মনোমোহন দত্ত

-জহির আহমেদ

“পায় ধরে কই গুরু ভজ
যাইও না মন কুপথে,
সোজা রাস্তায় চলরে ভাই
ভবের বোঝা লয়ে মাথে।।”

ভবের বোঝা মাথায় নিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিম বা সরল-সহজ-সুপথে থেকে ও গুরুর প্রেমে মগ্ন হয়ে, পরম প্রভুর আরাধনার মাধ্যমে অসীমের সন্ধানে যারা ঘুরে বেড়ায়, তারাই বাউল-ফকির।

লালন-হাছন-মনোমোহন, বাংলার মরমিয়া জগতের তিন অগ্রপথিকের নাম। এক সময় লালনগীতি ও হাছন রাজার গানের মতোই মনোমোহন দত্তের গান বিভিন্ন মিডিয়াতে বিশেষ গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হতো। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় কালের বিবর্তনে জাতীয়ভাবে মনোমোহনের গান এখন আর সেভাবে প্রচারিত হয় না।

তবে এ কথাও সত্য, মিডিয়ায় কম প্রচার হলেও, গ্রাম-বাংলার অসংখ্য বাউলের কণ্ঠে লক্ষ-কোটি অসাম্প্রদায়িক ভাবের মানুষ বিভোর হয়ে ও ভক্তিভরে তাঁর গান ঠিকই শ্রবণ করে চলছে। লালন, হাছন, মনোমোহন, রাধারমণ, বিজয়, জালাল খাঁ, শাহ্ আবদুল করিম তাঁরাই আমাদের প্রাণ, আমাদের আসল পরিচয়।

এই সকল মহতেরা তাঁদের বাণী ও সুরের মধ্য দিয়ে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর মায়ায় ভুলে থাকা মানুষের মাঝে সত্যজ্ঞানের আলো জ্বেলে দেন। তাঁদের গান ভক্তের হৃদয়ে প্রভুর প্রতি প্রেম জাগায়, মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়।

পরিতাপের বিষয় আমরা আদৌতে মিছে মায়ার বাঁধন থেকে মুক্তি পেতে চাই না। আমরা নিজেদেরকে মুক্ত মানুষ ভাবতে চাই না। আমরা চিরদিন ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস, অপব্যাখ্যা ও কুসংস্কারে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চাই। তাই মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েও মনুষ্যত্বের মর্যাদা আমরা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছি।

বর্তমানে আমরা মানুষ না হয়েই, হিন্দু বা মুসলমান হয়ে ধর্মের বড়াই করি। অহংকার করার একমাত্র অধিকারী যদিও মহান আল্লাহ, তবু ধর্মের নামে আমরা মানুষেরাই অহংকারের নিশান উড়িয়ে বেড়াই।

আমরা সত্যকে ধারণ করি না-ধর্মের বুলি আওড়াই মাত্র। আমরা মানুষকে ভালোবাসি না, ঘৃণা করি। আমরা অসহায় পাপীতাপীকে দয়া করি না, গরিমা ও অহংকারে দূরে ঢেলে দেই।

কিন্তু লালন-হাছন-মনোমোহন-রাধারমণরা তা করেন না। তাঁরা আত্মতত্ত্ব জ্ঞানী ও দরদী-প্রাণ, তাঁরা মানুষকে ভালোবাসেন। তাই যুগে-যুগে তাঁরাই সর্ব ধর্মের মানুষের অনুসরণীয়।

মনোমোহন, রাধারমণ, দ্বিজদাস, বিজয়, তাঁরা যত মহৎ সৃষ্টিই আমাদের জন্য রেখে যাক না কেন, আমাদের ধর্মান্ধ সমাজ তাঁদেরকে উপেক্ষা করবেই। এ বিষয়ে যদি নিশ্চিত তথ্য থাকতো যে, লালন ফকির হিন্দু ঘরেই জন্মেছিলেন; অথবা তিনি সাধক সিরাজ সাঁইয়ের কাছে যদি বায়েত না হতেন; তবে এতদিনে লালনও আমাদের মুসলিম সমাজের কাছে প্রায় অপাংক্তেয় হয়ে যেতেন।

মনোমোহন তাঁর একটি গানে বলেছেন:

“বিবেক বুদ্ধি হারাইয়ে হাত বাড়ায়ে ডাকিস কারে,
লাগ পাবি না অনেক দূরে।
যার জন্য তোর ডাকাডাকি, তার সনে তোর মাখামাখি,
খুলে দেখ তোর জ্ঞানের আঁখি বাকির ঘরে ওশল পড়ে।।”

প্রসঙ্গক্রমেই একটি বিষয়ে শ্রদ্ধেয় পাঠক বৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। বিষয়টি হলো: রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-সঙ্গীত নিয়েও এক সময় এদেশে কম ষড়যন্ত্র হয়নি। সে ষড়যন্ত্র যে এখন শেষ হয়ে গেছে, তা ভাবারও সুযোগ নেই। কারণ, সমাজে ধর্মীয় হিংসা-বিদ্বেষ যতদিন থাকবে, এসব চলতেই থাকবে। একটি শ্রেণি আজো রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে বাংলা সাহিত্যকে বিভাজিত ও কলুষিত করতে সচেষ্ট। তারা অজ্ঞ বাঙালিদের কাছে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মনগড়া অপপ্রচার চালিয়েই যাচ্ছে।

নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালে, আর রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পান ১৯১৩ সালে। তবুও অনেক বাঙালি মুসলমান বিশ্বাস করে- ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নজরুলকে বঞ্চিত করে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরষ্কার বাগিয়ে নিয়েছেন (যদিও ১৯১৩ সালে নজরুলের বয়স মাত্র ১৪)।

অসংখ্য শিক্ষিত বাঙালিও এসব বিদ্বেষপ্রসূত অপপ্রচার আজো অন্ধভাবে মেনে নেয়। ধর্মান্ধ বাঙালি মুসলমানের বিদ্যাশিক্ষার দৌঁড় এতটুকুই! ধর্মান্ধতার কারণে তারা সত্য ও বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারে না। ধর্মের বিধি-বিধানে যেহেতু আসলে নকল কিংবা সহিতে জইফ বা জাল প্রবেশ করেছে, তাই ধর্মান্ধ না হয়ে প্রভুর প্রতি অটল বিশ্বাসী হওয়া মানবতার জন্য মঙ্গলজনক।

মহর্ষি মনোমোহন দত্ত বাংলার মরমী সাধকদের মধ্যে এক অমূল্য রত্ন। তিনি জন্মেছিলেন ১২৮৪ বাংলা সনের ১০ মাঘ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার সাতমোড়া গ্রামে। ১৩১৬ সনের ২০ আশ্বিন অল্প বয়সেই তিনি দেহত্যাগ করেন। তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩১ বছর ৭ মাস।

মৃত্যুর পর সাতমোড়া গ্রামে তাঁর সাধনপীঠ বেলতলায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর জন্মতিথি ১০ মাঘে প্রতি বছর মহা সমারোহে ভক্ত-অনুসারিদের মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে দেশখ্যাত জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গও উপস্থিত থাকেন।

মনোমোহন দত্ত কিছু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন ধর্ম ও সাহিত্য বিষয়ে প্রচুর অধ্যয়ন করেন। স্বল্পায়ু জীবনে তিনি ‘মলয়া-১’ ও ‘মলয়া-২’ নামে দুটি মরমী সঙ্গীতগ্রন্থ ছাড়াও ‘তপোবন’, ‘উপবন’, ‘নির্মাল্য’ নামে তিনটি কাব্যও লিখেছেন।

এছাড়া ‘প্রেমপারিজাত’, ‘প্রীতি কদম্ব’, ‘পথিক’, ‘সত্যশতক’, ‘আলেয়া’, ‘ময়না বা পাগলের প্রলাপ’, ‘যোগ-প্রণালী’, ‘পাথেয় বা সঙ্গের সম্বল’ ”খনি’, ‘সর্বধর্ম তত্ত্বসার’ নামে আধ্যাত্ম-বিষয়ক মহামূল্যবান গদ্যগ্রন্থগুলোও লিখেছেন। তাঁর ‘লীলারহস্য’ নামের আত্মজীবনীটি আধ্যাত্মিক বিষয়ে চিন্তাশীল মানুষের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি গ্রন্থ।

তিনি প্রায় এক হাজারের বেশি গান লিখেছেন। মলয়া’র গানগুলো সর্বধর্ম সঙ্গীত, শ্যামা সঙ্গীত, শিব সঙ্গীত, কৃষ্ণ-বিষয়ক সঙ্গীত, ইসলামি সঙ্গীত, ইত্যাদি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত।

মনোমোহন দত্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার অন্তর্গত কালিকচ্ছ গ্রামের শ্রী আনন্দস্বামীর কাছে শীষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় গভীর মনোনিবেশ করেন। তিনি একসময় চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার শরীফে গিয়ে বিশিষ্ট সুফি সাধক আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (র) এর নিকট থেকেও তরীকত বিষয়ে তালিম নেন ও তাঁর অনুগ্রহ লাভ করেন।

অবশেষে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে তিনি সাতমোড়া গ্রামে সর্বধর্ম ‘আনন্দ আশ্রম’ গড়ে তোলেন। উল্লেখ্য যে, উপমহাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বড় ভাই উস্তাদ আপ্তাউদ্দীন খাঁ মহর্ষি মনোমোহন দত্তের অন্যতম নিষ্ঠাবান ভক্ত ছিলেন।

মনোমোহন বাংলার আধ্যাত্মিক সাধকদের মধ্যে এক অবিস্মরণীয় নাম। উচ্চ পর্যায়ের এক ক্ষণজন্মা তাপস ছিলেন তিনি। তাঁর রচিত গানগুলো লোক সঙ্গীতের এক অমূল্য রত্ন। মনোমোহন একেশ্বরবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর গান এক আল্লাহ বা পরমেশ্বরের ভাবে সমৃদ্ধ, তাঁর প্রেমেই রঞ্জিত। মনোমোহন পরমতত্বের এক গানে লিখেছেন-

“অদ্বৈত অদ্বৈত বিশিষ্ট অদ্বৈত,
তোমারে কে জানে, করে মতদ্বৈত।
যা আছে জগতে বৈধ কি অবৈধ,
কর্তাকর্ম তুমি তোমারি বিধানে।
অখণ্ড অসীম, পরম অব্যয়,
খণ্ডজ্ঞানে লণ্ডভণ্ড সমুদয়,
একেরি কাণ্ড বিশ্ব ব্রহ্ম অণ্ড,
প্রকাণ্ডেতে খণ্ড ভাবে ক্ষুদ্র জ্ঞানে।।”

সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই মহান মনীষী তাঁর গানে মরমী সাধনার মাধ্যমে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণীও শুনিয়েছেন-

“কও দেখি মন আমার কাছে, তুমি হিন্দু না মুসলমান,
আল্লা না হরি তোর ঠাকুর বটেরে,
তুই কে তোর মনিব কেরে কররে ইনসান।
তুমি আমি আদি যত কায়া আছে,
কে বিরাজে বল এ সব কায়ার মাঝে।
প্রাণে প্রাণে টানে টানে জাত বিচার নাই দেখি প্রমাণ।অ”

বাউলগণ গুরুবাদী এবং তারা দেহকেন্দ্রিক সাধন-ভজনে বিশ্বাসী। বাউল-সম্রাট লালন সাঁই বলেছেন- “যাহা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, তাহা আছে এ দেহভাণ্ডে।” দীক্ষাগুরুর প্রতি নিষ্ঠাবান হয়ে দেহতাত্ত্বিক সাধনার মাধ্যমে তারা আরশিনগরের পড়শির সন্ধান করেন।

গুরু বা পীরকেই তারা পরমেশ্বর বা আল্লাহ-রাসুলের প্রতিনিধি মনে করেন। পার্থিব বিষয়-আশয় কিংবা বাদশাহি-জমিদারি তাদের কাছে তুচ্ছ। আমিত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ও গুরুপ্রেমে মত্ত হয়ে তারা প্রভুকে সন্তুষ্ট করতে চায়। ‘মলয়া’র একটি গানের সুর ও বাণী-

“অমূল্য ধন গুরুর চরণ, কাঙালে লইয়া খেলায়,
কইবো কি তার প্রেমের কথা,
কইতে না জুয়ায়।
রাজা-বাদশা পায়না তারে, সামান্য ধনের বিকারে,
কাঙাল সে ধন তুচ্ছ করে- সদানন্দে দিন কাটায়।।”

বাউল গানকে বলা হয় বাণীপ্রধান গান। বাউলরা সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তেমন শিক্ষিত হয় না। বর্তমানেও তাদের অধিকাংশই অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বা স্বল্পশিক্ষিত। প্রকৃতি ও জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই আল্লাহতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, নবী-রাসুল ও মুনি-ঋষি-আওয়ালিয়ার জীবন ও বিরহ-বিচ্ছেদের গানে প্রচলিত লোকসুর আরোপ করে গ্রামীণ শ্রোতাদের তারা রাতভর ভাবে মাতিয়ে রাখে।

মহর্ষি মনোমোহনের ‘মলয়া’ গানের একটি বিশেষত্ব হলো, বাণীর সাথে এই গানগুলোতে রয়েছে সুরের বৈচিত্র্য। কারণ, মনোমোহন-শিষ্য সুরের জাদুকর উস্তাদ আপ্তাউদ্দিন খাঁ ‘মলয়া’র গানগুলোতে সুরারোপ করেছেন। প্রতিটি গানের সাথে তাই -তাল-রাগিণী উল্লেখ করা আছে। বাউলদের গানে এ বিষয়টি বিরল। তাই ‘মলয়া’র গান সুর ও বাণীর ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে সব শ্রেণির শ্রোতার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে।

(রাগিণী মনোহরসাই- তাল ঠুংরি)
“বারে বারে চাই যে আমি,
মনটি আমার দিতে তোরে।
হায় কি করি, দিতে নারি,
পড়েছি এক বিষম ফেরে।।”

মনোমোহনে গানগুলোর শব্দচয়ন, ভাষার প্রকাশভঙ্গী ও সুর স্বতন্ত্র। তাই শ্রোতাদের মধ্যে সেগুলো অনবদ্য আবেদন সৃষ্টি করে। নিরপেক্ষভাবে বলছি, এমন মার্জিত ও আবেগময়ী প্রকাশভঙ্গীর বাংলা গান সত্যিই বিরল।

“খুলে দাও শান্তির দুয়ার।
কাছে বসে থাক তুমি সর্বদা আমার।
করাঘাতে হাতে বেদনা প্রচুর,
ডেকে ডেকে বুকে বেজে গেছে সুর,
নিশি ভোর ভোর, হ্যারে চিত্তচোর,
বড়ই কঠোর অন্তর তোমার।।”

সৃষ্টির আদি থেকে অনাদি-অনন্তকে জানার-বোঝার আকাঙ্ক্ষা মানব-মনে রয়েছে। কালেকালে আকার-সাকার-নিরাকার, কতভাবে তাঁর পরিচয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে! তাঁর অস্তিত্বের ঘোষণা দিতেই যুগ-যুগে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ; কোরান-পুরান, ত্রিপিটক, বাইবেল, বেদ-বেদান্ত।

তাঁকে জানতে, তাঁর সন্ধান পেতে কত মত, কত পথ। সাধনায়-ধ্যানমগ্নতায় কতজন বছরের পর বছর আশ্রয় করে থেকেছেন কত বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত! কিন্তু সবকিছুই বৃথা- যদি কৃপাময়ের কৃপা না হয়। মলয়ার একটি বন্দনামূল গানের অংশ-

“তুমি না জানাইলে তোমারে কে চিনে আর কে জানে,
ষড়-দরশনে না পায় দরশন, অন্ত না পায় বেদ-পুরাণে।
অবধি হইতে পর্যন্ত পর্যন্ত, তব মহিমার নাহি আছে অন্ত,
অনাদি অনন্ত, সর্ব পরিব্যাপ্ত, জুড়িয়ে রয়েছ ক্ষিতি বিমানে।
বহুরূপী ভাবে স্বভাব তোমার, ভাবিয়ে কে পাবে অকূলে কিনার।
তুমি হবে যার, হৃদয়ে তাহার, জানাইয়ে দাও আপনি আপনে।
কৃপাহি কেবল, সত্য এ ভুবনে।।”

মানুষ জীবাত্মা, সে পরমাত্মারই অংশ। তাই পরমই জীবের আসল আত্মীয়, আসল আপন, প্রভু। আমি তাঁর পোষাপাখির মতো। আমাকে সে হাসায়-কাঁদায়। মনোমোহনের ভাষায়-

“আমি তোমার পোষাপাখি ওহে দয়াময়।
তুমি আমার মন মহাজন, সদয় নিদয়।
আমি তোমার পোষাপাখি, যা শিখাও তাই শিখি।
যা করাও তা করি আমি, আমি আমি কেহ নয়।
সংসার পিঞ্জরে তুমি,— রেখেছ, রয়েছি আমি;
সুখ ভোগে আশ মিটে না, ছুটিতে চাহে হৃদয়।
আমারে লইয়া তুমি, খেলা কর দিবা যামী;
হাসাইলে হাসি আমি, কান্দা(ই)লে কান্দিতে হয়।
চালাইলে চলি আমি, বলাইলে বলি আমি;
তুমি আমি আমি তুমি, দেহ আত্মপরিচয়।।”

পরমাত্মা সর্বত্র বিরাজমান। তাই মানুষ তার সত্তায়, চেতন কিংবা অবচেতনে পরমের আকর্ষণ অনুভব করে। ইশারায় ও সুরেসুরে সে তাঁর ডাক শুনতে পায়। পরমের ভাবনায় মানুষ যতই গভীরে যেতে থাকে, ততই রহস্যের দরোজা উন্মোচিত হয়।

“কে যেন আমারে, অতি সাধ করে,
হাত দুখানা ধরে কাছে টেনে নিতে চায়।
মন মাঝে যেন কার ডাক শুনা যায়।…
অবহেলা করি দৌঁড়াইয়া যাই,
চৌদিকে নেহারি, কিছু নাহি পাই,
ফিরে এসে কাছে, দেখি হৃদিমাঝে
দাঁড়াইয়া আছে আমার অপেক্ষায়।।”

সৃষ্টিজগৎ নশ্বর ও পরিবর্তনশীল। এখানে কেবল ভাঙা ও গড়ার খেলা। সকল সৃষ্টিই এখানে ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে বিলীন হয়ে যায়। জন্ম-মৃত্যু ও সুখ-দুঃখে আমরা উৎফুল্ল কিংবা বিষণ্ণ হলেও সেই উদাসী কারিগর, তিনি কিন্তু চিরকালই নিরাসক্ত। এই সত্যকে উপলব্ধি ও সৃষ্টির আসক্তি থেকে মুক্তির চেষ্টাই সাধকের প্রথম সোপান। এ প্রসঙ্গে মলয়ার একটি গানের অংশ-

“দেখে আমি তাজ্জব হয়েছি।
তোমার কর্ম কেবল আর কিছু নয়,
আঁকা আঁকি মুছামুছি।
শিশুর মতো কলম লয়ে, নানা রঙের কালি দিয়ে,
এ ব্রহ্মাণ্ড কাগজ পেয়ে লেখতেছো সব ভোজের বাজী।।”

মলয়ার হাজার গানে যে সুরের বাণী মহর্ষি মনোমোহন আমাদের জন্য রেখে গেছেন, ধর্মমত নির্বিশেষে আধ্যাত্মিক জগতের মানুষের কাছে তা চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। ইতোমধ্যে আমাদের প্রাণ যদি শুকিয়ে গিয়ে থাকে, প্রাণের প্রাণকে হারিয়ে আমরা যদি জন্ম-মরণের যাতনায় নাজেহাল হয়ে থাকি, চলুন- পরিত্রাণ পাওয়ার মন্ত্রটি একবার মহর্ষি মনোমোহনের কাছ থেকে খুঁজে নেই-

“চোখের জল আর প্রাণের টান, তা বিনে কি মন্ত্র আছে
আঁখি নীরে টেনে আন প্রাণের প্রাণ কাছে,
আভাস পেয়ে মনোমোহন, গাছতলাতে করছে রোদন
ছুটবে কি তার কর্মবন্ধন, জন্ম মরণ যাবে ঘুচে।।”

এই জন্ম-যাতনা ও কর্মবন্ধন ঘুচানো সহজ কথা নয়। মরণের কিছু আগেও যদি প্রভুর কৃপা হয়, যদি পরিত্রাণ পাওয়া যায়, তা হবে জনম-জনমের আরাধনার ফল। এ বিষয়ে মহর্ষির মর্ম বিদারী বাণী-

“যেদিন আমার ভব লীলার হবে অবসান,
তার কিছু পূর্বে, মায়ামুক্ত করে দিও ভগবান।
এ ভিক্ষা তোমার কাছে, এ দাস কাতরে যাচে,
টানাটানি করে যেন, ছিঁড়ে নাহি যায় প্রাণ।
যেদিন আমার ভবলীলার হবে অবসান।”

এই আধ্যাত্মপুরুষ ২৭ ভাদ্র ১৩০৮ বঙ্গাব্দে পরিবারের ইচ্ছায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলাস্থ ছয়ফুলা কান্দি গ্রামের দীননাথ দত্তের কন্যা সৌদামিনী দত্তের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের সাতবছর পর ২৭ আশ্বিন ১৩১৫ বঙ্গাব্দে তাদের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন পুত্র সুধীরচন্দ্র দত্ত।

সুধীচন্দ্রের এক বছর বয়সে পিতা মনোমোহন ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে যান। তিনি চলে যাওয়ার পর, তাঁর স্ত্রী সৌদামিনী দত্ত আনন্দ আশ্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করন এবং মনোমোহনের বাণী প্রচারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

সে সময় আনন্দআশ্রম ও মনোমোহনের চিন্তা-চেতনার দ্রুত প্রসার ঘটতে শুরু করে। সৌদামিনী দত্তের পর তাঁর পুত্র সুধীরচন্দ্র দত্ত এই গুরুভার গ্রহণ করেন। সুধীরচন্দ্রের দেহত্যাগের পর তার পুত্র বিল্বভূষণ দত্ত ও তার স্ত্রী শংকরী দত্ত এই ধর্মসাধনা ও আনন্দআশ্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

প্রতিবছর ১০ মাঘ তারিখে আনন্দ আশ্রমে মহর্ষির জন্মদিন জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। এই বিশাল আয়োজন দেশ-বিদেশের মহর্ষির ভক্তবৃন্দের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই আমন্ত্রিত এই আয়োজনে।

………………………………
মহর্ষি মনমোহন দত্তের গানের কথা
মহর্ষি মনমোহন দত্তের জন্মবার্ষিকী উৎসব

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!