ফকির লালন

বাংলা ভাষাভাষীদের স্রষ্টা প্রেরিত পথপ্রদর্শক ঐশী বার্তাবাহক মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির দোলপূর্ণিমা’২০

মনের গরল যাবে যখন,
সুধাময় সব দেখবি তখন।।

“আমি প্রত্যেক বার্তাবাহককে তাঁর স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের সামনে তাঁরা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে বুঝাতে পারে।” (সূরা- ইব্রাহীম)

কালীগঙ্গার জলে ফাল্গুনের সূর্য প্রতিফলিত। তার তেজে ম্রিয়মাণ বৃহ্ম লতা। সূর্য ফুরসত দিলেই হাওয়ারা জেগে উঠবে। এমনি তিথিতে ছেঁউড়িয়ার কালীগঙ্গার ঘাটে ভিড়লো এক মৃতপ্রায় যুবক। সারা শরীরে তাঁর প্রাণঘাতী বসন্ত। অতি দারিদ্র মলম শাহ্ এবং মতিজান ফকিরানী যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

কী করবেন এই যুবককে নিয়ে। কিছু ভেবে পান না। অবশেষে সংবিৎ ফিরে পেলেন। মানুষ ভজার ব্রত নিয়ে তুলে আনলেন মৃতপ্রায় যুবককে। দোল পূর্ণিমার চাঁদ সেই ব্রতচারীর আরাধনা দেখে ধন্য হয়ে উঠলো। দারিদ্র দম্পতির সেবা শুশ্রূষায় আরোগ্য লাভ করলেন সেই অচিন মানুষ।

নিঃসন্তান দম্পতি আপন ঘরে স্থান দিলেন অচেনা মানুষকে। নিজেদের ঘরে পালিত করে জগৎ যার মাধ্যমে আলোকিত হবে জেনে নাম দিলেন ‘লালন’। মতিজান আর মলম শাহ্’র পালিত পুত্রই জগৎময় আলোকিত করে তুললেন।সত্যের সন্ধানে আর জাত-পাত উপেক্ষা করে লালন হয়ে উঠলেন স্রষ্টার সৃষ্টির এক মাত্র অসাম্প্রদায়িক মানবতার বার্তাবাহক।

“এমন কোন জাতি নেই যার কাছে সতর্ককারী (নবী/বার্তাবাহক) আগমন করেন নাই।”(সূরা-ফাতির)

মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি বলেন-

“অকৈতব সে ভাবের কথা
কহিতে লাগে প্রাণে ব্যাথা
আমিও যদি না কয়;
জীবের নাইকো নিস্তার
আমি কয় সে জন্যে।।”

তাই জীবের মুক্তির জন্যে সাঁইজি আরো বলেন- “সময় গেলে সাধন হবে না…” আর সাধনার সময়ই হলো তারুণ্যের সময়, তাই এই সময়কে কাজে লাগাতে হবে।

সাঁইজি সাধনার সময় পরম দয়ালুর স্বরূপ সন্ধান করতে থাকেন। পরম করুনাময়ের তিনি এক নতুন নাম দিলেন ‘মনের মানুষ’। মনের মানুষকে তিনি খুঁজে ফিরলেন জাগতিক মানুষের ভিড়ে-

“ভবে মানুষ-গুরু নিষ্ঠা যার
সর্বসাধন সিদ্ধ হয়।
নদী কিংবা বিল বাওড় খাল
সর্বস্হলে একই সে জল
একা মোর সাঁই আছে সর্ব ঠাঁই
মানুষে মিশে সে হয় রূপান্তর।।”

মানুষ যখন বুঝতে পারে যে, মানুষের মধ্যেই অচিন সাঁই বসত করে তখন সে আর কোনো বিগ্রহের পূজা করে না। সাঁইজি বলেন, যার দিব্যজ্ঞান উদয় হয়েছে সে মাটির ঢিবি, কাঠের ছবি দেখে ভুলে যায় না। নানার রূপ ফন্দি ফিকির, ভূত বিশ্বাস, পেঁচা পেঁচি আলা ভোলায় বিশ্বাস প্রভৃতি হলো মানুষকে চিনতে না পারার ফল।

যেজন মানুষ রতন চেনে সে এই সকল ফাঁকা ভোকায় বা অনর্থক বিষয়ে ভোলে না। মানুষ যখন মন প্রাণ ভক্তি নিয়ে নিজ মুর্শিদ/গুরুর চরণে থাকে তখন তার গুরুই তার সব কিছুর কাণ্ডারী হয়, তাই সাঁইজি বলেন-

“দয়াল নিতাই কাউকে ফেলে যাবে না,
তুমি ধর চরণ ছেরো না।।”

মানুষ তার নিজের মধ্যেই এক সূক্ষ্ম নরক বহন করে ফিরছে। যে নর আদি মানব এবং তাে স্রষ্টার গুণাবলী বহন করে ফিরছে। প্রতিটি মানুষ স্রষ্টার পরশ পেয়েছে। আবার প্রতিটি মানুষের মধ্যে স্রষ্টা বর্তমান। তাইতো কোরানে বলা হয়েছে-

“আল্লাহ রঙে(গুণে) রঙিন হও।” (সূরা-বাকারা)

মানুষ ভজনার মধ্যে দিয়েই এই স্রষ্টার ভজনা সম্ভব। তাইতো সাঁইজি বলেছেন-

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।”

প্রতিটি মানুষ তাঁর গুরু/মুর্শিদের নির্দেশনায় জীবন যখন পরিচালিত করে তখন সেই পরম প্রভুর সান্নিধ্য পাই, তাই এই দোলে-

“গুরুর রঙে রঙিন হয়ে মিশে যাও গুরুতে
তারপর সেই রঙে রঙিন করো জগৎকে।”

সাঁইজি বলেন-

“যেই মুর্শিদ সেইতো রাসূল
ইহাতে নাই কোনো খোদাও সে হয়।”

(অসমাপ্ত)

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!