটা অন্যের জন্য গ্রহণীয় হতে পারে। সে জন্যই তাঁর স্মৃতিচারণ করা দরকার। কিন্তু মৃতের সেই পরিবার আসল তত্ত্বকে উপেক্ষা করে সাধ্যাতীত ব্যয় করে। যেটা পরিবার ও সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

ব্রাহ্মণের কূট চক্রে নিজে ক্ষয় হয়
পরিণামে করে শুধু হায় হায়।।
তাই বলি অর্থনীতি শেখ যতনেতে।
অর্থ নাহি পায় কেহ যথা তথা হতে।।
বিবাহ শ্রাদ্ধের ব্যয় কমাইয়া দাও।
সাধ্য অনুযায়ী কাজ সকলে করাও।।
(গুরুচাঁদ চরিত পৃ: ৪৫৫)

বৈদিক ধর্মের ভিত হচ্ছে- পরকার, আত্মা-পরমাত্মা, স্বর্গ-নরক, পাপ-পুণ্য ইত্যাদি। এসব এক দিকে যেমন মানুষকে লোভী করে তোলে, অন্যদিকে এসবকে উপেক্ষা করতে চাইলে ভয় দেখায়। যার ফলে মানুষ এর থেকে মুক্তির জন্য নিজের সর্বস্ব দিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়।

আর এসব করানোর মাধ্যম হচ্ছে ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণদের দ্বারা রচিত তথাকথিত ধর্ম গ্রন্থ। এই হাতিয়ারের দ্বারাই এই সব কর্ম করতে বাধ্য করে। আর এই ক্রিয়া করাতে গিয়ে যতো উপার্জন হয় সে সবই ঐ ব্রাহ্মণই ভোগ করে। যার জন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর একে বলেছেন ‘ব্রাহ্মণের কূটচক্র’।

ব্রাহ্মণদের কূটচক্র সম্পর্কে বঙ্কিমচন্ত্র কী বলেছেন দেখা যাক- ‘ধর্ম্মোপার্জ্জনের জন্য কেবল পুরোহিত মহাশয়কে দাও, গুরুঠাকুরকে দাও, নিষ্কর্মা, স্বার্থপর, কুকর্ম্মাসক্ত, ভিক্ষোপজীবী ব্রাহ্মণদিগকে দাও, আপনার প্রাণপাতনে উপার্জ্জিত ধন সব অপাত্রে ন্যস্ত কর। এই মূর্তি ধর্ম্মের নহে- একটা পৈশাচিক কল্পনা।

অথচ আমরা বাল্যকাল হইতে ইহাকে ধর্ম্ম নামে অভিহিত হইতে শুনিয়া আসিতেছি।’ (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টাপাধ্যায়, ধর্ম এবং সাহিত্য, বিবিধ প্রবন্ধ, কলিকাতা, ১৮৯২, হেয়ার প্রস, পৃ: ৭১৯-৭২০)

গুরুচাঁদ ঠাকুর ব্রাহ্মণদের কূটচক্রকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে এর থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারণ এর পরিণতি অতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মানুষ এই বৈদিক ধর্মের ফাঁদে ফেঁসে গিয়ে কাঙ্গালে পরিণত হয়।

নম:শূদ্র তথা অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর মানুষেরা এমনিতেই অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে আছে, তার উপর ঘরের ভাড়ার বাড়ন্ত; অর্থা( নুন (লবণ) আনতে পান্তা ফুরায়। এরপর যদি আবার এই বৈদিক ধর্মীয় নিয়মনীতির বোঝা চাপানো হয়, তাহলে তাদের অস্তিত্বই তো বিনাশ হয়ে যাবে।

কারণ ঐসব ধর্মীয় বন্ধন তো অনুন্নত লোকদের প্রগতির ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে প্রতিবন্ধক। সেজন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর সকলকে অর্থনীতিকে যত্ন করে শেখার কথা বলেছেন। অর্থাৎ মিতব্যয়ী হতে উপদেশ দিয়েছেন।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………………………
আরো পড়ুন:
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: এক
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: দুই
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: তিন

শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: দুই
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: তিন

তারকচাঁদের চরিত্রসুধা
অশ্বিনী চরিত্রসুধা
গুরুচাঁদ চরিত
মহান ধর্মগুরু হরিচাঁদ নিয়ে প্রাথমিক পাঠ
হরিলীলামৃত
তিনকড়ি মিয়া গোস্বামী
শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর

……………………………
আরো পড়ুন:

মতুয়া ধর্ম দর্শনের সারমর্ম
মতুয়া মতাদর্শে বিবাহ ও শ্রদ্ধানুষ্ঠান
মতুয়াদের ভগবান কে?
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: এক
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: দুই
মতুয়া মতাদর্শে সামাজিক ক্রিয়া

বিধবাবিবাহ প্রচলন ও বর্ণবাদীদের গাত্রদাহ
ঈশ্বরের ব্যাখ্যা ও গুরুচাঁদ ঠাকুর
বিধবাবিবাহের প্রচলন ও গুরুচাঁদ ঠাকুর

……………………………
গুরুচাদ ঠাকুরের সমাজসংস্কার ও মুক্তির দিশা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!