মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী

তপন বসু

“জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা ভবে।”

কবির কণ্ঠের এই উচ্চারিত বাণী, মানুষ যতোদিন এই পৃথিবীতে থাকবে, ততোদিন পুনরাবৃত্তি হবে বার বার, জন্মমৃত্যুর এই শ্বাশত কাহিনী। নিষ্ঠুর এই সত্য জেনেও আমরা স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যাথায় শোকাহত হই। তেমনি একজন স্বজন, ভাবগানের রাজা, মাগুরার কৃত্তিসন্তান মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী।

সংগীতে সুন্দরে আকুতিমিশ্রিত বাণী, যার কণ্ঠে সুরের মায়াজাল বিস্তার করে লাখ লাখ মানুষকে করেছিলো আকৃষ্ট। সেই ভাবগানের রাজা, লালন অনুসারী বাউল সাধক ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’, এই বাণীতে যিনি সপেছিলেন তার মন ও প্রাণ সেই সত্যিকারের মানুষটি হারিয়ে গিয়েছিলেন নিরবে নিস্তব্দে।

মাগুরাবাসী তথা দেশবাসী জানতে পারে নি একজন সংগীত সাধক হারিয়ে গিয়েছিলেন চিরতরে। যার কাছে ঋণ স্বীকার ছিল আমাদের সকলের। যে মানুষটি গ্রামবাংলার সোদামাটির গন্ধে মেশা সহজ সরল মানুষের অন্তর জুড়ে ছিলেন আমরণ। যার কণ্ঠের গানে ও কাব্যিকতায় ফুটে উঠতো সেই অনুরাগ।

লালন প্রিয় সেই মানুষটি লোকসংগীতকে নিয়েছিলেন জীবনের পেশা ও নেশা হিসাবে। হাজারো সংকট, অভাব, অনটনে তাকে আপন কর্ম যোগ্য হতে বিরত রাখতে পারে নি কোনোদিন। সেই সুরের সাধক মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলাধীন গোয়ালখালী গ্রামে বাংলা ১৩১৯ সালের ১৭ই জৈষ্ঠ্য জন্মগ্রহণ করেন।

পিতার নাম নিবারণ গোস্বামী। কবিয়াল এর বয়স যখন মাত্র ৪ বছর তখন তিনি পিতৃহারা হন। স্বাভাবিক কারণেই সংসার অভাব-অনটন দেখা দেয়। ৭ম শ্রেণী অব্দি লেখাপড়া করার পর কিশোর বয়সেই কর্মজীবনে ঢুকে পড়তে বাধ্য হন। কণ্ঠ ভালো থাকার কারণে কর্মজীবনের ঊষালগ্নে সিংহেশ্বর গ্রামের রাম বসু মহাশয়ের যাত্রা দলে যোগ দেন।

সেখানে এক বছর কাজ করার পর বাড়িতে চলে আসেন। পরবর্তীতে মেছের ঠাকুর হুলিহট্ট গ্রাম নিবাসী ভাসান গানের দলে নিয়ে যান। সেই দলটিও বেশ কিছুদিন চলার পর ভেঙ্গে যায়। গান পাগল মহেন্দ্র গোস্বামী এবার সাবলাট গ্রামের ভূষণ চন্দ্র বিশ্বাসের গাজীর গানের দলে যোগ দেন। উক্ত পেশায় তিনি ১০-১২ বছর ছিলেন।

গানের প্রতি অনুরাগ দেখে, ক্ষেপাচাঁদ গোস্বামী, যিনি মহেন্দ্র গোস্বামীর কাকা হতেন, একদিন বললেন- মহেন্দ্র! তুমি যে গান গেয়ে বেড়াও তাতে কোনো প্রাণ নেই। এখন থেকে তুমি ভাব গান শেখো। আমি তোমাকে শেখাবো। তরুণ মহেন্দ্রনাথের মনে ক্ষেপাচাঁদ গোস্বামীর কথাটি ভালো লাগলো।

তিনি রাজি হলেন এবং গুরুজ্ঞানে তার কাছ থেকে ভাব গানের পাঠ নিতে থাকলেন। সংগীত নামক সমুদ্রে ঢুকে সংগীত তৃষা বাড়তে লাগলো শিল্পীর। সংগীত সুধা আহরণের আশায় পরবর্তী পর্যায়ে কুশখালী গ্রামে আমিনউদ্দীন বিশ্বাসের কাছ থেকে ভাব গান শিক্ষাগ্রহণ করেন।

সংগীত ভুবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমার চূড়ান্ত পর্যায়ে জারি ও ভাব গানের গুরু ছিলেন আজাহরউদ্দিন বিশ্বাস। এই সংগীত সাধক আজীবন সংগীতকে জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেন। জীবন ও জীবিকার জন্যে একমাত্র পেশা হিসাবে ভাব গানকে বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি সংগীত ভুবনে দীর্ঘ ৫০ বছর পদচারণায় অনেক যশ খ্যাতি সম্মান অর্জন করেছেন। তার জীবদ্দশায় মাত্র তিনজন শীর্ষ করেছিলেন। তারা হলেন ছাদেক আলী (খুলনা), অশ্বিনী বয়াতি (সত্যপুর, মাগুরা) এবং নিজ গ্রামে সুরত আলী মণ্ডল। এছাড়া তিনি অন্য কোনো ভক্ত বা শিষ্য করে যান নি। (শিষ্য সংক্রান্ত তথ্য পরিবার থেকে সংগ্রহ করা)

লোকসংগীত চর্চায় আপনভোলা এই সাধক জীবনের বাকে বাকে বিভিন্ন সময়ে নৈপুণ্যতার সাক্ষর রেখেছেন অনেকবার। আঞ্চলিক বেতার খুলনায় প্রতিযোগীতামূলক ভাব গানে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ বেতার ট্রান্সকিপশন সার্ভিস আয়োজিত জাতীয় ভিত্তিক ২য় লোকসংগীত ও উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলনে লোকসংগীত পর্যায়ে অংশ নিয়েছিলেন এবং কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।

ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনছুর উদ্দিনের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের বাউল প্রতিনিধি দলের একজন হয়ে তিনি ভারত সফরে যান। ১৯৮১ সালের ১৫ই জানুয়ারি কোলকাতার ইছাপুরা অনুশীলনী ও পাঠাগারের উদ্যোগে এপার বাংলা ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক মিলন সন্ধ্যায় গুণীজন সম্বর্ধনা দেয়া হয়।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে কুষ্টিয়ার সার্কিট হাউজে বার্লিন কালচারাল ইন্সটিটিউট এর পরিচালক ম্যান্ড্রিল উইলিয়ামের সাথে মহেন্দ্র বাবুর সাক্ষাৎ হয়। তার কণ্ঠে গান শুনে ম্যান্ড্রিলস উইলিয়াম স্যার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মহেন্দ্রবাবু নিজে গান লিখতেন এবং সুর দিয়ে দর্শক শ্রোতাকে মঞ্চে গেয়ে শোনাতেন। তার লেখা গানের সংখ্যা প্রায় আড়াইশো। বিদগ্ধ পাঠক সমাজের কাছে দুইটি গানের কয়েক লাইন তুলে ধরছি-

“সাধের একতারা,
তোর লাগিয়া হইলাম পাগল পাড়া,
তার যায় জাতিকূল হয় সে বাউল রে
তোর সাথী হয় যারা।।”

“হলে মন সত্যবাদী অপরাধী যাবে কেটে
হলে সত্যের পূজারী, রয় হুজুরী
কাম কি আসে তার নিকটে
পুরুষ প্রকৃতি দোহে, ভুলো না কামের মোহে
কাম বিকার আপন দেহে যদি ওঠে
উভয় উভয় অনুগা, প্রেমের তাগা
অনুরাগে বন্ধ এটে।।”

বাউল ও জারি গানের এই একনিষ্ঠ সাধক অন্তিম মুহূর্তে কয়েকমাস ভায়না নিবাসী এডভোকেট আবদুল আজিজ সাহেবের বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। আজিজ সাহেব শিল্পীর চিকিৎসার জন্যে ব্যক্তিগত ভাবে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। এ ক্ষেত্রে মনোরঞ্জন গোঁসাই এর কথা উল্লেখ না করলেই নয়।

এই দুইজন সুহৃদ সেবা চিকিৎসা ও অর্থ দিয়ে শিল্পীর জন্যে অনুরাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তবুও অন্তিমের ডাক এলো। মহেন্দ্র গোস্বামী এডভোকেট সাহেব ও মনোরঞ্জন গোঁসাই এর কাছে জন্মভূমি গোয়ালখালীতে ফিরে যেতে চাইলেন।

জন্মভূমিতে ফিরে শেষ জীবনের ভাবগানের সহযোগী করিব শাহ কে, সন্তান এবং স্বজনদের বললেন সাধুসঙ্গের আয়োজন করতে। তারা সাধুসঙ্গের আয়োজন করলেন। কাছ থেকে ডেকে নিলেন করিম শাহ কে। আস্তে আস্তে কি যেনো বললেন তাকে, তারপর ঘোষপাড়া নিবাসী লালশশীর এই গানখানি গাইতে বললেন-

“অপরাধ মার্জনা করো প্রভু,
জন্ম জন্মান্তরে তব সংসারে
মতিভ্রম ঘটেনা যেনো কভু।।”

করিব সাঁই গানখানি গাইতে লাগলেন একতারা বাজিয়ে আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে মন প্রাণ দিয়ে। দুইচোখ বুজে গান শুনলেন ভাবক কবিয়াল। আপন মনে সবাইকে আরেকটুবার দেখে নিলেন। ১৯৮৯ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর “জন্মজন্মান্তরে তব সংসারে মতিভ্রম ঘটেনা যেনো কভু” গান ছিলো যার প্রাণ, সেই সুর, সাধক সুর সুধা পান করতে করতে চিরবিদায় নিলেন।

মাগুরা জেলা তথা দেশের একজন সংস্কৃতিক ভুবনের উজ্জ্বল নক্ষত্র হলো কক্ষচ্যুত। হাজার, লক্ষ্য ভাব গানের অনুরাগী ভক্তদের দু-চোখ কে ঝাপসা করে পারি দিলেন তিনি পরপারের শেষ আশ্রয় স্থলে।

……………………………….
তপন বসু
[ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই-এর পুত্র]
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ
প্রফুল্ল সিং আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ, মাগুরা।

….
আলোকচিত্র: ১৯৭৫ সালে মহেন্দ্রনাথ  গোস্মামী, মনোরঞ্জন গোঁসাই, লালন গবেষক ম্যানড্রিন উইলিয়াম কুষ্টয়া সার্কিট হাউজে।

……………………………….
আরো পড়ুন:
ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!